somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আজাদি না মুক্তি? ইনকিলাব না বিপ্লব? ~ ভিনদেশী শব্দের মচ্ছবে বিপন্ন বাংলা ভাষা?

২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১।
বিগত ৮ বছরের মতো এবারের ২১ ফেব্রুয়ারিও সাতসকালে কর্মস্থলে এসে হাজির হয়েছি, কেননা আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই, সেখানে বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতাদিবসের মতো জাতীয় দিবসগুলিকে উৎযাপন করা হয় যথোপযুক্ত মর্যাদার সঙ্গে, এবং খুব সিরিয়াসভাবে। এই ধরণের অনুষ্ঠানগুলোতে অংশ নেয়াও মোটের ওপর আমাদের চাকুরীর এক অলিখিত দায়িত্ব। আজ সকালের প্রভাতফেরীতে হাঁটতে হাঁটতে সদ্য ইরাসমাস স্কলারশিপে মাস্টার্স করে আসা সোশিয়লজি বিভাগের এক কলিগের সঙ্গে আলাপ করছিলাম তার সাম্প্রতিক সময়ের গবেষণা ইত্যাদি নিয়ে। এভাবে এককথায় দু’কথায় চলে এলো ১৩তম নির্বাচন পূর্ববর্তী ভাষা সংক্রান্ত বিতর্কের বিষয়টি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্লোগান দেয়া বাংলাদেশি তরুণেরা হঠাৎ মুক্তির বদলে আজাদি, ন্যায্যতার বদলে ইনসাফ, বিপ্লবের বদলে ইনকিলাব, জয় হোক / চিরজীবী হোকের বদলে জিন্দাবাদঃ ইত্যাদি বাংলা শ্লোগান বদলে দিয়ে তার উর্দু ফার্সিকরণে মজেছে। আমরা আলাপ করছিলাম, রাজনৈতিক শ্লোগানের এই বিজাতিকরণের প্রবণতা বাংলাভাষাকে কতোটুকু বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে?

অল্পসময়ের মধ্যেই আমরা দু’জন কমবেশী এ বিষয়ে একমত হলাম যে একটা নির্দিষ্ট আন্দোলনের প্রেক্ষিতে, মূলত ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে হিন্দি – উর্দু – ফার্সি – আরবি শ্লোগান রাজনৈতিকভাবে বেছে নেয়ার দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব আমাদের মাতৃভাষার ওপর পড়বে না।

আমি দীর্ঘদিন ধরে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে হিস্টরি অফ ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সটি পড়াচ্ছি। জার্মানিক ভাষাভাষী আরও বিবিধ ভাষার সঙ্গে উদ্ভুত ও দেড় হাজার বছরে পথ পরিক্রমা শেষে (ওল্ড ইংলিশ ~ মিডল ইংলিশ ~ মডার্ন ইংলিশ) ইংরেজি ভাষার আজকের যে অবস্থান, তার সূত্র ধরে আমার এ প্রবন্ধটিতে আমি একটি ব্যক্তিগত বোঝাপড়া ভাগ করে নেব। তা এই যে - যে কোন ভাষা গৃহীত ও চর্চিত হয়, পরিপুষ্টি ও মর্যাদা লাভ করে আমজনতার ক্রোড়ে। যদ্দিন একটি ভাষা দেশের জনসাধারণ এবং অপেক্ষাকৃত দরিদ্র্য জনগোষ্ঠীর মুখের বুলি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, ততদিন সে ভাষার বিলীন হবার সম্ভাবনা নেই। চাই তাতে যতই ঠেশে বিজাতীয় ভাষার শব্দ ঢুকানো হোক না কেন।

মোদ্দা কথা হচ্ছে ভাষার গতিপ্রবাহ কোন দিকে বাঁক নেবে, তা আগে থেকে স্থির করা সম্ভব নয়। '৫২র ভাষা আন্দোলন আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, জোর করে ভাষা চাপিয়ে দিলে একটা জনগোষ্ঠীর মাঝে সে ভাষাকে অগ্রাহ্য করার প্রবণতা বেড়ে যায়।


২।
আজ বিশ্ব শাসন করছে ইংরেজি ভাষা। শুধুমাত্র ভাষা শিখিয়ে, এবং ভাষাগত দক্ষতার পরীক্ষা নিয়ে যে ভাষার মালিকরা সবচে বেশি পয়সা কামাচ্ছে, তাও ইংরেজি। অথচ ইংল্যান্ডের ইতিহাসে এমন সময় ছিল, যখন খোদ ইংরেজি ভাষা যে নিশ্চিতভাবে ইংল্যান্ডে টিকে যাবে, এবং ব্যবহৃত হবে - তার নিশ্চয়তা ছিল না। বাংলা ভাষার ভবিতব্য বোঝার জন্য ইংরেজি ভাষার ইতিহাসের সঙ্গে এই তুল্যমূল্য আলাপ হয়তো কিছুটা সহায়ক হবে। নিজের যৎসামান্য পড়াশোনা থেকে সে চেষ্টা করছি।

ইংরেজি ভাষার জন্ম জার্মানিক গ্রুপ অফ ল্যাঙ্গুয়েজেস থেকে। পৃথিবীর অধিকাংশ ভাষার জন্ম যে ইন্দো ইয়োরোপিয়ান গ্রুপ অফ ল্যাঙ্গুয়েজেস, সেখান থেকে জার্মানিক ভাষার আদিরূপ 'প্রোটো' বা 'প্রিমিটিভ' জার্মানিক ভাষার জন্ম। আর এই প্রোটো জার্মানিক ভেঙ্গে ইস্টার্ন জার্মানিক (গথ ভাষা), নর্দার্ন জার্মানিক (নরওয়েজিন, সুইডিশ, ডেনিশ সহ বিবিধ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ভাষা), এবং ওয়েস্ট জার্মানিক (ওল্ড স্যাক্সন, ওল্ড জার্মান, এবং ওল্ড ইংলিশ) – ভাষাগুচ্ছের জন্ম। এই সূত্র ধরে, ওয়েস্ট জার্মানিক ভাষাগুচ্ছ থেকে ওল্ড স্যাক্সন, এবং ইংল্যান্ডে এসে জেঁকে বসার সময় অ্যাংলো স্যাক্সনদের সাথে করে নিয়ে আসা ভাষাই ওল্ড ইংলিশ হিসেবে পরিচিত, যা ইংরেজি ভাষার আদিতম রূপ। আজকের যুগে বসে ওল্ড ইংলিশ বোঝার কোন উপায় আমার আপনার নেই, এতোটাই বদলেছে ইংরেজি ভাষা গত দেড় হাজার বছরে।

ইংল্যান্ডের ঠিক পাশের দেশ ফ্রান্সের ফ্রেঞ্চ ভাষাকে বলে রোমান্স ল্যাঙ্গুয়েজ। কারণ, তার জন্ম ল্যাটিন থেকে। বিপরীতে ইংরেজি ভাষা পুরোপুরি জার্মানিক ভাষার বিবিধ চরিত্র বহন করে। সময় মতো সে আলাপ আসবে।

ইংল্যান্ডে ইংরেজি ভাষার স্বীকৃতি এবং প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক ধাপগুলো সংক্ষেপে বর্ণনা করি। অ্যাংলো স্যাক্সনদের মাধ্যমে যে ভাষাটি ব্রিটিশ জাতিগোষ্ঠী লাভ করলো, মোটাদাগে ধরা যাক ৩০০ খ্রিষ্টাব্দে, সেটা তার প্রথম লিখবার অক্ষর লাভ করলো ৫৯৭ সালে সেইন্ট অগাস্টিনের নেতৃত্বে খৃষ্টধর্ম গ্রহণের মাধ্যমে। সেই অক্ষর / লেটার ইংরেজি ছিল না, ছিল ল্যাটিন। অর্থাৎ, আজকে আমরা যেভাবে বাংলিশ লিখি কখনো কখনো ম্যাসেঞ্জারে বা হোয়াটসঅ্যাপে - সেভাবে তারা ল্যাটিন হরফে ইংরেজি লিখত। কাছাকাছি সময়ে কেদমন নামে এক ব্রিটিশ চারণকবির আবির্ভাব ঘটে, যে পেশাগতভাবে ছিল রাখাল। একদিন হঠাৎ করেই সে ইংরেজি ভাষায় ঈশ্বরের স্তুতি গাওয়া শুরু করে, এবং আসেপাশের সবাই বিস্মিত হয়ে যায় এই অলৌকিক ঘটনায়। ঈশ্বরের প্রশংসা তবে এই পতিত জনগোষ্ঠীর ভাষা ইংরেজিতেও করা সম্ভব! একটা ভাষার মর্যাদা স্থাপনে তার এক ঐশ্বরিক বা অলৌকিক অরা বা আভার প্রয়োজন হয়। ইংরেজি ভাষার প্রথম সেই অলৌকিক আভা ছিল চারণকবি কেদমনের হিমস , বা গীতি। এটাই ইংরেজি ভাষায় রচিত প্রথম কবিতার মর্যাদা পায়।

এরপর আগমন ঘটে স্যাক্সন রাজা অ্যালফ্রেড দি গ্রেটের। ৮৭১ সালে ওয়েসেক্সের সিংহাসনে বসে তিনি বেশ কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। তার মধ্যে প্রথমটি ছিল সাধারণ প্রজাদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়া (যদিও সে আমলে শিক্ষা বলতে চার্চ ও বাইবেলের শিক্ষার বাইরে কিছু ছিল না), এবং অনুবাদ প্রকল্প হাতে নেয়া। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ল্যাটিন বই তিনি মাতৃভাষা ওল্ড ইংলিশে অনুবাদ করান সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়।

ইংরেজি ভাষার প্রথম ষ্ট্যাণ্ডার্ড / প্রমিত ফর্ম তৈরি প্রয়াস দেখা দেয় বেনেডিক্টিয়ান রিফরম মুভমেন্টের মাধ্যমে, যেটা পুরো ১০ম শতক জুড়ে চলে। চার্চের ফাদাররা প্রথমবারের মতো এই প্রয়োজন অনুভব করেন যে, লোকমুখে তাদের মাতৃভাষা বিকৃত হয়ে যাচ্ছে, যেটার একটা প্রমিতকরণ প্রয়োজন। স্কুল অফ উইঞ্চেস্টার ছিল সেই ভাষাগত কাটাছেঁড়ার কেন্দ্র।

মনে রাখতে হবে, এই পুরো সময় জুড়ে, তৃতীয় খৃষ্টাব্দ থেকে নিয়ে ১০ - ১১ শতক পর্যন্ত ইংল্যান্ডের উত্তর অংশে রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে প্রধান ভূমিকা রেখেছে ইংল্যান্ডের নর্থ সাইডে জেঁকে বসা ভাইকিংস জনগোষ্ঠী। তাদের নর্স - ভাষার অক্ষরেই ইংল্যান্ডে সর্বপ্রথম লেখার প্রচলন ঘটে। তাদের ভাষাকে রুনিক ল্যাঙ্গুয়েজ বলা হতো, কেননা তারা রুনস, তথা পাথর, লোহা, কাঠ - ইত্যাদির ওপর খোদাই করে লিখত। তাদের অ্যালফাবেটের নাম ছিল ফুথার্ক। ১০২৪ থেকে ১০৪২ সালে অবিভক্ত স্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং ইংল্যান্ডের রাজা কানুটের আমলে এই ভাইকিং ভাষা এবং সংস্কৃতির সবচে প্রচার এবং প্রসার ঘটে ইংল্যান্ডে।

১০৬৬ সালে ইংরেজি ভাষা সবচে বড় বিপদের সম্মুখীন হয়, রাজনৈতিকভাবে ফরাসিদের কাছে বিপর্যস্ত হওয়ার মাধ্যমে।

১০৬৬ সালের কিছু আগে ব্রিটেনের সিংহাসনে শূন্যতা সৃষ্টি হয়। তখন একই সঙ্গে ৩ জন ব্যক্তি ইংল্যান্ডের রাজ সিংহাসনের ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইংল্যান্ডের উত্তর অংশ অধিকৃত করে রাখা ভাইকিং / নর্থমেন রাজা হ্যারল্ড হারড্রাডা, ফ্রান্সের নর্মান্ডির ডিউক উইলিয়াম, এবং দক্ষিণ ইংল্যান্ডের সমস্ত স্যাক্সন হাউজ মিলে নির্বাচিত স্যাক্সন রাজা হ্যারল্ড গডউইন। হ্যারল্ড গডউইন ভাইকিং রাজা হ্যারল্ড হারড্রাডাকে পরাজিত করতে পারলেও, কয়েকদিনের ব্যবধানে ফ্রেঞ্চ ডিউক উইলিয়াম দি কঙ্কয়েরারের নিকট হেস্টিংসের যুদ্ধে নির্মমভাবে পরাজিত হন, এবং সমস্ত স্যাক্সন যোদ্ধাদের লাশ সারিবদ্ধভাবে পড়ে থাকে লন্ডন ব্রিজের সামনে।

ইংল্যান্ডের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ফ্রান্সের কাছে ২০০ বছরের লজ্জাজনক পরাধীনতার ইতিহাস শুরু হয়।

ইংরেজি ভাষা ফাইটব্যাক করে আমজনতার মুখে।

ফ্রেঞ্চ ভাষাকে দেশের মানুষ কখনো নিজের ভাষা বলে গ্রহণ করে না। ফ্রেঞ্চ পরিণত হয় দাপ্তরিক ভাষায়। রাজারাজড়া এবং তাদের নৈকট্যপ্রাপ্ত আমত্যরা ফ্রেঞ্চ ভাষায় আলাপচারিতা চালিয়ে যায়। ধর্মচর্চার ভাষা থাকে ল্যাটিন। কিন্তু জনতার কোলেকাঁখে বেঁচে থাকে ইংরেজি ভাষা, প্রাত্যাহিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে।

এই সময়ে ইংল্যান্ডে রেগুলার বেসিসে বিদ্যমান ছিল প্রায় পাঁচটি ভাষা। কেল্টিক ভাষা - যা ছিল ইংল্যান্ডের আদিবাসি কেল্টদের মুখের ভাষা। ইংল্যান্ডের অধিকাংশ এলাকা এবং নদীর নাম কেল্টিক ভাষায়। ধর্মচর্চার ভাষা ছিল ল্যাটিন। একটা বিচ্ছিন্ন পেরিফেরিতে, নর্দান ইংল্যান্ডে চর্চিত হচ্ছিল ভাইকিংদের ভাষা নর্স, রাজা রাজড়ার ভাষা ছিল ফ্রেঞ্চ, আর আমজনতার ভাষা - ইংরেজি। এই অবস্থা থেকে আদান - প্রদান, গ্রহণ - বর্জনের মাধ্যমে ইংরেজি ভাষা টিকে থাকে এবং পুষ্ট হয়।

কিছুদিনের মাঝেই ‘দা ফাউন্ডিং ফাদার অফ আওয়ার ফাইনেস্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ – অর্থাৎ ইংরেজি ভাষার জনক জফ্রে চসার চলে আসেন, ইংরেজি ভাষাকে (ইংরেজি ভাষা তখন মিডল ইংলিশ) একটা মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে তুলে আনার জন্য। এবং জার্মানিতে প্রটেস্টাণ্ট মুভমেন্ট চালু হবারও ২শ বছর আগে ইংল্যান্ডের সেন্ট্রাল মিডল্যান্ড এলাকায় জন উইক্লিফের তত্ত্বাবধানে উইক্লিফাইট মুভমেন্টের জন্ম হয়, মাতৃভাষা ইংরেজিতে প্রার্থনা করা যার অনেকগুলো দাবীর একটি মূল দাবী ছিল। ইংল্যান্ডে প্রিন্টিং প্রেসের আগমন ঘটে ১৪৭৬ সালে। তারপর ইংরেজির আমূল বদলে যায়। ইংরেজি ভাষার সবচে বড় পরিবর্তনটি আসে, তাদের কলোনিয়াল এক্সপানশনের সময়।

যা হোক, সেই ফ্রেঞ্চ দখলিকৃত ইংল্যান্ডের সময় ইংরেজি ভাষার দিকে তাকালে আমরা বুঝি রাজনৈতিকভাবে যতই একটা ভাষা এবং ভাষাভাষী মানুষকে নিপীড়নের মধ্যে রাখা হোক না কেন – যদ্দিন সে ভাষার ব্যবহার আমজনতার মুখে মুখে বেঁচে আছে, সে ভাষা মরবার নয়।


৩।
এবার জার্মানিক ভাষার চরিত্রের সঙ্গে ইংরেজি ভাষার কিছু সাযুজ্য নিয়ে আলাপ করি, যা পরবর্তীতে ইংরেজি ভাষা সচেতনভাবেই পরিত্যাগ করে, নিজের বর্ধন ও পরিমার্জনের জন্য।

জার্মান ভাষার একটা মৌলিক চরিত্র হল, নতুন কোন এক্সপ্রেশান, বা বিষয়বস্তু যদি তাদের সামনে উপস্থিত হত, তবে তারা অন্য ভাষা থেকে শব্দ ধার করার বদলে কাছাকাছি অন্যান্য শব্দ থেকে সিলেবল বা শব্দাংশ ধার করে নতুন নতুন শব্দ তৈরি করত। অর্থাৎ, শব্দ ধার করার চেয়ে শব্দ তৈরিতে তাদের আগ্রহ ছিল বেশি।

ওল্ড ইংলিশ যেহেতু জার্মান ভাষা থেকে উদ্গত, কাজেই ওল্ড ইংলিশেরও এই প্রবণতা ছিল। তখন ওল্ড ইংলিশের শব্দভাণ্ডার ছিল সাকুল্যে ৫০০০০। মিডল ইংলিশে, বিশেষত নর্মাণ ফ্রেঞ্চদের দ্বারা ১০৬৬ সালের পর প্রায় ২০০ বছরের জন্য ইংল্যান্ড অধিকৃত হবার পর ইংরেজদের মধ্যে এই প্রবণতা হ্রাস পায়। তখন ইংরেজি শব্দভাণ্ডারের সাইজ দাঁড়ায় ১ লাখ থেকে সোয়া ১ লাখের মধ্যে। কলোনিয়াল এক্সপ্যানশনের পর, এবং বর্তমানে প্রযুক্তির ছয়লাবের যুগে এসে ইংরেজরা তাদের উপনিবেশগুলো থেকে ধনসম্পদের পাশাপাশি দেদারসে শব্দও লুট করে ইংরেজি ভাষায় প্রবেশ করাতে থাকে। বর্তমানে তাদের ইংরেজি লেক্সিকন/শব্দ - প্রায় ৫ লাখের মতো। তাতে লাখ লাখ ধারকৃত শব্দ আছে, সেটা বলাই বাহুল্য।


প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে শব্দ ধার করা - তাতে ইংরেজি ভাষার “ইংরেজিত্ব” (ইংলিশনেস) – কি কমেছে আদৌ?

ইংরেজি ভাষার হাজার বছরের পরিক্রমার দিকে তাকালেই বোঝা যায় – আইডিয়া হিসেবে একটা ভাষাকে ‘বিশুদ্ধ’ রাখা কোন প্রাকটিকাল পরামর্শ নয়।

যতদিন ইংরেজি ভাষা ল্যাটিন, নর্স, ফ্রেঞ্চ ইত্যাদি ভাষার সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখনও ইংরেজি ঐসমস্ত ভাষা থেকে প্রয়োজনীয় শব্দ নিজের ভেতর আত্তীকৃত করেছে। এটাকে ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোন থেকে ইম্পজিশন (অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী জাতিগোষ্ঠীর ভাষা থেকে দুর্বল জাতিগোষ্ঠীর ভাষায় শব্দ বা সিনট্যাক্স প্রবেশ করা) বলা হয়।

আর ইংরজরা নিজেরা যখন কলোনিয়াল এক্সপানশনে বেরিয়ে পড়েছে, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই পরাজিত জাতিগোষ্ঠীকে শাসন করবার জন্য নিজের ভাষার শব্দভাণ্ডারের আগল খুলে দিয়েছে, যার ফলে দেদারসে অন্যান্য ভাষার শব্দ বিজেতার ভাষা ইংরেজিতে প্রবেশ করে। এভাবে ইংরেজি ভাষার শব্দভাণ্ডার আজ প্রায় ৫ লাখের মতো, যেখানে ওল্ড ইংলিশ ভাষার শব্দভাণ্ডার ছিল তার ১০ ভাগের ১ ভাগ। এই প্রক্রিয়াকে ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোন থেকে বরোয়িং (অপেক্ষাকৃত দুর্বল জাতিগোষ্ঠীর ভাষার শব্দ বা সিনট্যাক্স যখন শক্তিশালী জাতিগোষ্ঠীর ভাষায় প্রবেশ করে) বলা হয়।

তাতে সবমিলিয়ে ইংরেজির ক্ষতিটা হয়েছে কি?

৪।

এই আলোচনার প্রেক্ষিতে আজ আমরা বাংলাভাষার ভবিতব্য কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারি।

এখন ট্রান্স - ন্যাশনালিজমের যুগ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নিজেদের সীমান্তে যত শক্ত করেই কাঁটাতারের বেড়া বসাক, ইন্টারনেটের যুগে এসে মানুষ যার যার পছন্দের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেই নেয়। যেমন, রাজনৈতিকভাবে আমরা হিন্দি বা উর্দুভাষাকে বাংলার প্রতিপক্ষ মনে করলেও, পেশাসূত্রে তরুণ ছেলেপেলেদের সংস্পর্শে থাকার কারনে আমি জানি, এখন তাদের ভেতর একটা বৃহৎ অংশের সবচে পছন্দের ভাষা এবং সংস্কৃতি কোরিয়ান। তারা ভালোবাসি, বা লাভ ইউ ইত্যাদি বলার বদলে 'সারাঙ্গেও' বলতে এবং তর্জনী এবং ব্রিদ্ধাঙ্গুল একত্রীত করে হার্টসাইন তৈরি করে দেখাতে বেশী সাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

সর্বোপরি আমাদের দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যতটুকু শক্তিশালী, আমাদের ভাষা, ভাষা সংশ্লিষ্ট শিল্প – সাহিত্য – সংস্কৃতিও ঠিক ততটুকুই প্রভাবশালী হবে। যদি বৈশ্বিক বানিজ্যে বাংলাভাষার গ্রহণযোগ্যতা না থাকে, যদি আমাদের বিদেশী বায়ারদের সঙ্গে ইংরেজি - মেন্দারিন - হিন্দি ভাষাতেই আলাপ করা লাগে, তবে আমাদের স্লোগানের ভাষা বাংলা হোক বা উর্দু - আমরা অলরেডি মারা খেয়ে বসে আছি।

জাত গেলো জাত গেলো বলে - মান বা প্রমিত ভাষা নির্মাণে সর্বদাই একটা গ্রুপ সক্রিয় থাকেন। এই প্রমিতভাষা নির্মাণের ব্যাপার যেহেতু সর্বদাই ক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গে সংযুক্ত, এবং যেহেতু এখানে ভাষিক আদারিং, বা ভাষা ব্যবহারের সূত্র ধরে আশরাফ – আতরাফ, ব্রাহ্মণ – বর্ণশূদ্র চিহ্নিত করার ব্যাপার থাকে, তাই সে দায়িত্ব সরকারের কাছেই থাক। আদারিং করা, ডিভাইড অ্যান্ড রুলের ব্যাপারটা যেহেতু সরাসরি রাজনীতি সংশ্লিষ্ট।

দেশের খেটে খাওয়া মানুষ, শ্রমিক - কৃষক - আমজনতা, কবি – সাহিত্যিক – সাংবাদিক সকলের দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহারে বাংলার যে চেহারা আজ হতে ১০০ বছর পর দাঁড়াবে, সেটাই বাংলা ভাষার ভবিতব্য। আমাদের বুঝতে হবে যে ভাষার এই পরিক্রমা, এটা একটা অরগানিক প্রসেস, যেটার মধ্যে বামহাত ঢোকানোর প্রচেষ্টা দিনশেষে একটা ভাষিক ফ্যাসিবাদ হয়েই দাঁড়ায়।

সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:০৪
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকে ট্রাম্পের মন ভালো নেই

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৩৫


যুক্তরাষ্ট্রের U.S. Supreme Court এক ঐতিহাসিক রায়ে ঘোষণা করেছে যে প্রেসিডেন্ট Donald Trump জাতীয় জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে যেভাবে ব্যাপক আমদানি শুল্ক (ট্যারিফ) বসিয়েছিলেন, তা তার আইনি ক্ষমতার সীমা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্ব ভাষা দিবসের সকল শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:১৫



একুশ মানে মাথা নত না করা।
একুশ মানে ভাষার প্রশ্নে আপোষ না করা।

অমর একুশে আমাদের শেখায়—
আমাদের মাতৃভাষা কারও দয়ার দান নয়।
ভাষা আমাদের অর্জিত অধিকার।

যারা ভাষার জন্য শহীদ হয়েছেন, তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ মাতৃভাষা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৫:০৯


রক্তে কেনা মাতৃভাষা
বিশ্বব্যাপী সম্মান।
দৃপ্ত শপথে অটুট রাখবো
বাংলা ভাষার মান। 

মায়ের ভাষা সবার কাছেই
সবচাইতে প্রিয়।
প্রত্যেক ভাষাভাষীকে তার
প্রাপ্য সম্মানটুকু দিও।

ভাষা নিয়ে বিদ্বেষ বিভেদ
রুখতে ফেব্রুয়ারিতে।
ঢাকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাষা আন্দোলনের ইতিকথা, স্বাধীনতার বীজ বপন

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:০৪


বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিকথা
ইতিহাসের পাতায় লেখা এক দিন
উনিশশো আটচল্লিশের মার্চের সকালে
জেগে উঠেছিল সময়ের রঙিন প্রাণ।

৪৮ এর এগারোই মার্চ, সভার ভেতর
করাচির গণপরিষদের প্রাঙ্গণ জুড়ে
একটি প্রস্তাব ধ্বনিত হলো দৃঢ় কণ্ঠে
নতুন রাষ্ট্রের... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামায়াতে ইসলামী ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে ছিল না

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:০২


জামায়াতে ইসলামীকে আমি এখন নতুন চোখে দেখি। মানুষ ভুল করতেই পারে, ইতিহাসে ছোটখাটো কিছু ভুল তো সবারই থাকে। যেমন ধরুন, একটা দেশের জন্মের বিরোধিতা করা, সেটাকে ভেঙে দিতে চাওয়া, বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×