somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিঃসঙ্গ যাত্রী

০১ লা জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৭:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


- আপনি?
- হ্যা আমি!
- আপনি এখানে? ... কেমন করে?
হেসে ফেললেন তিনি। সেই চিরচেনা হাসি,কিছুটা দুষ্টুমিতে ভরা। চঞ্চল কালো চোখে বুদ্ধির ঝিলিক। খুব উজ্জ্বল দেখাচ্ছে ওনাকে। উজ্জ্বল আভার মাঝে তার স্বর্গীয় সৌন্দর্য্যের মুখচ্ছবি ধীরে ধীরে আরো স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। পুরো অবয়বই যেন দেখতে পাচ্ছে আমরিন এখন তার সামনে। নির্মল এক আনন্দের অনুভূতি। তার কোন ব্যথা নেই,কোন যন্ত্রণা নেই। তাকে দেখেই কি সব কষ্ট নিমেষে শেষ হয়ে গেল? এক যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসার মাঝে তো সে রয়েছে মাসখানেক ধরে। আর এ সপ্তাহে তার শারিরীক অবস্থা আরোও খারাপের দিকে গিয়েছে। ডাক্তাররা শেষ কথা বলেছেনও তার পরিবারকে। পরিবার মানে তার বাবা,মা, ভাই, বোন সবাই এখন তাকে ঘিরে।
এখনই শুধু নয়, বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে আমরিনকে ঘিরে রয়েছে সকলে। প্রানান্ত চেষ্টা যেন যে কোন ভাবেই হোক আমরিনকে ঠেকাবে ওরা না যেতে দিতে। কেউই তো চায় না তার প্রিয় মানুষটি তাকে ছেড়ে চলে যাক না ফেরার দেশে। আসলে আমরিনের অসুস্থতা বছরখানেক ধরে। চিকিৎসার শেষ পর্যায়ে মাসখানেক হলো সে হাসপাতালের কক্ষে। এখানে সে আসতে চায়নি। শেষ ঠাঁই তার এখানে হোক কক্ষনো সে চায়নি। কিন্তু সব কথা তো বলেও সময় হয়ে উঠলো না তার সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার।
আর এখন?
দীর্ঘ কয়েকদিন ধরে অবচেতন থাকার পর আরোও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাকে বাড়িতে নিয়ে যাবার। কিন্তু বাড়ি নিতে না পারলেও একমুহূর্ত কাছ ছাড়া করছে না তাকে তার পরিবার পরিজনেরা। আজই যেন কেমন একটা দিন অতিবাহিত হলো।

রক্তলাল হয়ে দেখা দিবে চাঁদ আজকের আকাশে। খুব অদ্ভুত এক দিন আজ। কিন্তু মানসিক চাপ দীর্ঘদিন ধরে নেবার পরও সবার মনে যেন আজ আনন্দের দোলা। সেজন্যই বুঝি খুব অন্যরকম এক দিন আজ। সবার মন বলছে আমরিন আজ চোখ মেলবে। আর এরই প্রতীক্ষায় সারাটি দিন গড়িয়ে দুপুর প্রায়। হাসপাতালের নির্জন বারান্দায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে সবাই। ওর বাবা, মা দাঁড়িয়ে আছে ওর হাতে হাত রেখে। এ পৃথিবীতে ওর আগমনের সময় যেমন তারাই তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, তেমনি আজ কি তাকে বিদায় জানাবার ভারও তাদের হাতে এসে পড়েছে? কিন্তু এই কি তারা চান? কোন পিতা মাতাই তো তার সন্তানের মৃত্যু দেখতে চান না। কিন্তু হঠাৎই তাদের লক্ষী মেয়েটি আজ বড্ড অসুস্থ। অচেতন হয়ে আছে কয়েকদিন হয়ে গেল। কতবারই ডেকেছে তার নাম ধরে কিন্তু কোন সাড়া নেই, কোন শব্দ মেলেনি। কোথায় চলে গেল তাদের মেয়েটি? নাকি গভীর ঘুমে আছে,আবার জেগে উঠবে। কিছুই তো আর বোধগম্যে হয় না। ডাক্তার নার্সকে জিজ্ঞেস করলে,চুপ করে থাকে ওরা। মেশিন রিডিং দেখে চলে যায় তারা। আজ যদিও চীফ মেট্রন ইমরোজ এসেছেন ওকে দেখতে। খুব দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনে সিদ্ধহস্ত বলেই ইমরোজের খ্যাতি এই হাসপাতালে সর্বজন বিদিত। ঘরে প্রবেশের পরপরেই যখন উনি জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিলেন,বাইরের ঝকঝকে রোদ্দুর ঘরে এসে প্রবেশ করলো।

আমরিন ঘুমিয়ে আছে। নিবিড় তার ঘুম। চীফ মেট্রন ইমরোজ এসে তার পায়ের কাছে দাঁড়ালেন। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমরিনের দিকে। ঘুমের ঘোরেই যেন আমরিন এবার হেসে ফেললো। বাবা, মা সচকিত হয়ে ইমরোজের দিকে তাকালেন। তাদের এ এক অবাক বিস্ময়! আমরিন ঘুমঘোরে হেসে উঠেছে। কোরিডোরের সবাই এসে আমরিনকে ঘিরে ধরেছে।
আমরিন হাসছে আর জিজ্ঞেস করছে ইমরোজকে,‘আপনি?’
ইমরোজ কি উত্তর দেবে বুঝতে পারছে না। এ দায়িত্ব যে আজই ওকে দেয়া হয়েছে। আমরিনকে সে হাত ধরে পৌঁছে দেবে সেই জগতের দ্বারপ্রান্তে যেখান থেকেই কিনা তার এ পৃথিবীতে হয়েছিল আগমন। কিন্তু কিভাবে জানাবে একথা আমরিনের বাবা –মা কে? তারা কি মেনে নিতে চাইবেন তাদের সন্তানের চলে যাওয়ার সংবাদ? কিভাবে ইমরোজ বুঝাবে যে এ কাজের দায়িত্ব এক বিশেষ দায়িত্ব যা সাধারণত ন্যস্ত থাকে চলে যাওয়া পরিজনদের মাঝের কোন অতি আপনজনের কাছে, যিনি এই যাত্রীর খুব কাছের মানুষ। তিনিই আসবেন এই যাত্রীর নতুন যাত্রাপথের সঙ্গী হতে। পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন তার শেষ গন্তব্যস্থলে।
পৃথিবীর এ জীবন শেষ করে আবার ফিরে যাওয়া তার শেষ গন্তব্যস্থলে – এসব যেন কেমন অদ্ভুত মনে হয়। পার্থিব জীবনে থেকে থেকে অভ্যস্ত হয়ে অপার্থিবে মিশে যাবার যাত্রী যেন সঠিক নির্দেশনা হারিয়ে না ফেলে, তাই এমন এক আলোকবর্তিকার আগমন হয় যাত্রার শুরুতে। কিন্তু ইমরোজ এখনও রয়ে গেছেন এখানে। তিনি কিভাবে এ দায়িত্ব নেবেন এ প্রশ্ন আমরিনেরও।

ইমরোজ বলেছে, সে এ জগতে স্বাভাবিক ভাবে অবস্থান করলেও তার আরেকটি সত্তা সেই অজানা জগতেও বর্তমান, যে কিনা এই কাজের বাকীটুকু সম্পন্ন করবে। প্রথম পর্ব সম্পাদন হয়ে গেছে।
ইমরোজ এসেছে আমরিনের কক্ষে। পর্দা সরিয়ে বাইরের আলোকচ্ছ্বটায় ভরে তুলেছে ঘরটা। টানা ক’দিন বৃষ্টির পর আজ ঝলমল আকাশে মৃদুমন্দ বাতাসের খেলা।
শরতের এই আকাশে কাশ ফুলের মেলা। কিন্তু আমরিন আর কাশফুল দেখতে পায় না। পৃথিবীও এখন তার কাছে অস্পষ্ট। দিগন্ত রেখা থেকে ধেয়ে আসা আলোর ছ্বটা ধীরে ধীরে যখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ও দেখেছে একটি জ্যোতির্ময় অবয়ব। এই উজ্জ্বল সাদা আলোর মাঝেই তিনি দাঁড়িয়ে। খুব লম্বা দোহারা গড়নের চির পরিচিত ইমরোজ শায়ান। আমরিন অবাক হয়ে তাই জিজ্ঞেস করেছে এতগুলো প্রশ্ন একসাথে।

আমরিন বুঝতে পেরেছে, ও পৃথিবী ছেড়ে খুব দূরে কোথাও চলে এসেছে এখন। এখান থেকে সূর্যছ্বটা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। চারিদিকে প্রচন্ড আলো। সে চলছে এক টানেলের মধ্য দিয়ে অসীমের পানে। এ যাত্রাপথ শুধু তার একার। সঙ্গীহীন ।
চিরপরিচিত বাবা, মা, ভাই, বোন এখন নেই ওর সাথে। থাকার কথাও নয়। কারণ এখন যে ওদের সময় নয় ওর সাথে আসবার। এ কথাটিও ওর যেন জানা, কিন্তু কে কখন বলেছে ঠিক মনে করতে পারছে না আমরিন। তবে এটুকু জানে যে ইমরোজ শায়ান রয়ে গেছে ওই দূরের পৃথিবীতে। তার যাত্রাপথে সঙ্গী হবার সময় তো এখনও হয়নি তার। তাই আমরিনের একাই যাবার পালা আর সেভাবেই প্রস্তুতি গ্রহন করেছে সে এই ক’দিন। কিন্তু এরই মাঝে কেউ একজন এসে যখন বলেছে, ‘পার করে দাও আমারে’ –আমরিন হেসে ফেলেছে। তার সেই হাসিতে তার হাসপাতাল কক্ষের সবার চোখে মুখে আনন্দ।
আমরিন ঘুমের ঘোরে হাসছে কিন্তু ওর মুখোমুখি দাঁড়ানো ইমরোজ শায়ান অপলক তাকিয়ে আছে আমরিনের দিকে। আমরিন অবাক বিস্ময়ে দেখছে ইমরোজকে। এ তো অসম্ভব,তার এতো ভাল লাগার মানুষটিকে আজ এত কাছ থেকে পাওয়া,যার কিনা থাকার কথা ছিল না একদম! সেজন্যই কি ইমরোজ এসেছে তার সামনে? তীক্ষ্ণ চঞ্চল সেই দৃষ্টি। চোখ রাখা যায় না যার চোখে। এক গভীর আবেশে যেন জড়িয়ে আসে সবকিছু। নত হয়ে পড়ে সবকিছু। আজও তাই হচ্ছে। এতো বিহবলতা কিভাবে গ্রহন করবে আমরিন?
এখন অনেক দূরে চলে এসেছে যেন। ছুটে চলেছে সামনে। তীব্র গতি তার। পিছন ফিরে তাকাচ্ছে বারবার কিন্তু এখন পৃথিবী আর স্পষ্ট নয়। কিন্তু ইমরোজ তার পাশে। চলছে দুজন দুরন্ত গতিতে,পাশাপাশি। অনেকটুকু পথ পাড়ি দিয়ে প্রবেশ করবে নতুন এক অন্য জগতে,যেখানে তাদের আসল ঠিকানা। মেশিন রিডিং বন্ধ হয়ে গেল সব। থেমে গেল সব একে একে। চীফ মেট্রন ইমরোজের দীর্ঘশ্বাসে ঘরটা ভারী হয়ে উঠলো।
পার্থিব জগতের এই মেশিনগুলো এ মুহূর্তে আর ধরতে পারছে না আমরিনের উপস্থিতি। যদিও অপার্থিবের উদ্দেশ্যে তার জীবন – যাত্রাপথের শেষটা শুরু হয়েছিল বেশ কয়েকদিন আগেই।
.।.।.।.।.।.।.।.।.।

২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৭:২২
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্যক্তি বেগম খালেদা জিয়া কেমন ছিলেন?

লিখেছেন নতুন নকিব, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ দুপুর ১২:০৪

ব্যক্তি বেগম খালেদা জিয়া কেমন ছিলেন?

ইয়াতিমদের সাথে ইফতার অনুষ্ঠানে বেগম খালেদা জিয়া, ছবি https://www.risingbd.com/ থেকে সংগৃহিত।

তিন-তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রীও তিনি। তাকেই তার বৈধ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বছরশেষের ভাবনা

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ দুপুর ১২:৪৮


এসএসসি পাস করে তখন একাদশ শ্রেণিতে উঠেছি। সেই সময়ে, এখন গাজায় যেমন ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছে, তখন বসনিয়া নামে ইউরোপের ছোট একটা দেশে এরকম এক গণহত্যা চলছিল। গাজার গণহত্যার সাথে... ...বাকিটুকু পড়ুন

উৎসর্গ : জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP)

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ বিকাল ৫:৩৮



খিচুড়ি

হাঁস ছিল, সজারু, (ব্যাকরণ মানি না),
হয়ে গেল “হাঁসজারু” কেমনে তা জানি না।
বক কহে কচ্ছপে—“বাহবা কি ফুর্তি!
অতি খাসা আমাদের বকচ্ছপ মূর্তি।”
টিয়ামুখো গিরগিটি মনে ভারি শঙ্কা—
পোকা ছেড়ে শেষে কিগো খাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সুস্পষ্ট প্রমাণ সহকারে উপদেশ গ্রহণের জন্য আল্লাহ কোরআন সহজ করে দিলেও মুসলমান মতভেদে লিপ্ত হয় কোন কারণে?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ৮:৫২



সূরাঃ ৫৪, কামার ১৭ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৭। কোরআন আমরা সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য; অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?

সূরাঃ ৩ আলে-ইমরান, ১০৫ নং আয়াতের অনুবাদ-
১০৫। তোমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

খালেদা জিয়ার জানাজা

লিখেছেন অপু তানভীর, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ১১:৩৯

আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন আমার নানীর বোন মারা যান। নানীর বোন তখন নানাবাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন। সেইবারই আমি প্রথম কোনো মৃতদেহ সরাসরি দেখেছিলাম। রাতের বেলা যখন লাশ নিয়ে গ্রামের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×