সরকার ঘোষিত তেইশ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম কালা জাহাঙ্গীরসহ চারজন তাদের পাঁচ সঙ্গীকে নিয়ে ভারতের কলকাতায় অবস্থান করছে। এই ন'জনকে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাইয়ে দেয়া ও ভোটার করার নেপথ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এক সিপিএম নেতার হাত। সন্ত্রাসীরা ঢাকা থেকে তাদের 20 জন সঙ্গীকে সীমানত্দ পথে কলকাতায় নিয়ে গেছে। এরা পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার অফিসের কাছাকাছি একটি বাড়িতে নিয়মিত আড্ডা দেয়াসহ ঢাকার ব্যাপারে বৈঠক করে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ঢাকা থেকে নিয়মিত কলকাতায় যোগাযোগ রৰা করে চলেছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের 'এল' এবং 'ডি' আদ্যাৰরের দু'জন। অপরদিকে মিরপুরের সিরিয়াল কিলার দুর্ধর্ষ শাহাদত রয়েছে ত্রিপুরার আগরতলায়। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে দেয়া অথবা তাদের বিরম্নদ্ধে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কিংবা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে ঢাকার গোয়েন্দারা এমনটি আশা করছে না।
গত মাসে ঢাকা থেকে গোয়েন্দাদের একাধিক সোর্স কলকাতা ও আগরতলায় গিয়ে গোপনে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে বিসত্দারিত তথ্য সংগ্রহ করেছে। ভারতে তারা কিভাবে অবস্থান করছে এবং যাবতীয় খরচের ব্যাপারে পাওয়া গেছে নতুন তথ্য। সূত্র জানায়, বাংলাদেশের সীমানত্দবর্তী পশ্চিমবঙ্গের উত্তর 24 পরগনা জেলার বনগাঁ মহকুমায় সন্ত্রাসীদের রয়েছে অবাধ বিচরণ। ঢাকার মিন্টু পোদ্দার এক সময় পরিবার নিয়ে কলকাতায় চলে যায়। সেখানকার নাগরিকত্ব নিয়ে পরিবারসহ বসবাস করছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা সীমানত্দ পথে পালিয়ে কলকাতায় যাওয়ার পর মিন্টু পোদ্দারের সঙ্গে দেখা করে। মিন্টুই তাদেরকে নিয়ে যায় উত্তর 24 পরগনা জেলার সিপিএম নেতা অজয় চক্রবর্তীর নিকট।
একদিকে মিন্টু পোদ্দার এবং অপরদিকে সিপিএম নেতা অজয় চক্রবর্তী। এদের জন্যে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কলকাতা থেকে তাদের বহিষ্কার কিংবা জোর করে বাংলাদেশে পুশব্যাক করার কোন আশংকা না থাকায় সেখানে বসেই নিয়ন্ত্রণ করা শুরম্ন করে ঢাকার চাঁদাবাজি। সূত্র আরো জানায়, মিন্টু পোদ্দারই প্রত্যেকের নামে ভারতীয় পাসপোর্ট তৈরী করে দিয়েছে। পাসপোর্ট তৈরীর কাজটি করেছে 47, ভাংগোর এভিনিউ, বক-বি, নিনজা এ্যাপার্টমেন্ট, কলকাতা-700055 ঠিকানার এভিয়া ট্রাভেল। এর আগে সিপিএম নেতা অজয় চক্রবর্তীর মাধ্যমে প্রত্যেকের নাম ভোটার তালিকায় উঠানো হয়। ভোটার তালিকায় নাম থাকার ফলে পাসপোর্ট পেতে তাদের কাউকেই বেগ পেতে হয়নি।
ঢাকার গোয়েন্দা সূত্রে বলা হয়, চার শীর্ষ সন্ত্রাসী যারা তাদের পাঁচ সঙ্গীকে নিয়ে কলকাতায় অবস্থান করছে, তারা হচ্ছে কালা জাহাঙ্গীর, তানভীরম্নল ইসলাম জয়, জিসান আহমেদ, পুরনো ঢাকার ওমর ফারম্নক কচি, মিরপুরের পিয়াল, কালা সেলিম, আবু হায়দার বাবু, তাজ ও বগুড়ার মিলন। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, কালা জাহাঙ্গীর বর্তমানে আর কালো নয়। তার গায়ের রং নাকি উজ্জ্বল ফর্সা। কালা জাহাঙ্গীর তার পরিবারের লোকজনের মাধ্যমে রাজধানীর মহাখালী এলাকায় সঙ্গীদের হাতে নিহত হওয়ার খবর প্রচার করে। বাসত্দবতা হচ্ছে, সে অপর সঙ্গীদের নিয়ে কলকতায় সিন্ডিকেট তৈরী করে চলাফেরা করছে। কালা জাহাঙ্গীর ও তানভীরম্নল ইসলাম জয় ভারতীয় টাটা কোম্পানির তৈরী সবচেয়ে দামি জীপ ব্যবহার করে নিয়মিত কলকাতা-বনগাঁ যাতায়াত করে। কলকাতার নিউ মার্কেটে সিন্ডিকেটের রয়েছে সিমি ফ্যাশন নামে একটি শাড়ীর দোকান ও জুয়েলারীর ব্যবসা।
উত্তর 24 পরগনা জেলার বনগাঁও মহকুমা সদরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার অফিসের বিপরীতে চারতলা বাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাত শহীদ বসবাস করে। আর এই বাড়িতেই শীর্ষ সন্ত্রাসীরা প্রতি সপ্তাহে নিজেদের মধ্যে বৈঠকে মিলিত হয়। সূত্র জানায়, কলকাতাসহ আশেপাশে চালানোর জন্যে তারা 20টি ট্যাক্সিক্যাব কিনেছে। আর ট্যাক্সিক্যাব চালানোর জন্যে তাদেরই গ্রম্নপের ক্যাডারদের ঢাকা থেকে নিয়ে গেছে। এদের বয়স 18 থেকে 25 বছরের মধ্যে। ঢাকায় কোন কিলিং মিশন চালাতে হলে 5/6 জন ক্যাডারকে তারা পাঠিয়ে দেয়। এসব ক্যাডাররা গোপনে ঢাকায় এসে এখানকার চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এরপর মিশন শেষে সীমানত্দ পথে কলকাতায় পালিয়ে যায়। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ক্যাডাররা ঢাকায় 'এল' ও 'ডি' আদ্যাৰর নামের লোকের আশ্রয়ে অবস্থান করে। 'এল' ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মোহাম্মদ মহসীন হলের নিহত জিন্নার প্রতিপৰ। 'এল' এক সময় শীর্ষ সন্ত্রাসী টোকাই সাগরের বাসায় কাজ করত। তার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়। রাজধানীতে আত্মগোপনে থাকলেও তার হয়ে পুরনো ঢাকার সোয়ারীঘাটে মাছের আড়তে ব্যবসা পরিচালনা করছে তারই লোকজন। কলকাতায় অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হয়ে ঢাকায় নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে 'এল' ও 'ডি' নামের দু'জন।
রাজধানীর একাধিক মার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানান, কলকাতা থেকে কাপড়সহ অন্যান্য মালামাল নিয়ে আসার সময় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সিন্ডিকেটকে পার্সেন্টেজ দিতে হয়। ব্যবসায়ীরা এখন আর নিজেরা কলকাতায় যাওয়ার পরিবর্তে তাদের মনোনীত লোক পাঠিয়ে দিলে কাপড়সহ অন্যান্য মালামাল ঢাকায় চলে আসে। এদিকে মিরপুরের কয়েকজন ব্যবসায়ী হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসী শাহাদত বর্তমানে ত্রিপুরার আগরতলায় অবস্থান করছে। রাজধানীর চাঁদাবাজির একটি অংশ চলে যায় শাহাদতের হাতে। আর অপর অংশ যায় কলকাতায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সিন্ডিকেটের নিকট। বর্তমানে রাজধানীতে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে শাহাবুদ্দিন, মজিদ, আসলাম, চান্দু করিমসহ কয়েকজন। অবশ্য পুলিশ বলছে, এসব চাঁদাবাজরা আত্মগোপনে থেকে চাঁদাবাজি করছে।
ঃঃ দৈনিক ইত্তেফাক ঃ 07.08.2006 ঃঃ
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



