বুড়ি আবার ওঠে। হাঁটে। উদ্দেশ্যহীন হাঁটা। ইচ্ছে করলেই কারো বাসার দরজায় টুকটুক করে, হাত পাতে। রাস্তার প্রখর রোদে মাঝে মাঝে চলৎশক্তিহীনভাবে দাঁড়িয়ে কী যেনো চিন্তা করে। বাস-ট্রাককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে ওগুলোর চাকায় গিয়ে কয়েকটা দমাদম পিটুনি লাগায়। থুথু ফেলে একরাশ। বকাবকি করে। লোকজন তাকিয়ে থাকে-দেখে-হাসে। কয়েকজন উস্কানি দেয়। টোকাইরাও তাতে যোগ দেয়। আবার বাস-ট্রাকওয়ালা বুড়িকে ধমকিয়ে ভাগিয়ে দেয়। বুড়ির গালাগাল তখন আরো বাড়ে, বাড়তে থাকে, একসময় থেমে যায়।
বুড়ি হাঁটে, হাঁটতে থাকে।
সকাল যায়, দুপুর আসে। দুপুর যায়, বিকেল; বিকেলের পর সন্ধ্যা। বুড়ি উল্টো পথ ধরে হাঁটে। সেইদিকে, যেদিক থেকে এসেছিলো। বুড়ির হাঁটতে কষ্ট হয়। পুঁটলিটা ভারি লাগে। এক বাসা থেকে কিছু ফেলে দেয়া খাবার পেয়েছে বুড়ি। বুড়ি চিন্তা করে খাবারটা কখন খাবে? রাতে? সকালে?
হঠাৎ সামনে প্রকাণ্ড এক শব্দ হয়। বুড়ি দাঁড়িয়ে পড়ে। কী হয়েছে দেখতে চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুই দেখতে পায় না। শুধু একদল মানুষের জটলা সামনে। একটু গোঙানির শব্দ। ভিড় ঠেলে এগোতে সাহস করে না। উঁকিঝুঁকি মারে। লাভ হয় না। হাল ছেড়ে দিয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। মানুষের কথাবার্তা শোনার চেষ্টা করে। টুকটাক কিছু কথা কানে ভেসে আসে ‘মাসুম পোলাডা টেরাকের নিচে...’
মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে বুড়ি। তার চোখের সামনে সেই দৃশ্যটা ভেসে ওঠে। একেবারে জীবন্ত, একেবারে বাস্তব। বুড়ি ফিরে যায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগে...
আয়লা বিবি তার স্বামীর হাত ধরে হাঁটছে। ঠিক হাঁটছে না, লাফাচ্ছে। এতো বড় শহর সে আগে কখনো দেখেনি। দুচোখ ভরা তাই বিস্ময়। একটু পরপর স্বামীকে জিজ্ঞেস করে, এইডা কী? ওইডা কী? স্বামী একসময় বিরক্ত হয়ে যায়। ধমকায়। তবু আয়লা বিবির উচ্ছ্বাস থামে না। আবার একটু পরে আরেকটা প্রশ্ন করে। আবারো ধমক খায়। এবার একটু অভিমান করে। কিছুক্ষণ পর স্বামী সেই অভিমান ভাঙায়। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আয়লা বিবির উচ্ছ্বাস আরো বেড়ে যায়।
ব্যস্ত রাস্তা। দেখে-শুনে রাস্তা পার হতে হয়। স্বামীর হাত ছেড়ে নাচতে নাচতে রাস্তা পার হয়ে যায় আয়লা বিবি। স্বামী দেখে-শুনে আসতে থাকে। আয়লা বিবি মজা পায়। এতো সাবধানে হাঁটে মানুষটা? খিলখিল করে হেসে ওঠে।
হাসি থামাতে পারে না। আয়লা বিবি দেখে, আর তার স্বামীও দেখে। একদিক থেকে মালবোঝাই একটি ট্রাক প্রচণ্ড গতিতে আসছে। অপরদিকে আসছে একটি বাস। প্রচণ্ড জোরে চিৎকার দিয়ে ওঠে আয়লা বিবি। স্বামী হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। পা নাড়াতে পারে না। গোটা শরীরটাই যেনো অবশ হয়ে যাচ্ছে। আয়লা বিবি স্বামীকে চিৎকার করে ডাকতে থাকে। বাস-ট্রাক প্রায় মুখোমুখি। মাঝখানে তার স্বামী। আর কয়েক সেকেন্ড। তারপর?... অজ্ঞান হয়ে পড়ে আয়লা বিবি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


