প্রথম পর্ব
‘তুমিতো আধুনিক পৃথিবীতে বাস কর। সেখানে নিশ্চয়ই আধুনিক অনেক বাহন রয়েছে?’
‘আমরা আকাশে চলার মত অনেক যান বানিয়েছি। এমনকি চাঁদে ও অন্যান্য গ্রহেও আমরা যেতে পারি রকেটের সাহায্যে।’ অনন্য উত্তর দিল।
ইমহোটেপ অবাক না হয়ে বললেন, ‘সেটাই স্বাভাবিক, পাঁচ হাজার বছরতো আর কম কথা নয়। তুমি এত ছোট বয়সে পৃথিবীর ইতিহাস নিয়ে নাড়াচড়া করছো, বোঝাই যাচ্ছে তোমাদের সময়ের শিশুরা অনেক বেশি জানে এবং জানতে চায়ও।’
‘আমরা অজানাকে জানতে চাই। আপনারাই আমাদেরকে পথ দেখিয়েছেন। আমরা ইতিহাস ঘেটে যখন জানতে পেরেছি প্রাচীন পৃথিবীর মানুষদের নব নব আবিস্কারের কথা তখন আমরা উৎসাহিত হয়েছি অনুপ্রাণিত হয়েছি আরও জানার জন্য। আপনি কি আমাকে সংক্ষেপে বলবেন- মিশরের কথা, আপনার সময়ের সমাজের মানুষের কথা এবং পরবর্তীতে আপনার ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠা সম্পর্কে?’ অনন্য বলল।
ইমহোটেপ বললেন,‘নিশ্চয়ই বলব। তুমি আসলে এসেছ মিশরের তৃতীয় রাজবংশের রাজত্বকালে। মিশরের প্রথম রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা মেনেস। আমরা তাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। মিশর নীল নদের দান- এই কথাটি তুমি নিশ্চয়ই ইতিহাস থেকে জেনেছ। আজ থেকে দুই হাজার বছর পরে অর্থাৎ তোমাদের সময় থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গ্রীসের এক জ্ঞানী হেরোডোটাস যাকে তোমরা ইতিহাসের জনক বলবে তিনি আসবেন মিশর ভ্রমণে। তার মিশরে আসার সময়কালে অবশ্য পারস্য সাম্রাজ্যের দখলে থাকবে মিশর। পারস্যকে তোমরা চিনবে ইরান নামে। হেরোডোটাস মিশর ঘুরে অনেক কিছু দেখবেন এবং পরবর্তীতে তা লিপিবদ্ধ করে রাখবেন যা তোমরা জানতে পেরেছ। নীল নদ পৃথিবীর অল্প কয়েকটি নদীর একটি যেটি উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত না হয়ে দক্ষিণ দিকে থেকে উল্টো উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়েছে। প্রতিবছরের বন্যায় নীল নদের পলি দ্বারা গঠিত কালো মাটিই আমাদের সভ্যতার ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেছে। তবে শুরুর দিকে নীল নদের পাড়ে বিভিন্ন ‘ট্রাইব’ বাস করত। মহান যোদ্ধা রাজা মেনেস প্রথমে Upper Egypt এবং Lower Egypt -কে একত্রিত করে মেমফিস নগরকে রাজধানী করে এই শক্তিশালী মিশরীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।’
অনন্য মুগ্ধ হয়ে শুনছিল কিভাবে এই মহান মানুষটি তার নিজের সময়ের পরবর্তী, পূর্ববর্তী এবং বর্তমান কালের কথা একের পর এক বলে যাচ্ছেন। সে আবারও ইমহোটেপ কে প্রশ্ন করল-‘আপনি এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা, মানুষের জীবন-জীবিকা, শিক্ষা, বিশ্বাস ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে কিছু বলুন।’

রাজা মেনেস
ইমহোটেপ আবারও বলতে শুরু করলেন, ‘এই যে দেখছ, গাধার পিঠে এক ধরণের চেয়ার দিয়ে আমরা স্থলপথে যাচ্ছি, এটাই এখনকার সময়ের অভিজাতদের পরিবহন ব্যবস্থা। তুমি হয়ত উট না দেখে অবাক হচ্ছ। আসলে মিশরে উটের বহুল ব্যবহার শুরু হতে এখনও অনেক দেরি। পারস্য সাম্রাজ্যের দখলে যাওয়ার সময়ই এখানে তাদের দ্বারা উটের বহুল প্রচলন শুরু হবে। আর ঘোড়ার ব্যবহার শুরু হলে ‘চ্যারিয়ট’ হয়ে উঠবে অভিজাতদের প্রিয় বাহন। একটি চ্যারিয়ট ঘন্টায় প্রায় ২৫ মাইল পথ অতিক্রম করতে পারবে। ঘোড়ার ব্যবহার শুরু হবে আমার সময় থেকে প্রায় এক হাজার বছর পরে যখন সেমেটিক যাযাবর হাইকসস( Hyksos)’রা মিশর আক্রমণ করবে। এই যাযাবরদের কাছ থেকে মিশরীয়রা ঘোড়াটানা চ্যারিয়ট, নতুন অস্ত্র এবং ব্রোঞ্জের বহুল ব্যাবহার শিখবে। সাধারণ মানুষ অবশ্য পায়ে হেঁটেই পথ অতিক্রম করে। তবে এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যায়বহুল নয়। মূলত নদী পথে যাতায়াতই বহুল প্রচলিত। রাতে সাধারণত কেউ নদীতে যাতায়াত করতে চায় না।

নৌকাযোগে অনন্যকে নিয়ে রওনা দিলেন ইমহোটেপ
নৌকাই প্রধান বাহন। বর্ষা মৌসুমে মেমফিস থেকে আমাদের আরেক বিখ্যাত নগর থিবস( Thebes) যেতে দুই সপ্তাহ সময় লাগবে কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে এমনকি দুই মাসও লেগে যেতে পারে।

নীল নদ
এখানকার মানুষ মূলত কৃষিজীবী। যদিও বছরের অন্যান্য সময় বৃষ্টিপাত প্রায় হয় না বললেই চলে। তথাপি প্রতিবছর বর্ষায় নীলনদ অববাহিকায় প্রাণের সঞ্চয় হয়। প্রথম দিকে নীল নদ থেকে প্রবাহিত প্রাকৃতিক খালগুলোই কৃষিজমিতে পানি সরবরাহ করত। কিন্তু জনসংখ্যা এবং কৃষিজমি বাড়ার সাথে সাথে আমাদেরকে নতুন নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে হয়েছে। আমরা প্রচুর খাল এবং জলাধার খনন করিয়েছি রাজার পক্ষ থেকে, যাতে করে শুষ্ক মৌসুমে ফসলের জমিতে সেচের জন্য পানি পাওয়া যায়। তুমি নিশ্চয়ই ইতিহাস থেকে জেনেছ আমাদের রাজারা জনগণের কল্যাণে প্রথম যে সকল রাজকর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন তারা হলো- খাল খননকারী।

সাডফ ব্যাবহার করে একজন কৃষক পানি নিচ্ছেন ফসলের জমিতে
সাধারণ পরিবারের শিশুরা তাদের পরিবারের অভ্যন্তরে এবং চারপাশে দেখতে দেখতে সমাজ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। যদিও রাজা ও অভিজাতদের সন্তানেরা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পায় আমার মত অনেকের কাছ থেকে। আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যালয় স্থাপন করবে রোমানরা। আর এখন আমার নিজের শিষ্য সংখ্যা অনেক। সবচেয়ে বেশি রয়েছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্র, এছাড়াও আছে শিল্পকলা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং ধর্মীয় শিক্ষা নিতে আসা শিক্ষার্থীরা। পৃথিবীর প্রাচীনতম গণনা পদ্ধতি, আগুনের আবিস্কার এবং ‘টুলস’-র ব্যাবহার আফ্রিকাতেই হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০০ বছর সময়কালে দক্ষিণ আফ্রিকার লেবোম্বো গুহায় কেউ একজন সবচেয়ে প্রাচীন গণনা পদ্ধতির নিদর্শন রেখে গিয়েছে। যেখানে টালি স্টিকে ২৯টি দাগ আছে।

প্রাচীন গগণা পদ্ধতির একটি নমুনা
এমনকি খ্রিস্টপূর্ব ২০০০০ বছর সময়ের নীল নদের পাড়ের এরকম গণনার নিদর্শনও পাওয়া গিয়েছে। আমরা জ্যামিতির ব্যবহার শুরু করেছিলাম নীল অববাহিকার জমির পরিমাপ করতে। পরবর্তীতে আরবদের হাত ধরে ভারতীয় সংখ্যাপদ্ধতিও আমাদের এখানে এসে পৌছবে। এ প্রসংগে তোমাকে জানিয়ে রাখি এক মহান নারীর কথা। ৪০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে হাইপেশিয়া(জন্ম আনুমানিক ৩৭০ খ্রিস্টাব্দ) নামের এক নারীর আগমণ ঘটবে রোমান শাসনের সময়ে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায়। হাইপেশিয়া হবেন তোমাদের জানা পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম নারী যিনি গণিত ও বিজ্ঞানে অসামান্য অবদান রাখবেন। গণিতে তার অসাধারণ দক্ষতা তোমাদের অনেক উপকার করবে। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাসের শিকার হবে সে। প্যাগান ধর্মমতের অনুসারী হওয়ার কারণে তাকে উগ্র খ্রিস্টীয় চার্চের হুকুমে নৃশংসভাবে হত্যা করা হবে। তাকে নৃশংসভাবে হত্যার নির্দেশ দেবে সিরিল।

ইতিহাসের প্রথম নারী বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ হাইপেশিয়া
যাই হোক এখনকার কথায় ফিরে আসি। এখানকার মানুষের ধর্ম বিশ্বাস বিচিত্র। অসংখ্য দেব-দেবীর পূজা করা হয় এবং তাদের জন্য রয়েছে উপসানালয়। কয়েক বছর পূর্বে মিশর এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মধ্যে পড়েছিল। এ ইতিহাস অবশ্য তুমি পড়েছ। পরপর সাত বছর অনাবৃষ্টিতে ক্ষরা দেখা দিয়েছিল। ফসল উৎপাদন হয়নি ক্ষরার কারণে। মানুষ ভাবতে শুরু করেছিল রাজার উপর ঈশ্বর অসন্তুষ্ট, রাজা ছিলেন মহাবিপদে। আসলে অনাবৃষ্টিই ছিল মূল কারণ। যাই হোক আমার বিচক্ষণতায় সেই দুঃসময় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীতে আমি প্রচুর পরিমাণে ছোট ছোট খাল খনন করাই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য এছাড়াও মানুষের অনেক জটিল রোগ সারাতে সক্ষম হয়েছি আমি। এসবের কারণে মানুষ আমাকে দেবতা ভাবতে শরু করেছে। এমনকি কেউ কেউ রাজা জেসেরের মৃত্যুর পর আমার উপাসনাও করছে। এ অবস্থা চলতে থাকবে আরও তিন হাজার বছর। এমনকি রোমান এবং গ্রিকরাও আমাকে দেবতা জ্ঞান করে উপাসনা করবে। আমাকে তারা বলবে ‘গড অব মেডিসিন’। আমার নামের অর্থ দাঁড়াবে ‘শান্তির রাজপুত্র’। মিশরে এক সময় বিশ্বর প্রথম একেশ্বরবাদী ধর্মমত চালু করবেন ফারাও আখেনআটেন। একমাত্র ঈশ্বর আটেন-এর উপাসনায় তিনি সবাইকে বাধ্য করবেন। তার নিজের নাম পঞ্চম আমেনহোটেপ বদলে তিনি আটেনের সেবক অর্থাৎ আখেনআটেন নাম ধারণ করবেন। আটেন হলো সূর্য দেবতা। তার বিশ্বাস ছিল পৃথিবীতে সকল শক্তির উৎস যেহেতু সূর্য সেহেতু সূর্য দেবতাই একমাত্র ঈশ্বর। ফারাও আখেনআটেন রাজত্ব করবেন খ্রিস্টপূর্ব ১৩৫৩ থেকে ১৩৩৫ পর্যন্ত। তার রাজত্বকালের পঞ্চম বছরে নিজের নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি তিনি রাজ্যের রাজধানী থিবস থেকে আখেনটাটেন-এ পরিবর্তন করবেন। তোমাদের কাছে এই শহর অবশ্য ‘অমরনা’ নামে পরিচিত। আখেনআটেনের স্ত্রীও ইতিহাসের আরেক বিষ্ময় এবং যাকে তোমাদের সময়ে সৌন্দর্য্য ও প্রজ্ঞার প্রতীক মনে করবে সে হলো- নেফারতিতি। আখেনআটেন ও নেফারতিতির সময়ে মিশরের শিল্পকলার প্রভূত উন্নতি ঘটবে। নেফারতিতিকে নিয়ে তোমাদের কালের কবিরা অসংখ্য কবিতা লিখবে, গায়কেরা গাইবে গান। আখেনআটেন-এর জামাতা আট বছরের বালক ফারাও তুতেনখামেন ইতিহাসের আরেক বিখ্যাত চরিত্র। এই শিশু রাজাও ইতিহাসে অত্যন্ত রহস্যময় চরিত্র হয়ে রইবে। এর কথাও তোমাকে আমি জানাব।

তুতেনখামেন
আর চিকিৎসার কথা জিজ্ঞেস করছিলে। আমি চিকিৎসা করি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। অসংখ্য গাছ রয়েছে যারা নানাভাবে উপকারী। আমি প্রধানত গাছের ছাল, ফল, জীবাণুমুক্ত পানি আর বিভিন্ন গাছের শিকড় ও পাতার রস ব্যাবহার করি চিকিৎসার জন্য। আমি জানি রোগ আসলে কোন দৈব ব্যাপার নয়। আমার পরে আর একজন এমনিভাবে চিকিৎসা করে ইতিহাসে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক বলে অভিহিত হবে। তিনি হলেন গ্রিসের হিপোক্রিটাস। তিনি রোগের কারণ নির্ণয় করে তবে চিকিৎসা করবেন এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য নিয়মিত শরীরচর্চা এবং উপযুক্ত খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস করতে বলবেন। আমিও তাই বলি। আমার শিষ্যরাও অনেক ভালো চিকিৎসক। তোমাদের সময়ের চিকিৎসকদের শপথ নিতে হয় হিপোক্রিটাসের নামে। আর হিপোক্রিটাসের সময় চিকিৎসাবিদ্যা শেখানো হবে আমার নামে করা উপাসানালয়ে।’
..........চলবে
শেষ পর্ব
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে আগস্ট, ২০১১ রাত ২:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



