স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর দেশের সার্বিক অবস্থা দেখে মনে প্রশ্ন জাগে আমরা কি প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হতে পেরেছি? একটা দেশ স্বাধীনতার চুড়ান্ত স্বাদ পাচ্ছে তা বুঝতে পারা যায় দেশের মানুষের অবস্থা দেখে...হোক সে একজন সম্পুর্ণ সুস্থ্য অথবা নিতান্ত্ই সৃষ্টিকর্তার ইশারায় শারীরিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ্য একজন মানুষ। আপনাদের দুইটা উদাহরণ দিচ্ছি...
১। জার্মানীর একটা ষ্টেট ষ্টুটগার্টের শহর বাকনাঙ্গে বাসে বসে আছি...শীতের প্রকপের আমেজ আসতে শুরু করেছে কিন্তু ড্রাইভারের বাস ছাড়ার কোন ভাব দেখছিনা। প্রায় মিনিট খানেক পরেই হুড়মুড় করে একদল মানসীক আর শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়ে বাসে উঠে পরল। পথে যেতে যেতে দেখলাম আমার দেশের একজন প্রতিবন্ধী আর এই দেশের একজনের মধ্যে পার্থক্যটা কি? কি নেই তাদের হাতে...আইফোন থেকে শুরু করে দুনিয়ার সেরা সব কিছুই তাদের হাতে...কেউ ইশারায়...কেউবা চোখে পানি এনে দেয়া সব অঙ্গীভঙ্গিতে নিজেদের মাঝে কথা বলছে। পরে একজনের সাথে আলাপ করে জানলাম সরকার এদের যাতায়াতের সব খরচ বহন করে...বাকনাঙ্গে তাদের একটা প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে তারা হালকা ধরনের নিত্য ব্যবহার্য পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ নেয়। তারা হতে পারে আর দশজন মানুষের থেকে অস্বাভাবিক কিন্তু দেখে বুঝার উপায় নেই। হোক একজন ছেলে বা মেয়ে...তারা নিশ্চিন্তে আর নিরাপদে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে আসে এবং সারাদিনের কাজ শেষে রাতে বাসায় ফিরে যায়। কেউ তাদের পথে টিটকারী করে না বা অত্যচার করে না বরং একজন স্বাভাবিক মানুষের মতই সম্মান দেয়।
অনেক হলো পরদেশের কথা এখন বলি আমার নিজ দেশেরটা। আমাকে প্রায় যেতে হোত খুলনাতে; তাই ট্রেনের জন্যে বসে থাকতাম পোড়াদহ রেল ষ্টেশনে। এমনই একদিন এক অল্প বয়সী মেয়ে যে কিনা মানসিক প্রতিবন্ধী আমার পাশে বসে গান শুরু করে দিলো। আমি কখনই এদের নিয়ে ভীত নই...সুতরাং একা বসে থাকা সেই সময়টা আমি তার সাথে আলাপ শুরু করে দিলাম। পুর্ণ যৌবনা একটা মেয়ে...সৃষ্টিকর্তার ইশারায় ভাগ্যবঞ্চিত। নাম কি জিজ্ঞাসা করতেই খিলখিল করে হাসি দিয়ে বলে উঠল ‘অঞ্জু ঘোষ...আমি বেদের মেয়ে জোছনা ছবি করিছি (আঞ্চলিক ভাষা)’ এরপর সে আমাকে বলে বসল, ‘আমাক দেকি...আপনের ভয় করতেছ না (আঞ্চলিক ভাষা)?’ আমি উত্তর দিলাম, ‘ না অঞ্জু’। সে বলে উঠল, ‘তালি(তাহলে) আমাক সবাই মারে ক্যা?’ এটা বলে সে তার কনুই তুলে দেখাল...যেখানে আঘাতের পরে বিনা চিকিৎসার দগদগে ঘা।
এরপর সে আমাকে যা বলল তা শোনার জন্যে তৈরি ছিলাম না। অঞ্জু আমাকে অবাক করে জানায় সে একজনের সাথে মন দেয়া নেয়াতে জড়িয়ে পরেছে যে কিনা প্রায় রাতে তাকে এটা ওটা খাওয়ায়। আমি বললাম, ‘তোমার পরিচিত কেউ?’ সে যা বলল তা বলে দেশের আমজনতার নিরাপত্তায় নিয়োজিত সবাই কে ছোট করব না। অনেক দিন পরে আবার পোড়াদহ ষ্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি হঠাৎ পাশেই অঞ্জুর তীব্র রোষের গালি শুনে তাকালাম, ‘...আছাড় দিয়ে মাইরি ফ্যালবনে’ আমি আস্তে করে তার পাশে যেয়ে অবস্থা বুঝার চেষ্টা করি এবং যা নিয়ে ভয়ে ছিলাম তাই হয়েছে... ‘অঞ্জুর কোলে বাচ্চা!!!’ আমি দোকান থেকে কিছু খাবার কিনে তাকে দিতে যেয়ে হলাম চুড়ান্ত অপমাণ। অঞ্জু বলে উঠল, ‘এক....খাবারের লোব দেকা প্যাট বাদা থুয়ে চইল্লে গেছে...আপনের মতলব কি?’ আমি তাড়াতাড়ি তার পাশে খাবার রেখে পালিয়ে বাঁচি... পেছনে অঞ্জুর বাচ্চা আর তার মায়ের কান্নার ভারি পরিবেশ। ট্রেনে উঠে ভাবি একজন অথর্ব আর অসহায় মানুষও চরম সত্য কথা বলে যখন তার নিরাপত্তা প্রশ্নবোধক চিনহের আড়ালে বন্দী। মনে পরে একাত্তরের কথা...মনে পরে সেই সময়ে আমার মা বোনের হারানো ইজ্জতের কথা। আমি...আপনি বা আমরা নাহয় একজন অঞ্জুর কথা জানি কিন্তু এমন অঞ্জু কতজন আছে? আমরা কি আসলেই স্বাধীন হতে পেরেছি? যেখানে অঞ্জুর মত মানসীক প্রতিবন্ধীর ইজ্জত লুট হয়ে যায়; সেখানে সুস্থ্য স্বাভাবিকেরা কতটা নিরাপদ? প্রশ্ন রইল মাননীয় প্রধাণমন্ত্রীর কাছে...প্রশ্ন রইলো বিরোধীদলীয় নেত্রীর কাছে...প্রশ্ন তাদের কাছে যারা রাজনীতির লেবু কচলায় সারা বছর তিতা করেন...প্রশ্ন আপনাদের কাছে যারা এদের নির্বাচিত করেন।
পুনশ্চঃ রাত ২ টা বেজে গেছে কাজের চাপে। অফিসের গাড়ি আমাকে ষ্টেশনে নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। জনবিরল আর নিশুতি রাতে বাকনাঙ্গের এই ষ্টেশনে স্বল্প বসনা সদ্যই তীব্র যৌবনে পা দেয়া এক পরমা সুন্দরী কানে আইফোন গুজে দিয়ে ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা করছে...হাতে তার রেডওয়াইনের বোতল। মনে পরে যায় অঞ্জুর কথা...শুনছিলাম অঞ্জু তার বাচ্চার ক্ষুধা মেটাতে না পেরে সীমান্ত এক্সপ্রেসের নীচে ঝাঁপ দেয়...কপালের লিখনে কি ঘটেছিলো তা জানার সাহস হয়নি। বিজয়ের এই মাসে ফিরে আসব আরেক ভাগ্যবঞ্চিত আর ভাগ্য নিয়ে আসা দুইজনের কথা নিয়ে। ভাল থাকবেন সবাই।
কি দেখার কথা কি দেখছি?...!!! আমরা কি আসলেই স্বাধীন?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



