
ভূত, প্রেত, জ্বীনে বিশ্বাস করেন? তবে নিচের টুকু পড়ুন।
কোথায় থেকে শুরু করব সেটা ভালো মত বুঝে উঠতে পারছি না। বছর ছয়েক আগের কথা, তখন আমি মাত্র ক্লাস টেনে পড়ি। আমাদের বাড়ির ওপর তলায় একটা নতুন ভাড়াটিয়া এলো, আমরা থাকতাম নিচ তলায় ওরা উঠেছিলো দোতলায়। নতুন ভাড়াটিয়াদের পরিবারে কেবল মাত্র দুজন মানুষ সদ্য বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী, কোন প্রকার ঝুট ঝামেলা নেই, একেবারে সাজানো গোছানো ছিমছাম পরিবার।
দোতলায় কিছু ঝামেলার জন্য প্রায়শই ভাড়াটিয়া বদল হতো। এখন ব্যাপার গুলো ভৌতিক কিনা সেটার সঠিক ব্যাখা আমি দিতে পারবো না, তবে যা ঘটতো সেগুলোর একটা হালকা-পাতলা সারসংক্ষেপ বর্ণনা দিতে পারি।
রাতের বেলায় আমাদের বাড়ির ছাদে ওঠা নিষেধ ছিলো, আমরা সেটা অমান্য করতাম না। রাতের বেলা কেউ সিঁড়ি দিয়ে ওঠা নামা করতাম না ভয়ে। মাঝে মাঝে মনে হতো হয়তো, ছোটদের কে একটু বসে রাখার জন্যই হয়তো বজ্জাত বাড়িওয়ালা আমাদের কে ভূতের ভয় দেখাতো। এই নিয়ে আমিও ব্যাপারটা বিশেষ আমলে নিতাম না। যখনকার কথা বলছি সেটা ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাস, আমার দশম শ্রেনীর টেস্ট পরীক্ষা সবে শেষ হয়েছে, আর কয়দিন বাদেই এস এস সি পরীক্ষা লিখতে বসবো সুতরাং, পড়াশুনার বাড়তি চাপ সব সময়ই থাকতো।
ছোটবেলা থেকেই আমি একটু বেশি আঁতেল, সেই সময়ও একই রকম ছিলাম। অনেক রাত অবধি টেবিল ল্যাম্পের আলো জ্বেলে পড়ালেখা করতাম। এমনি একদিন অনেক রাত পর্যন্ত লগারীদম আর সেট তত্ত্ব এর অংক কষা শেষে ঘুমাতে যাবো এমন সময় শুনতে পেলাম আমারই ওপর তলার ঠিক বরাবর কেউ একজন ঘুঙুর পড়ে নাচছে। আমি শুনে একটু বিষ্মিত হলাম, মোবাইল ফোনের ব্যাকলাইট অন করে সময় দেখলাম রাত তখন পৌনে চারটা।
যদিও একটু আশ্চর্য হলাম কিন্তু কাউকে আর কিছু জিজ্ঞাসা না করে ঘুমিয়ে পড়লাম সেদিনকার মত। পরদিন সকালে নাস্তা খেতে গিয়ে মা কে জিজ্ঞাসা করলাম, “আচ্ছা, গতকাল রাতে তোমরা কেউ ঘুঙুর নাচের শব্দ শুনতে পেয়েছো?”
আমার কথা শুনে মা এবং বাড়ির সবাই হেসে উড়িয়ে দিলো। ওরা আমাকে এই বলে বুঝ দিলো যে, “সারা রাত না ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে তোমার মাথার স্ক্রু ঢিলে হয়ে গিয়েছে, কাল থেকে আর রাত জেগে পড়তে হবে না, যা পড়ার সেটা সকাল সকাল পড়ে নেবে। সন্ধ্যের মধ্যে সবকিছু শেষ করা চাই!”
আমি একটু অবাকই হলাম বটে, প্রথমত আমি অযথাই একটা ঝারি খেলাম তার ওপর আমার কথার কেউ পাত্তাই দিলো না। সেদিন আর রাত জাগলাম না, মায়ের কথা মত সন্ধ্যে ৭টার মধ্যে পড়াশুনা শেষ করে ফেলে মুঠোফোনে সধ্য কেনা নতুন হেডসেটে গান শুনতে লাগলাম। ডিসেম্বর মাস হলেও কোন একটা অযাচিত কারণে সেদিন বৃষ্টি হয়েছিল। রাতের দিকে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল, আমি গান শুনতে শুনতে আমি আমার রুমে বসে হেডসেটের গুণাগুণ বিচার করতে লাগলাম। প্লে লিস্ট থেকে একটার পর একটা সং সিলেক্ট করে প্লে করছি, এমনি একটা সময় সেই ঘুঙুর পড়ে নাচের শব্দ আমার কানে এলো। এবার সত্যিই আঁতকে উঠলাম, কারণ এইবার শব্দটা খোদ আমার ফোন থেকে আসছে আমার হেডসেটে। অন্ধকারের মাঝে আমার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গিয়ে ব্যাটারি খুলে গেলো, আমি একবার “মা! মা!” বলে চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারালাম।
পরদিন সকাল বেলার কথা, আমি মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে দোতলার সেই নতুন ভাড়াটিয়াদের ফ্ল্যাটে ঘুরতে গেলাম। বাসা থেকে আমাকে বলে দেওয়া হলো যেন বেশিক্ষণ সেখানে না থাকি। সুতরাং, আমিও কথা মত বেশি দেরি করবো না বলে ওদের সদর দরজায় দুটো কড়া নাড়লাম, এর প্রায় দশ সেকেন্ডের মাথায় দরজা খুললো, দরজা খুললেন ভদ্রলোকের স্ত্রী। দেখতে অপরূপ সুন্দরী লিকলিকে গরন এবং ফর্সা, বোধ করি গোসল দিয়ে ফিরছিলেন তাই ভেজা চুল গুলো কোমর পর্যন্ত ছেড়ে দেওয়া।
আমি বললাম, “জ্বী, আমি তুষার। আপনাদের নিচের তলায় থাকি, একটু ভেতরে আসতে পারি? কিছু কথা ছিলো!”
ভদ্র মহিলা খুশি হয়ে বললেন, “বেশ তো ভালো! এসো এসো, বল কি হয়েছে বাবু?”
আমি সরাসরি কোন প্রশ্ন করলাম না, প্রথমে বেশ কতক্ষণ কুশল বিনিময়ের পর জিজ্ঞাসা করলাম,
“আচ্ছা দিদি? আপনারা তো এখানে এ মাসেই উঠেছেন তাই না?”
ভদ্র মহিলা হেসে উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ! কেন বল তো?”
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “আচ্ছা ভোর রাতে কি কখনো ঘুঙুরের শব্দ পেয়েছেন?”
ভদ্র মহিলা আমার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থেকে কতক্ষণ চুপ করে রইলো; তারপর বলল,
“বল কি? সেই শব্দ তুমিও শুনতে পাও? আমি তো ভাবলাম শব্দটা নিচ তলা থেকে আসে। আমি দুদিন শুনতে পেয়েছি, একবার মনেও করেছিলাম এতো রাতে কে ঘুঙুর পড়ে নাচে? সেটা তোমাদের বাসায় গিয়ে একবার জিজ্ঞাসা করবো। কিন্তু সাহস হচ্ছিলো না, যেহেতু সবে মাত্র নতুন এসেছি আর তাছাড়া আমার বাড়িঘর সব ওলট-পালট হয়ে আছে, এখণো পুরোপুরি সব গুছিয়ে উঠতে পারিনি, ওসব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। তাই আর কেন যেন যাওয়া হয়নি তোমাদের ওখানে।”
বুঝতে পারলাম, ভদ্রমহিলা কোন কারণে ব্যাপারটা চেপে যাচ্ছেন। উনার ধারণা ছিলো, আমাদের ফ্ল্যাটেই কোন একটা গন্ডোগোল আছে, তাই জন্য আর ভয়ে জিজ্ঞাসা করতে যাননি। কারণ, ভোর রাতে অমন একটা জোরালো শব্দ শুনতে পাওয়া কোন স্বাভাবিক ঘটনা নয়।
আমি ভদ্রমহিলা কে বললাম, আচ্ছা আপনাকে একটা অনুরোধ করতে পারি? ভদ্রমহিলা বললেন, “অনুরোধ? বেশ তো! করো কি করবে?”
“আপনি একটু আমার সাথে আমাদের বাসায় যাবেন নিচের তলায়?”
তিনি একটু অবাক হয়ে গিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “বুঝলাম না, সেখানে গিয়ে আমার কি হবে?”
আমি উনাকে বুঝিয়ে বললাম, “দেখুন, শব্দটা আপনি একাই শোনেননি, আমিও শুনেছি। এবং গত রাতে আমি জ্ঞানও হারিয়েছি। সেটা আমার বাড়ির কেউ বিশ্বাস করতে চাইছে না যে আমি যা বলছি সেটা সত্য। ওদের কথা হলো, এমন একটা আঁওয়াজ কেবল আমিই শুনলাম আর বাড়ির কেউই শুনলো না এমনটা কখনো হতে পারে না! আপনি একটু আমার সাথে আমার বাড়ি চলুন, যা শুনেছেন সবটা আমার মা কে নিজ মুখে বলবেন।”
ভদ্রমহিলা রাজি হয়ে গেলো, আমি উনাকে আমার কথা মত আমার সাথে আমার বাড়ি গেলেন এবং মা কে আমি যা যা বলেছিলাম সবটাই অবিকল একই ভাবে খুলে বললেন, প্রথমে বাড়ির সবাই সেটা মানতে রাজি না হলেও পরে আমাদের দুজনের কথায় বিশ্বাস করলো যে এখানে কোথাও একটা ঝামেলা আছে। বাড়িওয়ালা কে ফোন দেওয়া হলো, তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে আসলেন এবং আমাদের কথা শুনে প্রথমে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। যদিও পরে আমার বাবা-মা এবং ঐ নতুন ভাড়াটিয়ার চাপাচাপিতে বলতে রাজি হলেন। বাড়িওয়ালার ভাষ্য মতে,
উনার সবচেয়ে ছোট মেয়ের নাম অরুণিমা। অরুণিমা কে উনারা অনেক বেশি ভালবাসতেন এবং তার নামেই বাড়ির নামকরণ করা হয় ‘অরুণিমা ভিলা’। অরুণিমা খুব ভাল নাচতে জানতেন এবং প্রতি শুক্রবার বিকেলে এক ওস্তাদ তাঁকে নাচ শেখাতে আসতেন। সেটা এখন থেকে কুড়ি-পঁচিশ বছর আগের ঘটনা, একদিন দুপুরে অরুণিমা ছাদে খেলতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে মারা যায়। তখন অরুণিমার বয়স হয়েছিলো ১৪ বছর। তারপর থেকে অনেকেই এই বাড়ির বিভিন্ন ফ্ল্যাটে সেই ভোর রাতে অরুণিমার ঘুঙুরের শব্দ শুনতে পায়। বাড়িওয়ালা সে সময় দোতলায় থাকতেন, এবং অরুণিমা মারা যাবার পর তারা সে বাসাটা ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র চলে যান এবং পুরো বাড়ি রিনোভেশন করে আবার ভাড়া দেন। বাড়িওয়ালার মতে, অরুণিমা তার স্মৃতি ভুলতে পারেনি বলেই বারবার দোতলার সেই ফ্ল্যাটটাতে ঘুরতে আসে কিন্তু সে কখনো কারো ক্ষতি করে না।
অবাক হলেও সত্য এই বাড়িরই নিচ তলায় আমি আজও বসবাস করি।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ ভোর ৫:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




