বহুদিন যাবৎ শুনে আসছি বাংলা চলচ্চিত্র, নাটক ইত্যাদির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। আগের মত লোকে হল-বিমুখ নয়, রুচিশীল দর্শকরা এখন টিকেট কেটে ছবি দেখছে, এক সময়ে যে অশ্লীলতায় সয়লাভ হয়ে গিয়েছিল, তা এখন আর নেই।
কিন্তু আদপেই কোন পরিবর্তন হয়েছে কি? নাকি বরং পুরোনো জিনিসেরই ভিন্ন রকম প্রতিচ্ছবি? ঘুরে ফিরে তো সব একই প্যাটার্নের কাহিনীই আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে। হয় সিনেমার শেষে নায়ক প্রতিশোধ নিবে, অথবা ভিলেন নায়িকা বা তার আত্নীয় কাউকে ধরে নিয়ে যাবে এবং নায়ক তাদের উদ্ধার করবে। শেষে যদি পুলিশ নাও আসে তবু সেটা ভিন্ন গল্প হবে না, কখনই না।
কিছু কিছু সিনেমা যে ভালো হচ্ছে না তা না। এমন আগেও ছিল, এখনো আছে। সে যুগে "মাটির ময়না", "নিরন্তর" এসব ছবিও তো তৈরি হত সেকালে!
এখন প্রশ্ন হল উন্নতি বলতে আমরা কি বুঝি? কেউ যদি ভাবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, এনিমেটেড অ্যাকশন, ডিজিটাল ক্যামেরা এগুলো সব উন্নতির লক্ষণ তাহলে আমার বলার কিছু নেই।
অ্যাকশন-ধর্মী চলচ্চিত্রকে আমারা খুব গুরুত্ব দিচ্ছি। অথচ ভেবে দেখেন দেখি বিশ্বের কয়টা অ্যাকশন ফিল্ম কিংবা কমেডী মুভি অস্কার কিংবা কান চলচ্চিত্র অথবা এ ধরণের কোন আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাচ্ছে? রেটিং-ই বা পাচ্ছে কি রকম? এই রেটিং তো আমার আপনার মত লোকেরাই দিচ্ছি তাই না?
গতকাল দেখলাম একটা নাটক পুরোটাই সবুজ রঙের। সাধারণত বিশেষ কোন ক্ষেত্রে অথবা অতীতের দৃশ্য দেখালে কামেরার মুড পরিবর্তন করা হয়ে থাকে। কিন্তু ইদানিং লাখ টাকার ক্যামেরা দিয়ে নির্মাতারা যা করছে তাকে প্রযুক্তির অপব্যাবহার বলে মনে হয় আমার কাছে। একটা ভালো ছবির জন্য এত রং-বেরঙ্গের ক্যারিক্যাচারের আদৌ কোন প্রয়োজন আছে কি?
২০১৩ সালে অস্কারে মনোনিত হওয়া "নেব্রাস্কা" ছবিটি ছিল সাদাকালো। কান ফিল্ম ফেস্টিবাল ও গোল্ডেন গ্লোভ পুরস্কার পাওয়া জার্মান ছবি "হোয়াইট রিবন (২০০৯)"ও ছিল সাদাকালো। ২০১১ সালের ফরাসী ছবি "দ্য আর্টিস্ট" তো আরেক কাঠি সরেস, ওটা ছিল নির্বাক ছবি।
সিনেমা-নাটকের প্রয়োজনে ভিএফএক্স ব্যবহার হয়ে আসছে বহুদিন থেকেই। দামী সফটওয়্যার দিয়ে, ফটোশপের ঝামা ঘষে যা বানানো হচ্ছে তার বেশিরভাগই অপ্রয়োজনীয়। নায়কের দিকে বুলেট এগিয়ে যাচ্ছে আর নায়ক সময়মত সরে পরছে, এ জাতীয় বস্তু আর কত খাওয়ান হবে? অথচ সফটওয়্যারের সাহায্য ছাড়াও কিন্তু ভিএফএক্স বানানো যায়।
কম্পিউটার গ্রাফিক্স করে যে দৃশ্য তৈরি করা হয় তাতে এতটাই খুত থাকে যে সামান্য একটা লোকেও বুঝবে যে এটা ভুয়া। নাটকে হেলিকপ্টার দেখাবে, সেটাও কাঁচাহাতের ফটোশপ দিয়ে। যদি দর্শক বুঝেই ফেলে সবকিছু, তবে এটা বানানোর দরকার কি? এগুলো না হলে কি ছবি হবে না?
বাংলা নাটকের ক্ষেত্রে আমরা দেখি পুরোটাই উদ্দেশ্যহীন সংলাপে পরিপূর্ণ। একটা বক্তব্য উপস্থাপন করতে গেলে অযথাই বাড়তি পাঁচ-দশটা সংলাপ ডুকানো হচ্ছে। কেন? একমাত্র কারণ হতে পারে নাট্যকার আর তেমন কিছু যোগ করতে পারছেন না কাহিনীতে, তাই সময়ক্ষেপণ করছেন। এমনই দৈন্যদশা তাদের।
একবার এক নাটক চোখে পরেছিল যেটা মূলত একটা শর্টফিল্ম (সম্ভবত তুর্কি) এর নকল। মূল ফিল্মটি ছিল পাঁচ মিনিটের আর নাটক প্রায় এক ঘন্টার!!
তরুন গায়ক ও নাটক নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমনকেও দেখি নাটকের মাধ্যমে তার কিছু কিছু গান দর্শকদের শুনিয়ে ছাড়ছে। তাও ভালো, লোকে কিছু গান শুনে কিছুটা বিনোদিত হতে পারে, নাটকের কাহিনী বুঝুক আর মাথার উপর দিয়েই যাক।
কিন্তু অনেক নাটকের মাঝখানেই সস্তা গান ডুকিয়ে প্রায় দশ-বিশ ভাগ সময় খেয়ে দেয়া হচ্ছে। এমন দৈন্যতা কত দেখব?
সব মিলিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র এবং নাটকের ভবিষ্যৎ হতাশ না হয়ে পারছি না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



