somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভুমিকম্পে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন – অপসারণ, সংস্কার অথবা পুনঃনির্মাণ বনাম বাস্তবতা।

০৯ ই মে, ২০১৫ বিকাল ৪:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সদ্য ঘটে যাওয়া নেপালের ভূমিকম্পের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি’র পর আমাদের দেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়বস্তু ছিল, “ঢাকা শহরের ঝুঁকিপূর্ণ ৭৪ হাজার স্থাপনা”। অর্থাৎ বিশেষজ্ঞদের মতে ভূমিকম্পের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে এই ৭৪ হাজার ভবন। তো? অপসারন করতে হবে? অসম্ভব!!! ভাই থামেন, থামেন... এটা কি মগের মুল্লুক? আপনি বললেন আর সাথে সাথে এই ৭৪ হাজার ভবন অপসারিত হয়ে যাবে। আসুন একটু আলোচনা করা যাক কেন এটা অসম্ভব একটা বিষয়।

৩৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে আমাদের প্রাণপ্রিয় এই শহর ঢাকা। প্রায় দুই কোটি লোকের শহর এই ঢাকা। এখন চটপট হিসেব কষে ফেলুন প্রতি বর্গ মিটারে কতজন মানুষ বসবাস করেন। এই ঘনত্ব’র সাথে খাপ খাওয়াতে গত দুই দশকে ঢাকা শহরে গড়ে ওঠে প্রায় তিন লাখেরও বেশী ভবন। বর্তমানে এই শহরে ছয় লক্ষাধিক ভবন রয়েছে বলে জানা যায়। এর মধ্যে চুয়াত্তর লক্ষ ভবন ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রায় আট ভাগের এক ভাগ ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ। এখন এই ভবনগুলোর মধ্যে সবচাইতে বেশী ঝুঁকিতে রয়েছে পুরাতন ঢাকার ভবনগুলো এটা সর্বজন স্বীকৃত। কিন্তু শুধুমাত্র কি পুরাতন ঢাকার ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ?

না, বরং পুরাতন ঢাকার অধিকাংশ এলাকার সুবিধা হল এখানকার মাটির গঠন। যারা রিয়েল এস্টেট বা ভবন নির্মাণের সাথে জড়িত বা অভিজ্ঞতা আছে তাঁরা জানেন পুরাতন ঢাকার বেশীরভাগ এলাকাতেই ভবন নির্মাণে পাইলিং এর প্রয়োজন হয় না এখানকার মাটির উত্তম গঠনের জন্য। অপরদিকে গত বিশ বছরে ঢাকা শহরের যে বিস্তৃতি হয়েছে, সেই এলাকাগুলোর অধিকাংশই জলাভূমি ভরাট করে গড়ে উঠেছে। বুড়িগঙ্গার এই পাশের মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকা থেকে শুরু করে অপর প্রান্তের বনশ্রী বা পূর্বাচল অথবা বিখ্যাত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা। এগুলোর প্রতিটিই কিন্তু জলাভূমি ভরাট করে গড়ে ওঠা এলাকা। ফলে এখানকার মাটির গঠন অনেক নাজুক। তাই অহেতুক পুরাতন ঢাকার দিকে আঙ্গুল না দেখিয়ে পুরো ব্যাপারটাতে একটু নজর দেয়া যাক।

এই লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিশেষজ্ঞদের মতে যে ঝুঁকিপূর্ণ ৭৪ হাজার ভবন রয়েছে, সেগুলো অপসারন করা বা সংস্কার করা কতটুকু সম্ভব বাস্তবতার নিরিখে। গত বছরের ১৫ জুন জাতীয় সংসদে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন জানিয়েছিলেন, রাজউক রাজধানীতে ৩২১টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করেছে। সংখ্যার ধাঁধায় পড়ে গেলেন তো? বাদ দেন, আসুন আমরা সাধারণ মানুষ, একটু সাধারণ হিসেব কষি।

প্রথম প্রশ্ন ঝুঁকিপূর্ণ ৭৪ হাজার ভবন কি অপসারন সম্ভব? উত্তর না? কারণ পুরো শহরের ১২.৫% জনগণের আবাস অপসারণ, পুনঃনির্মাণ বা সংস্কার কি খুব সহজ ব্যাপার? মোটেও না? দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, অর্থনৈতিক দিক। এই ৭৪ হাজার ভবনের পুনঃনির্মাণের জন্য দরকার কত টাকা। গড়ে যদি প্রতিটি ভবন পাঁচতলা ধরা হয় এবং প্রতি ফ্লোরের আয়তন দুই হাজার স্কয়ার ফুট এবং প্রতি স্কয়ার ফুটের নির্মাণ খরচ এক হাজার টাকা ধরা হয় তবে কত টাকা লাগবে একটু হিসেব করুন। আমি আবার বোকা মানুষ কি না, আমার হিসেবে ভুল হয়ে যায় বারবার :P প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকার মত হয় তাই নয় কি? তো এই টাকার যোগান কে দেবে?

শুধুমাত্র ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ করে আমরা কতটা ঝুঁকিমুক্ত হতে পারবো এটা একটা বড় প্রশ্ন? তারচেয়ে এই প্যানিক না ছড়ানোটা বুদ্ধিমানের কাজ নয় কি? নেপালের ভূমিকম্পের সময় এবং পরবর্তীতে আমাদের দেশে এই প্যানিকে আহত-নিহতের ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে। অথচ, ভূমিকম্পের সময় দৌড়ঝাঁপ করার তেমন একটা সময় কি পাওয়া যায়? ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ এবং এই সংশ্লিষ্ট নিউজ যতটা প্রচার হয়েছে তার চেয়ে অনেক অনেক কম প্রচারিত হয়েছে ভূমিকম্পের সময় করনীয় নিয়ে। অথচ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ যতটা অসম্ভব, তারচেয়ে অনেক অনেক বেশী কার্যকর হল এই ভূমিকম্পের সময় করনীয় বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা।

তবে এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণের একটি সহজ এবং কার্যকর উপায় রয়েছে। কি সেটা? আছে, তার আগে একটা কথা বলে নেই। আপনারা কে কে হাউজ বিল্ডিং লোণ নিয়ে নিজের বাড়ী করেছেন? তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন এই হাউজ বিল্ডিং লোণ পেতে কি হ্যাপা পোহাতে হয় এবং অবশ্যই সাথে আপনার লবিং থাকতে হবে। তো এখন ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ এবং নতুন ভবন নির্মাণে সরকার একটা উদ্যোগ নিলেই এটা অনেকাংশে সম্ভব হয়ে যাবে। প্রথম কথা আমাদের সেনাবাহিনীর সিভিল ওয়ার্ক এক্সপার্টদের তত্ত্বাবধানে প্রাইভেট ডেভেলপারদের নির্মাণ কাজের দায়িত্ব দেয়া হবে ভবনের এলাকার দিক বিবেচনা করে ৮/৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল ভবন নির্মাণের। এক্ষেত্রে সরকারী ব্যাংক অথবা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বেসরকারি ব্যাংক এই নির্মাণ কাজে বিনিয়োগ করবে। বাড়ীর মালিকের নামে বিশ বছর মেয়াদী হাউজ বিল্ডিং লোণ ইস্যু করে এই নির্মাণের পুরো খরচ আদায় করা হবে। এক্ষেত্রে হাউজ বিল্ডিং লোণের ক্ষেত্রে সুদের যে হার, সেই হারই না হয় প্রযোজ্য হবে। ফলে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মালিক নিজেরাই এসে ধর্না দিবে রাজউকের দরবারে। তারপরও প্রশ থেকে যায়, নির্মাণকালীন সময়ে এই ভবনের বাসিন্দাদের আবাসনের কি হবে? কারণ সংখ্যাটা কিন্তু কম নয়, প্রায় বিশ লক্ষাধিক মানুষ!

এই বিষয়ে পুরাতন ঢাকার বাড়ীর মালিকগুলোর কথা শেয়ার করি। বেশীরভাগ বাড়ীর মালিকের আয়ের অন্যতম উৎস হল এই বাড়ী ভাড়ার টাকা। অন্যতম কেন, অনেকক্ষেত্রে একমাত্র উৎস। তো আপনি, আমি বা সরকার চাইলেই সে এই বাড়ী হুট করে ভেঙ্গে নতুন বাড়ী তুলতে পারবে না। আবার এই বাড়ী ভাড়া না দিয়েও সে থাকতে পারবে না। আর ঢাকা শহরের অতি জনসংখ্যার চাপের কারণে তাদের ভাড়াটিয়া পেতেও সমস্যা হবে না। তাই সমাধান হল, সহজ শর্তে দীর্ঘ মেয়াদী লোণের ব্যবস্থা করে এই ভবনগুলো দ্রুত সংস্কার করা। আর আমার মতে, এটি একমাত্র করনীয়, এর বাইরে আর কিছুই করার নাই। কেননা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শুধু ভাড়াটিয়া নয়, বাড়ীর মালিকও বসবাস করেন, স্বপরিবারে।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মে, ২০১৫ বিকাল ৪:৫৯
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×