somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলার সংগ্রামের ২০০ বছরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও তুলনা।

০৫ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মাধ্যমে বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের সূচনা হয়। এরপর থেকে প্রথম ১০০ বছর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সরাসরি সশস্ত্র সংগ্রাম মূলত বাংলাতেই হয়েছে। ১৮৩১ সালে তিতুমীরের 'বাঁশের কেল্লা' কিংবা হাজী শরীয়তুল্লাহ ও দুদু মিয়ার 'ফরায়েজী আন্দোলন' (১৮১৮-১৯০৬) ছিল ব্রিটিশ এবং হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে বাংলার সাধারণ কৃষক সমাজের সরাসরি সশস্ত্র প্রতিরোধ।

অন্যদিকে, বর্তমান পাকিস্তানের অঞ্চলগুলো—যেমন সিন্ধু (১৮৪৩) এবং পাঞ্জাব (১৮৪৯)—ব্রিটিশদের অধীনে আসে বাংলার প্রায় ১০০ বছর পর। তাই প্রাথমিক সশস্ত্র প্রতিরোধের ইতিহাসে তাদের খুব একটা দেখা যায় না।
Peter Hardy, "The Muslims of British India" (Cambridge
University Press, 1972), pp. 50-59. (এখানে ফরায়েজী ও তিতুমীরের সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের বিস্তারিত আছে)।

১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ রাজের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল বাংলার ব্যারাকপুর থেকে (মঙ্গল পাণ্ডের নেতৃত্বে)। এই বিদ্রোহ উত্তর প্রদেশ (ইউপি) ও বিহারে তীব্র রূপ নেয়। কিন্তু সেসময় পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের সামন্ত এলিট (জমিদার) এবং পাঠানরা ব্রিটিশদের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং ব্রিটিশ সোলজার হিসেবে বিদ্রোহ দমনে সহায়তা করে।
Ian Talbot, "Punjab and the Raj, 1849-1947" (Riverdale Company Pub, 1988), pp. 36-39.

স্যার সৈয়দ আহমেদ খান উত্তর ভারতে 'আলীগড় আন্দোলন' শুরু করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের আধুনিক ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করা এবং ব্রিটিশদের সাথে সম্পর্ক ভালো করে প্রশাসনে জায়গা নেওয়া। 'দ্বিজাতি তত্ত্ব' বা Two-Nation Theory-এর বুদ্ধিবৃত্তিক বীজ মূলত এখান থেকেই আসে। পাকিস্তান রাষ্ট্র চালানোর জন্য যে শিক্ষিত আমলাতন্ত্র ও আদর্শিক ফ্রেমওয়ার্ক দরকার ছিল, তা আলীগড়ই দিয়েছিল।

আলীগড় যখন এলিটদের শিক্ষায় ব্যস্ত, বাংলার রাজনীতি তখন মাঠে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বাংলার মুসলিমদের মধ্যে এক বিরাট রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করে। এরপর ১৯০৬ সালে ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় 'অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ'। অর্থাৎ, জিন্নাহ পরবর্তীতে যে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে দরকষাকষি করেছিলেন, সেই প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করেছিল বাঙালিরাই।
David Gilmartin, "Empire and Islam: Punjab and the Making of Pakistan" (1988), pp. 11-15.

নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ১৯২৩ সালে 'বেঙ্গল প্যাক্ট' করেছিলেন, যেখানে হিন্দু-মুসলিম সমান অধিকারের কথা ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের কট্টরপন্থীরা তা বাতিল করে দেয়। এরপর সুভাষ বসু যখন ১৯৪১ সালে ভারত ছাড়েন, তখন বাংলায় একটি বিশাল ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির শূন্যতা তৈরি হয়। এই শূন্যতাই পরবর্তীতে হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লীগকে তাদের কট্টর অবস্থান নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।

শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক 'কৃষক প্রজা পার্টি (KPP)' গঠন করে মুসলিম রাজনীতিকে এলিটদের ড্রয়িংরুম থেকে বাংলার কৃষকদের মাঠে নামিয়ে এনেছিলেন। এছাড়া ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ও সুভাষ চন্দ্র বসু 'বেঙ্গল প্যাক্ট' করেছিলেন হিন্দু-মুসলিম সমান অধিকারের ভিত্তিতে। কিন্তু কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তা বাতিল করে দেয়। এরপর সুভাষ বসু ভারত ছাড়লে (১৯৪১) বাংলায় একটি বিশাল ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির শূন্যতা তৈরি হয়, যা মুসলিম লীগকে তাদের কট্টর অবস্থান নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।

জিন্নাহ অসাধারণ একজন আইনজীবী ছিলেন। কিন্তু ১৯৩০-এর দশক পর্যন্ত তার নিজস্ব কোনো গণভিত্তি (Mass base) ছিল না। তিনি রাজনীতি করতেন কেন্দ্রে বসে। ফজলুল হক বা পাঞ্জাবের সিকান্দার হায়াত খানের মতো নেতারা নিজেদের প্রদেশে সরকার টিকিয়ে রাখতে ব্যস্ত ছিলেন।

জিন্নাহ এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে অল-ইন্ডিয়া বা সর্বভারতীয় লেভেলে মুসলিমদের একমাত্র মুখপাত্র (Sole Spokesman) হয়ে ওঠেন। জিন্নাহ বাংলার জনসমর্থনকে কেন্দ্রে বসে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করেন।
Ayesha Jalal, "The Sole Spokesman: Jinnah, the Muslim League and the Demand for Pakistan" (Cambridge University Press, 1985), Chapter 7.

বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এ. কে. ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। মূল প্রস্তাবে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্রের (Independent States) কথা বলা ছিল। পরে ১৯৪৬ সালে অসাংবিধানিকভাবে এটিকে পরিবর্তন করে একটিমাত্র রাষ্ট্রের (State) কথা বলা হয়।

ব্রিটিশরা বলেছিল, পাকিস্তান বানাতে হলে প্রমাণ করতে হবে যে সাধারণ মুসলিমরা তা চায়। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে পুরো ভারতে মুসলিম লীগ কেবল বাংলাতেই (১১৯টির মধ্যে ১১৩টি আসন পেয়ে) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। সেসময় বর্তমান পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে মুসলিম লীগ হেরে যায়, আর পাঞ্জাবে সর্ববৃহৎ দল হলেও সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হয়।
Harun-or-Rashid, "The Foreshadowing of Bangladesh: Bengal Muslim League and Muslim Politics, 1906-1947" (UPL, 2003),

ব্রিটিশদের ভারত ছাড়তে বাধ্য করার পেছনে ১৯৪৬ সালের আগস্টে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কলকাতায় পালিত 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে'-র বিশাল প্রভাব ছিল। এটি ব্রিটিশদের বুঝিয়ে দেয় যে, ভারত একীভূত রাখা আর সম্ভব নয়।

বাংলার কৃষকদের রক্ত, ১৯০৬ সালের প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠন (মুসলিম লীগ), ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—১৯৪৬ সালের নির্বাচনের ১১৩টি আসনের ডেমোগ্রাফিক ম্যান্ডেট ছাড়া ব্রিটিশরা কোনোদিনও পাকিস্তান দিত না। জিন্নাহর পাকিস্তানের দাবি বাতিল হয়ে যেত।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৮
৫টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৫



সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

ফরাসি ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- Cherchez la femme। অর্থাৎ, ‘সেই মেয়েটিকে খোঁজ’।

ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা (Alexandre Dumas) ১৮৫৪ সালে তাঁর উপন্যাস Les Mohicans de Paris-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৩



তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে-

বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যু এখন রহস্যের আরেক নাম। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়াংসান থেকে জুলাইয়ের নতুন বন্দোবস্ত

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৯



Youngsan সিউলের ভিতরে আমেরিকান একটি মিলিটারি বেইস। মিলিটারি বেইসের ভিতরে বার্গার কিং, KFC, Macdonald সব আছে। কোরিয়ান ভিতরে সামরিক ঘাঁটি হলে ও মিলিটারি বেইসের ভিতরে প্রধান কারেন্সি ইউএস ডলার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬


হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

DNA — ঈশ্বর এবং প্রশ্ন ?

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১২



১. ক্ষুধা
পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছিল, বাড়ছিল মানুষের খাদ্যচাহিদা; কিন্তু সীমিত জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছিল।
মানুষ নির্বাচিত প্রজনন ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে এমন ব্রয়লার মুরগির জাত তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×