somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যৌন শিক্ষা ও আমাদের ভ্রান্ত ধারণা

১৪ ই আগস্ট, ২০১৪ রাত ১০:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

“স্কুলে শিক্ষার্থীদের মাঝে যৌন সুড়সুড়ি বিষয়ক বই বিতরণ” এই শিরোনামে গত ২৩ শে জুলাই একটা সামাজিক নেটওয়ার্ক মাধ্যমে প্রকাশিত একটা লেখা আমার এক লেখক বন্ধু আমাকে শেয়ার করেন। লেখাটি পড়ে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম! লেখায় বইটির কার্যকরি বিষয়বস্তুগুলো নিঃসন্দেহে ফুঁটে উঠেছে নেতিবাচকভাবে। কারণ সেখানে কেবল কি উল্লেখ আছে তাই বলা আছে কিন্তু কেন বা এটা থাকার ইতিবাচক কারণ সম্পর্কে কোন উল্লেখ নেই। কাজেই প্রত্যক্ষভাবে না হলেও আমি বলব একটা পরোক্ষ নেতিবাচক প্রভাব এই লেখায় আছে।

যৌন শব্দটা আমাদের মধ্যবিত্ত মানুষদের মধ্যে এমনিতেই একটা নেতিবাচক আলোড়ন তৈরি করে। এর প্রথম এবং প্রধান কারণ হল বিষয়টি সম্পর্কে আমাদের ভ্রান্তধারনা। আমরা যৌন সম্পর্কিত বিষয় এর উল্লেখ হলেই মনে করি যৌন কার্যক্রম সংক্রান্ত বিষয়। কিন্তু এটা মটেই ঠিক নয়। যৌন শিক্ষা হল বিষয়ভিত্তিক নির্দেশনা যা কিনা মানুষের যৌনতার (human sexuality) সাথে সম্পর্কিত। এটা আরও আলোচনা করে সেক্সচুয়াল এনাটমি(sexual anatomy), প্রজননতন্ত্র(sexual reproduction), যৌন কার্যক্রম(sexual activity), প্রজনন স্বাস্থ্য(reproductive health),আবেগিক সম্পর্ক(emotional relations), প্রজনন সংক্রান্ত অধিকার ও দায়িত্ব(reproductive rights and responsibilities), যৌন সম্পর্ক তৈরি করা থেকে বিরত থাকা (abstinence) এবং জন্ম নিয়ন্ত্রন(birth control) নিয়ে। যৌন শিক্ষা আমরা সাধারণত পেয়ে থাকি আমাদের বাবা-মার কাছে থেকে। বাবা-মা ছাড়া আমাদের দেখা শোনার দায়িত্ব যাদের উপর বর্তায় তাদের কাছ থেকেও আমরা বিষয়টা সম্পর্কে জেনে থাকি। এছাড়াও বিদ্যালয়ের ফর্মাল প্রোগ্রাম বা পাবলিক হেলথ ক্যাম্পেইনও এ বিষয়ে জানাতে ভূমিকা রাখেন। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বয়ঃসন্ধিকালে এই ধরণের বিষয়ে আলোচনা করা হয় না। এই ধরণের বিষয়ভিত্তিক আলোচনা আসলে সামাজিক ট্যাবু। তবে আমাদের সামাজিক ব্যবস্থায় যৌন শিক্ষা দেবার দায়িত্ব বর্তায় আমাদের অভিভাবকদের উপর। তবে বেশিরভাগ অভিভাবকই তাদের সন্তানদের বিবাহের পুর্বে এই জাতীয় বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে মুখ খুলতে চান না। কাজেই এমনিতেই অভিভাবকদের মধ্যে একটা নেতিবাচক ধারণা আছে। এমন শিরোনামের খবরের প্রকাশ বাস্তবিকভাবেই তাদের মধ্যে একটা বড় রকমের আলোড়ন সৃষ্টি করবে বলা বাহুল্য।

লেখায় উল্লেখ আছে যে বইটির শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন অধ্যায়ে লেখা আছে, ‘…যখন একটি মেয়ে ১০-১২ বছর বয়সে পৌঁছে, তখন তার শারীরিক পরিবর্তন শুরু হয়।‘ বইতে পরিবর্তনের বেশ কিছু দিক তুলে ধরা হয়েছে। আসলে বয়ঃসন্ধিকালে এই ধরনের পরিবর্তনগুলো ঘটে। কিন্তু এই ধরনের পরিবর্তন যে স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটে এবং সেটা সকলের সাথেই, সেটা বয়ঃসন্ধিকালের সকল ছেলেমেয়ে জানে না এবং বুঝতেও পারে না। সে কারনে তাদের জানা প্রয়োজন। কারণ নিজের শরীর সম্পর্কে না জানলে পরবর্তীতে যে কোন শারীরিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে একটা দ্বিধা তৈরি হয়। একটা সংকোচও কাজ করে বটে। বইতে মেয়েদের ঋতুস্রাব এবং ছেলেদের স্বপ্নদোষ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এগুলোও স্বাভাবিক নিয়মে ঘটে। কিন্তু অভিভাবকবৃন্দ এমন পরিবর্তনের সঠিক কারণ এর ব্যাখ্যা তাদের ছেলেমেয়েদের দেন না এবং ছেলেমেয়েরাও এসব বিষয়ে কথা বলতে সংকোচবোধ করে। তারা মনে করে তাদের বড় রকমের একটা অসুখ হয়েছে। সেক্ষেত্রে কোন বইতে যদি এইসকল ঘটনার ব্যাখ্যা থাকে তাহলে আমি সেটাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখব। কারণ এটা ইন্টারনেটের যুগ। এযুগে অভিভাবক বা শিক্ষকরা তাদের ছেলেমেয়ে বা শিক্ষার্থীদের সাথে অনেক বিষয় উল্লেখ না করলেও তারা সেটা ইন্টারনেটের মাধ্যমে জেনে নেয়। যেটা কিনা তাদের মধ্যে বাড়তি কৌতূহল তৈরি করে। এবং বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকেও এই সকল বিষয়ে ভ্রান্ত ধারণা তারা পায়। এই ধরনের ঘটনাগুলো থেকে বের হয়ে আসতে গেলে আমি বলব আলোচনার দরকার আছে। এখন প্রশ্ন হল বইতে যেভাবে উল্লেখ আছে সেভাবেই কি আলোচনা হওয়া দরকার বা বইগুলো কি এভাবে অবাধে ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিতরণ করাটাই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল কিনা?

প্রথমত যৌন শিক্ষা ফরমালি হলে ভালো কিন্তু এ শিক্ষা ইনফরমালিও হতে পারে। বিশেষ করে অভিভাবক, বন্ধু বা কাছের কারও সাথে এই বিষয়ে কথা বলা যেতে পারে। বই পড়ে বা মিডিয়ার সাহায্য নিয়েও এই বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করা সম্ভব। আসলে বিষয়টি বেশ স্পর্শকাতর। কারণ এটা আসলে মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলে। কাজেই এ শিক্ষা যদি স্কুলগুলোতে ফরমালি শেখানো হয় তাহলে বিষয়টির সামাজিক গুরুত্ব বেড়ে যায় অনেকখানি। তবে বয়ঃসন্ধিকালে অবাঞ্ছিত প্রেগনেন্সি নিয়ে সরাসরি আলোচনা নেগেটিভ ইম্প্যাক্ট ফেলতে পারে। যা করা যতে পারে তা হল যৌন শিক্ষার ব্যাপারে অভিভাবকদের অংশগ্রহণে সতর্কতামূলক আলোচনা করা যেতে পারে। তবে বিষয়টি ফরমালি হোক বা ইনফরমালি হোক একটা সিলেবাস বা দিক নির্দেশনা তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে স্কুলে চাকুরিরত শিক্ষকদের জন্য। ব্যাপারটা যেহেতু স্পর্শ কাতর কাজেই সাবধানতার সাথে উত্থাপন না করলে মানুষের মধ্যে একটা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে। শিক্ষকদের জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে একটা সেমিনার বা বিষয়টি নিয়ে ছেলেমেয়েদের সাথে কথা বলার জন্য দিক নির্দেশনা স্বরূপ ট্রেনিং সেশন এর আয়োজন করতে পারলে ভালো হয়। মোদ্দা কথা হল যৌন শিক্ষার ইতিবাচক দিকটি সাধারণ মানুষের কাছে পৌছে দিতে গেলে একটা সিলেবাস বা দিক নির্দেশনা থাকতেই হবে। একই সাথে অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে এই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে গেলে বিষয় ভিত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠানও আয়োজন করার প্রয়োজন আছে। যাতে করে তাঁরা বয়ঃসন্ধিকালের এই সব ছেলেমেয়েদের সাথে যৌন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে খোলাখুলিভাবে আলোচনায় অংশ নিতে পারেন।

এবার যৌনশিক্ষা কেন প্রয়োজন তা নিয়ে একটা গল্প বলি। আমাদের দেশের এক স্কুল পড়ুয়া মেয়ে পড়ে ক্লাস সিক্সে। নিয়মিত স্কুলে আসে। ক্লাস করে। একদিন ক্লাসরুমে তার হঠাৎ মাথা ঘোরানো, বমি বমি ভাব। একটা দুটো ক্লাস করার পর আর ক্লাস করতেই পারেনি। মেয়েটির বাবা মাকে খবর দেয়া হয়। এরমধ্যে স্কুলের ডাক্তার পরীক্ষা করে জানালেন মেয়েটি প্রেগনেন্ট। বাবা মা স্বভাবিকভাবেই স্তম্ভিত। কি করে বা কার মাধ্যমে ঘটনাটি ঘটেছে তা গুরুত্বপুর্ণ নয়। আসল কথা হল ঘটনাটি ঘটেছে এবং যৌনশিক্ষা সম্পর্কে ধারণা থাকলে ঘটনাটি প্রেগনেন্সি পর্যন্ত যেতোই না! আপনারা হয়ত ভাবছেন আমি পরোক্ষভাবে যৌন সম্পর্ককে সাপোর্ট করছি। আসলে বয়ঃসন্ধিকালে নিজের শরীর সম্পর্কে কৌতূহল জাগাটা কোন নতুন ঘটনা নয়। এ সময়টাতে কৌতূহল বসত বিপরীত লিঙ্গের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের ভাবনাও স্বাভাবিক নিয়মে আসতে পারে। কারণ আমরা সমাজের সকল ছেলেমেয়েদের জন্য এখনও পর্যন্ত স্বাভাবিক শিক্ষা বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারিনি। উপরে যে মেয়েটির ঘটনা বললাম, সে মেয়েটি একমাত্র মেয়ে এবং বাবা মা উভয়েই ভালো চাকরি করেন। পারিবারিকভাবে নিঃসঙ্গ মেয়েটি তাই বিপথে পা বাড়িয়েছে। আমি একটা ভালো পরিবেশের কথা বললাম কিন্তু যারা ভালো পরিবেশ পায়না তাদের অবস্থা একবার ভাবুন। আসলে সমাজে ঘটমান সব সামাজিক অস্থিরতার সমাধান যৌনশিক্ষা হয়তবা নয়। তবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে এই ধরণের শিক্ষা যে টনিকের মত কাজ করবে আমি তার দাবীই করছি।

আসলে যৌন শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে সব থেকে গুরুত্বপুর্ণ কারণ হল মহামারী আকারে এইডস এর ছড়িয়ে পরা। আমরা আফ্রিকাতে এইডস এর প্রকোপ সম্পর্কে জানি। এসকল স্বাস্থ্যগত কারণে তাই যৌন শিক্ষার গুরুত্ব বেড়ে যায় অনেকখানি। প্ল্যানড প্যারেন্টহুড নামক এক আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে যৌন শিক্ষার একটা বৈশ্বিক গুরুত্ব আছে। তাদের মতে যৌন শিক্ষা বিশেষ করে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখে। এছাড়াও বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিরাজমান অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে আনতেও এ বয়সে যৌন শিক্ষার ভূমিকা অনন্য।

উত্তর-আমেরিকার স্কুলগুলোতে “সোশাল হাইজিন” সংক্রান্ত ধারণার প্রচলন হয় উনিশ শতকের শেষ দিকে এবং এরই ধারাবাহিকতায় শুরু হয় স্কুল-ভিত্তিক যৌন-শিক্ষা কার্যক্রম। কিন্তু এই অগ্রগতি সত্ত্বেও মধ্য-বিশ শতকের দিনগুলোতে বয়ঃসন্ধি এবং তার পরবর্তী সময়ে যৌনতা নিয়ে যে বয়সে আগ্রহ জন্মায়, সে সময়ে যৌনতা সংক্রান্ত খবরাখবর বন্ধু-বান্ধব ও সংবাদপত্র থেকেই আহরিত হতো, যার অধিকাংশই ছিল ভুল এবং সন্দেহযোগ্য। পশ্চিমা দেশগুলিতে ষাটের দশকে আশংকাজনকহারে টিনেজ প্রেগনেন্সি দেখা দিচ্ছিল এবং তখনই এই সংক্রান্ত শিক্ষার পদ্ধতিগত ত্রুটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া গিয়েছিল। এইধরনের অবাঞ্ছিত গর্ভাবস্থা দূর করার লক্ষ্যে যৌন-শিক্ষা সংক্রান্ত প্রোগ্রাম শুরু করা হয়, যদিও এর বিরুদ্ধে অভিভাবক ও ধর্মীয় সংগঠন থেকে ছিল জোরালো প্রতিরোধ। তা সত্ত্বেও যৌনশিক্ষা বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়তা লাগ করেছে। এর একটা বড় কারণ হিসেবে বলা যায়, বয়সন্ধিকালে মেয়েদের অকাল গর্ভ ধারণ। আমারিকাতে প্রতি ১০০০ জনের ভেতর ৯৩ জন এই ঘটনার শিকার হন। ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসে এই সংখ্যা ৬২.৬, কানাডাতে ৪২.৭ এবং বেলজিয়ামে ১৫.১। তবে এই অবস্থা নেদারল্যান্ডে কিছুটা ভালো। সেখানকার পরিসংখ্যান হল প্রতি হাজারে ৮.১।

সুদূর আফ্রিকাতে যৌন শিক্ষা শুরু হবার সবচেয়ে বড় কারণ হল এইডস এর প্রকোপ। ইজিপ্টে পাবলিক স্কুলগুলোতে মেয়েদের reproduction system, sexual organs, contraception এবং STD (sexual tranmitted disease) নিয়ে পড়ানো হয়। এই সকল ছেলেমেয়েদের বয়স ১২ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। থাইল্যান্ডে এই অবস্থা আরও একটু ভালো। প্রতিবারের কারিক্যুলাম রিভিশনের সাথে সাথে যৌন শিক্ষার বিষয়গুলো রিভিশন করা হয়। ১৯৩৮ সালে সর্বপ্রথম সেক্সুয়ালিটি এডুকেশন নিয়ে স্কুলসমূহে পরিচিতি করানো হয়, কিন্তু ১৯৭৮ সালের আগে স্কুলে যৌনশিক্ষা সম্পর্কে পাঠদান দেওয়া হয়নি। তখনকার দিনে একে বলা হতো “জীবন ও গার্হস্থ্য শিক্ষা”। এর বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য-সুরক্ষা, পরিচ্ছন্নত এবং প্রজননতন্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারনা। তবে সরকারী এবং বেসরকারী উদ্যোগে শিক্ষা কারিকুলাম কয়েকবার রিভাইস করা হয়েছে এবং বয়ঃসন্ধিকালে যৌনশিক্ষার প্রচলন সমস্যার সমাধান করবে বলে আশা করা হয়। ভারতে স্কুলশিক্ষায় এবং গণসচেতনতা বিষয়ক কার্যক্রমে এইডস সহ যৌনশিক্ষা বিষয়ক নানা বিষয় সম্পর্কে টেক্সট অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, মঙ্গোলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ায় স্কুলসমূহে যৌনশিক্ষা বিষয়ে পাঠ-অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত আলোচনা তাদের নিয়মিত নীতি-পর্যালোচনার অন্তর্ভুক্ত বিষয়। মালয়শিয়া ও থাইল্যান্ডে বয়ঃসন্ধির সময়ে দরকারী প্রজননস্বাস্থ্য সংক্রান্ত সাধারণ জ্ঞান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়ে এই সংক্রান্ত বিষয়বস্তু নিয়ে প্রশিক্ষণ, মোবাইল মেসেজ ও অন্যান্য মেটেরিয়াল তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ, মায়ানমার, নেপাল ও পাকিস্তানে যৌনশিক্ষা সংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাই নেই। জাপানে ১০/১১ বছর বয়স থেকে যৌনশিক্ষা আবশ্যক করা হয়েছে। চিন ও শ্রীলংকায় যৌনশিক্ষার অন্তর্ভুক্ত হলো জীববিজ্ঞান গ্রন্থের প্রজননতন্ত্র সংক্রান্ত অধায়গুলি পাঠ্যসূচিতে রাখা। শ্রীলংকায় এই পাঠ দেওয়া হয় যখন শিক্ষার্থীদের বয়স ১৭/১৮ বছর হয়। ফিনল্যান্ডে ছোট ক্লাসে বায়োলজির মানব শরীর সংক্রান্ত পাঠদান আবশ্যক করা হইয়েছে এবং উপরের দিকের ক্লাসে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ধারণা দেওয়া হয়। ফ্রান্সে স্কুলগুলোতে যৌনশিক্ষা দেওয়া শুরু হয়েছে ১৯৭৩ সাল থেকে। সেখানে ৩০ থেকে ৪০ ঘন্টা যৌনশিক্ষা দেওয়া হয়। জার্মানিতে এই শিক্ষাদান শুরু হয়েছে ১৯৭০ সাল থেকে এবং ১৯৯২ সাল থেকে এটা একটা সরকারী দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরের বৃদ্ধি কীভাবে হয়, প্রজননের জৈবনিক কর্মকাণ্ড, যৌন ক্রিয়াকাণ্ড, সমকামিতা, অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ, গর্ভপাত, যৌন হেনস্থা, শিশু নির্যাতন, এবং যৌন্তার মাধ্যমে সংক্রামিত রোগ সম্পর্কে ধারনা দেওয়া হয়।

আমাদের দেশে যৌন শিক্ষা এখনও সমাদৃত নয়। সামাজিকভাবে বিষয়টি নিয়ে ভাবনার প্রতিও তাই রয়ে গেছে একটা বড় রকমের বাঁধা। আমি একবার একটি ছেলের সাথে কথা বলছিলাম। ছেলেটি আমাকে জানাল যে সে পড়ত একটা কো-এডুকেশন স্কুলে। সেখানে ক্লাসে মানবদেহ চ্যাপ্টারটি পড়ানোর সময় শিক্ষকরা লজ্জায় লাল নীল হয়ে যেত। পরবর্তীতে ছেলেটি যখন কলেজে ওঠে তখন দেখা গেল একই মানবদেহ পড়ানোর সময় শিক্ষক পড়াচ্ছেন বেশ সাবলীলভাবে। দেখা গেল যে বিষয় উপস্থাপনের ভঙ্গি বদলে যাবার ফলে ছাত্রদের মধ্যে বিষয়টি সম্পর্কে গ্রহনযোগ্যতা অনেক বেড়ে যায়। তৈরি হয় একটা স্বচ্ছ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। এই গেল একটা ঘটনা। একটা ব্লগে যৌন শিক্ষা বিষয়ে একবার পড়েছিলাম যে, ১৪ বছরের একটা মেয়ে সুইসাইড করে অবাঞ্ছিত প্রেগ্নেন্সির কারণে। মেয়েটিকে তার প্রেমিক তার গর্ভধারনের বিষয়টি জানালে ছেলেটি মেয়েটির এই ব্যাপারটিকে মেনে নিতে অস্বীকার করে। যার ফল হল মেয়েটির আত্মহত্যা। এই ঘটনা ঘটার একটাই কারণ হল নীতিনির্ধারকদের যৌন শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে উদাসীনতা।

বাংলাদেশে টিনেজ প্রেগনেন্সির ঘটনাগুলো কিন্তু ঘটছে। বেশিরভাগ মেয়েই এই যন্ত্রণা থেকে রেহাই পায় সুইসাইড করে, অদক্ষ ডাক্তারদের সহায়তায় গর্ভপাত ঘটিয়ে। এই বিষয় সম্পর্কে আমাদের হাতে কোন পরিসংখ্যান নাই কারণ এই সকল ঘটনার বেশীরভাগই ঘটানো হয় সকলের অগোচরে। সামহোয়্যার ইন ব্লগে তারান্নুম সবনমের মাধ্যমে জানতে পারলাম একজন চিকিৎসক উল্লেখ করেছেন, বহু অবিবাহিত এবং বয়ঃসন্ধিকাল ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ের তার কাছে গর্ভপাত ঘটানোর কেস নিয়ে আসে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে এই সকল মেয়েদের বেশীরভাগই এই ধরণের ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে না বুঝে। কারণ যৌন শিক্ষা সম্পর্কে তাদের কোন ধারণা নাই। তিনি বলেন যে এই ধরণের ঘটনাগুলো থেকে রেহাই পেতে ছেলে এবং মেয়ে উভয়কেই যৌন শিক্ষা নিতে হবে।

তারান্নুম শবনমের লেখা থেকে আরও জানতে পারি যে একজন শিক্ষক বলেছেন যে আমরা ব্যাঙের প্রজনন চক্র সম্পর্কে জানি কিন্তু একজন মানুষ কি করে জন্ম নেয় তা জানি না। লেখক তারান্নুম শবনম নিজে উল্লেখ করেন যে অনেক সময় আমরা আমাদের যৌন চাহিদা মেটাতে পর্নোগ্রাফি দেখি কিন্তু এটা সমস্যা সমাধানের বদলে বরং সমস্যা তৈরি করে। আসলে পর্নোগ্রাফি দেখলে আমাদের মধ্যে একধরনের পুশুত্ব দেখা যায়, অস্থিরতা তৈরি হয়। যার ফল স্বরূপ আমরা সমাজে ধর্ষনের সংখ্যা বাড়তে দেখি। একজন মনোবিজ্ঞানীর মতে যৌন শিক্ষা সমাজে ধর্ষনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে পারে।

আমি আসলে ইনিয়ে বিনিয়ে যৌন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলতেই এই লেখাটি লিখিনি। এই লেখার সবচেয়ে বড় কারণ হল যৌন শিক্ষা না থাকলে কি হতে পারে সেটা সম্পর্কে জানানো। নিঃসন্দেহে আমাদের একটা সামাজিক বা ধর্মীয় বাঁধা আছে যার কারণে আমরা খোলামেলাভাবে অনেক কিছুই হয়তো প্রকাশ করতে পারি না। সেক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক এবং ধর্মীয় দিকের কথা মাথায় রেখেই বিষয়টির উল্লেখ করলে সকলেই ইতিবাচকভাবে বিষয়টা মেনে নেবেন বলে আশা করি। আমি সিলেবাসের কথা আগেই বলেছি। এ ছাড়াও যেটা করতে হবে বা করা উচিৎ সেটা হল আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এই ধরনের কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করার আগে অবশ্যই অভিভাবকদের সাথে কথা বলে এই আলোচনার ইতিবাচক দিকটি নানা সামাজিক ঘটনার মাধ্যমে উল্লেখ করলে ভালো। তবে এই ধরনের বই যৌন সুড়সুড়ি দেবে তা আমি মনে করি না। তবে এই ধরণের বইতে কোন সামাজিক সাবধানতামূলক ঘটনার উল্লেখ থাকলে ভালো হয়। সরাসরি অনেক কথা না বলে হয়তো সামাজিক ঘটনার মাধ্যমে বোঝানো সম্ভব। তবে যে কোনভাবেই হোক এই বিষয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। আমি বলব যারাই এই কাজটির সাথে জড়িত আমাদের সামাজিক ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে তারা একটা সাহসী পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে নিয়েছেন। আমি বলব আপনারা এগিয়ে যান তবে অবিভাবকদের কথা অবশ্যই মাথায় রাখুন। তাদের সাথে আগে কথা বলুন। তাদের মধ্যকার ভ্রান্তধারনা দূর করুন এবং সর্বোপরি আরও সাধারণভাবে ঘটনার মাধ্যমে বিষয়গুলোর উল্লেখ করুন। সবচেয়ে ভালো হয় যদি এই জানার পেছনের কারণগুলো তাদের সামনে তুলে ধরা হয়।

সময়ের সাথে সামাজিক পরিবর্তন কাম্য। এটা আসবেই। ভুলে গেলে চলবে না এটা ডিজিটাল যুগ। এ যুগে আপনার সন্তানরা লুকিয়ে ইন্টারনেট ব্যাবহার করে জানলে মনে রাখবেন যে কোন অহেতুক কৌতূহল কিছু সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেবেই। ইভটিজিং বাড়বে এবং সেই সাথে বাড়বে ধর্ষন। সামাজিক অবস্থার কথা মাথায় রেখেই তাই আমরা আমাদের সময়ের সাথে এগিয়ে চলব এবং এটাই হোক আমাদের সকলের লক্ষ্য।

ফারহানা মান্নান: শিক্ষক, গবেষক ও লেখক


সূত্র : জুম বাংলা ডটকম, যৌন শিক্ষা ও আমাদের ভ্রান্ত ধারণা
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ সকাল ১০:২২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোথায় পাই পাগলের শ্বশুর

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৪৮


পাগলের পাতা ছাগলে খায়,
দাঁতের দোষটা হাতেই যে কয়;
দেয় রে দোষটা দেয় চোখের,
মনটা যে ধোয়া তুলসীপাতা,
কেউ দেখে না রে মুখের।

মুখের কথা ঠোঁটে কয়,
ছাগল ডাকে রে ভাই, ব্যাঁ-ব্যাঁ;
পাগলের কাজ পাগল করে সই,
সাধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×