
[link|

আমার জীবনের এক বিরাট অংশ এবং আমি এর এক ক্ষুদ্র অংশ। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে মেধার লড়াইয়ে হাজার হাজার প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলতে হয়েছে আমাকে। মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া প্রায় অসম্ভব। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে ভালো ফল। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াটা নিজের গৌরবপূর্ণ অতীতের সঙ্গে বেমানান।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই একমাত্র রাস্তা। তাই ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সুন্দরী রাজকন্যা ও অর্ধেক রাজত্ব লাভের আনন্দ পেয়েছিলাম আমি। নিজের মেধার মান রক্ষা, সে সঙ্গে দরিদ্র পিতাকে অহেতুক অর্থব্যয় হতে বাঁচিয়ে দেওয়া।এক ঢিলে দুই পাখি মেরে আনন্দে ভাসছিলাম আমি। আমার সে আনন্দের বেলুন ফুটে মাটিতে আছাড় খেতে বেশি সময় লাগল না। হলে ওঠার প্রক্রিয়া ও হলের পরিবেশ আমাকে আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে আনল। প্রথম বর্ষে হলে ওঠার নিয়ম নেই। দ্বিতীয় বর্ষে হলে ওঠার জন্য আবেদন করলাম। হলো না। সিট খালি নেই। অবশেষে সোনার হরিণ মিলল তৃতীয় বর্ষে এসে। আবার হোঁচট খেলাম আমি। হল প্রশাসন আমাকে সিট দিল কিন্তু সেখানে বাস করছেন রাজনৈতিক ছোট ভাই। আমার দুঃসময়ে এগিয়ে এলেন কয়েকজন বন্ধু। তাদের কাছে হলো আমার হল জীবনের প্রথম পাঠ। হল প্রশাসন নয়, রাজনৈতিক উপায়ে হলে প্রথম বর্ষেই সিট পাওয়া যায়। আমিও সেই পথ অবলম্বন করলাম এবং সফল হলাম অতি সহজে।
আনন্দিত হয়েছিলাম কিন্তু মনের মধ্যে কয়েকটি প্রশ্ন জেগেছিল, যে প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও খুঁজে পাইনি। ছাত্ররাজনীতি কি হল প্রশাসনের ঊধর্ে্ব? যে প্রশাসন ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না তার আবার দরকার কী? ছাত্ররা যদি হল প্রশাসন না-ই মানে, তবে লিখে-পড়ে নিচ্ছে না কেন?এ তো গেল হলে ওঠার প্রক্রিয়া।
হলের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ আমার অনুভূতিকে কেবল ব্যথিতই করল না, বরং লজ্জিতও করল। ক্যান্টিনের খাবার অস্বাস্থ্যকর, মানসম্মতও নয়। হলের ডালে ভিটামিন এম (মাছি) ভাসে, এক রুমে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জন থাকতে হয়। গণরুম, টিভি রুম, বারান্দা ও মসজিদে রাত্রিযাপন, ছারপোকা ও মশার রাজ্যে বসবাস_ এসব তো হল জীবন সম্পর্কে সর্বজনবিদিত প্রবাদ। ক্রমশ মোটা হতে থাকা আমার শরীরের চামড়ায় এসব প্রবাদ অথবা সত্যি সয়ে গেল। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, কিছু বিষয় আমাকে এখনও এই ভার্সিটি লাইফের শেষ সময়ে এসেও ভাবিয়ে তোলে।দোষ সবসময় নন্দ ঘোষেরই হয়। যখনই ক্যাম্পাসের এ বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখনই এক শ্রেণীর নবীন বুদ্ধিজীবীকে বলতে শুনি, প্রশাসন উদাসীন। ক্যান্টিনের খাবারের মান ভালো নয়। কারণ হল প্রশাসন খবর রাখে না। ক্যান্টিন মালিকরা অধিক মুনাফালোভী।
স্বীকার করছি হল প্রশাসন কিংবা ক্যান্টিন মালিকরা কেউই ধোয়া তুলসী পাতা নন। কিন্তু সারা মাস বাকি খেলে কিংবা ফাও খেলে মালিকরা নগদ অর্থের জোগান দেবেন কোথা থেকে?সিট সংকটের কারণ, হল প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নেই। বলি দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক হর্তাকর্তারা, সম্মানিত শিক্ষকরা কি আপনাদের সঙ্গে সিট দখলের লড়াইয়ে নামবেন? আপনাদের মধ্যে কারও কারও পাস করে যাওয়ার সময়টা যে এখন প্রত্নতাত্তি্বক গবেষণার বিষয়। আপনাদের নেতা থেকে শুরু করে পাতি নেতারা পর্যন্ত সবাই যদি একা একটা বেড বা রুম দখল করে বসে থাকেন তবে তো গণরুম অনিবার্য। আর সমবণ্টনের কথা বলবেন? এটা শুধু আমাদের (ছাত্রদের) মধ্যে না, এই জাতির মধ্যেই নেই।অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোতে এই জাতির একটা সুনাম আছে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন?
আমাদের একটু সচেতনতাই পারে হল জীবনকে সুন্দর ও মানানসই করতে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের কিছু তরুণ মেধাবী ছাত্র হল প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা হলের আন্দোলনে নেমেছে। তারা কতটুকু সফলকাম হয়েছে সে বিচার আমি করব না। কিন্তু উদ্যোগটি অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। হল প্রশাসনকে দোষারোপ না করে আমরা সবাই এ রকম ছোট ছোট উদ্যোগ নিলে বাসযোগ্য হয়ে উঠবে আমাদের প্রিয় হলগুলো।
১০/৫/১২
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জুন, ২০১৭ রাত ৯:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




