somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বেঁচে থাকার শুরু

২৭ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ সকাল ৯:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


জানালার পাশে বসে ভাবছিল কিভাবে ভালবাসাহীন জীবন কাটিয়ে দিল সুবর্ণা। সেই কিশোরী বয়স থেকেই কানায় কানায় ভরে উঠেছিল সৌন্দর্য। কাটাকাটা চেহারায় চিবুকের ধার, বাদামী চোখ, বাদামী লাল চুলের বাঁধনহারা এলোমেলো ভাব, অপ্রতিরোধ্য কামনায় ভরা একটা ইনোসেন্ট মন, যে কিনা অবুঝ, চঞ্চলা, মোহনীয় সৌন্দর্য্য স্কুলে থাকতে ইঙ্গিত দিতে শুরু করে তার শরীরে। কলেজে এসে সে বাঁধ ভেঙ্গে আছড়ে পড়ে। জীবনটা খুব সুন্দর ভাবে সাবলীল ভাবে কেটে যাবে এমনই তো চেয়েছিল সুবর্ণা। এমন সময়ে নায়ক চেহারারতি স্মার্ট, ধনাঢ্য পরিবারের পুত্রটি যখন এগিয়ে এলো, প্রস্তাব নিয়ে তখন আর ঠেকায় কে?
বাবা মায়ের ইচ্ছায় জীবনের অন্য একটি অধ্যায় বরণ করে নিতে হলো, বোধশক্তি হবার আগেই, জীবনকে উপলব্ধি করার আগেই। বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণাহীন একটা কিশোরী বরণ করে নিল দ্বিগুন বয়সী প্রবাসী এক অচেনা মানুষকে জীবন সঙ্গী হিসাবে।
চলার পথে হাত ধরে থাকবে যে সবসময়, এরকম প্রতিশ্রুতিই হয়েছে। প্রতিশ্রুতি ছেলেটি দেয়নি। কন্ট্রাক্ট মানে বিয়ের শর্তে তো, তাই –ই বোঝায়।
সুবর্ণা অতসত বুঝে না। বিয়ে কি। বিয়ের শর্ত কি।
বিয়ে হয়েছে, লোকটির সাথে থাকতে হবে, সংসার করতে হবে এমনি তো জীবন। এমনই হয়তো বা। নাকি তা না। তাও সে জানে না।
সে জানে না জীবন কাকে বলে।
অতিরিক্ত সুরক্ষিত জীবন যাপনে অভ্যস্ত সুবর্ণা এ-ও জানে না ভাল লাগা , বোঝাপড়া কি জিনিস।
স্বামী নামক একটা জিনিস ঘরে প্রবেশ করলো, অধিকার স্থাপন করলো, সন্তান জন্ম হলো, এই –ই বোধহয় জীবন। বোঝাপড়া, সুখ, ভালবাসা কখনো আর দেখা দিলো না। বরংচ নেমে এলো স্বামী নামক সেই লোকটির মেজাজ, খটমটে ব্যবহার আর মারপিটের রিহার্সেল। বড় সন্তানটি তখন একটু বড়ই বলা চলে। কন্যা তো বাবার বুকের ধন হবার কথা। কিন্তু এই বাবা যে অন্যরকম। কন্যার উপর চড়াও, স্ত্রীর উপরে চড়াও আর বাইরে গিয়ে হাসিমুখে সামাজিকতা দেখানো – সর্ব বিষয়ে অভিনয়ে পারদর্শী লোকটা একদিন ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে হঠাৎ কোথায় জানি উধাও হয়ে গেল।
সুবর্ণা বুঝে পায় না, আরো ৮/১০ টা সংসার কি এভাবেই চলে?
আসলে সংসার কি জিনিস ? এত দিনেও তো বুঝলো না।
সংসার মানে কি আশান্তি?
ঘর যে সুখের নীড় –এমন একটা কথা কোথাও শুনেছিল। আর এখন সে এসবের অর্থ কিছুই বোধগম্য করতে পারে না। ভালবাসার স্পর্শ তো সে জীবনে পায়নি। ভালো ব্যবহারটুকুও না। স্বামীর সাথে থেকে দীর্ঘ ২০ বছরে শুধু জেনেছে, তার কোন কিছু পাবার অধিকার নেই। কারণ তার গুন নেই। সে যে কুৎসিত, সে যে বোকা, সে যে অপদার্থ। নিজের প্রতি কনফিডেন্স হারিয়ে, তাই আজ সে নিঃস্ব।
কলেজের বন্ধুরা সেই আগের মতোই তাকে ভালবাসে। রাজীব যেন শূণ্যতা পূরণ করে দিয়েছে সবটুকু। স্বামীটি উধাও হবার পর থেকেই রাজীব তার পাশে পাশে সারাক্ষণ। মধ্যবয়সে জীবনের এ পর্যায়ে এসে সুবর্ণা আজ বুঝতে পেরেছে ভালোলাগা কি জিনিস, বোঝাপড়া কাকে বলে, মনের মানুষকে মন দেয়াতে কেমন লাগে। রাজীব ওকে শিখিয়েছে।
বিশ বছর পর যোগাযোগ, কিন্তু তার অপূর্ণতা পূরণে রাজীবের বিশ সেকেন্ড সময় লাগে নি। । আজ সুবর্ণা বুঝতে পেরেছে কি অর্থহীন, ভালবাসাহীন সময়টুকু সে পার করেছে এতদিন। ভালোই যাকে বাসেনি, তার সাথে হলো সংসার। দুটি ফুটফুটে সন্তান।
এ কেমন জীবন?
আর বোঝাপড়া, মন দেয়া নেয়া হলো যার সাথে তার আগমন তো এই হলো মাত্র। তার যে আর সময় নেই। সুবর্ণার এখন অজস্র সময় কিন্তু রাজীবের যে ভীষণ ব্যস্ততা। রাজীবের সময় আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা । রাজীবের জীবন তার কমিট্মেন্ট দিয়ে ভরা তার পরিবারের প্রতি। তার স্ত্রী, তার কন্যা, তার বোন সকলকে নিয়ে তার দায়িত্ব। পরিবার তার অগ্রাধিকার। মনে যাই থাকুক, ক্ষুধা, তৃষ্ণা সব অগ্রাহ্য করে দায়িত্ব সে পূরণ করবে। কারণ পরিবার তার priority.
সুবর্ণাকে ভালো লাগতো কলেজে থাকতে। সুন্দরী মেয়েটি সুন্দর মেয়েও ছিল। যার মন এত সুন্দর তার কাছে গেলেই রাজীবের মনে হতো সাক্ষাত স্বর্গের অপ্সরা। এস্টাব্লিশড্ পাত্র দেখে সুবর্ণাকে বিয়ে দিল যখন, তখন সেটা তো মেনে নিতেই হবে। কারণ তার তো এস্টাব্লিশড্ হতে অনেক অনেক দেরী।
এই দেরীও একদিন যে শেষ হয়ে জীবনের চলার পথে দুজন আবার মুখোমুখি দাঁড়াবে, রাজীব বা সুবর্ণা তা কখনোই ভাবেনি। সোস্যাল মিডিয়ার যুগে দূরত্ব তো একটা ক্লিক মাত্র। সুবর্ণা তো তাই এত কাছে চলে এসেছে। তার স্বপ্নেরে অপ্সরা। সুবর্ণাকে ছুঁয়ে প্রাণ ফেরৎ এনেছে সে। সুবর্ণা বেঁচে উঠেছে।সুবর্ণ আলোয় সে আরো প্রাণময় হয়েছে।
কলেজের উচ্ছ্বলতা নেই, সময়ের সাথে সাথে ধীরতা এসে গেছে অনেকটা। কিন্তু মনের তো একটু ও পরিবর্তন হয়নি। সেই পুরোনো কলেজের সহপাঠী আজো তেমনি রয়ে গেছে। মাঝ দিয়ে অতিক্রান্ত হয়েছে ২০টি বছর।
সুবর্ণাকে হাত দিয়ে স্পর্শ করতে পারেনি রাজীব। কিন্তু মনের পরশে তাকে জাগিয়ে তুলেছে। তাই আজ সুবর্ণা ভাবে ভালোবাসাহীন জীবন কি রকম একটা জীবন? যাকে ভালীবাসা সম্ভব হয়নি তাকে নিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিলাম।
কিভাবে?
এতগুলো বছর এরকম মায়াহীন এক সংসারে। একটা দিনও প্রেম, আদর, স্নেহের পরশ তো জুটেনি। সংসারে আয় উন্নতি হয়নি। সন্তানরা হয়েছে ভুক্তভোগী। মা নিজেই তার ঘরে অরক্ষিত, বাবার দানবীয় আচরণে সন্তানরা ভীত সন্ত্রস্ত । আশান্তিতে ভরা এ ঘর নরকের মতো। সেখানে কোথায় সুখ, কোথায় শান্তি।ভালোবাসা তো অলীক কল্পনা।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে সুবর্ণা । দূরের মেঠোপথ পেরিয়ে ট্রেন ছুটে চলছে তার গন্তব্যে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় একাকী পথ ভ্রমন । শহর পেরিয়ে চলে যাবে অনেক দূরে লোকালয়হীন কোন প্রান্তরে। বেলা শেষে দেখবে গোধূলী, পরের দিনের সূর্যোদয়। ভালবাসবে আপনাকে।
আজ সে বুঝেছে নিজেকে নিজেরই ভালবাসতে হয়। প্রেম বলে কিছু থাকলেও তা আগে নিজের সাথে নিজের। তারপর হবে প্রেমিকের আগমন সেই কল্পলোক থেকে। আজ সে বুঝেছে জীবন তার নতুন অধ্যায় নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এবার তার বেঁচে থাকা অনেক্টুকু স্বপ্নলোকের রাজকন্যার মতন। অনেকখানি সুখ আর ভালোবাসার স্পর্শে। এই স্পর্শটুকু সে নিজেই গড়বে, নিজেই প্রস্তুত করে নিজেকে অর্পণ করবে।
এখন থেকে তার বেঁচে থাকার শুরু। মৃত্যুর সমাপ্তি।
৩/১২/২০২৫
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ সকাল ৯:১০
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার কথা : তৃতীয় পর্বের পর

লিখেছেন সুম১৪৩২, ০৯ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৩০



“আসলে উনি কে…?”
এই শিরোনামের একটি লেখা দিয়েই আমার লেখালেখির শুরু।
সামুতে।
এটার পর, আমি এই গল্পের কয়েকটা পর্ব লিখেছিলাম। মোট তিনটি । শেষ পর্বটির নাম ছিল—“পশ্চিম পাড়ার পথে”।

গল্পটার সময়কাল ১৯৯০ সাল।
রহস্য আছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঁধ ভাঙার আওয়াজ আজ আর কেন আ্ওয়াজ করছেনা ?

লিখেছেন সূচরিতা সেন, ০৯ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৩০



সত্যি করে বলছি মাঝে মাঝে ভাবি এটা কি সেই বাঁধ ভাঙার আওয়াজ ? একটা সময় যে বাঁধ ভাঙা আওয়াজের
একটাই পরিচয় ছিল,বিশ্বের সব থেকে বড় বাঙলা ভাষীর ব্লগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভালোবাসা নাও, হারিয়ে যেও না

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:২৯



মুনা, আজ ঢাকায় শীতের তীব্রতা কিছুটা কম।
যদিও অনেকের কাছে এই শীত টুকুই অনেক শীত। আমার আবার শীত কম। তুমি শুনলে অবাক হবে এই শীতে আমি পাতলা একটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরান - বাংলাদেশ

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:০০

ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। একেবারে উথাল পাথাল অবস্থা। যেকোন সময়ে সরকার পতন হয়ে যেতে পারে।
এর আগে কয়েক বছর আগেও এমনটা হয়েছিল, হিজাব ইস্যু নিয়ে লোকজন সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ শীতার্ত একটি শিশু ও দুটি কুকুর

লিখেছেন ইসিয়াক, ১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩২


রাত বাড়ে যত তাপমাত্রা নামে তত,
পা ফাটে, ঠোঁট ফাটে গভীর হয় ক্ষত।

একটা শিশু কাঁপছে শীতে ছাতিম গাছটার নীচে।
দুটো কুকুর গা ঘেঁষাঘেসি করে তাকে ছুঁয়ে আছে।

শীতার্ত সবাই তারা,সমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

×