একবার অনামিকার প্লেটের দিকে, একবার নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়েই ছোটখাটো একটা চিৎকার দিয়েছিল হাসান।
'আমার রান কই?'
'দুপুরে না খাইসিস। একটা মুরগীর কয়টা রান হয়?'
'ওওতো খাইসিল'
হাসান অনামিকাকে দেখিয়ে মায়ের যুক্তি খন্ডন করে।
এবার মা আর কোন রিস্ক নেন না। আগের অনেকবারের মত যথারীতি পিন খুলে গ্রেনেডের মত বয়সের দোহাই ছুঁড়ে মারেন।
'ওতো ছোট। তোরে যেটা দিসি ঐটাও ভালো।'
হাসানের দুঃখ তাতে কমে না। সে অনামিকার দিকে যতটুকু অগ্নিদৃষ্টি না হানলেই না, ততটুকু হেনে ভাত মাখাতে শুরু করে। ওর যে অনেক দুঃখ তাও না। মুরগী ব্যাপারটাইতো বেশ চমৎকার একটা ব্যাপার। সে আলুগুলোর মাঝখানে আঙ্গুল দিয়ে কায়দা করে দুইভাগ করে ফেলে। আলুর ফাটলের মাঝখান দিয়ে ঝাল ধোঁয়া উঠছে।
মধ্যবিত্তের মাঝারি সাইজের জীবনে মুরগীর একটা ভালো ভূমিকা আছে। সপ্তাহের-দুই সপ্তাহের একটাদিন, যেদিন মুরগীর মাংস রান্না হয়, ছোটরা বেশ উত্তেজিত থাকে। খেতে বসেও উত্তেজনা। মুরগীর রানের বিলিব্যবস্থা ঠিকমত হবেতো। আমি পাবোতো।
পৃথিবীর সব শিশুরা পৃথিবীর সব মুরগীর রানের বৈধ মালিক।
অধিকাংশ সময়ই মুরগী রান্নার দিনটা শুক্রবার হয়। এসময় বাবারা সকাল থেকে আয়েশ করেন। আর দুপুরে খেতে বসে বাচ্চাদের মুখ দেখে আরো একসপ্তাহ বাঁচার ব্যাটারিতে চার্জ করে নেন। তবে শিশুদের আনন্দটা ভিন্ন ছিল। এটা মুরগীর মাংস খেতে পারার অতটা না। তারচেয়ে বাবা-মা'র সবকিছু খাইয়ে দেয়া কর্মসূচীর হাত থেকে বাঁচার আনন্দের জন্য। বিস্বাদ খাবারের হাত থেকে মুক্তির আনন্দ।
'আর কিছু নিবেন?'
ওয়েটারের এই তুমুল প্রশ্নে হাসান অতীতের ঘোড়া থেকে হোটেলের ভাতের প্লেটে এসে পড়ল। সে মাথা নাড়ে। আর কিছু লাগবে না।
এখন হাসান ইচ্ছা করলেই সপ্তাহে কয়েকবার মুরগী খেতে পারে। বাবা-মা জোর করে সবজী খাওয়াতে পারবে না। তারা সব অধিকার নিয়ে চলে গেছেন অন্ধকারে। চাইলেই নাম পালটে লেগপিস হয়ে যাওয়া রান পাওয়া যায়। অনামিকা এখন আর সেটার জন্য বায়না ধরে না। বাসায় গেলে হাসানের প্লেটে নিজেই সবার আগে মুরগীর রানটা তুলে দেয়। তবু তা নিয়ে হাসান কোন উত্তেজনায় ভোগে না। এটা এখন আর ছেলেবেলার ফ্যান্টাসি নেই, খাবারের আর দশটা আইটেমের মত শুধুই একটা কেমন জানি ব্যাপার হয়ে গেছে।
তাই মুরগীর মাংস সামনে নিয়ে হাসান হঠাৎই কেমন একটা বিপন্নতা অনুভব করে। পৃথিবীর আকাশে সব ভালোবাসারা কালো হয়ে লেপ্টে গিয়ে সন্ধ্যা ডেকে আনছে।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা এপ্রিল, ২০১৬ দুপুর ১২:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



