কিছু মিডিয়া টাকার বিনিময়ে নিউজ প্রকাশ করে । মাঝে মাঝে সত্য গোপন করে । আবার কিছু মিডিয়া ক্ষমতাসীনদের নিউজ বেশি করে। এগুলো আমরা সবাই-ই জানি।
আলোচনাটি ভিডিও দেখুনঃ https://www.youtube.com/watch?v=BCrj4Xd4Ozg
তবুও আপনি হয়ত বিশ্বাস করেন এমন অল্পকিছু মিডিয়ার বাইরে অনেকে বড় বড় গণমাধ্যম আছে যারা সত্য প্রকাশ করে। কিন্তু অধ্যাপক এডওয়ার্ড এস হারম্যান ও বিখ্যাত লেখক , দার্শনিক ও অধ্যাপক নোম চমস্কি মিলে একটা দীর্ঘ গবেষণা শেষে এটা প্রমাণ করেছেন যে এই ধারণা একেবারই বিপরীত। তাদের মতে প্রথম সারির গণমাধ্যমের মূল কাজই হল ক্ষমতাসীনদের জনবিরধী কার্যক্রমের পক্ষে আপনার আমার মত সাধারণ জনগণকে প্রভাবিত করে সম্মতি তৈরী করা।
কি ভয়ংকর না? হয়ত মনে হতে পারে ইলুমিনাতি , এলিয়েন টাইপের কন্সপিরেসি থিওরি নিয়ে কথা বলছি মনে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই দুইজন মিলে 1988 সালে একটা বই প্রকাশ করে Manufacturing consent নামে। আমেরিকার মত গণতান্ত্রিক দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যম ও তাদের অনেকগুলো নিউজের কেস স্টাডি করেছে এবং পুরো বইটা এতটা গবেষণা ও তথ্যবহুল যে, আপনি যদি প্রচন্ড রকম সংশয়ীও হন তবুও আপনি এটা যে বাস্তব তা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন।
প্রপাগান্ডা শব্দটা আমরা বেশি ইউজ করি চিন,ইরান,উত্তর করিয়ার মত একনায়কতান্ত্রিক দেশ যারা ঘোষণা দিয়ে গণতন্ত্রকে নাকচ করছে। তাদের দেশের মিডিয়া নিয়ে সাধারণত আমরা আলোচনা করি,দেশগুলোর শাসকরা নিজের ইচ্ছা মত দেশের জনগণকে মিডিয়ার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে।
আর গণতন্ত্র , প্রেস ফ্রিডম বা বাক স্বাধিনতার কথায় আমরা উদাহরণ টানি আমেরিকা, ফ্রান্স, আষ্ট্রলিয়ার মত দেশ গুলোর। কিন্তু এই দুই লেখকের মতে গনতন্ত্র হচ্ছে একটি মঞ্চ যার মাধ্যমে মিডিয়া প্রপাগান্ডা বাস্তবায়ন করতে পারে।
চমস্কি বলেন “জনগণ হচ্ছে বিভ্রান্ত পশুর পালের মতো। তাদেরকে যদি বল প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ না থাকে, তাহলে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে 'ক্যালকুলেটেড ম্যানুফ্যাকচার অফ কনসেন্ট'-এর মাধ্যমে।” ’ম্যানুফ্যাকচার অফ কনসেন্ট’ অর্থ হচ্ছে ‘সম্মতি উৎপাদন’ অর্থাৎ মিডিয়া এমন একটি যন্ত্র যা দ্বারা সাধারণ জনগণের সম্মতি তৈরি করা হয়।
একনায়নকতান্ত্রিক দেশ গুলো মুলত বল প্রয়োগ করে কোন কিছু চাপিয়ে দেয়। আর গণতান্ত্রিক সিস্টেমে শাসকের জন্য সে সুজোগ থাকে না। যার ফলে কৌশলগত ভাবে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় বা যে কোন কাজের সম্মতি তৈরী করা মিডিয়ার মাধ্যমে।
মিডিয়ায় পাঁচটি ফিল্টার হয়ে জনগণের কাছে সংবাদ পৌঁছে। যার কারণে কোন মিডিয়া যদি বে সরকারি-ও হয়, এই পাঁচটি ফিল্টার এড়িয়ে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ বিরোধী কোন সংবাদ প্রকাশ করেনা বা করতে পারবে না।
প্রথমটি হল - মালিকানা
সংবাদপত্র, নিউজ চ্যানেল, ডিজিটাল নিউজ প্ল্যাটফর্ম সবই কিন্তু ব্যবসা, নিখাদ ব্যবসা৷ আর পাঁচটা ব্যবসার মতো এখানেও মন্ত্র একটাই, প্রফিট করতে হবে৷ ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর জন্য কেউ বড় আকারে মিডিয়া তৈরী করে না৷ তবে অন্য ব্যবসার সঙ্গে ফারাকটা হলো, মিডিয়া জনমত গঠন করতে পারে । যে কোনো ইস্যুকে একদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে, যেটা আর পাঁচটা ব্যবসা পারে না৷
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের মালিক কারা এ ব্যাপারে ঢাকার সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের (সিজিএস) গবেষণায় দেখা যায় মূল ধারার 48 টি মিডিয়ার মালিকানা 32 টি বহুজাতিক কম্পানির হাতে। এই কিম্পানি গুলোর মালিকরা অনেকেই প্রতক্ষ্য এবং পরোক্ষভাবে ক্ষমতাসিন রাজনীতির সাথে জড়িত। এছাড়াও এসব মালিকরা যেহতেু ব্যাবসার জন্য সরকারের উপর নির্ভরশীল সেক্ষেত্রে যে কোন নিউজ তাদের স্বার্থবিরোধী হওয়ার সুজগই থাকে না। এরপরও যদি কোনটা সরকারের সমালোচনায় আসে সেক্ষেত্রে তার লাইসেন্সই বন্ধ করা হয়। যেমন, দিগন্ত টিভি।এছাড়াও একুশে টিভির মালিকানাও পরিবর্তন হয়েছে বহুবার। যতদিন সরকারের সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে না এসেছে, ততদিন এটি বন্ধও করে রাখা হয়েছিল।
দ্বিতীয় ফিল্টার- বিজ্ঞাপন
মিডিয়া অডিয়েন্স থেকে যে পরিমাণ উপার্জন করে তা তাদের মূল খরচরে ধারে পাশেও না। তাহলে কে এই বৃহৎ গ্যাব পুরণ করে ? বিজ্ঞাপণদাতারা । মিডিয়া মূলত বিজ্ঞাপণদাতাদের কাছ অডিয়েন্স বিক্রি করে। দ্বিতীয় এই ফিল্টারে কোন সংবাদ এই বিজ্ঞাপণদাতাদের ক্ষতি করবে এমন হলে সেটা একানেই আটকে পরে।
যেমনঃ মোবাইল কোম্পানিরগুলোর ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য, হাজার কোটি টাকা কর ফাঁকির সংবাদ কিংবা হরলিকস খেলেই লম্বা হওয়া যায় না এসব নিয়ে নিউজের পর নিউজের হয় না।
তৃতীয় ফিল্টার- সংবাদের অফিসিয়াল সোর্স
কোন একটি মিডিয়া চাইলেই সারা দেশে সবসময়ের খবর বা কোন ঘটনার প্রমান সমসময় কালেক্ট করা সম্ভব হয় না। যেমন ক্রসফায়ার ! মিডিয়া শুধুমাত্র পুলিশ বা র্যাবের অফিসিয়াল বক্তব্যই ততুলে ধরে। বরাবরের মত বলা হয় বন্ধুক যুদ্ধে মারা গেছে। মিডিয়ার কাছে ঘটনার কোন প্রমাণও নেই । নেয়া হয়না ক্রসফায়ারে মৃত্যু হওয়া ব্যাক্তির পরিবারে কোন ভাষ্য। এরপরও যদি কোন অনাকাক্ষিত লাইভে সত্য বেরিয়ে আসে। অথবা কোন সংবাদিক বা কোন মিডিয়া কোন বৃহৎ সত্য প্রকাশ করে ফেলে, তখন শুরু হয় চতুর্থ ফিল্টার-
সমালেচনা
কয়েকদিন আগে আলজাজিরার করা ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট " দ্যা প্রাইমিনিস্টার ম্যান" শিরোনামে বাংলাদেশ নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। যেখানে তারা প্রচুর তথ্য দিয়ে সব গুলো প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল। এরপরই বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো একজোট হয়ে সংবাদের সমালোচনা শুরু করে। এত এত মিডিয়া আর দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিদের দিয়ে এটার সমালোচনা করানো হয় যেন জনগণের কাছে এটা ডাহা মিথ্যা মনে হয়। এপরও যদি কোন মিডিয়াকে ফিল্টারে আনা না যায় বা কোন সংবাদিক এককভাবে সরকারের স্বার্থ বিরোধী কার্যক্রম তুলে ধরে তখন শুরু হয় হুমকি এবং হত্যা। এত কিছু করার পরও যদি কোন সংবাদ অনাকাক্ষিত ভাবে ছড়িয়ে পরে যা ক্ষমতাসীনদের জন্য হুমকির! তখন শুরু হয় সর্বশেষ বা পঞ্চম ফিল্টার।
জাতীয় শত্রু
এটা এমন একটা ফিল্টার যা উপরের চারটি ফিল্টার যদি কাজ না করে, ঠিক তখন ব্যাবহার করা হয়।এজন্য এই ফিল্টারটি সবথেকে শক্তিশালি হওয়া জরুরী। যাতে এক বাক্যে দলমত নির্বিশেষে সকলের দৃষ্টি একদিকে নেয়া যেতে পারে। যেমন জঙ্গিবাদ, অভিবাসনের মত ইস্যু গুলো।
এই পাঁচটি ফিল্টারের মাধ্যমে মিডিয়া নামক যন্ত্র আপনার চার-পাশে শাসক ও পুজিপতিদের জন্য জনসম্মতি তৈরি করে।

সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০২১ রাত ১:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


