
জীবনে যা করেছি সব কিছুই ছিলো হুটহাট। মন চাইলো আর করলাম। জাপান আসাটাও এই রকমই।
২০১৩'র শেষ দিকে এক সহকর্মী বললেন, IELTS দেবেন কি না? দাফতরিক চাকরদের জন্য একটা জায়গায় IELTS-এর কোচিং করায়। সপ্তাহে ১ দিন পড়াবে। সারা দিন। সহকর্মী আবার সেখানে ভর্তি হয়েছেন আরেক সহকর্মীর মাধ্যমে। তিনি ইঞ্জিনিয়ার মানুষ, কিন্তু প্রোমোশন হয় না। সে জন্য তার চিন্তা-ভাবনা ইউরোপের দিকে চলে যাওয়ার। আর আমার সহকর্মী ইংলিশে মাস্টার্স করা এবং এর আগে একটা স্কুলে ইংলিশের মাস্টারও ছিলেন। কোচিং আমার ভালো লাগলো না। তিন কি চার দিন গিয়ে বাদ দিয়ে দিলাম।
২০১৪'র শেষার্ধে কীভাবে যেন এই ভার্সিটির লিংক পেয়ে গেলাম। সাবজেক্টটার নাম শুনেই ভালো লাগলো। সুবিধা হলো ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, পুরোপুরি ইংরেজিতে পড়ায়। জাপানী শেখার হাঙ্গামা নেই। ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করলাম। প্রস্তুতি ছাড়া IELTS দিলাম মনঃপুত রেজাল্ট না এলেও ইউনিভার্সিটির ক্রাইটেরিয়ায় পাশ করলাম। এক বছর মেয়াদী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ১ বছর মেয়াদী মাস্টার্স কোর্স করতে এলাম।
এ সব কাহিনী জানানো উদ্দেশ্য না। তারপরও পটভূমি বলে রাখলাম। এই ভার্সিটি ইন্টারন্যাশনাল র্যাংকিংয়ে অনেক উপরের দিকে থাকলেও এর কিছু মজার দিক আছে :
১. এখানকার ৮০%-এরও বেশি ছাত্রছাত্রীর বয়স ৩০-এর উপরে।
২. কেবল আন্ডারগ্রাজুয়েট শেষ করে আসা ছাত্রছাত্রীদেরকে এখানে দুগ্ধপোষ্য শিশু হিসাবে গণ্য করা হয়।
৩. জাপানী ভার্সিটি হওয়ার পরও ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পাসে জাপানের কোনো ফ্লেভার পাওয়া যায় না।
৪. এটা গ্রাজুয়েট স্কুল, কোনো আন্ডারগ্রাজুয়েশন নেই।
৫. এক নম্বর পয়েন্টে যাদের কথা বলেছি তারা প্রায় সবাই সরকারী চাকর। জাইকা বা আইএমএফের স্কলারশিপ নিয়ে তারা পড়তে আসে।
৬. বাংলাদেশী যারা আছে তাদের কারো কারো এটা তৃতীয় মাস্টার্স। বিদেশী সরকার বা বাংলাদেশ সরকারের সাথে উন্নয়ন কাজে নিযুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বৃত্তি সরকারী চাকররা কুক্ষিগত করে রাখার কারণে এত বৃত্তি তারা কী করবে ভেবে পায় না। সে জন্য একেকজন দুইটা-তিনটা মাস্টার্স করে। এই সময়টাতে বৃত্তির টাকা দিয়ে চলে আর বেতনের টাকা জমিয়ে ফ্লাট কেনে।
এগুলোও আসল কাহিনী না। আসল কাহিনী হইলো ভর্তির সময় ভার্সিটির কাছে আচরণ বিষয়ক প্রতিজ্ঞাপত্র দিতে হয়, যাতে অন্য কারো সাথে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করা যাবে না। এই আচরণের কোনো লঙ্ঘন হলেই খাইছে। তো আমাদের সহপাঠিনী শহরবানু [তার নাম বানিউবেনিন প্রিয়েতা, আমরা নাম দিয়েছি বানু, সেখান থেকে শহরবানু]—বিড়ি খাওয়ায় তাকে মনে হয় কেউ টপকাতে পারবে না। পোলাপানের জন্য সে বিনা পয়সায় সিনেমা দেখার ব্যবস্থা করে। নায়কের নাম ক্রিস [কেউ আবার R বাদ দিয়ে তার নাম উচ্চারণ করবেন না]। সে উত্তরখণ্ডের অধিবাসী, বর্তমানে কানাডার নাগরিক। পোলাপানের সিনেমা দেখার কাহিনী হইলো শহরবানু তার জানালার হরাইজন্টাল ব্লাইন্ড টেনে দেয়ার সময় কালো পাশ বাইরে দিয়ে সাদা পাশ ভিতরে রাখে। কালো পাশ যে দিকে থাকবে সে দিক থেকে সব দেখা যাবে। শহরবানু হয়তো এটা জানে না বা তার এটা খেয়াল থাকে না।
খেয়াল তাকে না এ জন্য বললাম, এক রাতে পাকঘরে একজন রান্না করছিলো। শহরবানু এসে তার কাছে জানতে চাইলো তোমার কাছে তৈল আছে? সে বললো আছে। শহরবানু তার তৈলের বোতল থেকে হাতে কতখানি তৈল নিলো। সে জানতে চাইলো, তুমি রান্না করতে চাইলে কড়াই নিয়ে আসো। আমি আরো তৈল দিই। শহরবানু একটা হাসি দিয়ে বেরিয়ে গেলো।
ফল টার্মের বন্ধে নায়ক 'দু হপ্তে'র জন্য ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যায়। আমাদের শহরবানুর শহর বিরানভূমিতে পরিণত হয়। এই সময়েই মূল নায়কের আবির্ভাব [আমরা খলনায়ক বলছি না; আর এতক্ষণ যাকে নায়ক বললাম তাকে আমরা বলি সেমিনায়ক]। কিন্তু মূল নায়ককে না কি শহরবানু তার রুম থেকে বের হয়ে যেতে বলে।...শহরবানুর ভাষ্য মোতাবেক সে মূল নায়ককে তার রুমে আসতে বলেনি। দুষ্ট ছেলেরা বলে, তাইলে তুমি রুমের দরজা খোলা রাখছিলা কেন? যেহেতু শহরবানুর ভাষ্য মোতাবেক তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে মূল নায়ক তর রুমে এসেছে তাই মূল নায়ক ঘ্যাচাং—মানে তিন মাসের জন্য সাসপেন্ড।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জানুয়ারি, ২০১৬ রাত ১১:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


