স্কুল ক্যাম্পাস থেকে হোস্টেলে ফিরেই সদ্য পাওয়া ল্যাপটপটা সযত্নে টেবিলের উপর রাখল অনন্য। অনন্যদের স্কুলে এখন আর ব্যাগ ভর্তি বই নিয়ে ক্লাস করতে হয় না। উফ্ সেই দিনগুলোর কথা ভাবতেই অবাক লাগে! ডজন খানেক খাতা আর ডজন খানেক বই দিয়ে ভর্তি ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা। তখন আবার স্কুলের কোন হোস্টেলও ছিল না। মেরুদণ্ডের হাড়টা যে ঠিকমত আছে সেটাই বিষ্ময় জাগায় মাঝে মাঝে। অনন্য-র রুমমেট শিহাব ফিরতে আজ অনেক দেরি করবে। স্কুলে গ্রীষ্মের ছুটি শুরু হচ্ছে আগামীকাল থেকে। শিহাব স্কুল মাঠে ক্রিকেট খেলছে। স্কুল ইউনিফর্ম পাল্টে বাথরুম থেকে ভালোমত ফ্রেস হয়ে রুমে ফিরে অনন্য দরজা-জানালা সব বন্ধ করে নিয়েছে সতর্কতার সাথে। জানালার পর্দাগুলো ঠিকমত টানা রয়েছে কি না দেখে নিয়ে এবার সে নিজের আলমারিটা খুলল।
কিছুদিন আগে অনন্য-র ছোট ফুফু দেশে এসেছিলেন আমেরিকা থেকে। ছোট ফুফু হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্কিওলজি পড়ান। গত বছর তিনি তার শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষা সফরে মিশরে গিয়েছিলেন। মিশর আফ্রিকা মহাদেশের সমৃদ্ধ ইতিহাসের একটি দেশ। মানব সভ্যতার অন্যতম লীলাভুমি মিশরে রয়েছে হাজার হাজার বছর পূর্বেকার অসংখ্য প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন। মিশরে থাকা অবস্থায় ফুফু অনন্য-র সাথে প্রতিদিন ইন্টারনেটে ‘ভিডিও চ্যাট’ করতেন। একদিন স্কাইপ-এ ফুফুর সাথে ভিডিও চ্যাট চলার সময় ফুফু অনন্য-কে একটি মোটা প্রাচীন বই দেখিয়ে বললেন, ‘এই বইটি তোর জন্য কিনেছি। বইটি বেশ প্রাচীন এবং রহস্যময়।’ অনেকটা এ্যালবামের মত দেখতে বইটি ভিডিওতেই ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছিল। চমৎকার সব চিহ্ন আর চিত্র ফুফু উল্টে-পাল্টে দেখাচ্ছিলেন। দেশে এসেই তিনি বইটি উপহার দিয়ে যান অনন্য-কে। প্রায় দুই হাজার বছরের পুরনো বইটি প্যাপিরাস কাগজের উপরে লেখা। বইটি লেখা হয়েছে প্রথম দিকের হায়ারোগ্লিফিক লিপি-তে। তবে ফুফু’র একজন সহকর্মী হাতে লিখে বইটি’র আংশিক ইংরেজি অনুবাদ সংযুক্ত করে দিয়েছেন সম্ভব সকল পৃষ্ঠায়। যদিও এর কিছু অংশের পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয় নি। প্রায় দুই হাজার বছর আগের অজ্ঞাতনামা এক মিশরীয় বিজ্ঞানী বইটি লিখেছিলেন। অনন্য শুরু থেকেই বইটিকে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়ে। এই বইটি অত্যন্ত রহস্যময়। এতে একটি গোপন গাণিতিক সূত্র রয়েছে। ঐ সূত্রের সাহায্যে অনন্য প্রাচীন পৃথিবীর যে কোন সময়ে ঘুরে আসতে পারবে। বইটির ঠিক যে পৃষ্ঠায় মিশরীয় চিকিৎসক ইমহোটেপ-র প্রতিকৃতি রয়েছে সেই পৃষ্ঠার নম্বর এবং প্রতিকৃতিটির মস্তিস্কের বাম দিকের একটি নির্দিষ্ট স্থান হচ্ছে এর মূল রহস্য। অনন্য ছাড়া আর কেউই এই সূত্র জানে না। বইটির লেখক বিজ্ঞানী ভবিষ্যতের মানুষকে প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে জানাতে চেয়েছিলেন। তার সারাজীবনের সাধনার ফসল এই বইটি। ভাগ্যক্রমে বইটি সাতক্ষীরার এলিকজার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ক্ষুদে শিক্ষার্থী অনন্য-র হাতে এসে পড়েছে। শিশুকাল থেকেই অনন্যর প্রচণ্ড আগ্রহ প্রাচীন পৃথিবীর ইতিহাস সম্পর্কে। স্কুলে যত বেশি এ সম্পর্কে জেনেছে আরও জানার জন্য ছোট ফুফু-কে বারবার প্রশ্ন করেছে। ছোট ফুফু অনেক কিছু জানে। মাঝে মাঝে অনন্য-র মনে হয়-‘ইস্ আমি যদি ছোট ফুফু হতাম!’। ফুফুকে সে কয়েকবার বলেছে, ‘ছোট ফুফু, তুমি যা জান সব আমাকে জানাবে।’ অনন্যর এই জ্ঞানতৃষ্ণা ছোট ফুফু’র খুব ভালো লাগে। এ কারণেই ছোট ফুফু রহস্যময় বইটি তার জন্য নিয়ে এসেছে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অনন্যদের ক্লাসে আফ্রিকা মহাদেশের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে পড়ানো হচ্ছে। অনন্য বরাবরই এই কোর্সে শতভাগ নম্বর পেয়ে আসছে। সে কোনদিন এই কোর্সের কোন ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে না। শুরুতেই সে জেনেছিল প্রাচীন যুগে পৃথিবীর মানুষ আফ্রিকা থেকেই এশিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য মাহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ আমাদের আদিনিবাস আফ্রিকায়। ইথিওপিয়ায় প্রাপ্ত প্রায় ৩৪ লক্ষ বছর পুরোনো লুসি’র কংকাল সম্পর্কেও সে জানে। তখন থেকেই আফ্রিকা নিয়ে অনন্য খুবই আগ্রহী। মিশরের মমি, পিরামিড, নীল নদ আর ফারাওদের দেখতে খুব ইচ্ছে হয়। আজ সুযোগ এসেছে আফ্রিকা ভ্রমণের। অনন্য ধীরে ধীরে ইমহোটেপ-এর প্রতিকৃতি সম্বলিত পৃষ্ঠাটি বের করল। সমগ্র মনোযোগ সন্নিবেশিত করে গোপন সূত্রটি প্রয়োগ করে প্রতিকৃতিটির বাম মস্তিস্কের নির্দিষ্ট স্থানে চাপ দিল। আস্তে আস্তে ঘরের ভিতরে এক ধরনের সাদা ধোয়া জমতে শুরু করল। অনন্য বেশ ভয় পেয়ে গেল। এই প্রথম সে সূত্রটি প্রয়োগ করছে। সে জানে তার শরীরের প্রতিটি কণা আলাদা হয়ে এই ধোয়ার মধ্য দিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের আফ্রিকায় গিয়ে আবার একত্রিত হবে। পাঁচ হাজার বছর সময় অনন্যই নির্ধারণ করেছে। অনন্য প্রথমেই যেতে চায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রকৃত জনক ইমহোটেপের কাছে। যার প্রতিকৃতির মধ্যে অতীতে ভ্রমণের এই রোমাঞ্চকর সম্ভাবনা লুকিয়ে ছিল।

অনন্যর সমস্ত শরীর একটি বিরাট ঝাকুনি দিয়ে থেমে গেল। সে আস্তে আস্তে চোখ মেলতে শুরু করল। সম্বিত ফিরে পেতে কিছুটা দেরি হওয়ায় চারিদিকের অপরিচিত জিনিস দেখে সে বুঝতে পারছে না কোথায় আছে। তবে কি মৃত্যুর পরে কোথাও চলে এসেছে?

হঠাৎ অদ্ভুত পোশাক পরা এক বৃদ্ধ অনন্যর মাথায় হাত রেখে বলল, ‘স্বাগতম হে আধুনিক যুগের মানুষ! তুমি তোমার সময় থেকে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ বছর আগের পৃথিবী পরিভ্রমণে এসেছ।’ অনন্য অবাক হলো, বৃদ্ধ যে ভাষায় কথা বলছে তা অনন্যর নিজের ভাষা নয়, কিন্তু অনন্য বুঝতে পারছে তার কথা। নিজের হাতে চিমটি কেটে অনন্য নিশ্চিত হলো সে বেঁচে আছে। মনে পড়ল সে স্কুলের হোস্টেল রুমে বসে ছোট ফুফুর দেয়া রহস্যময় মিশরীয় বইটির সাহায্যে প্রাচীন আফ্রিকায় যেতে চেয়েছিল। সে বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কে? আমি এখন কোথায় আছি?’ বৃদ্ধ প্রজ্ঞাময় হাসি দিয়ে উত্তর দিলেন, ‘তুমি আমার সাথে দেখা করতে প্রায় ২৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মিশরের মেমফিস নগরে এসেছ। আমি রাজা জেসেরের প্রধান উজির ইমহোটেপ।’ অনন্য বিষ্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল। সে ইমহোটেপের দু’ই বাহু চেপে ধরে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি সেই মহান ইমহোটেপ? যিনি সবচেয়ে প্রাচীন পিরামিডের স্থপতি, যিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানের মহান জনক?’ ইমহোটেপ অনন্যর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ঘরের এক কোণে রাখা একটি পাথরের পাত্র থেকে কিছুটা পানীয় ঢাললেন একটি পেয়ালায়। অতঃপর তিনি পেয়ালাটি অনন্যর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তুমি সঠিক স্থানেই এসেছ বালক। এই পানীয়টুকু পান করে নাও। তোমাকে অনেক ধকল পোহাতে হয়েছে এখানে পৌছতে।’ অনন্য মুগ্ধ হয়ে দেখল ইমহোটেপকে। পরিধেয় পোশাকই বলে দিচ্ছে ইনি রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় কোন ব্যক্তিত্ব। তার দুচোখ এবং মুখমণ্ডলের ঔজ্জ্বল্য বহন করছে জ্ঞানের স্মারক। এই মহান মানুষটিই পরবর্তীকালে মিশরীয়, গ্রিক এবং রোমানদের কাছে দেবতা বলে গণ্য হবেন। তাকে বলা হবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ঈশ্বর। একাধারে কবি, ভাস্কর, দার্শনিক, স্থপতি, গণিতজ্ঞ, চিকিৎসক এবং মিশররাজ জেসেরের সহকারী ও প্রধান উপদেষ্টা, যিনি প্রাচীন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি সাক্কারার স্টেপ পিরামিডের স্থপতি, সেই মহান ইমহোটেপ অনন্যকে পানীয় পান করাচ্ছেন স্বহস্তে। ‘আমি কিন্তু এ্যালকোহল পান করি না, আপনার এই পানীয় কি আমার জন্য স্বাস্থ্যকর হবে?’ অনন্য কিছুটা দ্বিধান্বিত ইমহোটেপের দেয়া পানীয় পান করার ব্যাপারে। ইমহোটেপ স্মিত হেসে উত্তর দিলেন, ‘অনন্য আমি তোমার সম্পর্কে সবকিছু জানি। তুমি নিশ্চিতে পান করতে পার। এটি আমার নিজের হাতে প্রস্তুত অমৃত বিশেষ। আমি এই পানীয় প্রস্তুত করি দীর্ঘায়ুর জন্য। আমার চিকিৎসা এবং ঔষধ অব্যর্থ। এটা তোমার যুগের ভেজাল ঔষধ নয়।’ অনন্য এবার লজ্জা পেল। তার বোঝা উচিৎ যিনি এই পানীয় তাকে দিচ্ছেন তিনি সর্বকালের সেরা চিকিৎসক। অনন্য এবার পানীয়টুকু পান করল। কিছুটা ঝাঝালো হলেও বেশ সুস্বাদু।

কিছুক্ষণের মধ্যে সে এর গুণ বুঝতে পারল। বেশ চনমনে মনে হচ্ছে এখন। শরীরে অনেক বল ফিরে পাচ্ছে। এতক্ষণে শয্যা থেকে নামল সে। ইমহোটেপকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আচ্ছা, আপনি কি করে আমার সম্পর্কে সবকিছু জানেন? আমিতো আপনার সময় থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পরে জন্মেছি।’ ইমহোটেপ অনন্যর ঘাড়ে হাত রেখে হাঁটতে হাঁটতে বললেন,‘আমি আরও অনেক কিছুই জানি এই বিশ্ব এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কে। সাধনা এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমেই আমি এসব জেনেছি। এখন বলো তোমার জন্য আমি কি করতে পারি? তোমার ইতিহাস জানার আগ্রহে আমি মুগ্ধ। কি জানতে চাও তুমি?’ অনন্য প্রথমেই জানতে চাইল রাজা জেসের সম্পর্কে, ‘আপনিতো রাজা জেসেরের প্রধান উজির। তাই নয় কি? তিনি এখন কোথায়?’ ইমহোটেপ অনন্যর কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে ছোট্ট করে নিশ্বাস ফেললেন, ‘রাজা জেসের কয়েক বছর হলো মারা গিয়েছেন।’ অনন্য জিজ্ঞেস করল, ‘অর্থাৎ আপনি ইতিমধ্যেই প্রথম পিরামিডটি প্রস্তুত করেছেন?’ ইমহোটেপ একজনের নাম ধরে ডাক দিলেন। একজন রাজকর্মচারী এসে কুর্নিশ করে দরজায় দাঁড়াল। ইমহোটেপ তাকে বাহন প্রস্তুত করতে বললেন। ‘অনন্য চলো তোমাকে প্রথমে আমার নকশা করা রাজা জেসের-এর সমাধির স্টেপ পিরামিডটি দেখাবো।’ ইমহোপেট ঈশারায় তাকে অনুসরণ করার জন্য অনন্যকে নির্দেশ দিলেন। প্রাসাদের বাইরে এসে অনন্য দেখল দু’টি গাধা দাড়িয়ে আছে। গাধার পিঠে বসবার জন্য চমৎকার করে আসন সাজানো রয়েছে।

অনেকটা চেয়ারের উপরিভাগের মত করে তৈরি কাঠের আসন চমৎকার করে ডিজাইন করা। একটিতে অনন্য এবং অন্যটাতে ইমহোটেপ সওয়ার হলেন। তাদের সাথে সাথে বেশ কয়েকজন রক্ষী এবং কর্মচারীও হাঁটতে লাগল। পাশাপশি যেতে যেতে ইমহোটেপ অনন্যকে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে বলতে লাগলেন।
চলবে ------------------- প্রথম পর্ব শেষ
বিঃদ্রঃ অনন্যর এই ভ্রমণ চলতে থাকবে। দ্বিতীয় পর্ব
শেষ পর্ব
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে আগস্ট, ২০১১ রাত ১১:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



