somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বন্দিজীবন ওদের

১৯ শে এপ্রিল, ২০১৭ দুপুর ১:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বন্দিজীবন ওদের। এখানেই থাকা, এখানেই কাজ। দিন-রাত হাড়ভাঙা খাটুনি। তারপরও খেয়ে না খেয়ে সময় পার করতে হচ্ছে তাদের। চাতাল শ্রমিকদের করুণ কাহিনী সবার মুখে মুখে। ধান শুকাতে গিয়ে চাতাল নারী শ্রমিকদের পা কালো হয়ে গেছে। রোদে পুড়ে সুন্দর মুখের অবয়বও বদলে গেছে। এতেও তাদের কোন ক্ষোভ কিংবা আক্ষেপ নেই। তাদের আক্ষেপ- একই পরিমাণ কাজ করে পুরুষ শ্রমিকরা যেখানে দিনে ২০০ টাকা পায়, সেখানে তারা কেন ৫০ টাকা পাবে? এর প্রতিবাদও করতে পারেন না তারা। কারণ প্রতিবাদ করলে যা-ও পাচ্ছেন তাও পাবেন না। বরং অভাবের সংসারে যে ৫০ টাকা পেতেন তাও বন্ধ হয়ে যাবে? ফলে মানবেতর জীবনকেই তারা বেছে নিয়েছেন। ফজরের আজান থেকে শুরু হয় তাদের কাজ। চলে গভীর রাত পর্যন্ত। ফাঁকে খাওয়া-দাওয়ার সময় পান কিঞ্চিৎ। কিন্তু ঘুমানোর জন্য ঘড়ি বাঁধা ৫ ঘণ্টা। কথা হয় এক নারী শ্রমিকের সঙ্গে। তার নাম মর্জিনা। তিনি বলেন- ‘দুখের কতা কইলে কিতা অইব। আমরার দুখ কি আপনেরা ঘুচাইয়া দিতা ফারবাইন। আমরা শইল থেইক্যা ঘাম জরাইয়া চাতাল চালু রাহি। আর তাইনেরা ট্যাহা-পয়সা নিয়া মুজ করে। ফারলে এইডা বন্ধ করইন। বেডারা ফাইব ২শ’ ট্যাহা আর আমরা ফামু ৩০ ট্যাহা। ইডা কোন দরনের বিছার কইনছেন।’ সত্যিই চাতাল কন্যা মর্জিনাদের জীবনযুদ্ধ অবিরাম চলছে। কিন্তু তাতে তৃপ্তি নেই। নেই হাসি। আছে শুধু বেদনা। অধিকার বঞ্চিত হয়েও তারা মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন। দুই ঈদ ছাড়া তাদের ভাগ্যে কোন ছুটি জোটে না। নারী দিবস কি সেটাও তারা বুঝেন না। ওইদিনে এখানকার নারীদের খোঁজও কেউ নেয় না। ঝাড়ু-পাটনা বিন্দা আর মাথার বস্তা এখন তাদের নিত্যসঙ্গী। শেষরাতে ঘুম থেকে জেগেই শুরু হয় কাজ। এতটুকু বিশ্রাম নেই তাদের। তারপরও আছে বঞ্চনা হুমকি-ধমকি ও গালমন্দ। গতকাল কয়েকটি চাতালে সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, নারী-পুরুষ ও শিশুরা কাজ করছে। শ্রমিকদের জন্য রয়েছে ৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৭ ফুট প্রস্থের কক্ষ। যেখানে পরিবার নিয়ে তারা গাদাগাদি করে থাকেন। একই কক্ষে রাখেন আসবাব পত্র ও খাবার। শ্রমিকদের কথা, শেষ রাত থেকে শুরু করে পরের রাত ১০টা পর্যন্ত চলে ধান ভেজানো ভাপানো-শুকানো চাল তৈরি ও বস্তা জাত করার কাজ। নারী-পুরুষ উভয়ে মিলে সমান কাজ করলেও মজুরিতে রয়েছে চরম বৈষম্য। তবে প্রাপ্য মজুরি নিয়ে পুরুষ শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ। একটি চাতালে গেলে সৈয়দ মিয়া (৪৩), শফিকুল ইসলাম (৪৫) ও রাসেল মিয়া (২৫) প্রতিবেদকের সামনে আসেন। তবে প্রত্যেকেই ছিলেন, ভয়ে কাতর। তাদের ভাষ্য- মিল মালিক আর সর্দার জানতে পারলে আমরার অবস্থা খারাপ অইব। তারা হুনলে লাথি দিয়া বাইর কইরা দিব। ফেরত দিতে অইব এককালীন ট্যাহাও। তারা বলেন, আমডা হুবই কষ্টে আছি। কাম করি ২৪ ঘণ্টাই। টেহার বেলা নাই। পানিতে চুবানো থেইক্ক্যা ধান হুকানো পর্যন্ত আমডারে ডেলি ২শ’ ট্যাহা দেয়। রাইতে আবার গাড়ি থেইক্ক্যা ধানের বস্তা লামান লাগে। নাইলে হাজিরা থেইক্ক্যা ৫০ ট্যাহা কাইট্টা রাহে। ধান চালের বস্তা গাড়িত উডানি-নামানি বাবদ দেয় ৫ ট্যাহা। ৫ ট্যাহা থেইক্ক্যা আবার ২ ট্যাহা ৭০ পয়সা দিয়া দিতে অই সর্দার ও নারী কামলাদের। বাগে পাই ২ ট্যাহা ৩০ পয়সা। ঢরে শরীল বালা না থাকলেও যাই। এই টেহা দিয়া অই আমডার খাওন কাপড় তেল পানি ডাক্তর দেখানি সব করণ লাগে। এরপর আমডা মইরা গেলেও মালিক ফিরা চায় না। বছরে দুই ঈদের দিন ছাড়া আর কোন বন্ধ নাই। কামে আইতে একটু দেরি অইলে হুনতে অয় হুমকি-ধমকি। এইডা মানুষের জীবন না। এককালীন টেহা নিয়া বিপদে পইড়া গেছি। অহন টেহা দিয়া যাইতে অইব। নিজেরাই তো বাঁচতাম পারতাছি না। বাইচ্চাদের পড়ামু কেমনে? আকলিমা বেগম (৩০) ও মনোয়ারা বেগম (৪৫)কে মজুরির কথা জিজ্ঞেস করতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা বলেন, দিন-রাইত নাই কাম করি। কিন্তু কাম মতো ট্যাহা পাই না। বেডাইনরে সারা দিনে ২শ’ টেহা দিলে আমডা কম পাইতাম কিয়ের লাইগ্গ্যা? বেডাইন মাইনষের মতো একই কাজ করি, মজুরি পাই মাত্র ৫০ ট্যাহা। কারো কারো দেয় ৩০ ট্যাহা। আবার সর্দাররে ভাগ দেওন লাগে। আমগোর পক্ষে খাড়াইয়া কেউ এই কতাডা কয় না। এক জাগাতে দুই নিয়ম থাকত পারে না। এইডার একটা কুছতাকরণ দরহার। ছোড জাগা। ৪-৫ বাইচ্চা স্বামীসহ হুব কষ্টে গিজাগিজি কইরা থাহি। একাধিক নারী-পুরুষ চাতাল শ্রমিকদের কথা- আমাদের এককালীন কিছু দিয়ে বন্দি করা হয়েছে। হাড় ভাঙা পরিশ্রম করে শ্রমিকরা। আর নানা কৌশলে শ্রমিকের টাকা মেরে খাচ্ছেন সর্দার ও মালিক পক্ষ। কাজের তুলনায় মজুরি কম। চাতালে নেই চিকিৎসা। আসে না পরিবার পরিকল্পনার কোন কর্মী। চরম দুরবস্থা পয়ঃনিষ্কাশন, স্যানিটেশন ও পরিষ্কার- পরিচ্ছন্নতার। সর্দার আবদুর রহমান (৫১) নারী ও পুরুষের মজুরি বৈষম্যের কথা স্বীকার করে বলেন, বিশ বছর ধরে এ লাইনে আছি। এখানে আমার সামান্য লাভ হয়। সত্য কথা বললে আমার চাকরি থাকবে না। ১৭ লাখ টাকা শ্রমিকদের অগ্রিম দিয়েছি। কেউ পালিয়ে গেলে জরিমানা আমাকে বহন করতে হবে। এখানকার শ্রমিকরা বেঁচে আছে অধিকার বঞ্চিত হয়ে। চরম বৈষম্যমূলক মজুরি তাও আবার নগণ্য। এদের কোনও স্বপ্ন নেই, সাধ নেই। এরা জানেন না নারী দিবস কি? নারী অধিকার কি? রাইস মিলের মালিক নারী ও পুরুষ শ্রমিকের মজুরি বৈষম্যের কথা স্বীকার করে বলেন, পুরুষের চেয়ে নারীরা কম কাজ করে। দুই ঈদ ছাড়াও তাদেরকে ছুটি দেয়া হয়। তবে ছুটির দিনের মজুরি পায় না।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে এপ্রিল, ২০১৭ দুপুর ১:৩৩
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"বহু দিন পর বন্ধু"

লিখেছেন সনজিত, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৮


বহু বছর পর হঠাৎ তোর সঙ্গে দেখা।
প্রথমে চিনতেই পারিনি।
তারপর একচিলতে হাসি-
মনে হলো,
সময় আমাদের চেহারা বদলেছে,
কিন্তু শৈশবের মুখটা এখনো একই রয়ে গেছে।

চোখের কোণে ক্লান্তির রেখা,
চুল অর্ধেকটা সাদা রং,
কাঁধে সংসার,... ...বাকিটুকু পড়ুন

কিছু খাতের চাকুরী বেতন-ভাতামুক্ত ঘোষণা করা যেতে পারে

লিখেছেন এমএলজি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:২৮

এক সমীক্ষায় জানা যায়, বাংলাদেশে সরকারি চাকুরেদের প্রায় ৯১ শতাংশ ঘুষ গ্রহণ করে। এছাড়া, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনেকেও মনে করেন বাংলাদেশে দুর্নীতি নির্মূল সম্ভব নয়; যার অর্থ দাঁড়ায়, দুর্নীতিকে আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:২৩



দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

যতদিন যাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছ -এই দেশের তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশকে নিয়ে আশাবাদী হওয়াটা রীতিমতো বিলাসিতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সেদিন দেখলাম, এক ছাত্রশিবির নেতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

×