somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তাকওয়া হাসিলের উপায়-৩

১৩ ই আগস্ট, ২০১৪ রাত ১১:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তাকওয়া হাসিলের উপায়-৩

মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী

১ম পর্বের লিঙ্ক
Click This Link

২য় পর্বের লিঙ্ক
Click This Link

দ্বিতীয় আমল : শোকর
দ্বিতীয় আমল হল, বেশি বেশি শোকরগোযারি করা। চিন্তা করে দেখুন, প্রতি মুহূর্তে আল্লাহ তাআলার কত অসংখ্য নেআমত আমাদের উপর বর্ষিত হচ্ছে। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আল্লাহ তাআলার নেয়ামত। এগুলো সবল ও কর্মক্ষম থাকা কত বড় নেয়ামত! স্বাভাবিক অবস্থায় এই সব নেয়ামতের মূল্য না বুঝলেও যখন কোনো একটি অঙ্গ অসুস্থ বা অকেজো হয়ে পড়ে তখন তার মূল্য বুঝে আসে।

ইমাম বায়হাকী রাহ. শুআবুল ঈমান কিতাবে এক বুযুর্গের ঘটনা লিখেছেন। বুযুর্গ মারাত্মক অসুস্থ ছিলেন এবং চলাফেরাতেও অক্ষম ছিলেন। হাত-পা অবশ হয়ে গিয়েছিল। সেই করুণ অবস্থাতেও শুয়ে শুয়ে বলছিলেন যে, ‘হে আল্লাহ! তোমার শোকর, তোমার শোকর।’ এক ব্যক্তি বলল, হযরত! এত অসুখের মাঝেও শুকরিয়া আদায় করছেন? তিনি বললেন, ভাই! আল্লাহ তাআলা তো আমার চোখ দুটো এখনও সুস্থ রেখেছেন। যদি এ দুটোও নষ্ট হয়ে যেত তাহলে আরো কত পেরেশানি হত!

খলীফা হারুনুর রশীদের একটি ঘটনা আছে। তিনি পিপাসার্ত হয়ে খাদেমের কাছে পানি চাইলেন। বিখ্যাত বুযুর্গ বুহলূল রাহ. খলীফার কাছেই ছিলেন। খলীফা পানি পান করতে যাবেন, এমন সময় বুহলূল বললেন, জনাব, একটু থামুন। আমার একটি প্রশ্ন আছে। খলীফা কিছুটা অবাক হয়ে পাত্র নামিয়ে নিলেন। বুহলূল বললেন, ‘প্রচন্ড পিপাসার সময় এই এক পাত্র পানির জন্য আপনি কী পরিমাণ সম্পদ খরচ করতে রাজি হবেন?’

একটু ভেবে খলীফা বললেন, ‘পিপাসা যদি তীব্র হয়, প্রাণনাশের আশঙ্কা দেখা দেয় তাহলে প্রয়োজনে আমার গোটা রাজত্ব দিয়ে হলেও এ পানিটুকু পেতে চাইব।

বুহলূল বললেন, ঠিক আছে। পান করুন।’ খলীফা পানি পান করার পর বুহলূল আবার জিজ্ঞাসা করলেন, হুজুর, আরেকটি ছোট্ট প্রশ্ন আছে।’ খলীফা বললেন, ‘বলুন।’ বুহলূল বললেন, ‘আপনি যে পানিটুকু পান করলেন তা যদি আপনার শরীরে আটকে থাকে (অর্থাৎ প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায়) তাহলে তা বের করার জন্য কী পরিমাণ ব্যয় করবেন?’

খলীফা বললেন, ‘এমন যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজনে আমার গোটা রাজত্ব দিয়ে দেব।’

এবার বুহলূল বললেন, ‘হুজুর! এই রাজত্বের কী মূল্য, যা এক পাত্র পানির পান করার জন্য এবং এক পাত্র পানি শরীর থেকে বের করার জন্য চলে যায়?!’ অর্থাৎ এটি আল্লাহ তাআলার এত বড় নেয়ামত, এর মোকাবিলায় আপনার এই বিশাল রাজত্বও অতি তুচ্ছ।
বান্দা যদি তা চিন্তা করে তাহলে সে শোকরগোযারি করবে।

তাই ইস্তিঞ্জা করার পরই এই দুআ পড়ার কথা আছে-
الحمدللهالذيأذهبعنيالحمد لله الذي أذهب عني الأذى وعافني
الأذىوعافني
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমার ভিতর থেকে কষ্টদায়ক বস্ত্ত বের করে দিয়েছেন এবং আমাকে আফিয়ত ও সুস্থতা দান করেছেন।

সুনানে দারাকুতনীর এক রেওয়ায়েতে দুআটি এভাবে আছে-
الحمدللهالذيأذاقنيلذتهوأبقىعليقوتهالحمد لله الذي أذاقني لذته وأبقى علي قوته ودفع عني أذاه
ودفععنيأذاه
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি আমাকে খাবারের স্বাদ আস্বাদন করিয়েছেন, আমার দেহে এর শক্তি ও উপকারিতা বাকি রেখেছেন এবং এর ক্ষতিকর অংশটুকু আমার ভিতর থেকে বের করে দিয়েছেন।

কত সুন্দর অর্থবহ দুআ!
এভাবে প্রতি মুহূর্তে মানুষ আল্লাহ তাআলার কত নেয়ামত ভোগ করছে!
কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলেন-
وقليلمنعباديالشكوروقليل من عبادي الشكور.

আমার বান্দাদের মাঝে শোকরগোযার খুবই কম।

মোটকথা প্রয়োজনের শুরুতে দুআ আর প্রয়োজন পূরণ হলে শুকরিয়া, ইনশাআল্লাহ, খুব সহজ এ আমল দুটি পাবন্দির সাথে আদায় করলে দ্রুত আল্লাহ পাকের নৈকট্য অর্জিত হবে।

আবার খুব সহজ হওয়ার কারণে দেখবেন, এখান থেকে উঠেই ভুলে যাচ্ছেন। গাফলত এসে যাচ্ছে। এই গাফলত দূর করার উপায় হল আল্লাহ ওয়ালাদের সোহবত। সোহবতের বরকতে আমলের তাওফীক হয়।

আর শোকর এমন এক দামি আমল, যে বান্দা যত বেশি শোকর আদায় করবে তত বেশি শয়তানের হামলা থেকে বেঁচে যাবে। শয়তান জান্নাত থেকে বহিষ্কার হওয়ার সময় পণ করেছিল, আদমসন্তানকে সবদিক থেকে গোমরাহ করার চেষ্টা চালাবে। তখন একথাও বলেছিল-
ولاتجداكثرهمشاكرينولا تجد اكثرهم شاكرين
তাদের অধিকাংশকেই শোকরগোযার পাবেন না।

বুঝা গেল, শয়তানের অনেক বড় একটি হামলা হল, বান্দাকে শোকরগোযারি থেকে বিরত রেখে নাশোকরিতে লিপ্ত করে দেওয়া।
আর বান্দার অন্তরে যখন আল্লাহ তাআলার নেয়ামতের কদর সৃষ্টি হয় তখন গুনাহ থেকে বেঁচে থাকাও সহজ হয়ে যায়। এভাবে ধীরে ধীরে আল্লাহ তাআলার সাথে তাআল্লুক বাড়তে থাকে।

তাকওয়া অর্জনের দ্বিতীয় উপায় হল, মুজাহাদা।
মুজাহাদা ও জিহাদের শাব্দিক অর্থ সর্বাত্মক চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করা।
আর সশস্ত্র জিহাদ শরীয়তের হুকুম-আহকাম মোতাবেক হলে তা অনেক বড় ইবাদত। আরেক ধরনের জিহাদ হল, যার ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
المجاهدالمجاهد من جاهد نفسه
منجاهدنفسه
আপন নফসের সাথে যে জিহাদ করে, সে-ই মুজাহিদ। অর্থাৎ প্রবৃত্তির কামনার বিরুদ্ধে কাজ করা। একে বড় জিহাদ বলেও অভিহিত করা হয়েছে। হাদীসের সনদে যদিও কিছুটা কালাম আছে, কিন্তু বুযুর্গ ও ফকীহগণ একে জিহাদে আকবর বলেছেন। মনে চাচ্ছে না মসজিদে যেতে, মনের বিরুদ্ধাচরণ করে মসজিদে চলে যেতে হবে। গুনাহ ছাড়তে মনে চাচ্ছে না, তারপরও জোর করে ছাড়তে হবে।

হযরত থানভী রাহ. বলেন, অল্প কথায় তাসাওউফের সারমর্ম হল, কোনো ইবাদত পালনে অলসতা লাগলে জোর করে তা আদায় করা। আর গুনাহ থেকে বাঁচতে অনীহা বোধ করলে নিজের ওপর জোর খাটিয়ে তা থেকে বাঁচা।

কে বলেছেন এই কথা? হাকীমুল উম্মত। যিনি তাসাওউফের মুজাদ্দিদ, যাঁর সারা জীবন এই পথেই কেটেছে। তিনি আরো বলেন, এই গুণ যার অর্জিত হয়েছে, তার অন্য কিছুর প্রয়োজন নেই। এর মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। এর কারণেই সম্পর্কে উন্নতি ঘটে এবং এর মাধ্যমেই তা স্থায়ী থাকে।

আর সবকাজে মনমতো চলা মানুষের প্রকৃতি নয়। বলুন দেখি, এমন কেউ আছে, যার সবকাজ মনমতো হয়? কখনোই অনাকাঙ্খিত কিছুর সম্মুখীন হতে হয় না? যত বড় সম্পদশালী, পুঁজিপতি বা ক্ষমতাশালী হোক না কেন, এ দাবি করতে পারবে না যে, আমি যা চাই, তাই হয়। কামনা-বাসনা কখনো কখনো বিসর্জন দিতেই হয়। এই বিসর্জন যদি আল্লাহ তাআলার পছন্দ মোতাবেক হয়, তাহলেই তা বান্দার জন্য আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের কারণ হয়। তাই নিজের ওপর জোর খাটিয়ে মনের বিরুদ্ধে আল্লাহ তাআলার হুকুম মেনে চলতে হবে। এই চিকিৎসা ছাড়া অলসতার আর কোনা চিকিৎসা নেই। আল্লাহ তাআলা নিজ মেহেরবানিতে আমাদের সবাইকে এ আয়াতের শিক্ষা অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন।
আমীন।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই আগস্ট, ২০১৪ রাত ১২:২৩
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোথায় পাই পাগলের শ্বশুর

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৪৮


পাগলের পাতা ছাগলে খায়,
দাঁতের দোষটা হাতেই যে কয়;
দেয় রে দোষটা দেয় চোখের,
মনটা যে ধোয়া তুলসীপাতা,
কেউ দেখে না রে মুখের।

মুখের কথা ঠোঁটে কয়,
ছাগল ডাকে রে ভাই, ব্যাঁ-ব্যাঁ;
পাগলের কাজ পাগল করে সই,
সাধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×