somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চেতনায় সৃষ্টি

১৮ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সৃষ্টিই ছন্দ।
সৃষ্টিই চেতনা ।
চেতনার রূপান্তরেই সৃষ্টি ।
সৃষ্টি চেতনার রূপান্তর মাত্র ।
‘সৃষ্টি কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; বরং এক নিরবচ্ছিন্ন রূপান্তর।’ — কিভাবে?
মেটাফিজিক্স ও স্পিরিটুয়্যালিটির আলোকে যদি ভাবি, সৃষ্টি কি —এই শব্দটি মানবচেতনায় প্রাচীনকাল থেকেই এক রহস্যময়তায় ঘিরে থাকা বিশালতার প্রতীক।
ধর্ম, পুরাণ, দর্শন ও আধ্যাত্মিক ভাবনায় সৃষ্টি সম্পর্কে বহু বর্ণনা পাওয়া যায়। মানুষের মনে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা ছিল — সৃষ্টি মানেই অলৌকিক ঘটনা, হঠাৎ কোথাও থেকে কিছু একটি জন্ম নেওয়া। কিন্তু মেটাফিজিক্স ও স্পিরিটুয়্যালিটির মতানুসারে, সৃষ্টি আসলে কোনো আকস্মিক বা রহস্যময় ঘটনা নয়, বরং এটি অস্তিত্বের নিরবচ্ছিন্ন রূপান্তর, যেখানে প্রকৃতিতে শক্তি চেতনারূপে নতুন ভাবে প্রকাশিত হয়। এই নিরবচ্ছিন্ন শক্তির প্রবাহমানতাই চেতনাকে বহন করে। শক্তি চেতনার বাহক। সৃষ্টি হলো চেতনার প্রকাশ ।
চেতনা কি?
মেটাফিজিক্স -এর ধারণা অনুসারে অস্তিত্বের মূল প্রকৃতি হলো চেতনা (consciousness)। চেতনা পরিবর্তিত হয়। চেতনা শক্তির ধারক বলে পরিবাহিত শক্তি চেতনাকে সম্প্রসারিত করে। চেতনা বিস্তৃতি লাভ করে। তারপর কোন এক সময়ে নতুন রূপ ধারণ করে। চেতনার দ্বারা আমাদের এই জগৎকে আমরা 3D বা থার্ড ডাইমেনশানে দৃশ্যমান দেখি। এখানে জীবজগত, আশপাশের গঠন, পায়ের নীচের স্থানটুকু —যেখানে দাঁড়িয়ে এই রিয়্যালিটিকে দেখছি, সব কিছুরই দৈর্ঘ্য আছে, প্রস্থ আছে, উচ্চতা আছে। অর্থাৎ এই দৃশ্যমান জগৎ চেতনারই ধারাবাহিক পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে, মানব মনে অবলোকন করার স্পৃহা তৈরি করে, উপলব্ধির সঞ্চার করে। ক্রমে চেতনার রূপান্তরের মধ্য দিয়ে আরো নতুন কিছু প্রকাশিত হয়। সৃষ্টি বিকশিত হয়। তরঙ্গের আকারে স্পন্দিত হয়। ছন্দের সূচনা করে। মানব মনের ভাবনাগুলো চারিদিকে ব্যাপ্তি লাভ করে।
অর্থাৎ কোনো কিছু হঠাৎ জন্ম নেয় না। জন্ম হয়েছে তখনই যখন উৎস (source) বিরাজমান ছিল বা উৎস বিরাজমান আছে। এই বিরাজমানতা থেকেই সৃষ্টির সূচনা। পরবর্তীতে সৃষ্টি রূপান্তরিত হয়, তথ্যে সমৃদ্ধি লাভ করে। তথ্যগুলো আর কিছুই নয়, এক একটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা । ইংরেজীতে বলতে পারি data accumulation বা তথ্যের সম্ভার। তথ্যের ভাণ্ডারে ভর্তি হয় অভিজ্ঞতার ঝুলি [ চেতনা→ সৃষ্টি → রূপান্তর → অভিজ্ঞতা ]
সৃষ্টি হচ্ছে কম্পনের পরিবর্তন – সংকোচন ও প্রসারণ। যখন চেতনা সংকুচিত থাকে, তখন সৃষ্টিও সীমিত থাকে। কিন্তু যখন চেতনা প্রসারিত হয়, নতুন উপলব্ধি , নতুন অভিজ্ঞতা সংগৃহীত হয়, নতুন সম্ভাবনার জন্ম হয়। এই নতুন সম্ভাবনাই নতুন সৃষ্টি সাধন করে। চেতনার প্রসারণই 'নতুন সৃষ্টি'র মূল চালিকা শক্তি।
পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বা সমাজের চেতনা যখন সীমিত অভিজ্ঞতা, সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও পুরাতন ধারণায় আবদ্ধ থাকে, তখন সৃষ্টিও সেই সীমার মধ্যেই ঘুরপাক খায়। একই ধরনের চিন্তা, একই ধরনের কর্ম, একই ধরনের ফলাফল দেখে দেখে মানুষ আশাহত হয়ে ভাগ্যকে দোষারোপ করে, কুসংস্কারে আবদ্ধ হয়। কারণ,
• নতুন অভিজ্ঞতা → চেতনার প্রসারণ
• প্রসারিত চেতনা → অভূতপূর্ব সৃষ্টি
• সীমিত চেতনা → পুনরাবৃত্তিমূলক সৃষ্টি

প্যারালাল রিয়্যালিটি কি?
আধ্যাত্মিক দর্শন বলে, সমগ্র বিশ্বই শক্তির স্পন্দন। ছন্দের কম্পন। প্রতিটি প্রাণ, চিন্তা, অনুভূতি — সবকিছুর মাঝে তার নিজস্ব স্পন্দন অন্তর্নিহিত। কারণ প্রতিটি বিষয়ই শক্তির অনুরণনের বহিঃপ্রকাশ। এই প্রকাশের ব্যাপ্তি চারিদিকে নতুন রূপে ছড়িয়ে পড়ে। জন্ম দেয় নতুন নতুন বাস্তবতার। এ থেকেই প্যারালাল রিয়্যালিটির ধারণা আসে।


চারিদিক কি?
এই ধারণাটি আসে স্থান বা স্পেস এর ধারণা থেকে । অর্থাৎ আমাদের ত্রি –মাত্রিক জগতে (3D রিয়্যালিটিতে) আমরা যে স্থানে দাঁড়িয়ে বাস্তবতাকে অবলোকন করি সেই উপলব্ধি থেকে অনুভূত ত্রি –মাত্রিক রিয়্যালিটি, আমাদের মস্তিষ্কে ‘দিক’ –এর ধারণা প্রদান করে । উচ্চ মাত্রার রিয়্যালিটিতে (বাস্তবতায়) অর্থাৎ উচ্চ ডাইমেনশানে (5D, 7D…) এই বাস্তবতার রূপ ভিন্ন।
আমাদের ত্রি –মাত্রিক রিয়্যালিটিতে আমরা দেখি পানি বাষ্পে পরিণত হয়। মাটি থেকে বীজের অঙ্কুরোদগম হয়। পরে (প্রকৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে) চারা গাছটি বৃক্ষে পরিণত হয়। এই তথ্যসমূহ আমাদের চেতনায় 'অভিজ্ঞতা' যুক্ত করে। আমাদেরকে তথ্যে সমৃদ্ধ করে। সৃষ্টি যেহেতু পরিবর্তনশীল তাই অভিজ্ঞতা বদলায়। আবারো নতুন তথ্য সংগৃহিত হয়। নতুন উপলব্ধির সঞ্চার হয়। চেতনার প্রকাশ উন্নত হয়। চেতনার সম্প্রসারণ নতুন 'সৃষ্টি' সম্পাদন করে। এগুলো কোনো অলৌকিকতা নয়; বরং শক্তির অন্তহীন সঞ্চারনের পরিবর্তিত ও বর্ধিত রূপ।
বাস্তবতার রূপান্তর কি?
স্পিরিটুয়্যালিটির মতাদর্শনে 'Shifting consciousness is the real creation.' অর্থাৎ সৃষ্টি মানেই চেতনার রূপান্তর।
চেতনা বদলালে বাস্তবতার ধরণও বদলায়। চেতনা যখন প্রসারিত হয়, সৃষ্টি নতুন রূপে সম্প্রসারিত হয়। এটি এমন নয় যে বাস্তবতা স্থির থেকে চেতনা শুধু তাকে দেখার উপায় বদলায়; বরং চেতনার পরিবর্তনের সাথে সাথে বাস্তবতা নিজেই নতুন রূপ ধারণ করে। মানব মন যদি তার চেতনায় ভীত অবস্থায় থাকে, তখন তার চারপাশের বাস্তবতা হুমকি ও বিপদে পূর্ণ মনে হয়। কিন্তু যখন সেই একই মন প্রেম ও আস্থাকে ভর করে অনুরণিত হয় তখন একই পরিবেশ ও তার চারপাশ নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় বলে অনুভূত হয়। বাহ্যিক জগৎ একই থাকলেও চেতনার পরিবর্তনে বাস্তবতার ধরণ সম্পূর্ণ বদলে যায়।
সৃষ্টি কেন নিরবচ্ছিন্ন?
মেটাফিজিক্স এর মত দর্শনে —'Being is dynamic.' অর্থাৎ অস্তিত্ব স্থির নয়, নিত্য পরিবর্তনশীল। চেতনা বহমান, সদা পরিবর্তনশীল। শারীরিক মৃত্যু হলো চেতনার রূপান্তর, অন্য আরেকটি স্তরে উত্তরণ। যেমন বলি 'উর্ধ্বলোকে গমন', কারণ সৃষ্টি যেহেতু থামে না সে শুধু রূপ পাল্টায়, সে প্রবাহমান অবস্থায় দেহ ত্যাগের পর এক মাত্রা থেকে অন্য মাত্রায় ভ্রমণ করে। একই সংগে বিভিন্ন স্থানে (location) অবস্থান করতে পারে।

সৃষ্টিতে বহুলোকের ধারণাঃ
আমাদের জানার ও দেখার বাইরের ডাইমেনশান-ই পরাবাস্তব জগত, যা অজ্ঞাত বলে অলৌকিক, রহস্যময় ঠেকে। 'লোক লোকান্তর' ধারণা এ থেকেই এসেছে। কিন্তু আধ্যাত্মিক জ্ঞান যত গভীর হয়, বোঝা যায় সৃষ্টিতে যে রহস্য আছে তা পরাবাস্তব জগতের উচ্চ ডাইমেনশান/ মাত্রায় অবস্থিত রিয়্যালিটি যা, মাঝে মাঝে আমাদের চোখে ধরা দেয়। যদিও বৈজ্ঞানিক ভাবে পর্যবেক্ষণ করে প্রমাণ নিয়ে হাজির করার মত অবস্থা এখনো তৈরি হয় নাই।
সৃষ্টিতে সব ডাইমেনশানে শক্তির প্রভাবে চেতনার বিকাশ ঘটছে। সৃষ্টির প্রক্রিয়া আছে যা, নিয়মের উর্ধ্বে নয়। চেতনা অনন্ত রূপান্তরের পথ মাত্র। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডই চেতনার একটি বিশাল প্রবাহ। যখন এই চেতনা নিজেকে নতুন উপায়ে প্রকাশ করতে চায়, তখন নতুন গ্রহ, নতুন জীবন, নতুন বিশ্ব সৃষ্টি হয়।

শেষের কথা, সৃষ্টিতেই চেতনা। আর এই ত্রি-মাত্রিক জগতে সৃষ্টি —শক্তি ও পদার্থের নিরবচ্ছিন্ন রূপান্তর মাত্র। ব্রহ্মান্ডের চেতনা আছে। চেতনার দ্বারা ব্রহ্মাণ্ড নিজের ভেতরের শক্তিকে বিভিন্ন সজ্জায় বিন্যস্ত করে বিভিন্ন ভাবে প্রকাশ করে। আর আমরা তাকেই “সৃষ্টি” নামে চিনি। সৃষ্টি কখনো অচেনা চমক নয়। এটির অনন্ত প্রবাহ অস্তিত্বকে প্রতিটি মুহূর্তে টিকিয়ে রাখতে নতুন রূপে প্রকাশিত হয়। এ কোন অলৌকিক বিষয় নয়। তার রূপান্তরের জটিল ধারাকে আমরা পুরোপুরি দেখতে পাই না, বুঝতে পারি না তাই অলৌকিক মনে হয় । তার বিশালতার তুলনায় আমাদের অস্তিত্ব (existence) নগণ্য। আমাদের চেতনাই আমাদের অস্তিত্বের মূল প্রকৃতি। কিন্তু চেতনার ক্ষুদ্র অংশ হিসেবে এর বিস্তার হলেই ‘পরিবর্তনের’ বিবিধ রূপ মাঝে মাঝে অনুধাবন করি। নয় সৃষ্টি যেন এক খেলা।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৭
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

খেলাধুলা কি পেটে ভাত দেয়?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২১ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:৫২


যখন এই ব্লগটি লিখতে বসেছি, তখন বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিশাল কেলেঙ্কারি বেঁধে রয়েছে। এক শ্রেণির ভুয়া জাতীয়তাবাদীদের চক্করে পড়ে আবেগী জনগণ হাততালির মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে ধ্বংসের মুখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সংসদ নির্বাচন: যেভাবে ভাগ হতে পারে ৩০০ আসন

লিখেছেন নতুন নকিব, ২১ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:৫৮

২০২৬ সংসদ নির্বাচন: যেভাবে ভাগ হতে পারে ৩০০ আসন

ছবি সংগৃহিত।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডোগন ও সিরিয়াস নক্ষত্রমন্ডলী

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২১ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৩


ধূসর সাহারা মরুভূমির পশ্চিম অঞ্চলে অবস্থিত একটি দেশ নাইজার। নাইজারের দক্ষিণে মালি নামক এক মালভূমিতে বাস করে ডোগন (Dogon) নামক এক জাতিগোষ্ঠী। বহুকাল আগে থেকেই স্থাপত্য আর ভাস্কর্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

পবিত্র কোরআনুল কারীম এর তেলাওয়াত ১

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২১ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:২৮


অশান্ত মনে প্রশান্তি আনতে পবিত্র কোরআনুল কারীম এর তেলাওয়াত শুনুন অথবা পড়ুন। যখন আপনার মন অশান্ত থাকবে তখন তেলাওয়াত শুনন; অবশ্যই ভালো লাগবে। মন শান্ত হবে। মনে এক ঐশরীক... ...বাকিটুকু পড়ুন

টবি ক্যাডম্যানের প্রস্থান: ট্রাইব্যুনাল না কি ট্র্যাজেডি?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:২৮

টবি ক্যাডম্যানের প্রস্থান: ট্রাইব্যুনাল না কি ট্র্যাজেডি?

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায়-তবে কোনো ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য নয়, বরং একজন আন্তর্জাতিক আইনি বিশেষজ্ঞের নীরব প্রস্থান ঘিরে। ব্রিটিশ ব্যারিস্টার টবি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×