গত ১২ ই জানুয়ারি রাত এগারোটার দিকে আমি অফিস থেকে বাসায় ফিরি। রাত একটার দিকে আমার ফ্যাক্টরি ম্যনেজার ফোন দিয়ে জানতে চাইলেন, আমি বাসায় পৌছেছি কি-না। জানালাম, হ্যা পৌঁছেছি। প্রশ্ন করলাম, কেন কোন সমস্যা?
ম্যানেজার বললেন, "মেরুল বাড্ডায় খুব গ্যাঞ্জাম হচ্ছে। এক হিন্দু মন্দিরের ভেতর কোরআন শরিফ জ্বালিয়ে দিয়েছে। তা নিয়ে আন্দোলন চলছে। তিনি অনেকক্ষণ ধরে সেখানে আটকে আছেন।"
কথাটা শুনে আমার গায়ে কাটা দিয়ে গেল। কেননা এ কথা অস্বীকার করার কিছু নেই যে, পবিত্র কোরআন শরিফের এমন অবমাননার কথা শুনেলে যে কোন মুসলমানের শরীরই প্রথমে একটা ঝাঁকুনি খাবে।
আমার স্ত্রী জানতে চাইলো, কি সমস্যা? আমি চুপ রইলাম।
পরের দিন মেরুল এলাকার একজন আমার অফিসে আসেলন। প্রথমেই তিনি আগের রাতের ঘটনার বর্ণনা দিলেন যে, "মন্দিরের পাশের পুকুরে একটি কোরআন শরিফ পড়ে ছিল। কেউ একজন সেটি তুলে মন্দিরের ভেতর রোদ দিয়ে ছিল। মন্দিরের ভেতর থাকা বিমল চন্দ্র এাতে ক্ষিপ্ত হয়ে আগুন লাগিয়ে দেন।"
আমার জানা মতে মন্দিরের পাশে কোন পুকুর নেই। তাই তার বক্তব্যটি আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হলো না।
সকালে ফেসবুক ও অনলাইন পত্রিকা মারফত জানতে পারলাম, সেখানকার মুসল্লিদের অভিযোগ, সোমবার দুপুরে নিমতলী মন্দিরের সামনে দিয়ে এক ব্যক্তি কোরআন শরিফ নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। মন্দিরের ভেতর থাকা বিমলচন্দ্র সেই মুসলিম ব্যক্তির কাছ থেকে সেটি কেড়ে নিয়ে মন্দিরের ভেতর পুড়িয়ে দেন।
বিশ্বস্ত স্থানীয় সূত্রসমূহের ভাষ্য মতে প্রকৃত ঘটনা:
স্থানীয় কিছু বখাটে হিন্দু যুবক কিছু বখাটে মুসলমান যুবককে সাথে নিয়ে অনেকদিন যাবত মন্দিরটির ভেতরে গাঁজা সেবন করে আসছিল। মন্দিরের ভেতরে থাকা সাধু এতে বেশ কয়েকবার বাঁধা প্রধান করেন। যুবকেরা তার কথা শুনেনি। উক্ত ঘটনার দিন সাধু জোরপূর্বক বখাটেদের বের করে দেন। এতে দিনের বেলা স্থানীয় পর্যয়ে বিচার-আচারও হয়। বিচারে যুবকদের বিপক্ষে সবাই কথা বলে। এরপর তারা পরিকল্পনা করে রটিয়ে দেয় যে, সাধু কোরআন শরিফ পুড়িয়ে ফেলেছে। এককান হতে দুই কান। এভাবে গুজবটি ছড়িয়ে পড়ে। যে কোন মুসলমানের পক্ষে এ কথাটি শোনার পর স্থির থাকা অসম্ভব। তাই অনেকেই রাতে রাস্তায় নেমে আসেন। অনেকে মন্দিরটি ভাঙ্গার জন্য এগিয়ে যায়। রাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেটি রক্ষার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়।
অনেকের মনে প্রশ্ন যে, এতবড় একটি ঘটনা মিডিয়া কেন প্রচার করে নি? কথা হচ্ছে, এতবড় একটি মিথ্যা ও গুজব মিডিয়া প্রকাশ করলে অবস্থাটা কি হতো একবার ভেবে দেখুন তো। সারা দেশে দাঙ্গা লেগে যেত। শত শত মন্দির ভাঙ্গা হতো। নিরীহ অনেক মানুষের প্রাণ যেত। মিডিয়ার কাজ হচ্ছে হয় সত্য প্রকাশ মিথ্যা বা গুজব নয়। রাতে অনেক চ্যানেল ও পত্রিকার সাংবাদিকগণ সেখানে গিয়ে ছিলেন। তারা বিষয়টি তদন্ত করে এর বিন্দুমাত্র সত্যতা পান নি।
ছোটবেলা থেকে আমি উক্ত মন্দিরটির সাথে পরিচিত। একসময় এ মন্দিরটির পাশ দিয়ে নিম্নাঞ্চলে আমাদের ধানক্ষেত দেখতে যেতাম। আশা-যাওয়ার পথে বিশাল বটগাছে ছেয়ে থাকা মন্দিরটির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে উঁকিঝুকি মেরে ভেতরটা দেখতাম।
আজ অফিসে আসার পথে পুলিশের ব্যাপক প্রস্তুতি ও তৎপরতা চোখে পড়লো। বাদ জুমা স্থানীয় মুসল্লি ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীগণ আন্দোলন করতে পারেন- এমন একটি ধারণা থেকে উক্ত প্রস্তুতি।
আমি আমার মুমিন মুসলমান ভাইদের বলবো, মিথ্যা বা গুজবে কান না দিয়ে সত্য জানুন। আপনার একটি ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। যে কোন নিরীহ মানুষের প্রাণ যেতে পারে। উক্ত ঘটনা যদি সত্য হতো তবে আমি নিজে আজ রাস্তায় দাঁড়িয়ে এর প্রতিবাদ করতাম। প্রকৃত ঘটনাটি যাদের কাছে জেনেছি, তারা আমার কাছের এবং বিশ্বস্ত লোক।
মহান আল্লাহ তালা, রাসূল পাক (স) ও পবিত্র কোর'আনুল কারিম- এ তিনটি বিষয়ে অন্য কারো চেয়ে আমার অনুভূতি কম নয়। আমি দেশের বিখ্যাত একটি হাফেজি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ছিলাম। ছিলাম দেশের নামকরা একটি আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীও। এর পর কলেজ ইউনিভার্সিটি হয়ে শিক্ষাজীবন শেষে করি। আমার ধর্মীয় গাঁথুনি আপনাদের কারো চেয়ে হালকা নয়। এ লেখাটি যখন লিখছি তখনও আমার টেবিলের উপর একযিল পবিত্র কোর'আনের বঙ্গানুবাদ রয়েছে। প্রতি বছর আমার ও আমার বাবার টাকায় বেশ কয়েকজন হাফেজে কোরআন পাশ করে বের হয়।
আল্লাহ তালা আমাদের সকলকে সমাজের কুচক্রি মহল থেকে হেফাজত করুন। যারা অযথা ফেতনা-ফ্যাসাদ তৈরীর মাধ্যমে দেশ ও সমাজে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাঁধিয়ে রাখতে সদা সচেষ্ট। আল্লাহ পাক আমাদেরকে সেইসব খান্নাসদের ওয়াছওয়াছা থেকে তার কুদরতি হাত দিয়ে বাঁচিয়ে রাখুন।
সবাইকে জুম'আ মোবারক। কারো কোন প্রশ্ন থাকলে জুম'আর নামাজ শেষে এসে উত্তর দিবো

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

