সেঁজুতি,
আজ ২১শে এপ্রিল ২০২৬, রাত ১১ টা বেজে ৪ মিনিট। আজ সন্ধ্যা থেকে সারাটা রাত তোমায় স্বপ্নে দেখেছি। বিকাল চারটায় টেক্সট পাঠিয়েছ- আসতে চাও, দেখা করতে চাও। আমি বললাম, আসো। যদিও কাল আমার পরীক্ষা। বাইরে ল্যাপটপ রেখে পড়ছিলাম। বাইরের বাগান মিশে গেছে সেই পাশের রাস্তায়। অথচ ল্যাপটপ বাইরে ফেলে রেখে আসলেও হারাবার কোন চিন্তা নেই। তাহলে বুঝো কত সিকিওর একটা এলাকায় থাকি। কোন দেশ বুঝলাম না স্বপ্নে। কোন লোকেশন বা কোন বাড়ি চিনতে পারলাম না। কিছুই পরিচিত নয়। বাসায় আমি আর আমার হাজবেন্ড থাকি। তোমরা আসবে বলে আমার হাজবেন্ড রান্না বসালো। তুমি ঠিক আগের মতনই আছো,যেমন শেষবার বাস্তবে দেখেছি। হালকা হলুদ সালোয়ার কামিজ পরনে। রাত নয়টা পর্যন্ত ছিলে। যাবার বেলায় দেখলাম শাড়ি পরা। যাবার আগে আলিঙ্গন করলাম যখন, মনে হল এই আলিঙ্গনে তোমার হৃদয়ের স্পন্দন আমি অনুভব করেছি।
স্বপ্ন কি এতটা বাস্তব হয়?
কত কথা যে হলো সারাটা বিকেল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্য। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। বিদেশে বাবা, মা, পরিবার ছেড়ে থাকার যে একাকিত্ব তা আমিও বুঝি বলেই হয়তোবা তোমাকে বিদায় দেবার সময় তা বেশি অনুভব করেছি। তখন মনে হচ্ছিল, দেশের রাস্তার জ্যাম-ই বোধহয় বেশি ভালো, যেখানে জীবনের গতি থেমে থাকে, কিন্তু নির্জনতা তো থাকে না। সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকা সেখানে। এই ছিমছাম নিরিবিলি একাকী বিদেশ যাপন যেন আমাদের জন্য নয়। ছবির মতন শহরে আমরা যেন ভীষণ একা।
একাই তো।
প্রথম থেকে বলি। সন্ধ্যার আগের মুহূর্তে বিকেলটা একটু নরম হয়ে এসেছে। আমি ল্যাপটপ খুলে সাবজেক্ট দেখে থ! কাল আমার পরীক্ষা, আর আজ কিনা প্রথম বই খুলছি। কিছুই বুঝিনা। একবার রিভিশন দিলেও লাভ নেই। অনেকটা মাইক্রোওয়েভ ইঞ্জিনিয়ারিং ধাঁচের কিছু। প্রস্তুতি নিতে বেশ সময় লাগবে। বানিয়ে লেখার তেমন সুযোগ নেই। এভাবে যখন আমি দিশেহারা, তখনই তোমার টেক্সট। তারপর তোমার আগমন। অনেকদিন পর সামনা সামনি পেয়ে কি যে আনন্দ! তখনও সন্ধ্যা নামে নি। মানে তুমি কাছাকাছি কোথাও থাকো। তাই তুমি এসেছো, জানতে পেরে যে, আমিও তোমার কাছে থাকি। তারপর শুরু হলো কথা। তোমার হাজবেন্ডকে ছবিতে যেমন দেখেছি তার থেকে একটু ডার্ক কমপ্লেকশন দেখলাম স্বপ্নে। তুমি তো আগের মতনই আছো।
কথা শুধু একটা বিষয় নিয়ে বারবার হয়েছে। আর তা হলো, বিদেশে থাকতে হলে তোমাকে বিদেশের মতন হতে হবে। বিদেশ তোমার মতন হবে না। এখানকার বাসস্থানকে নিজের ঘর ভেবে নিতে হবে। মনটা যতই দেশের বাড়িতে ফেলে আসা নিজের সেই ছোট্ট ঘরটার মাঝে আটকে থাকুক, এই ঘরই এখন তোমার ঘর । বিদেশের এই একাকীত্বে ভরা কষ্টের মাঝে থাকলেও বলিনি যে, দেশে ফিরে যাও। স্বপ্নে তো বলতে পারতাম। কেন বলিনি জানিনা। হয়তোবা সংসার জীবনে প্রবেশ করেছো, তাই বলেছি বিদেশ এমনিই। অথচ বিদেশ, দেশ বাদ দিয়ে সমগ্র জীবনের দিকে যদি তাকাও, জীবনের এই পুরো পথচলাটাই একটা এক্সপেরিয়েন্স মাত্র। সবই হলোগ্রাফিক এক্সপেরিয়েন্স। সুতরাং সিরিয়াসলি দুঃখ কষ্টকে অনুভব করার কোন দরকার নেই। যেমন চলছে চলুক। যদিও মন এসব কথা মানে না। মন পড়ে থাকে ফেলে আসা নিজের সেই দেশে, তাই এখানকার জীবন এত কষ্টকর। এই হলোগ্রাফিক রিয়্যালিটির মাঝে যখন স্বপ্ন এসে ভিড় করে, সে তো একটু স্বস্তি দিবে। তখন সে হয়ে উঠবে আরো মজার। মায়ার মাঝে মায়া। যেমন খুশি সেভাবেই ভেবে নেয়া। আর ভাবলে তো স্বপ্নে তা ঘটেও যায়।
কিন্তু তারপরও স্বপ্নের মাঝে আমি ভাবতে পারিনি যে, কালকের পরীক্ষার প্রস্তুতি আমার ভালভাবে শেষ হয়েছে। বরংচ ভেবেছি, তোমার বিদায়ের ক্ষণে,আমার সাথে আমার পরিবারের সবাই যেন আছে। বোধয় সেজন্যই পাশে তাকিয়ে দেখি আমার বাবা মা দাঁড়ানো। তুমি চলে যাবার মুহূর্তে তারাও বিদায় জানাচ্ছেন তোমাকে। আমার ছোট ভাইটাও এখানে। কিন্তু ওনারা সব বিদেশে এলো কোথা থেকে? ওনারা তো বিদেশে থাকেন না! বিশেষ করে আমার বাবা-মাকে স্বপ্নে বেশ ইয়ং -লুকিং দেখে আমি তো অবাক। আর তুমি বললে, 'ম্যাডাম আমি ওনাদের আঙ্কেল আন্টি বলি?' আমি খুব হেসে বললাম, ‘অবশ্যই।‘ তাদের উপস্থিতি, তোমার থাকা, সব মিলিয়ে এত আনন্দ আমি কখনো পাইনি। আবার যেহেতু তোমার বসবাস একই শহরে বলে মনে হচ্ছিল, সেজন্য আরোও ভালো লাগছিল।

কিন্তু দেশটা কোথায়?
ইউ.এস.এ.-র কোন শহর হবে। হতে পারে আমার ফেলে আসা সেই পুরনো ফ্লরিডা। কারণ বিকেলটা আমার বাংলাদেশের বিকেলের মত লাগছিল। শুধু সারা পাড়া জুড়ে কোন মানুষজন নেই। রাস্তা ফাঁকা ।মাঝে মাঝে দুই একটা গাড়ি যায়। বাইরে পড়ে থাকা ল্যাপটপ হারাবার ভয় নেই। তারপর তোমরা যখন চলে গেলে, কি জানি কি মনে হলো, ল্যাপটপ ঘরের ভেতর নিয়ে আসলাম। আসলে তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল । ঠিক সন্ধ্য না। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গিয়েছিল। ভাবলাম বৃষ্টি আসে যদি তাই বাসার ভেতর ল্যাপটপ-টা নিয়ে আসি। কিন্তু অ্যাডাপ্টার,বৈদ্যুতিক তার, সবকিছু বাইরেই ফেলে রেখে এসেছি।
টাউন হাউস ধরণের একতলা বাসা আমার। দরজা খুললেই বিশাল ড্রইয়ং রুম। পাশে ডাইনিং, পিছনে বেডরুম। আজকালকার দিনের মতো সাদা বাল্ব যেগুলো আছে সেগুলো ওখানে জ্বলছিল না। ওই পুরনো কালের হলদে্ আলোর বাল্বগুলো জ্বলছিল বাসার ভেতর। খুব একটা উজ্জ্বল আলো নয়। তবে আমার রিডিং টেবিলটা বাইরেই পড়ে আছে।
আমি এবার পড়ায় মনোযোগ দেব। তোমরা মাত্র চলে গেছ। এই রাতটুকুই আছে। নয়টা থেকে ভোর পাঁচটা। তারপর পরীক্ষার সেন্টারে যেতে হবে পরীক্ষা দিতে, যেখানে কিনা পরীক্ষার সাবজেক্ট ম্যাটারই আমি জানিনা। অনেকটা যেন জীবনের পরীক্ষার মতো। সামনে কি আছে জানিনা। কিন্তু তার মুখোমুখী হতে হবে। কিছুই করার নেই। তারপর মুখোমুখী হয়ে জীবনটাকে সামলাও। আবার উপায়ও নেই। এর থেকে কোনভাবে নিস্তার তো পাওয়া যাচ্ছে না।
আমি তো স্বপ্নে ভাবতে পারতাম যে, পরীক্ষা না হয় হবেই না।
কিন্তু সে ভাবনা তো আসেনি।
ভাবনায় এসেছে দেশে ফেলে আসা বাবা মায়ের কথা।
ভাবনায় এসেছে এমন এক শহরে থাকা, যেখানে তুমি আমার খুব কাছে থাকো। হঠাৎ জানতে পেরেছ আমি এসেছি। তাই দেখা করতে এসেছ।
ভাবনায় এসেছে প্রিয় মানুষগুলোর কথা। কিন্তু জীবনের সংগ্রাম, জীবনের পরীক্ষা, এসব কিছুই ভাবনায় আসেনি। নাকি আমি ভাবিনি? ভাবতে চাইনি?
কাল সকালে পরীক্ষায় কি হবে তা নিয়ে আর চিন্তা করিনি বলেই বোধহয় স্বপ্নটা তারপর শেষ হয়ে গেল।
স্বপ্নের বাস্তবতাই জানে যে পরের দিন সকালে এক্সাম–হলে যেয়ে,সামনে খাতা পাওয়ার পর সেই খাতায় কি লিখবো!
আমার এই বাস্তবতা তা জানে না। জানতে চায়ও না। সে যে প্রিয় মানুষগুলোকে কাছে পেয়েই খুশি।
.....।
২১/০৪/২০২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

