আমাদের রোগব্যাধি নিরুপণের প্রধান ধাপ ডায়গনষ্টিক সেন্টার। কিন্তু এই ডায়গনষ্টিক সেন্টারের প্যাথলজি টেষ্ট নিয়ে জনগণের বিভ্রান্তির কোন শেষ নেই। প্যাথলজি পরীক্ষা নিয়ে রয়েছে নানান গালগল্প। তাই এর জন্য প্রশ্ন ওঠে প্যাথলজি টেষ্ট করেন কারা?
কামরুল হাসান, একটি বেসরকারি হাই স্কুলের প্রধান শিকক্ষ। সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য গিয়েছিলেন ডায়গনষ্টিক সেন্টারে। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল থানার, “শ্রীমঙ্গল ডায়গনষ্টিক সেন্টারে” গত ২৬ জুন এমপি টেষ্ট করানোর পর পজেটিভ রিপোর্ট দেওয়া হয় তাকে। রিপোর্ট দেখে সন্দেহ হয় কামরুল ইসলামের। তিনি সাথে সাথে শহরের অন্য ডায়গনষ্টিক সেন্টার পপুলারে একই টেষ্ট করতে দেন। সেখানে তার রিপোর্ট আসে ভিন্ন অর্থাৎ নেগেটিভ।
দুটি জায়গার ভিন্ন টেষ্ট রিপোর্ট পাওয়ায় কোনটি সঠিক তা নিয়ে মহা সমস্যায় পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত তৃতীয় বারের মতো একই দিন শহরের অন্য আরেকটি জনতা পলি ডায়গনষ্টিক সেন্টারে এমপি (্লাইড মেথড) ও এমপি (র্যাপিড মেথড আরএফটি) টেষ্ট করান। সেখান থেকে তাকে রিপোর্ট দেওয়া হয় একটি পজেটিভ ও আরেকটি নেগেটিভ। এমতাবস্থায় শিক কামরুল ইসলাম ভীষণ বিপদে পড়েন। এখন তিনি কোন টেষ্টটি সঠিক মনে করবেন। গত শতকের পঞ্চাশ দশক পর্যন্ত ডায়গনষ্টিক সেন্টারে প্যাথলজি পরীক্ষা করতেন ডাক্তাররা।
পঞ্চাশ দশক থেকে প্যাথলজি পরীক্ষায় সাহায্যকারী হিসেবে ল্যাব এসিষ্ট্যন্টের আগমণ ঘটে এবং ষাট দশক থেকে এই ল্যাব এসিষ্ট্যন্টগণই প্যাথলজী পরীার শতকরা ৮০ ভাগ কাজ সম্পন্ন করতেন। তবে রিপোর্টে দস্তখত করেন ডাক্তাররা। কিন্তু এখন অনেক অদ টেকনিশিয়ান দ্বারা মলমূত্র সহ বিভিন্ন পরীা করানো হচ্ছে। তাই শুধু একজন কামরুল হাসান নয় সারা দেশে আজ অসংখ্য কামরুল হাসান প্রতারিত হচ্ছে ডায়গনষ্টিক সেন্টারের নামে খুলে রাখা অসৎ ব্যবসায়ীদের দ্বারা পরিচালিত এইসকল চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে।
তাদের নেই কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা, নেই জবাবদিহীতা। প্রতিনিয়তই আইনকে তারা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যাচ্ছে। আর এর ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ। কতিপয় প্রতিষ্ঠান ডায়গনষ্টিক সেন্টারের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে ভূয়া রিপোর্ট সর্বস্ব রমরমা ব্যবসা কেন্দ্র। মানব সেবাকে পুঁজি করে সারাদেশে আজ অসংখ্য ডায়গনষ্টিক সেন্টার গজিয়ে উঠেছে ব্যাঙের ছাতার মতো। রোগ নির্ণয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ডায়গনষ্টিক সেন্টারগুলোর ভুল রিপোর্টে রোগীরা মানসিক ও আর্থিক দুভাবেই প্রতারণার শিকার হচ্ছে।
একেকটি থানা শহরে গড়ে উঠেছে বর্তমানে অনেকগুলো ডায়গনষ্টিক সেন্টার, জেলা ও বিভাগীয় শহরে আরো বেশি রাজধানীতে এর সংখ্যা কত হবে তার সঠিক হিসাব সম্ভবত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছেও নেই। বেশ কিছুদিন আগে “সমকালে” ছাপা হয়েছিলো রাজশাহী শহরে ১৩৬ টি কিনিক ও ডায়গনষ্টিক সেন্টারের মধ্যে ৯০টিই সরকারি অনুমোদন ছাড়া চলছে। একটি বিভাগীয় শহরের এ চিত্র দেখে স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে সারাদেশে অনুমোদনহীন অবৈধ ডায়গনষ্টিক সেন্টারগুলোর সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
আমরা খবরের কাগজে প্রায়ই দেখতে পাই ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু ঘটনা। কিন্তু এই মৃত্যুর জন্য ডায়গনষ্টিক সেন্টারগুলো কি তাদের দায় এড়িয়ে যেতে পারবে। আমরা ঢালাওভাবে ডাক্তারের দোষ দিয়ে যাচ্ছি। একটি বারও কি চিন্তা করেছি ডায়গনষ্টিক সেন্টার থেকে দেওয়া রিপোর্টটির কথা। কতটুকু সঠিক ছিল সেই রিপোর্ট। তাই হয়তো বা কিছু কিছু মৃত্যুর কারণ হতে পারে ডায়গনষ্টিক সেন্টারের ভুল রিপোর্ট। সঠিক রোগ নির্ণয় করতে না পারলে রোগীরা বঞ্চিত হয় সুচিকিৎসা থেকে। ভুল রিপোর্টে অনেক সহজ রোগ ধারণ করে জটিল রোগে।
অভিযোগ আছে কতিপয় কমিশন ভোগী ডাক্তারদের নিকট রোগীরা শরণাপন্ন হলেই তাদেরকে বিভিন্ন টেষ্ট লিখে দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের পছন্দের ডায়গনষ্টিক সেন্টারে। ক্ষেত্রে ডায়গনষ্টিক সেন্টারের ভুল রিপোর্টের পরও কমিশনের ভাগবাটোয়ারার কারণে কোন আইনী পদপে নেওয়া হচ্ছে না তাদের বিরুদ্ধে। তাই অদ টেকনিশিয়ান দিয়েও প্যাথলজি চালাতে কোন অসুবিধা নেই তাদের। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতা গ্রহণের পর স্বচ্ছতা এসেছে সমাজের অনেক ক্ষেত্রেই।
কিন্তু ডায়গনষ্টিক সেন্টারগুলোর কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে এর কোন প্রভাবই যেন পড়ছেনা তাদের উপর। চিকিৎসা সেবা নাগরিক মৌলিক অধিকার হলেও এক্ষেত্রে যে কি বেহাল দশা তা বলার অপো রাখে না। ডায়গনষ্টিক সেন্টারগুলোতে চিকিৎসা সেবার নামে চলছে নৈরাজ্য। যা ব্যবসা বাণিজ্যর সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। সাধারণ মানুষগুলো তাদের নিকট প্রতিনিয়তই হচ্ছে বলির পাঠা। চিকিৎসা সেবার নামে তাদের রমরমা বাণিজ্য বন্ধের জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগী হতে হবে।
শিক কামরুল হাসানের মতো এ দেশের অসংখ্য কামরুল হাসানদের তাদের হাত থেকে রা করার জন্য, ডায়গনষ্টিক সেন্টারগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ ও জবাবদিহি মুলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



