আরব-বিশ্বের বাইরে কাতার থেকে প্রচারিত আল-জাজিরা টিভি চ্যানেল সম্পর্কে ধারণা দুই রকম: অন্যান্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে মুসলমাদের মুখপাত্র হিসাবে, আর পশ্চিমা বিশ্বে ওসামা বিন লাদেন ও জঙ্গীবাদ বা ইসলামী সন্ত্রাসবাদ প্রচারের মুখপাত্র হিসাবে। বহির্বিশ্ব আল-জাজিরার প্রচার বেড়েছে মূলত বিন লাদানের টেপ প্রচার করে এবং আমেরিকার আফগানিস্তান ও ইরাক আক্রমনের ঘটনাবলী সরাসরি প্রচার করে। আল-জাজিরা একটি আরবী চ্যানেল; ফলে সারা বিশ্ব আল-জাজিরাকে জানতে পেরেছে পশ্চিমা গনমাধ্যমের মাধ্যমে। কিন্তু আল-জাজিরা বিন লাদেন ও যুদ্ধের ঘটনা প্রচারের বাইরে নিয়মিতভাবে কি প্রচার করে কিংবা 1996 সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে তারা কি প্রচার করে আসছে সে সম্পর্কে আমরা অ-আরবী ভাষা-ভাষীরা কমই জানি। জানলে বোধ হয় আমরা আশ্চর্য হয়ে বলতাম, রাজকীয় দেশ কাতার যদি এমন একটি স্যাটেলাট টিভি চ্যানেল চালু করতে পারে তাহলে আমরা বাংলাদেশের মত এমন একটি গনতান্ত্রিক দেশে তা পারি না কেন?
হিউজ মাইলস আল-জাজিরা নিয়ে একটি বই লেখার জন্য এ-বিষয়ে গবেষণা করেছেন। বইটি গত বছর প্রকাশিত হয়েছে; শিরোনাম হলো: 'আল-জাজিরা: হাউ আরব নিউজ চ্যালেনজড দা ওয়ার্ড '। এই বইটি পড়ার সুবাদে আমি এ-সম্পর্কে কিছু তথ্য ও মতামত এখানে হাজির করতে পারছি।
কাতারের বর্তমান আমির শেখ হামাদ বিন খালিফা আল থানি ক্ষমতায় আসেন তার পিতাকে সরিয়ে। রাষ্ট্রিয় একটি টিভি চ্যানেল থাকা সত্ত্বেও তিনি ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যে আল-জাজিরা চ্যানেলের অনুমোদন দেন। তিনি পশ্চিমা দেশে শিক্ষা-দীক্ষা লাভ করেন, এবং দেশে ফিরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব গ্রহন করেন। পিতার শাসন-কার্য পরিচালনায় অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি 1995 সালে ক্ষমতা দখল করেন। তার পিতা তখন সুইজারল্যান্ডে প্রমোদ-ছুটি কাটাচ্ছিলেন। সেই থেকে তার পিতা বাইরেই আছেন। এমনকি কি তিনি রাষ্ট্রিয় কোষাগার খালি করে দেয়ার ও সৌদী আরবের সহায়তায় পালটা-ক্যু করে ক্ষমতা দখলের জন্য পিতার সকল উদ্যোগও ভন্ডুল করে দেন। (জানা যায় যে, সৌদী আরব এখনো তার পিতাকে মর্যাদা দিয়ে সে দেশে রাজকীয় অতিথি হিসাবে আমন্ত্রন করে থাকে।) নিজ হাতে পিতার মত সকল ক্ষমতা কুক্ষিগত করার বদলে নতুন আমীর ক্ষমতার কিছু বিকেন্দ্রিকরণ ঘটান যদিও রাষ্ট্রীয় সকল ব্যাপারে তার রায় শিরোধার্য। নতুন সংবিধান তৈরী করেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু করেন। মহিলাদের নির্বাচনে দাঁড়াবার সূযোগ করে দেন। শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে মনোনিবেশ করেন। বাক-স্বাধীনতার পথ প্রসস্থ করেন। এত সব সত্ত্বেও কাতার একটি গনতান্ত্রিক দেশ নয়, কিন্তু আবার পুরোপুরি একনায়কতান্ত্রিকও নয়। আমির শেখ হামাদের উদারনীতিক দৃষ্টিভঙ্গীর ফলে এমনটি সম্ভব হয়েছে। আর সে জন্যই আল-জাজিরার মত চ্যানেল আজ আরবীয় বিশ্বে, এমনকি পশ্চিমে আরব ভাষা-ভাষীদের কাছে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
আল-জাজিরার শুরুটা হয়েছিলো খবর ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দিয়ে। কিন্তু আমির শেষমেশ ঠিক করলেন পুরো 24 ঘন্টাব্যাপী খবর-ভিত্তিক অনুষ্ঠান প্রচার করতে হবে। তিনি যাত্রার শুরুতে আল-জাজিরাকে প্রদান করলেন এককালীন 137 মিলিয়ন ইউ এস ডলার। কিন্তু আল-জাজিরা লাভজনক হয়ে না-ওঠায় কার্যত এখনও আমিরের কাছ থেকে সহায়তা পেয়ে আসছে। আমিরের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বাধীনভাবে অনুষ্ঠান প্রচারের জন্য এমন একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো যে, যদি আমির নীতি নির্ধারণে ও সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে বাঁধা প্রদান করেন তাহলে আল-জাজিরার সকলে সমবেতভাবে পদত্যাগ করবেন। ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণএ কারনে যে, একটি টিভি ষ্টেশন চালাবার মত প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা মানুষ আরব বিশ্বে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। আল-জাজিরার মোটামুটি পুরো দলটি বিবিসি'র সাথে সম্পর্কিথেকে দক্ষতা অর্জন করেছে। নব্বই দশকের প্রথম দিকে সৌদী আরব একটি আরব টিভি চ্যানেল চালু করার জন্য বিবিসি'র সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। যথারীতি পশ্চিম লন্ডন থেকে এর প্রচারও শুরু হয়। কিন্তু অনুষ্ঠান প্রচারের ওপর সৌদি আরবের রাজকীয় খবরদারী বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে লাগল। ফলে এই চ্যানেলটি বেশীদিন চললো না। সেই সময়ে চাকুরীচ্যুত এই দক্ষ দলটির অধিকাংশই আল-জাজিরায় যোগ দেয়। এ দলের সবাই আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের; তবে বেশীরভাগই প্যালেস্টাইনের।
আমীর শেখ হামাদ সাংবিধানিকভাবেও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করেন। অবশেষে 1988 সালে তিনি তার দেশের তথ্য মন্ত্রনালয় বিলুপ্ত করে মত প্রকাশের সকল বাঁধা সরিয়ে ফেলেন। রা্রিীয় বেতার, টিভি, প্রেস এজেন্সি সবকিছুকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। তার এমন উদ্যোগ আমেরিকার জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দেয়। ওসামা বিন লাদেনের ভিডিও টেপ বার বার প্রচার করায় আমেরিকা আমীরের উপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে আল-জাজিরা বন্ধ করে দেয়ার জন্য। তখন আমীর তার অপারগতার কথা জানান। কারন সাংবিধানিকভাবে তিনি সে অধিকার রাখেন না। এর পরের ইতিহাস আমরা সবাই জানি; আমেরিকা আল-জাজিরা টিভি স্টেশন বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো। আল-জাজিরার সাংবাদিক হত্যা ও কাবুলে দপ্তরে বোমা মেরে তােেদর জব্দ করতে চেয়েছিলো।
1996 সালে অনুষ্ঠান প্রচারের শুরু থেকেই আল-জাজিরা মধ্যপ্রাচ্যে সমালোচিত হয়ে ওঠে। প্রচারিত বিভিন্ন টক-শো, প্রতিবেদন, সাক্ষাৎকার ও ইসলাম-ভিত্তিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে বিতর্কের সৃষ্টি করে। কারন, আরব দেশগুলো রাজা-বাদশার দেশ, স্বৈরতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্র শাসন-ব্যবস্থার মূল অংগ। আল-জাজিরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এমন সব আলোচনার সূত্রপাত করতে শুরু করেছিলো যে, এসব রাজা-বাদশারা আতংকিত হয়ে উঠল, অভিযোগ করতে লাগলো আল-জাজিরার বিরুদ্ধে; এমনকি কোনো কোনো দেশ আল-জাজিরার স্থানীয় অফিস বন্ধ করে দিতে শুরু করলো। কাতারের সাথে এসব দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেরও অবনতি ঘটতে শুরু করলো। মনে রাখতে হবে যে, আরব-দেশের টিভিতে রাজা-বাদশাহদের পরিবার আর তাদের কর্মকান্ডের খবর প্রচার নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। (আমাদের দেশ রাজার দেশ না-হলেও রাষ্ট্রিয় টিভিতে প্রধানমন্ত্রি আর বাকী মন্ত্রিদের খবরা-খবর প্রচার বাধ্যতামূলক, বাদ যায় না বেসরকারী স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোও, অসহনীয় হলেও সমপ্রচারিত হয় একযোগে মধ্যরাতের খবর যা মূল্যবান সময়ের অপচয় মাত্র। কে-না জানে সরকার অপচয় করতে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসে, যদি-না অপচয়ের পয়সা মন্ত্রিবর্গের নিজেদের পকেট থেকে আসে।) সেই প্রেক্ষাপটে আল-জাজিরা মরুদ্যানে একটি বৈপ্লবিক ঘটনা।
আল-জাজিরার যে অনুষ্ঠানটি সবচেয়ে বেশী বিতর্কের জন্ম দিয়েছে তা হলো ফয়সল আল-কাসিম উপস্থাপিত 'দা অপজিট ডিরেকশন'। তার অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ হলো তিনি সম্পূর্ণ বিপরীত মতালম্বি দুই জনকে আমন্ত্রন করেন; বেশীরভাগ ক্ষেত্রেইএকজন হলেন মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ থেকে নির্বাসিত ভিন্ন মতালম্বি ব্যক্তি, অন্যজন সেই দেশের সরকারের মূখপাত্র। সরাসরি প্রচারিত এই অনুষ্ঠানে বিতর্ক কখনও কখনও ভদ্্রতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আকস্মিক চিৎকার, ঝগড়া, এমন-কি ওয়াক-আউটের মত ঘটনা বিরল নয়। 1998 সালে প্রচারিত এক অনুষ্ঠানে এক মিসরীয় লেখক জর্ডানের প্রাক্তন বিদেশ-মন্ত্রিকে বলেন যে, ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি করতে জর্ডান আরব বিশ্বের তোয়াক্কা করেনি। বিষয়টি জর্ডানকে এত বিব্রত করেছিলো যে জর্ডানের তথ্য মন্ত্রনালয় ও তথ্য মন্ত্রিআম্মানে কর্মরত আল-জাজিরার অফিস বন্ধ করে দিলো, এবং আল-জাজিরা কর্তৃপক্ষকে ক্ষমা চাইতে হবে সে দাবী তুললো। আর এক অনুষ্ঠানে বহুগামিতা বিষয়ে জর্ডানের একজন নারীবাদীর সাথে বিতর্ককালে জনৈক মিসরীয় লেখক সেট ছেড়ে উঠে চলে যান। এ অনুষ্ঠানে এমন সব বিষয় আলোচিত ও বিতর্কিত হতে থাকলো যা আরব-বিশ্ব বিরল; ধর্মিয় লোকাচার ও বিশ্বাস নিয়ে উত্থাপিত হলো নানা প্রশ্ন। ইসলাম সামাজিক প্রগতির পথে বাঁধা কিনা, সৌদী বাদশাহ দুর্নিতিপরায়ন কিনা, হিজবুল্লাহ কি সন্ত্রাসী সংগঠন, আল্লার অস্তিত্ত্ব আছে কিনা, কোরান শরীফের সাথে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণা সঙ্গতিপূর্ণ কিনা - এসব বিষয়ে তুমুল বাক-বিতন্ডা হয়। অনুষ্ঠানে দর্শকরা সরাসরি ফোন করে প্রশ্ন করতে ও মতামত রাখতে পারে। একদিকে অনুষ্ঠানটি জনপ্রিয়তার শীর্ষে, অন্যদিকে আল-কাসিম একাধারে নিন্দিত ও নন্দিত হতে লাগলেন। তিনি অভিযুক্ত হলেন ইসলামের শত্রু হিসাবে, কমিউনিষ্ট হিসাবে, ইসরাইলের চর হিসাবে। আবার কেউ কেউ বললেন তিনি অসামপ্রদায়িক, আরব-জাতীয়তাবাদী। অন্যদিকে তিনি কয়েক সপ্তাহ অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালে আল-জাজিরার টেলিফোন সুইচ রুম মাত্রাতিরিক্ত কলে উপচে পড়ল। সবারই একই কথা, তারা আল-কাসিমকে অনুষ্ঠানে ফিরে পেতে চায়। আল-কাসিম ছাড়া এই অনুষ্ঠানটি যেন 'দা ওয়ান ডিরেকশন'।
তাহলে আমরা বুঝতে পারছি, মুক্ত ও স্বাধীনভাবে মতামত প্রদান ও মত- বিনিময়ে সাধারণ মানুষের আপত্তি নেই। সমাজে প্রত্যেক মানুষেরই বিভিন্ন বিষয়ে নিজ নিজ মত থাকে। সে মত সমাজের বিভিন্ন স্তরে স্বাধীনভাবে আত্মপ্রকাশের সূযোগ পেলে মানুষ বুঝতে পারে সে একা নয়, তারও ভাবনার সঙ্গী আছে। আর মত আদান-প্রদানের মানুষ ভিন্ন মতের প্রতি সহনশীল হতে শিখে, সমাজে ভিন্ন মতালম্বিদের প্রয়োজনিয়তা উপলব্ধি করতে পারে, এবং এ প্রক্রিয়া একটি সামাজিক শক্তি হয়ে ওঠে। একই সাথে সমাজ-রাষ্ট্র পরিচালিত হবার জন্য কিভাবে ঐক্যমতে পৌঁছাতে হয় তার চর্চা করতে উদবুদ্ধ হয়। রাজতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্রের ভয় এখানেই, তারা জনগোষ্ঠীকে একটি সামাজিক শক্তি হয়ে উঠতে দিতে চায় না। নিজেদের থলের বিড়াল যাতে বের-না হয়ে পড়ে তার জন্য তারা যা বলে বা বলতে চায় তা আমাদের শুনতে বাধ্য করে, তা আমাদের বিশ্বাস করতে বলে। সেজন্যই মত প্রকাশের ব্যাপারে এত কালা-কানুন, গণমাধ্যমের উপর এত নিয়ন্ত্রন। ফলে আমরা একটি সামাজিক শক্তি হয়ে উঠতে পারছি না, ভাঙ্গতে পারছি না এই শৃঙ্খল। এ অবস্থায় সমাজের সচেতন অংশের দায়িত্ব অনেক বেশী।
(মূল লেখাটি আপনারা পড়তে পারেন আমার বাংলা ওয়েব সাইট: হুমায়ুন-নামা ডট কম-এ।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

