somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ক্যাকটাসে ফুল , এক ধূসর পান্ডুলিপি

১২ ই জুলাই, ২০০৯ সকাল ১১:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বৃহস্পতিবার আজ , সুষমা বের হয় নিউমার্কেটের উদ্দেশ্যে । কত সপিং মল হয়েছে এখন , চোখ ধাঁধানো রূপ তাদের ; ক্রেতা বিক্রেতারাও অপরূপ ! সেখানে গেলে তেমন আপন মনে হয় না যেমন মনে হয় নিউমার্কেটে গেলে । নানাবাড়ীর পুরোন এক পা ভাঙ্গা নড়বড়ে জলচৌকীটার মত ; নতুন নতুন চেয়ার এসেছে , কিন্তু গেলে সেই জলচৌকীর খোঁজ । বসবার আসন নয় শুধু , স্মৃতিরও আসন ; পুরোন দিন , অভ্যাস -- এ সব যে ফেলনা নয় সেটা জলচৌকীটার কাছে গেলে বোঝা যায় । নিউমার্কেটে ভীড় বেড়েছে আগের চেয়ে । সাদা- কাল শাড়ী পরা সুষমা লম্বা মালাটা জড়িয়ে নিতে ভুলেনি কাল পাথরের ; মন ভাল রাখতে সাজগোজ করে সে ।
দুপুর গড়িয়ে গেছে , গেট দিয়ে ঢুকতে হালকাই মনে হয় ভিতরটা । বইয়ের দোকানে গিয়ে পেয়ে যায় বই দুটো যার খোঁজে আসা। বেরিয়ে বাঁ দিকে মোড় নিয়ে চলতেই পা পিছলে যায় , পড়ে গিয়েছিল প্রায় ; কে যেন ডান কাঁধের কাছে শক্ত করে ধরে ফেলে , ভু-পাতিত হতে দেয় না । সোজা হয়ে দাড়াতে দাড়াতে বলে ,ধন্যবাদ আপনাকে ,পড়ে যাচ্ছিলাম । তাকিয়ে দেখে বাদল , দেখে দু'চোখে স্পষ্ট দেখে তবু বিশ্বাস করতে পারে না । সুষমার কন্ঠনালী কে যেন চেপে ধরেছে , বোধশূন্য , ভরশূন্য মনে হয় নিজেকে । বাদল একপাশে সরে দাড়ায় , ওকেও বলে সরে দাড়াতে । সুষমার মনে হয় ওর হৃদপিন্ড বারে বারে পাঁজরে সজোরে আঘাত করছে ! বাদল হাত বাড়িয়ে বইয়ের প‌্যাকেটটা নেয় ; ফ্যাকাশে সুষমাকে দেখে বুঝতে পারে হয়তো ওর শক্তিহীন এই দাড়িয়ে থাকা । বলে , চল সুষমা কোথাও বসি । বাইরে বেরিয়ে এসে কাছের এক চাইনীজে গিয়ে বসে ওরা । খাবার অর্ডার দিতে চাইলে সুষমা বলে , ড্রিঙ্কস ওনলি । প্রথম সুষমার কথা শুনতে পায় বাদল । বাদল নুডলসএর অর্ডার দেয় সাথে ।
বাদল পরিবেশ হালকা করতে বলে , আজ তো পড়ে যেতে , পা ভাঙ্গতো ; আমি না ধরলে ।
সুষমা বলে ,তুমি তো আমার ছায়াসঙ্গী , এতদিন জানি এই তুমি পতনোন্মুখ আমাকে বার বার রক্ষা কর , পড়তে দাও না । তবে পড়ে যাবার কারন কি তুমি নও ? আমাকে অন্যমনস্ক করে রাখবার দায় তোমার , আর কারো নয় । তুমি এখন এখানে ? কিভাবে ?
বাদল জানায় একটা জরুরী কাজে আসতে হয়েছে দেশে , আগামী পরশু চলে যাবে । বলে , বলাকার ওদিকের গেট দিয়ে ঢুকেছি আমি , পেছন থেকে একজনের চলার ভঙ্গী দেখে তোমার কথা মনে হয়েছিল , ভেবেছিলাম ভুল দেখেছি । এখন বুঝতে পারছি ঠিক তোমাকেই দেখেছিলাম । বিপরীত দিকে গেলে দেখতে পেলাম ।
সুষমা বলে , নিউমার্কেট গোলাকৃতির দেখনা , একসাথে নাই বা চললে , বিপরীতমুখী চললেও সাক্ষাৎ ঘটে যায় , ধাক্কাও লেগে যেতে পারে । পৃথিবীটাও গোল , গন্ডগোল সেখানেই ; চলতে চলতে ধাক্কা লেগে যায় , মর্মে সে আঘাত স্থায়ী হয়ে গেলে মরন ! আগুন জ্বলতেই থাকে আজীবন !

ঠান্ডা পানীয়তে চুমুক দিতে গিয়ে দেখে সুষমা তার হাত কাঁপছে । বেমানান লাগল কিনা বোঝার ধৈর্য্য থাকে না তার , সে টেবিলে কপাল ঠেকিয়ে বসে থাকে । কেন , কেন দেখা হল বাদলের সাথে ? এই সেই জন -- বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ লুকিয়ে ফেলল নিজেকে , শত অনুরোধেও সাড়া দিল না বাদল ।
কিছুদিন আগে বার বার উদ্যোগ নিয়ে শেষে বন্ধু ফাহিমাকে কিছু কথা না বলে পারে নি সুষমা বাদলের এবারের ব্যাপারে , দূর দেশে বসেও বাদলের প্রভাবে তার স্বাভাবিক জীবনে ঝড় , তোলপাড় সকাল দুপুর ভোর ।
বিপর্যস্থ সুষমাকে দেখে ফাহিমা মন খারাপ করল , তাকে খুলে বলাতে ফাহিমা আপসেট হয়ে গেল , সে সুষমার ডায়েরীতে যত্নে রেখে দেয়া বাদলের নিজ হাতে লেখা ফোন নম্বর কলম দিয়ে কেটে দিল , সুষমার অনুরোধে তার নামটা থাকল শুধু অক্ষত । এই সে বাদল , কোমল আশ্রয় সুষমার , কত কতবার আশ্রয় নিয়েছে মনে মনে সুদূরে থাকা বাদলের কাছে জানতেও পারেনি বাদল , পারেনি অন্য কেউ । অনেক পরে অস্বচ্ছভাবে যা জেনেছে সুষমা তা হল , বাদলের পারিবারিক জীবনে সুষমা একটা কাঁটা হয়ে আছে বিনা আয়োজনে , বিনা ছিদ্র অন্বেষনে ।
ফাহিমা সব শোনবার পরে কদিন ধরে চিন্তিত ।
বলল , আমার টেনশন হচ্ছে , তুমি যেমন চাপা স্বভাবের তোমাকে আমি চিনি ; ভাবছি বাদলের রহস্যময় আচরনে তুমি যেমন স্ট্রেসফুল কন্ডিশনে আছো ভয় পাচ্ছি তোমার কোন শারিরীক সমস্যা হয় কিনা ! কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছি না ; বলেছি তোমাকে বিষয়টা ভুলে যেতে ; পরস্পর তোমরা আজ এতদূরের অধিবাসী যে মীমাংসা সহজ নয় । বুঝতে পারছি বলা সহজ তবে তোমার পক্ষে ওর এহেন জটিল আচরন মেনে নেয়া দু:সাধ্য । আমার ভাল লাগছে না , তোমাকে সাইকিয়াটিস্টের নিয়েও লাভ হবে না , তুমি তো ঘুমের ওষুধ খেতে শুরু করেছো , ঘুমুতে পারছো না ।
আরো বলল , আমি বাদলের সাথে ফোনে কথা বলি , আমার মনে হয় এটাই একমাত্র পথ সমাধানের । অন্য কিছুতে কাজ হবে না মনে হয় । আমি তো বাদলের ফোন নম্বর রেখে দিয়েছি লিখে আমার কাছে , তোমার ডায়রীতে কাটবার সময় । তোমার অবস্থা দেখে আমার মনে হয়েছিল নম্বরটা রাখা দরকার ।
সুষমা বলে , বাদলের বন্ধুর সাথে কথা বলা যায় কিনা ;
ফাহিমা জানে বাদলকে , বলে কোন মাধ্যম নয় , সরাসরি ওর সাথে কথা বলা ভাল ।
সুষমা বুঝে উঠতে পারে না কি বলবে । বলে , আমি কদিন ভেবে নেই কি করা যায় ।
এরপরে সুষমা অনেক ভেবেছে । বাদল তার বিশেষ এক বন্ধু ছিল , ছিল ছায়াসঙ্গী । তার নিশ্চিন্তপুর স্টেশন হল বাদল ; বাদল তার ঘরের বাইরের বড় উঠোন ! সুষমা তার সব কাজের কৈফয়ত লিখে রাখে মনের দলিলে বাদলের জন্য , সব ব্যথাভার সঞ্চিত রাখে নির্বিঘ্নে বাদলকে সপে দিয়ে মুক্ত হবে বলে !
এখন তার হাজার দ্বিধা , হাজার দ্বন্ধ ! ফাহিমার অনুরোধে বাদল যদি ফোন করে , যদি সুষমাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কোন ভুমিকা রাখে ; সুষমার কি মনে হবে না এটা বাদলের স্বেচ্ছাপ্রনোদিত নয় ; অভিনয় ! কি করবে সুষমা , কি করা উচিৎ ! বাদল কেন সব পরিষ্কার করতে পারছে না তার কাছে ? কি এমন বাঁধ , বাঁধা বাদলের -- তাকে মু্ক্তি দিতে যে মুক্তি তার প্রাপ‌্য । আর কিছু না দিতে পারুক বাদল , সুষমার সময়গুলোকে কেন নিষ্পেষিত করা !
বাদল তো অনেক মেইল পেয়েছে সুষমার , তারপরেও কেমন কঠিন নিশ্চুপ , পাষানতম !
এক একবার মনে হয়েছে , সব আঘাত যে ভুলিয়ে রাখত সবার অজান্তে ,আড়ালে থেকেও , সে বাদল । অথচ সেই বাদলই সবচেয়ে বড় আঘাত হয়ে হানল তাকে ! কিন্তু কেন ? স্বেচ্ছায় ? নিল কি প্রতিশোধ !
হতেই পারে না । সুষমার বড় কষ্ট , যন্ত্রনারা চেপে ধরে তাকে বার বার ।


ফিরে আসে বর্তমানে সুষমা ।
বাদলের সামনে বসে ঠান্ডা পানীয় চুমুক দিতে দিতে ভাবে সুষমা আজ যে দেখা হয়ে গেল এর পরিনতি কি ? ওতো কোনভাবে দোষী করতে পারে না বাদলকে , বাদলের কাছে হার মানা হার কবে পরে নিয়েছে বাদল জেনে গেছে , তবে কেন বাদল তাকে নিয়ে খেলা করে , মনটাকে ভেঙ্গে চুরে কি আবিষ্কার করতে চায় বাদল ?
বাদল দেখে অনেকটা সময় চুপ করে আছে সুষমা , বলে , আর কিছু খাবে সুষমা ?
সুষমার বলতে ইচ্ছে করে , " বাদল তুমি আমাকে শান্তি দাও , তা না হলে মরন দাও , এত কষ্ট , এত শাস্তি দিও না যা আমার সহ্য করবার ক্ষমতা নেই " । বলতে পারে না । বাদলের নিষ্পলক চোখে সেই অতীতের মত আকুতি, যা বার বার সুষমার মনে ঝড় তোলে । বাদল কষ্ট পাবে ভেবে সামলে নেয় নিজেকে ।
বাদল তার টেবিলের ওপর রাখা হাতটা ধরে , ধরে রাখে । সুষমা এই মানুষটাকে কি ভীষন জানে ! তাই বোঝে বাদলের কতখানি সে । তবু আজ কথা বলার বেলা ; সুষমা বলে , আমার কোন ইচ্ছা তোমাকে সমর্পণ করবো না বাদল , কোন জিজ্ঞাসাও নয় আর । শুধু অনুরোধ করবো , ফাহিমা যদি আমার বিষয়ে তোমার সাথে কথা বলে , তার পরিপ্রেক্ষিতে তুমি এমন কিছু করো না যা তোমার স্বত:স্ফূর্ত নয়। আমি একদিন ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি , তুমিও সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করনি ;সময় চলে গেছে । সে সবই মেনে নিয়ে আমাদের আপাত:সুখী জীবন । তুমি আমার ছায়াসঙ্গী হয়ে আছো , বন্ধনহীন পরিচয়ে যে কষ্ট তোমার কারনে এবার পেলাম সেও সইবে -- তোমার করুনা আমি সইতে পারব না ।
তুমি আমার স্বপ্ন , আমার কল্পনায় যে কষ্টের ছবি আঁকতে পারো , এঁকে দাও । বাস্তবের আর সব কিছু একপাশে পড়ে থাকে , থাক ; তুমি অন্যপাশে একা আমার বিশ্ব , আমার আশ্রয় । তেমনি থাকো যেমন তোমাকে মানায় । ক্যাকটাসে ফুল , খুব একটা সুলভ নয় ; যখন ফুটেছে সে ফুল , থাক তার অনন্য পরিচয় ।




ছবি কৃতজ্ঞতা : রানা
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুন, ২০১৩ বিকাল ৫:১০
৩৪টি মন্তব্য ২৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ব্লগার ভাবনা: ব্লগ জমছেনা কেন? এর পেছনে কারণ গুলো কি কি? ব্লগাররা কি ভাবছেন।

লিখেছেন লেখার খাতা, ১৩ ই জুন, ২০২৪ রাত ৮:৩৫


সুপ্রিয় ব্লগারবৃন্দ,
আম পাকা বৈশাখে বৈশাখী শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি। কাঠফাটা রোদ্দুরে তপ্ত বাতাস যেমন জনপ্রাণে একটু স্বস্তির সঞ্চার করে, ঠিক তেমনি প্রাণহীন ব্লগ জমে উঠলে অপার আনন্দ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকার ২৭ নম্বর সমুদ্রবন্দর থেকে

লিখেছেন অপু তানভীর, ১৩ ই জুন, ২০২৪ রাত ১১:০০

চারটার দিকে বাসায় ফেরার কথা ছিল । তবে বৃষ্টির কারণে ঘন্টা খানেক পরেই রওয়ানা দিতে হল । যদিও তখনও বৃষ্টি বেশ ভালই পড়ছিল । আমি অন্য দিন ব্যাগে করে রেইনকোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুক্তিযুদ্ধা কোটা ব্যাবস্থা কাউকে বঞ্চিত করছে না।

লিখেছেন হাসান কালবৈশাখী, ১৪ ই জুন, ২০২৪ রাত ৩:৩২

কোটা ব্যাবস্থা কাউকে বঞ্চিত করছে না।
সকল যোগ্যতা জিপিএ-্র প্রমান দিয়ে, এরপর প্রিলিমিনারি পরীক্ষা, সেকেন্ডারি।
এরপর ভাইবা দিয়ে ৬ লাখ চাকুরি প্রার্থি থেকে বাছাই হয়ে ১০০ জন প্রাথমিক নির্বাচিত।

ধরুন ১০০... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিউ জার্সিতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে পেয়ে গেলাম একজন পুরনো ব্লগারের বই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৪ ই জুন, ২০২৪ দুপুর ১২:৩৭

জাকিউল ইসলাম ফারূকী (Zakiul Faruque) ওরফে সাকী আমার দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু; ডাঃ আনিসুর রহমান, এনডক্রিনোলজিস্ট আর ডাঃ শরীফ হাসান, প্লাস্টিক সার্জন এর। ওরা তিনজনই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের একই... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেনজীর তার মেয়েদের চোখে কীভাবে চোখ রাখে?

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ১৪ ই জুন, ২০২৪ বিকাল ৩:০৬


১. আমি সবসময় ভাবি দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর যারা মিডিয়ায় আসার আগ পর্যন্ত পরিবারের কাছে সৎ ব্যক্তি হিসেবে থাকে, কিন্তু যখন সবার কাছে জানাজানি হয়ে যায় তখন তারা কীভাবে তাদের স্ত্রী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×