somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ আবার ফিরে আসে -২

০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০১২ রাত ১:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আগের পর্বের পর

নয়টায় ঘুম ভাংতেই ধড়মড় করে উঠে বসল পার্থ। কেন জানি মনে হচ্ছিল কোথাও কোন সমস্যা হয়েছে, কিছু একটা ঠিক নেই। শোবার ঘরের চারদিকে তাকাল। সায়মা নেই, টুটুও। স্কুলে নিয়ে গেছে মেয়েটাকে। ইদানীং আর সকাল সকাল পার্থকে ঘুম থেকে ডাকার প্রয়োজনবোধ করে না সায়মা। এতোদিন ব্যাপারটা স্বাভাবিক মনে হলেও আজ ঠিক ভালো লাগলো না। স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তাদের মধ্যে একটু দূরত্ব তৈরি হচ্ছে মনে হচ্ছে। সংসারের কোন ব্যাপারে তার নাক না গলানোই হয়তো এর পেছনে আছে। সে শুধু টাকা দিয়ে খালাস। পুরো সময়টা চলে যায় মিডিয়ায়। আজ ঢাকা তো কাল আউটডোর শুটিং-এ।
জানালা দিয়ে সুন্দর রোদ ঢুকেছে ঘরে। বাথরুম সেরে জামা-কাপড় বদলে নিলো পার্থ। প্যান্টের পকেটে মোবাইল ফোনটা নিতে ভুলল না। কোন কল আসে নি। তারমানে এবার ডিরেক্টর সাহেব ভালোই রেগে গেছেন, একবারও ফোন করে নি। এটা একটা রেড সিগন্যাল। ডিরেক্টর পাত্তা দিচ্ছে না। যেচে ফোন করতেও ইচ্ছে করছে না পার্থর। আজ শুটিং-এ যাবার কথা দুপুরের পর। গাজীপুরে এক খামার বাড়িতে। ডিরেক্টর ফোন না করলেও যেতে হবে। এই লোকের হাতে এখন অনেক কাজ। এর সাথে কোনমতেই সম্পর্ক খারাপ করা যাবে না।
গুন গুন করতে করতে ডাইনিং রুমে চলে এলো পার্থ। টেবিলে নাস্তা সাজানো আছে। ডিম ভাজি, পরোটা। কোহিনূরের মা’র কাজ। মহিলা গত দুবছর ধরেই কাজ করছে এ বাসায়। কিন্তু কখনো তার সামনে আসে না। সময়মতো যা দরকার মেশিনের মতো করে যায়। শুধু পার্থ’র সামনে আসতেই তার অসুবিধা। ভয় পায় না অতিরিক্ত লাজুক কে জানে।
ডাইনিং টেবিল এখান থেকে মায়ের রুমটা দেখা যায়। বিছানায় অসুস্থ মানুষটা শুয়ে থাকে। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, কথা বলার চেষ্টা করতো আগে। এখন তাও করে না। মায়ের এই মুখ দেখাটাও কষ্টকর পার্থ’র কাছে। গতরাতে একবার গিয়েছিল রুমে, তাও বিশেষ প্রয়োজনে।
কলিং বেলের শব্দে চিন্তায় ছেদ পড়ল। নিজে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল।
বাসার দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে। কাচুমাচুভাব চেহারায়।
‘স্যার, আফনের চিডি?’
‘কে দিল?’
‘টয়লেটে গেছিলাম, আইস্যা দেখি আমার টেবিলের উপরে চিডিডা,’ হাসিমুখে উত্তর দিলো দারোয়ান।
‘ঠিক আছে, তুমি যাও,’ বলল পার্থ। সাদা খামটা নিলো দারোয়ানের হাত থেকে।
খামের উপর তার নাম লেখা, প্রেরকের কিছু লেখা নেই।
দরজা বন্ধ করে টেবিলে এসে বসলো পার্থ। বুঝতে পারছে তার হাত কাঁপছে কিছুটা। সামান্যতেই অস্থির হয়ে যাওয়াটা তার স্বভাব নয়। কিন্তু গতকালের ঘটনাগুলোর পর...
কাঁপা হাতে খাম খুলল পার্থ। পুরো পাতায় লেখাঃ
“তোর জন্য একটা ভালো খবর--- সায়মা, টুটু নিরাপদে আছে।
তোর জন্য একটা খারাপ খবর--- আজ বাসা থেকে বের হোস নে।”
বাংলায় টাইপ করা লেখা। যে করেছে শালা ঘাঘু মাল। নিশ্চয়ই এটাতে কোন ফিঙ্গার প্রিন্ট পাওয়া যাবে না। জটিল!! মনে মনে হাসি পেল পার্থ’র। তার পেছনে কোন সাইকো লেগেছে। মানসিক রোগী নিশ্চয়ই। কেন লেগেছে সেটাই বুঝতে পারছে না। কারো বড় কোন ক্ষতি করেছে বলে মনে করতে পারছে না সে।
চুপচাপ নাস্তা সেরে নিলো পার্থ। মোবাইল বেজে উঠলো। ডিরেক্টরের ফোন। হাসি ফুটল পার্থের মুখে। যাক, নিজে থেকে ফোন করতে হলে প্রেস্টিজ থাকতো না।
‘কি পার্থ ভাই, কাল খবর না দিয়া কই গেলেন?’ ডিরেক্টর মফিজুল আলমের কন্ঠ শোনা গেল ওপাশ থেকে।
উত্তর তৈরিই ছিল, বলতে দেরি হলো না। ‘ভাই আর বলবেন না, মেয়েটা হঠাৎ এতো অসুস্থ হয়ে গেল...’
‘থাক ভাই, ভাবিরে ফোন দিছিলাম গতকাল সন্ধ্যায়। টুটু’তো ভালো আছে,’ একটু বিরতি নিলো ওপাশ থেকে মফিজুল ইসলাম। ‘যাই হোক, চলে আসেন। এখুনি রওনা দেন, আজ গাজিপুরের রাস্তায় অনেক জ্যাম।’
‘ঠিক আছে, আপনারা যাচ্ছেন কখন?’
‘আমি তো রাস্তায়। জেনিফারও আছে আমার সাথে। আপনে চলে আসেন তাড়াতাড়ি। গতকালের কিছু শট বাকি আছে এখনো।’
‘আচ্ছা---’ বলার আগেই ফোন কেটে গেল।
শোবার ঘরে ঢুকে মানিব্যাগ আর গাড়ির চাবি নিলো পার্থ। এখান থেকে গাজিপুর যেতে ঘন্টাখানেকের উপর লাগবে। এক্ষুনি রওনা দেয়া দরকার। দরজা খুলে বের হতে গিয়ে একটু থমকে দাঁড়াল। সায়মার সাথে একটু কথা বললে ভালো লাগতো। সব ঠিকঠাক আছে কি না দেখে নেয়া দরকার।
‘হ্যালো, সায়মা,’ দুবার রিং হতেই ফোন রিসিভ করেছে ওপাশ থেকে।
‘হ্যা, বলো, শুনতে পাচ্ছি।’
‘তুমি কি স্কুলে?’
‘হ্যা, কেন আর কোথায় যাবো?’ উল্টো প্রশ্ন ভেসে আসে ওপাশ থেকে।
‘ন-না, এমনি। কিছু আনতে হবে?’
‘কাজে যাও। কিছু লাগবে না।’
ফোনটা পকেটে নিয়ে ফুরফুরে মেজাজে বের হলো পার্থ। গাড়িটা নীচে পার্ক করা। এইসময়টা রাস্তাঘাট একটু ফাঁকা থাকে। আজ স্পটে যেতে বেশি সময় লাগার কথা না।
গাড়িটা নতুন কেনা হয়েছে। পুরানোটা সায়মা ব্যবহার করে, ড্রাইভার আছে সবসময়ের জন্য। এটার জন্য কোন ড্রাইভার নেই। নিজেই চালায় পার্থ। ভালো লাগে। এখন গাড়িতে উঠেই জগজিতের বিরহীকন্ঠের একটা গজল ছেড়ে দিল এমপিথ্রি-তে। এসিটা ফুলে দিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে এলো পার্থ।
যা ভেবেছিল তাই। রাস্তা অনেকটাই ফাঁকা। চাইলে সত্তর-আশিতে চালানো যায়। এক্সেলেটের কিছুটা চাপ বাড়াল পার্থ। মনটা বেশ ফুরফুরে। ঐ হারামজাদার চিঠিটা পেয়ে যদিও কিছুটা খচখচ করছিল বুকের ভেতরে, সায়মার সাথে কথা বলার পর তা কেটে গেছে।
‘শালা, আমাকে বলে বাসা থেকে বের হোস নে,’ বিড়বিড় করে বলল পার্থ। কুৎসিত গালি দিল অচেনা শত্রুকে উদ্দেশ্য করে।
মগবাজার পার হয়ে গেল সহজেই। এতো চমৎকার খালি রাস্তা কখনোই চোখে পড়ে না। ব্রেকে পা দিতে হয় নি একবারও। আজ ঢাকা বদলে গেল নাকি? আয়নায় নিজের দিকে তাকাল পার্থ। বেশ দেখাচ্ছে। চেহারায় সতেজ একটা ভাব, মুখে হাসি। জগজিতের গান শেষ হয়ে এবার একটা হেভি মেটাল গান শুরু হয়েছে। এই ধরনের উদ্ভট গান কিভাবে আসলো বুঝতে পারলো না পার্থ। প্রতিটি গান সে নিজে পছন্দ করে লোড করিয়েছে প্লেয়ারটায়। বিরক্তিতে মুখ কুচকাল।
সামনে মগবাজার রেল ক্রসিং। ট্রেন আসবে মনে হচ্ছে। ঘন্টা বাজছে। কিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছে এরমধ্যে। রেল ক্রসিং-এর বড় খামগুলো নামানো হচ্ছে। ব্রেকে চাপ দিল পার্থ। কাজ হলো না। পা’টা ঠিক করে আবার চাপ দিল। এবারো কাজ হয় নি। এবার দু’পা দিয়ে চেপে ধরল পার্থ। কাজ হলো না।
সামনের গাড়িগুলো একেবারে কাছে চলে এসেছে। পাগলের মতো হর্ন চাপছে পার্থ। ব্রেকফেল করেছে। গাড়ির গতিবেগ এখন চল্লিশের উপর। সামনের গাড়িটা বিপদ বুঝতে পেরে একটু সরার চেষ্টা করল, কিন্তু বিপদ এড়াতে পারলো না। পার্থ’র লাল রঙের এলিয়নটা সামনের গাড়ির পাশ ঘেষে চলে গেল। ঘর্ষনে দুটো গাড়ির দরজা যে প্রায় ভেঙ্গে যাচ্ছে পরিষ্কার বুঝতে পারছে পার্থ। কিন্তু কিছু করার নেই। সামনের গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে এসেছে, উত্তেজিত স্বরে কিছু বলছে। কিন্তু কিছু বোঝার মতো অবস্থায় নেই পার্থ। এবার সামনে আরো একটা গাড়ি। এটার পেছন দিকটাও থেতলে দিয়ে দূর্দম গতিতে এগিয়ে চলেছে পার্থর গাড়িটা। সামনে রেল ক্রসিং-এর ব্যারিকেড। ট্রেনের হুইসেল শুনতে পাচ্ছে পার্থ। যে কোন সময় চলে আসবে।
‘শালা বলেছিল বাসা থেকে বের হোস নে,’ মনে মনে বিড়বিড় করল পার্থ।
চারপাশে লোক জড় হয়ে হৈচৈ করছে, যে দুটো গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে এসেছে ড্রাইভারও আসছে পেছনে। সামনের ব্যারিকেডে থামার কোন লক্ষন দেখতে পাচ্ছে না পার্থ। হ্যান্ড ব্রেক জোরে চেপে ধরে বসে আছে। ঘাম ঝরছে অনবরত। কোনভাবে যদি ইঞ্জিন বন্ধ করা যেতো। মাথা কাজ করছে না। চোখ বন্ধ করল পার্থ। লোহার ব্যারিকেডে আঘাত খেয়েও এগিয়ে চলেছে গাড়িটা। ট্রেনের হুইসেল ক্রমশ এগিয়ে আসছে। ঐ পারের ব্যারিকেডটা পার হয়ে পাশের দোতলা বাসার দিকে হুইল ঘোরাল পার্থ। যে করেই হোক থামাতে হবে গাড়িটা আগে।
প্রচন্ড শব্দ করে দোতলা বাড়ির নীচতলার দেয়ালে আঘাত করছে গাড়িটা। নিজেকে সামলাতে পারে নি পারে নি পার্থ। সিট বেল্ট বাঁধা ছিল, তবু সিট থেকে উঠে সামনের কাঁচে মাথা লাগল তার। জ্ঞান হারাল সাথে সাথে।

টানা পনেরো দিন বিছানায় শুয়ে কাটাতে হলো পার্থকে। মাথা ফেটে বারোটা সেলাই লেগেছে। অন্যান্য জায়গায় আরো আঘাত তো আছেই। চকচকে লাল এলিয়ন গাড়িটা রমনা থানায় পড়ে আছে। থানা থেকে গাড়ি বের করতেও বেশ কিছু টাকা বেরিয়ে যাবে। যে দুটো গাড়িকে ধাক্কা দিয়েছিল তাদের ক্ষতিপূরন দিতে হবে। টাকার অংকটা নেহাত খারাপ হবে না। সবচেয়ে বাজে ব্যাপার হচ্ছে এই কদিনে মিডিয়ার আচরন পুরো অন্যরকম লেগেছে পার্থর কাছে। এক্সিডেন্টটাকে তারা পার্থের গাফিলতি মনে করছে। অনেকেই লিখেছে বেশি মাত্রায় এলকোহল খাওয়ার কারনেই এই ধরনের দূর্ঘটনা ঘটিয়েছে এই তারকা। শুয়ে বসে কয়েকটা পত্রিকা পড়ে মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছিল পার্থর। কিন্তু কি করার আছে? ঐ হলুদ সাংবাদিকদের কাছে প্রমান করার কিছু নেই তার। সবচেয়ে অদ্ভুত লেগেছে গাড়ির ব্রেকফেল হলো কি করে? একইসাথে হ্যান্ডব্রেকও কাজ করছিল না। তারমানে কেউ জিনিসগুলো নষ্ট করে রেখেছিল আগে থেকেই। বাসা থেকে বের হতে নিষেধ করেছিল এই কারনেই। আজব। অদ্ভুত। কে এই লোক যে তার জান হারাম করতে পিছু লেগেছে?
মফিজুল আলম একবার মাত্র এসেছিল দেখা করতে, তার জায়গায় অন্য কাউকে নিচ্ছে সেই খবরটা জানিয়ে গেছে। এছাড়া বাকি তেমন কারো সাথে যোগাযোগ হয় নি। মিডিয়া কি তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে ইদানীং? সে কি বুড়ো হয়ে গেছে? তার জনপ্রিয়তা নেই বিন্দুমাত্র?
বাসায় এসেই ঘুমিয়ে নিয়েছে পার্থ। শরীর প্রায় সেরে এসেছে। আবার কাজে নামতে হবে। ভাগ্যভালো এরমধ্যে অচেনা কোন নাম্বার থেকে ফোন কল কিংবা বেনামী চিঠি আসে নি। হয়তো সেই লোকটার শখ মিটে গেছে। আরেকটু হলেই তো মরতে বসেছিল পার্থ।
বিছানায় শুয়ে মোবাইল ফোন নিয়ে ঘাটাঘাটি করছিল পার্থ। সায়মা পাশে আছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। টুটু ঘুমাচ্ছে। কাউকে কল করতে ইচ্ছে করছে পার্থর। কিন্তু ডায়াল লিস্ট ঘেটে কথা বলার মতো কাউকে পাচ্ছে না। সবাই মনে হয় দূরের মানুষ। মন খুলে কথা বলার মতো কেউ নেই। সায়মা বেশি কথা বলে না। যেন কথা না বলতে হলেই বাঁচে।
মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো এই সময়। অচেনা নাম্বার। কলটা সাইলেন্ট করে দিল পার্থ। এই কল ধরা যাবে না। ধরলেই বিপদ। কল হতে হতে কেটে গেল। সায়মার দিকে তাকাল পার্থ। একমনে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে মাথায়, অন্যমনস্কভাবে।
আবারও কল এলো। একই নাম্বার থেকে। যা হবে দেখা যাবে ভেবে রিসিভ করলো পার্থ।
‘কি ভাই কল ধরেন না ক্যান?’
‘কে বলছেন?’ উঠে বসল পার্থ। সায়মাকে ইশারায় মাথায় হাত বুলাতে নিষেধ করল।
‘আমি কেউ না। তবে আপনার জন্য একটা খবর আছে?’
‘কোন খবরের দরকার নেই। রাখি।’
বলে লাইনটা কেটে দিল পার্থ। কেউ একজন তার পেছনে লেগেছে। জ্বালাতে চাচ্ছে। কেন চাচ্ছে সেটাই বোঝা যাচ্ছে না। পৃথিবীতে কত ধরনের মানুষ থাকে!
ফোনটা আবার বেজে উঠলো, তবে এবার কল না এসএমএস।
ওপেন করল পার্থ।
‘মিঃ পার্থ, সাফারিংস আর ওয়েটিং ফর ইউ, ইটস জাস্ট দ্য বিগেনিং। ’
গালি দিয়ে একটা রিপ্লাই করল পার্থ। শালাকে হাতে পেলে নিজের হাতে পিঠের চামড়া তুলে নেবে বলে কসম কাটলো।
‘কি হয়েছে? কে কল করছে বারবার?’ সায়মা জিজ্ঞেস করল।
‘কেউ না। সম্ভবত কোন ভক্ত।’
‘হমম। ভালো। মেয়ে ভক্ত না ছেলে?’
‘নাম্বার দেখে কিভাবে বুঝবো মেয়ে না ছেলে?’
হাসল সায়মা, গালে সুন্দর টোল পড়ে হাসলে। এক্সিডেন্টের পর স্বামী-স্ত্রীর দূরত্ব কিছুটা কমেছে, ভাবল পার্থ। আসলে সে নিজেই একদম সময় দিতো না সায়মাকে। সেটা মোটেই উচিত হয় নি। অসুস্থতার এই সময়টায় সায়মার সেবাই তাকে অনেকটা সুস্থ হতে সাহায্য করেছে।
‘চলো খেয়ে ফেলি। তোমার আরো ঘুম দরকার।’
‘এখুনি খাবো। আটটা বাজে মাত্র।’
‘তাতে কি? চলো। ডাইনিং টেবিলে সব রেডি আছে।’ বলল সায়মা। পার্থকে সাহায্য করল উঠতে।
ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজানো ছিল। পার্থর টেবিল খাবার বেড়ে দিচ্ছিল সায়মা। কলিং বেলে ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে কেউ। বিরক্ত মুখে দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে।
দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে পুলিশের কয়েকজন লোক।
‘এটা কি পার্থ রহমানের বাসা?’
‘জ্বি,’ নার্ভাস কন্ঠে বলল সায়মা।
‘আমরা ভেতরে আসবো,’ প্রায় আদেশের সুরে বলল পুলিশের দলটার একজন।
‘আসুন, কিন্তু---’
‘কিন্তুর কিছু নেই ম্যাডাম। আমাদের কাছে সার্চ ওয়ারেন্ট আছে।’
ভাত খেতে খেতে দেখছিল পার্থ। বুঝতে পারছিল নতুন কোন ঝামেলা তৈরি হতে যাচ্ছে। খাওয়া বন্ধ করে বসে আছে।
পাচজন পুলিশ ভেতরে ঢুকে গেল। একজন এগিয়ে এলো পার্থর দিকে। সম্ভবত এই দলটার নেতা সে।
‘আপনি তো পার্থ রহমান?’
‘জ্বি।’
‘আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। আপনি ড্রাগ ব্যবসায় জড়িত।’
‘আমি? ড্রাগ ব্যবসা?’
‘হ্যা, আমরা আপনার বাসায় তল্লাশি চালাবো।’
‘কিন্তু এই ধরনের অভিযোগ আসার কারন বুঝলাম না। আমি নাটক-সিনেমায় কাজ করি। ড্রাগের সাথে আমার কোন কানেকশন নেই।’
‘সেদিন তো মাতাল হয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলেন।’
‘কি যে বলেন? মেডিক্যাল সার্টিফিকেটে কি সে রকম কিছু লেখা ছিল?’
‘আপনার বড়লোক মানুষ। হয়তো কোন কারসাজি করেছেন। কিন্তু এখনকার অভিযোগ ভয়াবহ।’
উত্তর দিলো না পার্থ। অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল সায়মার দিকে। সায়মাও দাঁড়িয়ে আছে, দেখছে পুলিশের লোকগুলো সব কিছু উলটে পালটে দেখছে কোথাও কিছু আছে কি না। একজন বেডরুমের দিকে গেছে। আরেকজন মায়ের রুমে। বাকি দুজন ডাইনিং রুমে খুঁজছে।
‘অভিযোগটা কি?’
‘অভিযোগ হচ্ছে আপনি ড্রাগ ডিলার। অন্তত আপনার এই এলাকায়।’
‘কি ড্রাগ? কি বলছেন আবোল-তাবোল?’
‘আমি আবোল-তাবোল বলছি না, আর---’
কথা শেষ করতে পারলো না পুলিশ কর্মকর্তা। বেডরুম থেকে একজন বের হয়ে এসেছে। হাতে ছোট দুটো কার্টন।
‘স্যার, এই কার্টুনগুলা পাইছি খাটের নীচে,’ দাঁত বের করে বলল পুলিশের লোকটা, সম্ভবত হাবিলদার হবে, ভাবল পার্থ।
‘খোল এখানে,’ কর্মকর্তা বলল।
একটা কার্টন খুলে যা বের হলো তা দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল পার্থ। ছোট ছোট প্যাকেট ভর্তি ট্যাবলেট। লাল রঙের। জিনিসগুলোর নাম মনে করতে না পারলেও বুঝতে পারছে সাম্প্রতিক সময়ে নেশা করার জন্য এগুলোই পছন্দ করে তরুন প্রজন্ম।
‘আপনার কিছু বলার আছে?’
‘বলার থাকলে কি শুনবেন?’
‘না, শুনবো না। বিচারের ভার আদালতের। আমরা আপনাকে অ্যারেস্ট করছি।’
উঠে দাঁড়াল পার্থ। বেসিনে গিয়ে হাত ধুয়ে নিলো। নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করছে সায়মা। দৌড়ে এসে পার্থকে জড়িয়ে ধরেছে।
‘তুমি রফিক আঙ্কেলকে খবর দাও। আমার জামিনের ব্যবস্থা করতে বলো।’
সায়মা কাঁদছিল। এই কেসগুলোতে না কি অজামিনযোগ্য, কোথাও পড়েছিল সে। কিন্তু সেকথা এখন পার্থকে মনে করিয়ে দিতে ইচ্ছে করলো না।
বাসার বাইরে পিক-আপ দাঁড়ানো ছিল। । ঠিক পাঁচমিনিটের মধ্যে পার্থকে নিয়ে চলে গেল পুলিশের লোকগুলো।

চলবে----

আগের পর্বের লিংক
Click This Link
আবার ফিরে আসে-১
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তারেক সাহেব জিতলেন, কিন্তু কতটা?

লিখেছেন মুনতাসির, ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:৩৪


গতকাল রাতে বাসে করে বাড়ি ফিরছি। ঢাকার বাস একটা চলমান টকশো। টিকিট একটাই, কিন্তু বিষয়বস্তু ফ্রি।

সামনের সিটে বসা দুই ভদ্রলোক এমনভাবে কথা বলছিলেন, মনে হচ্ছিল তারা নির্বাচন কমিশনের বিশেষ উপদেষ্টা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রেম করে বিয়ে করবেন? নাকি বাড়ির পছন্দ অনুযায়ী বিয়ে করবেন?

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১০:৪১



লালনের একটা গান আছে,
"এমন মানব জনম আর কি হবে। মন যা কর ত্বরায় কর এই ভবে।" চমৎকার গান। চমৎকার গানের কথা। কথা গুলো বুঝতে চেষ্টা করুন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৮১

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:৫২



যাক নির্বাচন শেষ!
আমি ভোট দেইনি। মন থেকে ভোট দেওয়ার তাগিদ অনুভব করিনি। তবে ভোটের দিন রোজা আর ফারাজাকে নিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে বেড়িয়েছি। দুই কন্যা আর আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিজড়াদের ব্যাপারে ইসলামে কিছু বলা আছে কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৪৬



একটু আগে তারাবী নামাজ পড়ে আসলাম। এসে ফেসবুক খুলতেই চোখে পড়লো, আমার এক আত্মীয় জুনায়েদ সাকীকে নিয়ে পোস্ট দিয়েছেন। সাকী সাহেব বুঝি সমকামীদের সমর্থন করেছিলেন। যেহেতু তিনি সমকামীদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহিয়সী

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:০২



প্রেসক্লাবের সামনে এক মেয়ে চিৎকার করে উঠলো,
আমি এক মহিয়সী কন্যা।
দুষ্টলোকেরা আমাকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিলো!
প্রিয় নগরবাসী, আমার দিকে তাকান, আমার কথা শুনুন।
আমার বাবা আমায় এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×