
শীতের সকালে কলেজ ক্যাম্পাস খুব নির্জন থাকে। ক্লাসগুলো খালি খালি। অফিস আওয়ার শুরু হয়ে গেলেও ছেলেমেয়েদের কলকাকলি বেশ কম। ঘন কুয়াশায় দূরের মাঠটা ঢেকে আছে। আজ সকাল থেকে একটু বেশিই ঠান্ডা পড়েছে। তারপরও মৌটুসি এসেছে প্রফেসর লিজার্ডের সাথে দেখা করতে। তিনি আজ সকাল সকাল সময় দিয়েছেন। কিন্তু ক্যাম্পাস যে, কুয়াশার চাদরে ঢেকে এত নির্জন হয়ে যাবে তা তারও জানা ছিল না। কিন্তু মৌটুসিকে সময় দিয়েছেন। যত শীত শীত আড়ষ্টতা থাকুক, ক্যাম্পাসে তাকে যেতেই হবে। পৌঁছেছেন ঘড়ি ধরে ঠিক আটটায়। পৌঁছে অফিস= কক্ষের তালা খুলতে গিয়ে লক্ষ্য করলেন মৌটুসি দাঁড়িয়ে আছে তার কক্ষের বদ্ধ দুয়ারের পাশে। কালচে লাল একটা চাদর পরেছে। কপালে কালচে লাল টিপ। এই রং-টা তাকে যেমন মানায়, তেমন তাকে এ রঙে দেখলে লিজার্ডের মাথাও ঠিক থাকে না।
রুমের দরজা খুলে দিয়ে বলল,'বসো।' তারপরই উধাও হয়ে গেলেন প্রফেসর লিজার্ড।
কোথায় গেলেন প্রফেসর?
মৌটুসি ভাবছে মনে মনে। বিল্ডিং এর পিছনে ক্যান্টিন আছে, সেখানে কি?
একটা সিগারেটে টান দিতে?
ভদ্রলোক বেশ আশ্চর্য। এখন সিগারেটের নেশা পেয়ে ধরলো। প্রফেসরকে দারুণ লাগে, যখন তাকে হাতে সিগারেট ধরে খাতার দিকে নিশ্চিন্ত মনে তাকিয়ে থাকতে দেখে। বা যখন তিনি কোন অংকের সমাধানের চেষ্টা করছেন, মগ্ন হয়ে- তার সে একাগ্র চিত্তে নিবিষ্ট মনে বইয়ের পাতার দিকে তাকিয়ে থাকাটা মৌটুসিকে ভীষণ আকৃষ্ট করে। সাথে রয়েছে তার ব্যক্তিত্ব, তার বচনভঙ্গি।
আর মৌটুসির?
মরক্কোর বেদুইন মেয়েদের মত এই পরীখানা, বাংলাদেশে এলো কোথা থেকে? প্রফেসর লিজার্ড ভেবে পায় না! ওকে ডেকেছে আজ সবার আগে। দেখা করতে, নাকি পড়া বুঝাতে? নাকি মৌটুসি পড়া বুঝবে আর লিজার্ড তাকে মন ভরে দেখবে। ফণাটা মুখ থেকে বের করে কোনভাবে নিজেকে সামলে রাখবে? নাকি ফণাটা মুখ থেকে বের হতে দেবে না? মানুষের চেহারায় সে যে, একটা খোলসের ভিতরে লুকিয়ে থাকার সাপ - তা সে কোনভাবেই প্রকাশ করবে না।
সিগারেটের টানটা শেষ করেই লিজার্ড ক্যান্টিন থেকে বের হয়ে রুমে প্রবেশ করল। সৌম্য, শান্তরূপ নিয়ে, ধীর স্থির হয়ে নিজেকে সামলে নিতে নিতে চেয়ারে বসলো। গাম্ভীর্য, ব্যক্তিত্ব, বচনভঙ্গি নিখুঁত রেখেই আজ মৌটুসিকে বলে ফেলবে মনের বাসনার কথা। বলবে, 'মৌটুসি, বাসায় আসো না একদিন। বেশি করে তোমায় সময় দিতে পারবো।' মৌটুসি নিশ্চয়ই গর্বে, অহংকারে, সম্মানের সাথে তার প্রস্তাব গ্রহণ করবে। প্রফেসর লিজার্ড স্বয়ং এরকম আন্তরিকতা দেখালে জীবনে আর কি লাগে? এত সম্মান ছাত্রীর জন্য সবচেয়ে গর্বের বিষয়! মৌটুসির কখনোই এ সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। সে হাতছাড়া করবেও না। আর ওকে বাড়িতে আনতে পারলে লিজার্ডের শূন্য গোয়াল -ঘর কানায় কানায় পূর্ণ হবে। খালি ঘরে আর কত?
স্ত্রী ছেড়ে গেছে সেই কবে। স্ত্রী কিনা তাকে বলে, তাকে তার ভালো লাগে না! ঘরে শুধু সিগারেটের গন্ধ। তার গায়ে গন্ধ। মুখ থেকে ভক্ ভক্ করে বের হয় ধোঁয়ার গন্ধ। বউয়ের কিছুই পছন্দ না। কিন্তু ফন্দি ফিকিরের বুদ্ধি আঁটলে স্ত্রীর সহযোগিতা সে সবসময় পায়। যতই দূরেই থাকুক তার বউ, এসব বিষয়ে সবসময় তাকে তার পাশে পেয়েছে। এতটুকু তো লিজার্ডের জন্য বিরাট পাওয়া! তাই ফরমালি বউটাকে সে ছেড়েও দিতে পারে না, আবার কাছেও টানতে পারে না। কিন্তু একা একা আর কত? জীবনের একটা চাহিদা আছে না? যৌবন না হয় চলেই গেছে- জীবন তো যায়নি। বেঁচে তো আছে। একটু বয়স যা হয়েছে। ক্লাসে একদিন জ্বর নিয়ে লেকচার দিচ্ছিল । ক্লাসের পিছনের সারির দুষ্টু ছেলের দল বারবার শব্দ করছিল। লিজার্ড তখন অনেক কষ্ট পেয়ে বলেছিল, 'আমি জ্বর নিয়ে তোমাদেরকে আজ পড়াতে এসেছি। আমার বয়স তোমাদের দ্বিগুণ। তারপরও। কষ্ট হচ্ছে কিন্তু ক্লাস নিচ্ছি।' দুষ্টু সোনামণিদের মাঝে একজন তৎক্ষণাৎ উত্তর দিয়েছিল, 'দ্বিগুন নয় স্যার। আপনার বয়স আমাদের দ্বিগুনেরও বেশি।' হজম করে প্রফেসর লিজার্ড লেকচার চালিয়ে গেছেন সেদিন। কিন্তু লেকচার নেয়াই কি জীবনের সব? কলেজে তিনি আজ স্বনামধন্য হয়েছেন, কলেজের বিশাল পরিসরে, সকলের কাছে। বছরের পর বছর হাজার হাজার ছাত্র তার হাতে তৈরি হয়েছে। হাজার নয় শ'খানেক হবে, তার দীর্ঘ শিক্ষকতার জীবনে। শ'খানিক তো কম নয়! কিন্তু বিশাল ব্যাপ্তির মাঝেও তো ক্ষুদ্র কিছু থাকতে পারে! নিতান্তই ক্ষুদ্র পরিসরে একান্ত কিছু! সেখানে তো তার শূণ্যতা ছাড়া আর কিছু নেই। রয়েছে সিগারেটের ওই বাট-টা। যা ফেলে দিলে আর কি বা থাকে?
এই সেদিনই তো অধ্যক্ষের রুমে ঢুকবার আগে বাট-টা কোথায় ফেলবে, কোথায় ফেলবে, করতে করতে দরজায় কোনায় রেখে অধ্যক্ষের ঘরে ঢুকলো। রত্না পাশেই দাঁড়িয়ে দেখছিল, এরপর লিজার্ড কি করে। রত্নাকে দেখে, জিজ্ঞাসা করেছে, 'কি করছো এখন? পাশ তো করেই ফেলেছো।' উত্তরে রত্না বলল, 'রিসার্চের কাজ শুরু করেছি।' দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লিজার্ড বলল, তার অনেক আফসোস । আহা। মেয়েটার জন্য অনেক অনেক আফসোস। মেয়েটার বিয়ে শাদীর কোন গতি তো হলো না মেয়েটার কি আর করবে? রিসার্চই না হয় করুক। এই বলেই সিগারেটের বাট-টা দরজার পাশে, রত্নার পায়ের কাছে, ফেলে রেখে অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করল। রত্নার কেন জানি মনে হচ্ছিল, বাট-টা এখনো যেহেতু জ্বলছে, লিজার্ড এসেই এই 'অ-নিভু' বাট-টা আবার তুলে মুখে পুরে নেবে। যদি রত্না একটা পাড়াও দেয় বাট-টার ওপর, তাও লিজার্ড বাটটা মুখে পুরবে। লিজার্ড তো জানবে না, টেরও পাবে না যে, রত্না সিগারেটের বাটে পাড়া দিয়েছে। কিন্তু সেদিন সুযোগ থাকলেও রত্না এই কাজটা করেনি। পাছে পরের জন্মে এই লোকের এই সাপের ফণার চেহারা আবার দেখতে হয়। কর্মফল বলে কথা আছে না? তার ফেলে যাওয়া বাটে শুধু একটা পাড়া দেওয়ার কারণে যে কর্মফল তৈরি হবে, তা রত্না আর নিতে প্রস্তুত না। তাই রত্না চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল আর অপেক্ষা করছিল লিজার্ড এসে কি করে দেখার জন্য। রত্নার বারোটা বাজিয়ে লিজার্ড অনেক টাকা হাতরে নিয়েছে, রত্নার সাইকোপ্যাথ শ্বশুরের কাছ থেকে। রত্না তো প্রতিশোধ নিতেই পারে লিজার্ডের বাটে পাড়া দিয়ে। কিন্তু সে সেটা শেষ অব্দি করেনি। লিজার্ড ঠিকই, যেই ভাবা সেই কাজ। অধ্যক্ষের ঘর থেকে বের হলো। বিশাল কেইংঠা ধরণের লম্বা শরীরটা কুঁজো করলো। ফেলে দেওয়া, বা বলা যায় দরজার পিছনে পড়ে থাকা - মানে তার রেখে যাওয়া বাট-টা তুলে নিল হাতে। তারপরে মুখে পুরলো। একটা টান দিয়ে তারপরে সম্মুখ পানে তার লম্বা লম্বা ঠ্যাং ফেলে রওনা দিল। রত্নার ভাবনা একদম ঠিক আছে। লিজার্ড, বাট ছাড়া থাকতে পারবে না,এটাকে ফেলতেও পারবে না। সিগারেট শেষ হয়ে যাওয়া বাটেরও তো দাম আছে। অথচ এই বাট -সর্বস্ব জীবনে লিজার্ড বড় একা। তার মনোরঞ্জনের জন্য কিছুই নেই। দর্শন শাস্ত্রের প্রফেসর। অথচ দার্শনিক চিন্তা করেও নিজের চাহিদাগুলো মিটাতে পারছে না। পয়সা দিয়ে ভাড়া করে আনতে পারে অনেককে। সাময়িক সময়ের জন্য আনন্দ পেতে পারে। সময়টা আনন্দে কাটাতে পারে।
না। সেসবে তার মন ভরে না।

আসলে মৌটুসির কোমরের ওই বাঁকটার কথা ভাবলে, জীবনের বাঁকে এসে তার ভিতরের লিজার্ডটা ফণা মেলে ওঠে। মৌটুসির তীক্ষ্ণ, ধারালো আগুন ধরানো রূপ, যৌবন, স্মার্টনেসের কাছে পৃথিবীর সবকিছু ম্লান। তাই মৌটুসিকে সে বাসায় নেবে। একা করে পাবে। তখন প্রফেসরের ছোঁয়ায় ছাত্রীর গর্বের সীমা থাকবে না। আর তার ভিতরের যে প্রতিনিয়ত দগ্ধ হওয়া সাপটা আছে, সেটাও লিজার্ডের ফণার ছোঁয়ায় পরিপূর্ণতা পাবে। ওকে লিজার্ড ছাড়া এই জনমে আর কেউ হজম করতে পারবে না। এবং মৌটুসি সেটা জানে। যে এসেছে তার জীবনে, তারই একটা না একটা দশা হয়েছে। মৌটুসির প্রথমজন কাল -রোগে মরে গেছে অকালে। মৌটুসির দ্বিতীয়জন বদ্ধ উন্মাদ হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছে। যে-ই আসে মৌটুসির জীবনে, তারই ভয়ানক পরিণতি হয়।
কিন্তু কেন? সর্পযোগ আছে নাকি তার? বন্ধুরা কখনো কিছু বলেনি তাকে, পাছে মৌটুসি কষ্ট পায়। কিন্তু গ্রুপ ছবিতে সেদিনও দেখল তার কুচকুচে কালো চোখ দুটো লাল হয়ে ছবিতে জ্বলজ্বল করছে। সামনা সামনি তো মৌটুসিকে এমন দেখায় না। ছবিতে অমন আসে কেন? আগুনের মত রূপ আছে তার, কিন্তু আগুনের মত জ্বলজ্বলে চোখ তো আর নেই। কাজল কালো নয়ন, ওই গোরা মুখে -তাকে তো অপরূপা করে রাখে! অথচ কেমন যেন একটা ব্যাপার তার সাথে ঘটে!
কিছু কি আছে ওর সাথে? কোথায় গেলে তার এই সাথের জিনিসটাকে সে ঝেড়ে ফেলে দিতে পারবে? কার কাছে গেলে তার বিষাক্ত শক্তিটুকু সেই লোক টেনে নিয়ে, তাকে শান্ত করতে পারবে?
প্রফেসর লিজার্ড তাকে খুব টানে। তার লক লকে জিহ্বা অনেক দূর প্রসারিত হয়ে আজ তার মাঝে প্রবেশ করেছে। লিজার্ডের টানে আজ সে মাতোয়ারা। সে তার শয়ন কক্ষের দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে। নরম গোলাপি আভার শিফন শাড়ির মত একটা শাড়ি জড়িয়েছে গায়ে। তারপর মৌটুসি হেঁটে হেঁটে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গলির মোড়ের রিক্সায় উঠে বলল,'চলো। ঠিক ওই রাস্তা বরাবর।' যেদিক দিয়ে লিজার্ডের প্রসারিত ফণা পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে।
আজ সপ্তাহের ছুটির দিন। বাড়িটা নির্জন। কিন্তু খালি নয়। কারণ মৌটুসি এসে পৌঁছাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।
লিজার্ডের ঘরে তার জিহ্বা আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরেছে মৌটুসিকে। মৌটুসি ছাড়াতে পারছে না কিছুতেই তার নিজেকে। মৌটুসি আসবেই আসবে তার কাছে। ওর বিষটুকু খেয়ে প্রফেসর আরো ভয়ঙ্কর বিষাক্ত হয়ে উঠবে। আরো দু চারটে ক্রাইম গোপনে গোপনে করে ফেললেও কেউ জানবে না। ভুক্তভোগীরা কি মুখ খুলে? রত্নার মত আরো এক ছাত্রের থিসিস নিয়েও তো তার বারোটা বাজিয়েছিল। অনেক টাকার কন্ট্রাক্টে কাজ করে প্রফেসর। কিন্তু সেই ছাত্র তো মুখ খুলেনি!
লিজার্ড তার বিষ প্রয়োগে কাউকে যেমন মারতে পারে মৌটুসিকে তেমনি শান্ত করতে পারে।
তার ফণার জোর অনেক।
তার ফণার কাজ বহু বহুমুখী।
তাই সে বহুরূপী। তাকে কেউ চেনে না। কেউ চিনতে পারে না।
তাকে কেউ জানে না- শুধু তার ভেগে যাওয়া বউটা ছাড়া।
.....
লেখা শুরু ০১/০১/২০২৬
শেষ ০৪/০২/২০২৬
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




