জাতীয় এবং আনর্্তজাতিক পরিবেশবাদীদের সকল বক্তব্যকে উপেক্ষা করে অবশেষে ভারত মনিপুরের চুরাচান্দপুরে বরাক নদীর উপর টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছে। গতকাল বুধবার থেকে বিশাল এ কর্মযজ্ঞের জন্য দরপত্র বিক্রি শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের সিলেট সীমান্তবতর্ী এ এলাকায় 78 মাসের মধ্যে এই বাঁধ এবং জলবিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। বাংলাদেশ বার বার প্রতিবাদ জানালেও এ বাঁধ নির্মাণ প্রশ্নে ভারত এখনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানায়নি।
ভারতের আসাম রাজ্যের নর্থ ইস্টার্ন ইলেক্ট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন লিমিটেড (ভারতীয় সরকারী প্রতিষ্ঠান) তাদের ওয়েব সাইটে টিপাইমুখ জলবিদু্যৎ কেন্দ্র ও বাঁধ নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করেছে। গতকাল 1লা ফেব্রুয়ারী থেকে ঐ কোম্পানি আনর্্তজাতিক দরপত্র বিক্রি শুরু করেছে। আগামী 15 ফেব্রুয়ারী দরপত্র বিক্রির শেষ দিন। 3রা এপ্রিল দরপত্র জমা নেয়া হবে এবং ঐদিনই দরপত্র খোলা হবে। ভারতীয় বিদু্যৎ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত নিপকো তাদের দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, টিপাইমুখ জলবিদু্যৎ কেন্দ্র নির্মাণ বহুমুখী প্রকল্পের আওতায় এখানে প্রতিটি 250 মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন মোট 6টি ইউনিট অর্থাৎ 1500 মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদু্যৎ কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।
ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রক্রিউরমেন্ট এবং কনস্ট্রাকশন (ইপিসি) নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের জন্য দরপত্র আহ্বান বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এ কাজের জন্য আর্নেস্ট মানি হবে 50 কোটি রুপি। টার্ন কী ভিত্তিতে এই বিদু্রৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। নিপকোর ঘোষণা মতে, 5 বছরে ঐ প্রতিষ্ঠান 10 বিলিয়ন রুপি আয় করতে পারবে। ইপিসি প্রতিষ্ঠান এই কাজের জন্য কনসোর্টিয়াম গঠন করতে পারবে। 78 মাস বা 6 বছর 5 মাসের মধ্যে এই জল বিদু্যৎ কেন্দ্র নির্মাণ সম্পন্ন করতে হবে।
পরিকল্পনার আওতায় 1500 মেগাওয়াট ক্ষমতার এ জল বিদু্যৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য বাঁধ, স্পিলওয়ে ট্যানেল, বিদু্যৎ ট্যানল, জলকপাট নির্মাণ করা হবে। বিদু্যৎ কেন্দ্রে পানি আনার জন্য 1 কিলোমিটার দীর্ঘ 7 মিটার ব্যাসের যে ট্যানেল নির্মাণ করা হবে, তা দিয়ে 7 হাজার কিউবিক মিটার পানি সরবরাহ করা হবে। যে বাঁধটি সেখানে নির্মাণ করা হবে তা হবে পাথরের তৈরী। তাই সেই পাথরও খননের মাধ্যমে সংগ্রহ করবে ইপিসি কোম্পানি। ইপিসি কোম্পানি এ বাঁধ ও বিদু্যৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ঋণের যোগাড় করবে। ঐ দরপত্রে এ কাজের জন্য 6টি উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানেরও তালিকা দিয়েছে নিপকো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, ভারত এবং ফ্রান্সের ডিজাইন প্রতিষ্ঠান বাঁধ নির্মাণে পরামর্শ দেবে।
বাংলাদেশের সরকারী সূত্রগুলো জানিয়েছে, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে তারা কিছুই জানে না। ভারতকে যখনি এ বিষয়ে বলা হচ্ছে, তখনি তারা বলেছে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি কেবল চিন্তাধারার মধ্যে রয়েছে। ভারতীয় সাবেক পানি সম্পদ মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাশ মুন্সি বলেছিলেন, তারা এই বাঁধ নির্মাণ করতে উদ্যোগ নিলে, তা বাংলাদেশকে জানাবে। আর তারা এই বাঁধ নির্মাণের জন্য কোন উদ্যোগই নেয়নি। তাছাড়া প্রতিবেশী দেশের কোন অসুবিধা হয়, এমন কোন পরিকল্পনা তারা গ্রহণ করবে না। কিন্তু এ কথার আর সত্যতা থাকলো না।
জানা গেছে, নিপকো সোয়া 5 হাজার কোটি ভারতীয় রুপিরও বেশী অর্থ ব্যয়ে এই ব্যারেজ-কাম-বাঁধ নির্মিত হলে বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চল পুরোপুরি মরুভূমিতে পরিণত হবে, শুকিয়ে যাবে প্রধান নদী মেঘনা এবং আঞ্চলিক নদী সুরমা ও কুশিয়ারা।
বেশ কয়েক বছর ধরে ভারত এই বাঁধ নির্মাণের জন্য বিভিন্ন প্রস্তুতি সম্পন্ন করে, দরপত্র আহ্বান তার শেষ পদক্ষেপ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এর আগে ভারতের নর্থ-ইষ্টার্ন ইলেক্ট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন বা নিপকো এই বৃহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যেই সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে অনুমোদন আদায় করে। কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ পরিদফতর থেকে এই প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য সকল অনুমোদন দিয়ে দেয়া হয়েছে। জানানো হয়েছে, এটি নির্মাণে ব্যয় হবে 5 হাজার 163 কোটি টাকা। প্রতিটি আড়াইশ' মেগাওয়াট ক্ষমতার 6টি ইউনিট অর্থাৎ 1500 মেগাওয়াট ৰমতাসম্পন্ন একটি জলবিদু্যৎ কেন্দ্র ছাড়াও এই বাঁধ এলাকায় বন্যা ব্যবস্থাপনা, নদীর নাব্যতা রক্ষা, সেচ সুবিধাসহ আনুষ্ঠানিক আরও নানা অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
জানা গেছে, এই জলবিদু্যৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে গত 2004 সালের জুলাই মাসে ভারতের কেন্দ্রীয় বিদু্যৎ পরিদফতর অনুমোদন দিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর এসসি শর্মা সাংবাদিকদের কাছে বেশ কিছুদিন আগে জানিয়েছেন, তাদের এই এলাকায় 2012 সালের মধ্যে সবার কাছে বিদু্যৎ পেঁৗছে দেবার জন্য এই বাঁধ ও বিদু্যৎ কেন্দ্র নির্মাণ জরুরি।
জানা গেছে, এই বাঁধ নির্মিত হলে কেবল বাংলাদেশের পরিবেশেরই ক্ষতি হবে তাই নয়, মনিপুর এবং মেঘালয়ের সীমান্তবতর্ী এবং বরাক ও তুভাই নদী লাগোয়া অধিবাসীরাও মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। এই প্রকল্পের সরাসরি শিকার হবে বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল। টিপাইমুখ এলাকার বাঁধের কারণে বাংলাদেশের অন্যতম প্রদান নদী মেঘনায় পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবে। শুকিয়ে যাবে সুরমা ও কুশিয়ারা নদী। এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ঐ অঞ্চলের 275 দশমিক 5 বর্গ-কিলোমিটার এলাকা নদীর পানি না থাকায় মারাত্মক পানিশূন্য এলাকায় রূপ নেবে। সুন্দর শ্যামলিমা সিলেট হয়ে উঠবে মরুভূমি। এখানে বইবে লু বাতাস। ফসলের ক্ষেতে উৎপাদন যাবে শেষ হয়ে।
ঃঃ দৈনিক ইত্তেফাক ঃ 02.02.2006 ঃঃ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


