চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাংলাদেশ সীমান্তের দেড় কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা বাংলাদেশ রাইফেলস-এর (বিডিআর) দুই সদস্যকে গুলি করে হত্যা করেছে। বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরে পদ্মা নদীতে বিডিআর সদস্যরা নদীতে নৌকায় টহল দেয়ার সময় বিএসএফ অতর্কিত হামলা চালিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। নিহত দুই বিডিআর সদস্য হলেন-বগুড়ার গাবতলী উপজেলার হাবিলদার হান্নান সরকার (৫৩) ও মাগুড়ার শালিকা উপজেলার ল্যান্সনায়েক কৃষ্ণপদ দাস (৩২)। ঘটনার পর বিডিআর ও বিএসএফ’র মধ্যে প্রায় ৩০ মিনিটি গুলিবিনিময় হয়। এ ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ সব সীমান্তে সতর্কাবস্থা জারি করে।
এ ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বিডিআর সদর দফতর। ঘটনার প্রেক্ষিতে সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাসুমপুর সীমান্তে ১৬৮/৮ সাব পিলার সংলগ্ন এলাকায়। বৈঠকে বিডিআর-এর পক্ষে নেতৃত্ব দেন বিডিআর-এর রাজশাহী সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোঃ ইকবাল। শুক্রবার দুপুর দুইটা ১০ মিনিট থেকে শুরু হয়ে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত এ বৈঠক চলে। এদিকে বিডিআর সদর দফতরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ঘটনাকে উস্কানিমূলক ও ভারতের আগ্রাসী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ বলে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে বৃহস্পতিবারের এ ঘটনাকে ‘মারাত্মক ঘটনা’ হিসাবে অভিহিত করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী। ঘটনার পুরো বিবরণ পাওয়ার পর নয়াদিল্লির কাছে প্রতিবাদ জানানো হবে বলে বার্তা সংস্থা বিডিনিউজকে জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘটনার তদন্ত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রতিবেদন দেবে।
বৃহস্পতিবার রাত বারোটায় বিডিআর বাংলাদেশের সীমান্তের দেড় কিলোমিটার ভেতরে পদ্মা নদীতে টহল দেয়ার সময় হঠাৎ করেই ভারতীয় একটি স্পিড বোট এবং একটি ইঞ্জিন চালিত নৌকা দেখতে পায়। ভারতীয় একটি টহল নৌকা ও স্পিড বোট মুর্শিদাবাদ জেলার ১০৮ বিএসএফ নিমতিতা সীমান্ত ফাঁড়ি থেকে আসছিল। টহল কমান্ডার হাবিলদার হান্নান সরকারের নেতৃত্বে বিডিআর-এর চার সদস্যের দলটি বিএসএফকে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চ্যালেঞ্জ করে। নিয়মানুসারে সাড়া না দিয়ে বরং উল্টো বিডিআর-এর ওপর গুলি চালায় বিএসএফ। ফলে সঙ্গে সঙ্গেই হাবিলদার হান্নান সরকার এবং ল্যান্সনায়েক কৃষ্ণপদ দাসের মৃত্যু হয়। জানা যায়, কৃষ্ণপদ মাত্র ১০ দিন আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিডিআর-এ যোগ দিয়েছিলেন।
বিডিআর-এর টহল সদস্যরা বিএসএফ-এর প্রতি পাল্টা গুলি চালালে তারা ইঞ্জিন চালিত নৌকা ফেলে স্পিড বোট নিয়ে পালিয়ে যায়। ইঞ্জিন চালিত নৌকাসহ নৌকায় অবস্থান করা এক ভারতীয় চোরা চালানকারীকেও আটক করে বিডিআর। এসময় নৌকায় থাকা ভারতীয় জোয়ানদের বেশ কয়েকটি টুপি অন্যান্য কিছু সরঞ্জামও জব্দ করে বিডিআর। এর মধ্যে বিডিআর খবর পায় যে, পাল্টা গুলিতে এক বিএসএফ সদস্য নিহত হয়েছে।
বিডিআর সদর দফতর জানায়, আটক ভারতীয় চোরাচালানকারী স্থানীয় এক গরু ব্যবসায়ী। তার নাম মোঃ আনজাম হোসেন। বর্তমানে তাকে বিডিআর কাস্টডিতে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
আমাদের চাঁপাইনবাবগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, শুক্রবার দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিহত দুই বিডিআর সদস্যের লাশের ময়না তদন্ত শেষ হয়। তার পরই নিহতদের লাশ নিজ নিজ বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে এর আগে বিডিআর ক্যাম্পে হাবিলদার হান্নান সরকারের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, হাবিলদার হান্নান সরকারের বাম পাজরে ৩টি এবং ল্যান্স নায়েক কৃষ্ণপদ দাসের বাম পায়ের উরুতে ৫টি গুলিবিদ্ধ হয়। খবর পেয়ে বিডিআর-এর রাজশাহী সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোঃ ইকবালসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।
বিডিআর সদর দফতরে ব্রিফিং
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক বিডিআর-এর ওপর হামলা এবং দু’জন বিডিআর সদস্যকে হত্যা করার ঘটনাকে উস্কানিমূলক বলে বর্ণনা করেছে বিডিআর কর্তৃপক্ষ। তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি বিডিআর-এর পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার রাতের এ ঘটনাকে ভারতের আগ্রাসী মনোভাব এবং নিয়ম না মানার প্রবণতা হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
শুক্রবার বিকালে বিডিআর সদর দফতরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বিডিআর-এর পরিচালক (অপারেশন এন্ড ট্রেনিং) কর্নেল আব্দুল হালিম বলেন, বাংলাদেশ সীমান্তে আসার পরেও মোটেই সংযমী ছিল না বিএসএফ। বিডিআর-এর টহল দল আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে বিএসএফকে চ্যালেঞ্জ করলেও তারা নিয়মানুসারে সাড়া না দিয়ে বরং উল্টো বিডিআর-এর ওপর হামলা চালায়। তিনি বলেন, বর্ডার গাইড লাইন মেনে সাড়া দিলে কোন অবস্থাতেই এমন ঘটনা ঘটত না।
তিনি বলেন, বিএসএফ সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে কোন প্রকার উস্কানি ছাড়াই অতর্কিতে ‘বার্স্ট ফায়ার’ করে। এ ঘটনায় বিডিআর-এর রাজশাহী সেক্টর থেকে কঠোর প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, এ ঘটনার একদিন আগেই দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে দিল্লীতে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, যখনই পার্শ্ববর্তী এই দুটি দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের কোন বৈঠক হয় তখনই কেন বারবার এমন দুর্ঘটনা ঘটে? এ প্রশ্নের উত্তরে বিডিআর কর্নেল বলেন, দিল্লীর বৈঠকের সঙ্গে বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনার কোন সম্পর্ক আছে কিনা সেটা বলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এই ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর কোন রকম চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে কিনা সেটাও কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই বলতে পারবে বলে জানান তিনি।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে কর্নেল আব্দুল হালিম বলেন, এ ঘটনায় সরকারের কোন পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ কিনা সেটা সরকারই ঠিক করবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নদী সীমান্তে বিডিআর ও বিএসএফের মধ্যে সংঘটিত ঘটনা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, এ ঘটনাকে আমরা খুবই গুরুতর হিসেবে বিবেচনা করছি। আমরা বিএসএফের হাতে বিডিআরের দুজন সদস্যের নিহত হওয়ার ঘটনার নিন্দা জানাই। আমরা মনে করি বিডিআর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নিকট তুলে ধরবে। এখন আমরা বিস্তারিত প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছি।
ভারতীয় হাইকমিশনের বক্তব্য
এদিকে ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশন এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, পদ্মা নদীর ধারে গরু চোরাচালানের খবর পাওয়ার পর নিমতিতা সীমান্ত চৌকি এলাকার বিএসএফ নদী রক্ষীবাহিনী শাখা গরু চোরাচালানীদের ধাওয়া করে। এসময় চোরাচালানকারীরা বিএসএফকে লক্ষ্য করে গুলি করলে বিএসএফও পাল্টা গুলি চালায়। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে একজন বিএসএফ সদস্যের গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হওয়ার খবর বলা হলেও দুজন বিডিআর সদস্যের নিহত হওয়ার খবর চেপে যাওয়া হয়।
।। ইত্তেফাক ১৯.০৭.২০০৮ ।।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিএসএফ’র গুলিতে দুই বিডিআর সদস্য নিহত
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
কত ভেবেছি, আমাদের একদিন দেখা হবেই
কত ভেবেছি,
আমাদের একদিন দেখা হবেই।
হয়তো হঠাৎ সামনে এসে
আমাকে চমকে দেবে।
হায়,
ওরা কেন জানালো,
পৃথিবীতে
তুমি আর বেঁচে নেই!
কত ভেবেছি,
চলতে চলতে পথে
সামনে একটা রিকশা থেমে যাবে।
কী মোহন ভঙ্গিমায়
রাজাসনে বসে আছো তুমি,
রোদে ভেজা মুখ... ...বাকিটুকু পড়ুন
ফতোয়া যখন আইসক্রিম: ক্ষমতার গরমে গলে, মার্কিন বাতাসে জুড়ায়!

মুখে জিকির আর অন্তরে ডলারের ফিকির—ধর্মের নামে এই লেভেলের "মাল্টিটাস্কিং" মুনাফেকি কি আপনিও খেয়াল করেছেন?
ঈমানের তলোয়ার শুধু গরিবের ওপর চলে, আর হোয়াইট হাউজের সামনে গেলেই কেন এদের লুঙ্গি কোঁচা... ...বাকিটুকু পড়ুন
পি ভি নরসিমা রাও - ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কারের জনক

পি ভি নরসিমা রাও ১৯৯১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তৎকালীন ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় যে ঐতিহাসিক সংস্কারনীতি গ্রহণ করেন, তা "এলপিজি সংস্কার" (LPG Reforms - Liberalisation,... ...বাকিটুকু পড়ুন
সব দোষ গাজী সাহেবের!

ধরেন, এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে। শেখ হাসিনা সংসদ ভবনের সামনে ভারতের স্বাধীনতা দিবস জাঁকজমক করে পালন করলেন। ভারতের শীর্ষ নেতা এলেন, ভারতের পতাকা উড়ল...
এখন চুপ করে থাকা পাকিস্থানপন্থীরা... ...বাকিটুকু পড়ুন
হিসাব বিষয়ক ভাবনা

সংখ্যাওয়ালা কোনো লেখা দেখলে হিসাব ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করা আমার অভ্যাস। ইদানিং বিভিন্ন রকম সংখ্যাওয়ালা কিছু বিজ্ঞাপন সামনে আসছে, এগুলো ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপন। এসব বিজ্ঞাপনে যেসব সংখ্যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।