
সময় তার চলার পথে জীবনকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে বসে, যে অনাকাঙ্খিত বিষয়গুলো জীবনের প্রাত্যহিক বিষয়ে রূপান্তরিত হয়। আগে যখন সাবদার মিয়া এদিক ওদিক মানুষদের দেখতো, বেশ অবাক হতো। বয়স হলে সবার কি যেন কি হয়! সে খেয়াল করে দেখতো, বয়স্করা মাঝে মাঝে গলার মধ্যে একটা বিশেষ ধরণের গলাবন্ধনী পেঁচিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কাপড়ের ঠিক না, শক্ত প্লাস্টিক জাতীয় কি দিয়ে যেন তৈরি –ওই গলাবন্ধনীটা। এমনভাবে ওটা সবাই গলায় প্যাঁচায়, যেন তাদের ঘাড় এইমাত্র কেউ মটকে দিয়েছে।
সাবদার মিয়া এসব অসুখের মর্ম তেমন একটা বুঝতো না আগে। জোয়ান ছিল তো তখন, তাই। কিন্তু আজ জীবনের মধ্যে বয়সে এসে ঠিকই বুঝেছে ওই ঘাড় মটকানি ব্যারামটার কি যন্ত্রণা !
এখন জীবন যে তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। সময়ের সাথে সাথে সে এখন মধ্যবয়স্কদের কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে। আর যেই না এই বয়সে সে পা রেখেছে, নিয়তির কি পরিহাস, কেউ যেন ঘ্যাচাং করে একদিন তার ঘাড়টা মটকে দিয়েছে!
ডাক্তার দেখে বললেন,'ও কিছু না। একে স্পন্ডালাইটিস বলে। সেরে যাবে । কলার ব্যবহার করেন আর ব্যথা নাশক কিছু ওষুধ খান। সব ঠিক হয়ে যাবে।'
সাবদার মিয়া ভাবে, 'এ কেমন ব্যাপার রে বাবা! ঘুম থেকে প্রতিদিনের মতো সকালে উঠে সারাদিন তো ভালোই কাটতো। এই সেদিনও তো ক্লাস নিয়ে ফেরার পথে ডিপার্টমেন্টের তুখোড় ছাত্রীটার সাথে পথে দেখা। আগে বেশ ভালো লাগতো তাকে। কিন্তু সেজন্য তার মেধা, আমাকে ছাড়িয়ে যাবে? চারিদিক তার প্রশংসায় ভন ভন করবে? এসব আর ভালো লাগে না। অসহ্য লাগে।'
তাই ছাত্রীটি সামনা সামনি পড়তেই, তাকে দেখে নিজের অজান্তেই সাবদার মিয়া নিজের ঘাড়টা মটকা মেরে ঘুরিয়ে ফেলল্। তারপর কি জানি কি হলো। ঘচাং করে ঘুরানি দিতেই ঘাড়ের বাঁ দিক থেকে শুরু হলো যন্ত্রণা। মটকা মেরে পড়ে থাকলো কিছুক্ষণ।
ব্যথা শুধু বাড়ে । কমে না।
ঘাড় –মটকানি ব্যারাম বলে কথা। ডাক্তারি ভাষায় যাকে বলে স্পন্ডালাইটিস।
কিন্তু কি করবে সাবদার মিয়া?
ভেবে পাচ্ছে না। নিজের উপর রাগও হচ্ছে। আমেরিকা থেকে পি.এইচ.ডি. করে আসার আগেও তো ডিপার্টমেন্টে তার বাদে কারোর নাম মুখে মুখে ফিরতো না। সবাই বলতো,
-ক্লাসে সর্বোচ্চ নম্বর কে পেয়েছে? সাবদার মিয়া।
-ছোট্টবেলা থেকে কঠিন কঠিন বইগুলো কে পড়ে ফেলেছে? সাবদার মিয়া।
-কলেজের প্রফেসর ওনার বইয়ের মুখবন্ধে কোন ছাত্রের নাম উল্লেখ করেছে? সাবদার মিয়ার নাম।
এত গুণের সাবদার আমেরিকা যেয়ে সেখানেও ফাটিয়ে ফেলল খুব কম সময়ে। পনেরটা গবেষণা পত্র লিখে ফেলে তখন দেশে হই-চই ফেলে দিয়েছিল। ডিপার্টমেন্টে ফেরত আসলে, তাকে লাল গালিচা সম্বর্ধনা দিয়ে ডিপার্টমেন্ট বরণ করে নিল। উচ্চ র্যাংকে ভূষিত করার বরণমালা দিয়ে কাজে যোগদানের নিয়োগপত্র দিল। ছাত্ররা হুমড়ি খেয়ে পড়ল, তার সাথে গবেষণার কাজ করবে বলে। কিন্তু সাবদার মিয়া অকৃতজ্ঞ না। তার গুরুর কথা সে সবসময় স্মরণ করে। পদে পদে তার পদধুলি নেয়। সকালে এসে গুরু –প্রণাম করে দিন শুরু করে। কারণ গুরুর কৃপায় তো তার এই উত্থান। এতো উন্নতি। তার গুরু আবার যেনতেন লোক না। কলেজে আইনস্টাইন হিসেবে খ্যাত। গুরুর এই শিষ্য তাহলে হবে আইনস্টাইন নাম্বার – টু। ছোটবেলার সেই দেখা ফিল্মের নামটার মতো। কি জানি একটা নাম ছিল না? দিপু নাম্বার –টু ।
সাবদার মিয়া এখন নামের আগে টাইটেল জুড়েছে। ড. সাবদার মিয়া। ডিপার্টমেন্টের দ্বিতীয় আইনস্টাইন।
ছাত্ররা এসে জিজ্ঞেস করে,‘স্যার এবার কি রিসার্চ স্টুডেন্ট নেবেন?’
সাবদার গর্ব ভরে উত্তর দেয়,‘আমার গুরুর কাছে যাও। তিনি যা বলবেন তাই। অনুমতি দিলে আমি নেব।‘
এ কথাটি রুমার কানে এসে একদিন পড়লো। রুমার কেন জানি একটু খটকা লাগলো। ডিপার্টমেন্টের প্রধানকে একবার কথায় কথায় বলেও ফেলল, সাবদারের স্টুডেন্ট সিলেকশনের বিষয়টা। যেই না বলা, আর যায় কই। বিভাগীয় প্রধান শুধু দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকেন তা তো নয়। কলেজে এসেই একে ধরা, ওকে ধরা, এসব কাজেও ব্যস্ত থাকতে হয় তাকে। কত ব্যস্ততা তার। কিন্তু তারপরও সময় করে রুমার কথাটা বেশ মনে রেখেছেন। তিনি সাবদার মিয়াকে পাওয়া মাত্রই ধরে বসলেন। তার স্টুডেন্ট নেয়া -নেয়ি কেমন চলছে সে সবের বৃত্তান্ত জানতে চাইলেন।
গর্বে তো সাবদার সবসময় আটখানা। পনেরটা গবেষণা পত্র প্রকাশ করে ফেলেছে পাঁচ বছরে। তাও তাত্ত্বিক বিষয়ে। এমনতর দর্শন চিন্তা তো সোজা বিষয় নয়। সাবদার নিজেই বলে, তার এত নাম ডাক ছিল আমেরিকায়, যে কতজন যে তার লেখা গবেষণা পত্রে তাদের নাম জুড়ে দিয়েছে তার ইয়ত্তা নাই। সেসব ছাত্রদের সংখ্যা এতই বেশি, এত অগণিত যা সাধারণের কল্পনার বাইরে । তিনি নিজেই অনেককে চেনে না। কিন্তু তারা তার লেখার সাথে যুক্ত।
কেন?
কারণ সেই ছাত্রদের শুধু একটাই খায়েশ ছিল যে, সাবদার মিয়ার সাথে তাদের কাজের নিদর্শন যেন থাকে। অর্থাৎ সাবদার বুঝাতে চাইতো তার মতন প্রতিভাবান মানুষ পাওয়া, যে কোন ছাত্রের সারা জীবনের স্বপ্ন, সারা জীবনের সাধনা ছিল।
কিন্তু কলেজে জয়েন করার পর যেই না একজন ছাত্রীর নাম সবার মুখে মুখে শুনতে শুরু করেছে, সেই থেকেই সাবদার মিয়ার ভীষণ মনোকষ্ট শুরু হয়েছে। তার বিভাগের গবেষণা ছাত্রী। তার জন্মের আগে, মধ্যে এবং পরেও এই কলেজে যদি কারো নাম থাকে সেটা সাবদার মিয়া ছাড়া আর কারো নাম হতে পারেনা। ভালো ছাত্রের তালিকায় তো থাকতেই পারে না। তাহলে এ এলো কোথা থেকে আজ? রুমা না ঝুমা নামের এই ছাত্রী উদয় হয়েছে কিভাবে? সাবদার বুদ্ধি আঁটলো। ধরতে হবে তো তাকে। বেশ কায়দা করে একদিন বাজিয়ে দেখবে।
সে সিধা চলে যাবে রুমার ল্যাবে। গল্প করতে করতে জিজ্ঞেস করবে, কোন সালে ম্যাট্রিকুলেশন। এতে সঠিক বয়সটাও বের করে ফেলবে। আর তার যে মুগ্ধ করা তুখোড় ব্যক্তিত্ব তা তো এই ছাত্রী এক কথাতেই তাকে গুরু মানতে বাধ্য হবে; অন্যরা যেমন মানে।
‘তাহলে চেষ্টা করে দেখিই না কেন?’
যেই ভাবা সেই কাজ। পরদিন সাবদার মিয়া রুমার ল্যাবের বিশাল রুমটার মাঝে তার একটা ল্যাপটপ এনে রাখলো। কি জানি কি কাজ করবে এই লোক, সেই ধান্দা দেখার জন্য রুমা এগিয়ে গেল তার কাছে। জানতে তো হবে, দিপু নাম্বার –টু এর এখানে আসার উদ্দেশ্যটা কি।
বুঝলো, তার ধান্দা একটাই। এই ল্যাবটাকে সাবদার তার জন্য ব্যবহার করবে। পুরোটা নয়, আংশিক। রুমের ওইপ্রান্তে একটা বুকশেলফ আছে যেখানে, সে ওই পাশটাতে তার বইপত্র সাজাবে। কিছু বই সাথে করে নিয়েও এসেছে আজকে। দর্শন তত্ত্বের একটা বই, রুমা দেখেই ধার চেয়ে বসলো। ড. সাবদার সাথে সাথে ধার দিয়ে দিল। আর জামানত হিসেবে চাইল রুমার যোগাযোগের নম্বর। সরাসরি নয়। একটু আঁকা বাঁকা করে, একটু ঘুরিয়ে।
-তোমার নাম্বারটা যেন কি?
রুমা তার ফোন নাম্বারটা দিতেই ড. সাবদার বেশ অবাক হয়ে বলল, ‘বাহ তোমার ফোন নাম্বারটা তো খুব মজার। সব সংখ্যা জোড়া জোড়া। 5588112 '
রুমা সাথে সাথে বলল, ‘স্যার খেয়াল করেছেন, সব জোড় জোড় সংখ্যার শেষে, ২ সংখ্যাটাও একটা জোড় সংখ্যা। তিনি খুব মজা পেলেন । এর মাঝে রুমার ম্যাট্রিক পাসের বছরটা জেনে নিয়েছেন। বছর পাঁচেকের সিনিয়র তিনি। তাই রুমা যখন ভর্তি হবে হবে, তখন কলেজে তার পড়ার দিন শেষ। পাশ করে সারা। তাহলে তিনি রুমার নাম জানবে কিভাবে? কিন্তু রুমা যখন ভর্তি হলো, কলেজে ঢুকে প্রথম দিন থেকে দিপু নাম্বার –টু এর বিরল প্রতিভার কথা শুনতে শুনতে হয়রান হয়ে গিয়েছিল।
একবার ছুটিতে এই বিরল প্রতিভা দেশে এসেছিল। দেশে এসেই তার গুরু, যিনি কিনা কলেজ তথা দেশের আইন্সটাইন বলে খ্যাত, তার সাথে দেখা করতে কলেজে এসেছিল। সে সময় সাবদার ভাইকে দেখার সুযোগ হয়েছিল কলেজের সকল ছাত্র ছাত্রীদের। ব্যাঙের মত লাফ দিয়ে হাঁটছিল সাবদার ভাই। প্রতিভার চ্ছ্বটায় স্বাভাবিকভাবে পা ফেলতে পারছিল না বোধহয়। সবসময় লাফ ঝাঁপ দিয়ে এখান থেকে সেখানে আর সেখান থেকে এখানে যায়। সেই উদ্যমতা আজও আছে তার ভেতরে। শুধু সমস্যা একটাই । খ্যাতির শীর্ষে আজ কেন সকলের মুখে মুখে তার নাম নেই? রুমার নাম কেন মুখে মুখে?
কলেজে জয়েন করেই এটা সে লক্ষ্য করেছে।
কিন্তু কেন?
কারণ সে যে ছাত্র নয়। আর এইটুকু যে তার মন বুঝতে চায় না। এখন তো বুঝতে হবে সবদিন একরকম যায় না।
ছাত্র যায়। ছাত্র আসে। তার মাঝে কেউ তুখোড় হয়। কেউ তুখোড় থাকে। কেউ আবার তুখোড় ছিল বলে সময়ের গহ্বরে কোন একসময়ে বিলীন হয়ে যায়। সেই দূরের অতীতে হারিয়ে যায়। কিন্তু সবদার মিয়া যে আজীবন তার নামখানা অমলিন করে রাখতে চেয়েছিল। সে পারেনি। নিজেই পারেনি। বিশেষ করে রুমার পরীক্ষার খাতা যখন তার হাতে এসে পড়লো তখন সে খেয়াল করে দেখলো, খাতার কোথাও সে কলম ছোঁয়াতে পারছে না।
‘কি সাংঘাতিক রে বাবা! এই ছাত্রী কোন দুনিয়া থেকে এসেছে?
এলিয়েন না তো? আর হলেই বা কি ? আমি তো আমি। আমার থেকে ভালো কেউ নেই – কেউ হবে না, কেউ হতে পারে না।‘
এসব ভাবতে ভাবতে ল্যাবের দিকে হাঁটা দেয় সাবদার মিয়া।
হেঁটে যেতে যেতে আবারো ভাবে, ‘রুমা বইটা ফেরত দিয়ে দিয়েছে তো? হ্যা ফেরত দিয়ে দিয়েছে। তাহলে আর কি? তার ল্যাবে আমার আস্তানাটা আমি গড়ে নেব। পুরো ল্যাবটা আমি দখল করে নেব। ত্রি সীমানায় তাকে আসতে দেব না। মুখও দেখতে চাই না ওর।‘
এসব ভাবতে ভাবতে যখন ল্যাবের দিকে আগাচ্ছে আচমকা সেই ছাত্রীটা ভুতের মতো এসে তার সামনে পড়লো।
তাকে ল্যাবের সামনে দেখা মাত্রই ঘ্যাচাং করে ঘাড়টা ঘুরিয়ে নিল ড. সাবদার মিয়া।
এই কান্ডটা দেখে রুমার বেশ অবাক লাগল।
ঝটাং করে লোকটার ঘাড় ঘুরানোর কারণটা কি? এই সেদিনও তো রুমার পিছন দিয়ে হেঁটে গেলে হালকা শিস দিয়ে সুর তুলতেন তিনি, মনোযোগ পাবার জন্য। রুমা তার শিক্ষকের সাথে কাজ করছে, ঝুঁকে কম্পিউটারের সামনে। এমন সময় হালকা সুর তুলে শিস দিয়ে তার মনোযোগ কিভাবে বিচ্ছিন্ন করা যায় সেই পাঁয়তারাও তো করতেন। রুমা ভাবতো, তিনি বোধহয় আমেরিকা থেকে এই কালচার আমদানি করে এনেছেন। বিদেশ থেকে এসেছে বলেই বোধহয় একটু ওপেন –মাইন্ডেড। হাসি খুশি মনের। তাছাড়া এদেশে তো গ্রিট করবার আদত নেই, কালচার নেই, কিন্তু তাকে দেখলেই তিনি যেহেতু গ্রিট করেন, এই আদব কায়দাও তাহলে আমেরিকার আমদানি।
এতো আন্তরিকতা দেখানো মানুষটার তাহলে আজ হঠাৎ কি হলো? এরকম ঘ্যাচাং করে ঘাড় ঘুরিয়ে, চোয়ালটা শক্ত করে ফেলল কেন? তারপর পাশ দিয়ে হেঁটে গেল, না চেনার ভান করে।
কেন?
তার ঘাড় টার্ন নেবার দৃশ্যটা দেখে রুমা ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল। অমনভাবে ঘাড় ঘুরালে, ঘাড় মটকে যাবে তো! আর ঘাড় মটকালে, ঘাড় মটকানি ব্যারাম কি তিনি রুখতে পারবেন?
কে জানে, আজকের পর থেকে ঘাড় ঘুরানির ব্যথায় সাবদার মিয়াকে কাতরাতে হয় কিনা।

...............
২১/০২/২০২৬
ফণা
প্রফেসর চিবানীচন্দর
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ১১:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



