somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

ফুল বানু
আমি একজন সাধারণ মানুষ

অপমৃত্যু

১৩ ই অক্টোবর, ২০১৫ বিকাল ৩:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

===সকাল থেকেই প্রকৃতি এক ধরনের গুমট ভাব নিয়ে ঝিম ধরে ছিল। মাঝে মধ্যে দমকা হাওয়া আর ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি। খেলার মাঠ কাদা আর জলে মাখামাখি।

বিকেলে শিহাব এসে ডাক দিল। চল, আজ কাদা-জলে মাখামাখি করে ফুটবল খেলবো। খেলাটা হবে মজার।

তারপর অনেকক্ষণ ফুটবল খেলে বাসায় ফিরছিলাম। জুবায়েরকাকার বাসার সামনে আসতেই মিষ্টি স্বরের গান কানে ভেসে এলো।

সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের কোলাহল থেমে নিস্তব্ধতায় পরিণত হলো।

আমাদের কয়েক বাসা পরই থাকেন জুবায়েরকাকা। বেতারের নিয়মিত শিল্পী। প্রতিদিন মাগরিবের আগে হারমনিয়াম নিয়ে বসে রেওয়াজে মত্ত থাকেন। দারুণ গলা। প্রগতিবাদী হওয়ায় ধর্ম-কর্মের প্রতি মনোযোগ কম। তাই পাখিরা যখন নীড়ে ফেরে, মুয়াজ্জিন যখন আজান দেন তখন তিনি বসেন গানের রেওয়াজে।

নিজেরা বলাবলি করছিলাম, কাকা একদিন অনেক বড় শিল্পী হবেন। কথাগুলো বলতে বলতে যে যার ঘরে গিয়ে কাদামাখা শরীর পরিষ্কার করলাম। তারপর নাশতা খেয়ে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসলাম।

মাস্টারমশাই এলেন।

পড়ার টেবিলে বসে পড়তে পড়তে ঘুমের ভাব এসে ঝিমুনিটা আমার ছোটবেলার অভ্যাস। এ জন্য মারও খেতে হয়েছে প্রচুর। এভাবে কিছু সময় কেটে গেল।

মাঝে মধ্যে মাস্টারমশাইয়ের রক্ত চোখ আমাকে সচল করছিল। হঠাৎ দূর থেকে একটা মেয়েলি স্বরের বিকট চিৎকার সন্ধ্যার নীরবতা ভেঙে খান খান করে দিল।

সজাগ হয়ে উঠলাম আমরা সবাই।

আমার আব্বা, আম্মা ভেতরের কাজ-কর্ম ফেলে ছুটে গেলেন বাইরের দিকে।

আমরাও পড়ার টেবিল ছেড়ে তাদের পিছু নিলাম। আবিষ্কার করার চেষ্টা করলাম চিৎকারটা কোনদিক থেকে এসেছে।

হঠাৎ আম্মা বলে উঠলেন, জুবায়েরভাবীর চিৎকার মনে হচ্ছে?

সবাই আমরা প্রায় দৌড়েই গেলাম কাকার ঘরের দিকে। খুব জটলা ঘরের সামনে। কে যেন একটা কানের কাছে এসে ফিশফিশ করে বললো, বিষ খেয়েছেন কাকা।

কথাটা শুনে মাথা ঘুরে উঠলো আমার।

ইতিমধ্যে সবাই জেনে গেছে, বন্দরের অ্যাকাউন্টস অফিসার জুবায়ের সাহেব বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন।

ইতিমধ্যে সাইরেন বাজাতে বাজাতে বন্দর হসপিটালের সাদা রঙের অ্যাম্বুলেন্স এসে হাজির হলো।

কয়েকজন ধরাধরি করে কাকাকে মুমূর্ষু অবস্থায় গাড়িতে এনে ওঠালেন।

অ্যাম্বুলেন্সটা সাইরেন বাজাতে বাজাতে হসপিটালের দিকে ছুটলো।

বাসার সামনে সকল প্রতিবেশীর ভিড়। চোখে-মুখে বিস্ময়। প্রশ্ন আর কথার ঝড় উঠতে শুরু করেছে তখন।

অত্যন্ত সাদাসিধা মানুষ জুবায়ের সাহেব। একটা হাসি লেগে থাকতো তার মুখে সব সময়। সদা সুখী এ মানুষটি।

অল্প বয়সী জুবায়েরকাকার ছেলে সোহাগের পাশে গিয়ে দাড়ালাম।

আমাকে দেখেই হাউমাউ করে জড়িয়ে ধরলো সোহাগ। বলতে লাগলো, আম্মু, এতো নিষ্ঠুর কেন? কি অপরাধ করেছিলেন আমার বাবা? মা বাবাকে চড় মারলেন কেন ? বলতে বলতে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়লো সোহাগ।

ইতিমধ্যে সবাই জেনে গেছে, জুবায়ের সাহেবের স্ত্রী, আমরা যাকে শীলাআন্টি বলে ডাকি, তার সঙ্গে সোহাগের আব্বার কথা কাটাকাটি চলছিল অনেক্ষণ ধরে। এক পর্যায়ে শীলাআন্টি তার স্বামীর গালে কষে একটা চড় বসিয়ে দেন।

এতে জুবায়ের অপমানে ইদুর মারার বিষের বোতলটি এনে গটগট করে খেয়ে ফেলেন সবটুকু। তাই এ দুর্ঘটনা।

কি নিয়ে ঝগড়া হচ্ছিল দুজনের ভেতরে? আবারও প্রশ্নটা সবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো।

আব্বা, আম্মা দুজনেই ছুটে গেলেন শীলাআন্টির পাশে।

তাদের দেখে হাউমাউ করে কেদে আম্মাকে জড়িয়ে ধরলেন শীলাআন্টি। তারপর গড়গড় করে বলতে শুরু করলেন মূল ঘটনা।

সেদিন সকালে হসপিটালে গিয়ে ডায়াবেটিসের মাত্রা চেক করা হয়েছিল। প্রায় বিশের মতো ছিল তার রেজাল্ট। সন্ধ্যায় বসে গানের চর্চায় মগ্ন ছিলেল। তারপর হঠাৎ গান বন্ধ করে রেফৃজারেটর থেকে মিষ্টির বাক্সটা বের করে মিষ্টি খেতে থাকেন জুবায়ের।

ওপাশ থেকে সেটা দেখেই হই হই করে ছুটে আসি আর চিৎকার শুরু করে দেই।

সেও আমার ওপর তেড়ে আসে।

আমিও নাছোড়বান্দা। বললাম, মিষ্টি খেয়ে ডায়াবেটিস বাড়িয়ে মরার যদি অতোই শখ থাকে তাহলে প্রেম করে আমাকে বিয়ে করলে কেন?

চোখের কোণাটা একবার মুছে হয়তোবা প্রেমের স্মৃতিই আওড়ালেন শীলাআন্টি কিছুক্ষণ। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন।

সে আমার কথা কেন শুনলো না? তাহলে তো এই দুর্ঘটনা ঘটতো না। আমি তো তার ভালোর জন্যই বলেছিলাম।

বাকবিতন্ডার এক পর্যায়ে আমি রেগে গিয়ে তার গালে একটা চড় বসিয়ে দেই।

সে তখন ছুটে যায় স্টোররুমের দিকে। দরজার কাছেই ছিল বিষের বোতলটা। আমি দৌড়ে ধরার আগেই সে খেয়ে ফেলে ওই মরণ পানি।

তারপর আমার আব্বার দিকে সজল চোখে তাকালে শীলাআন্টি বলতে থাকলেন, এখন আমি কি করবো বলে দিন? আমার তো সর্বনাশ হয়ে গেছে।

হসপিটাল থেকে খবর এলো জুবায়ের চিরবিদায় নিয়েছেন। একে তো মিষ্টি খাওয়ার কারণে ডায়াবেটিসের মাত্রা ছিল বেশি। তারপর আবার দ্রুত গতিতে বিষ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ায় ডাক্তারদের পক্ষে আর সম্ভব হয়নি তার মৃত্যু ঠেকানো।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই অক্টোবর, ২০১৫ বিকাল ৩:১৩
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১০


ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]

“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"

২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×