somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাদকসেবীর চার ভাগের একভাগ নারী

০৯ ই মার্চ, ২০১৮ রাত ১২:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

‘তুমি আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দিবো’ নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এর এই বিখ্যাত উক্তি ছোট বেলায় কম বেশি আমরা সবাই পড়েছি। কিন্তু বর্তমানে আশঙ্কাজনক হারে মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়ছে নারী একটি অংশ। আর জাতি বঞ্চিত হচ্ছে একটি শিক্ষিত মা পাওয়া থেকে। যা একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়তে তোলার জন্য অন্তরায়।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন আইনশিঙ্খলার বাহিনীর অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী আটক গডফাদারে ধরতে না পারার কারণে সমাজে সহজ সহজ লভ্য হচ্ছে মাদক। আর গবেষণা বলে দেশের মোট মাদকাসক্ত প্রায় চার ভাগের একভাগ নারী।


জান্নাতারা মীম শিক্ষা জীবনের শুরু ১৯৯৮ সালে ধানমন্ডির একটি ইংরেজি মাধ্যমে স্কুলে প্রে-গ্রপে ভর্তির মাধ্যমে দিয়ে। সে হিসাবে তাঁর এখন বিস্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রাজধানীর আদাবরের ‘মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র ক্রিয়া’তে চিকিৎসা নিচ্ছে। এর আগে ঢাকার আরও দুই তিনটি মাদকাসক্তি চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন তিনি। কিন্তু কোনো ভাবেই মাদকের দুনিয়া থেকে ফিরে আসতে পারছে তিনি। সবশেষ পত্রিকা বিজ্ঞাপন দেখে তিন মাসের ‘প্যাকেজ’-এ চিকিৎসা ক্রিয়া তে ভর্তি আছে।

তাঁর কেস হিস্টরি ও পরিবারের সাথে কথা বলে জানায়, বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান মীম। তিনি যখন ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে তখন তাঁর বাবা মারা যায়। এর পরে মূলত অনেকটা শাসনের বাইরে চলে যায় সে। পরিবারের সদস্য বলে একমাত্র মা। আর আয়ের উৎস বাবা রেখে যাওয়া ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়ের মোট ৪টি বাড়ি। খুব অল্প বয়সে আদরের মীমের হাতে অধিক অর্থ দিতে শুরু করে তাঁর মা। এর পরে যখন সে ৯ শ্রেণিতে পড়ে তখন পরিবারের অন্য সদস্যের মাধ্যমে মীমের মা জানতে পারে তাঁর সন্তান মাদক জগতে পা রেখেছে। এর পরে শুরু হয় চিকিৎসা। এর ফলও পায়। ও- লেভেল পরীক্ষাতে মোট ৫টি পরীক্ষাতে অংশ গ্রহণ করে পাঁচটি তে উর্ত্তিন হয় সে। কিন্তু এর পরে আবার মাদকে জড়িয়ে যায় মীম। তাঁর পর থেকে এখন পর্যন্ত দীর্ঘ সারে ৪ বছরে এ-লেভেল পরিক্ষার মোট ছয়বার অংশ নিয়ে সম্পুন করতে পারেনি।

জান্নাতারা মীমের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, পাপা(বাবা) মারা যাওয়ার পরে আম্মু আমাকে অনেকটার শাসন থেকে মুক্ত করে দেয়। আম্মুর কথা ছিল লেখা পড়ায় ভালো ফলাফল করতে হবে। আর আমিও মা কে কথা মেনে সেভাবে রেজাল্ট করে আসছিলাম। কিন্তু আমি যখন ক্লাস এইট শেষ করে নাইনে উঠি। তখন বন্ধুদের সাথে একদিন রাতে বাসার বাইরে থাকার অনুমতি পাই আম্মু কাছ থেকে। সেখানে ক্লাসের কিছু বন্ধুদের থেকেই আমার কিছু পানিও(মদ) এবং গাঁজা খাওয়ার সুযোগ হয়। আমি আগে থেকে সিগারেট খেতাম কিন্তু সেদিন যে আনন্দ পেয়ে ছিলাম তা এর আগে পাইনি। এর পর থেকে আমি নিয়মিত খাওয়া শুরু করে দেই। অন্যদের থেকে আমার কাছে সব সময় টাকা একটু বেশি থাকতো। তাই সবাই আবার সে সময় একটু গুরুত্ব দিতে শুরু করে। এভাবে করে কবে যে আমি মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়েছি নিজেও বলে পারি না। আমি জানি আমার জন্য আমার আম্মুর অনেক কষ্ট হয়।

তবে জান্নাতারা মীম তার মাকে কষ্ট দিতে এবং সমাজে সবার সামনে ছোট করতে চায় না মন্তব্য করে আরো বলেন, ‘আমি ভালো হতে চাই। আমি নিজেই এবার ভর্তি হয়েছি এখানে। আম্মুকে আসতে না করেছিলাম এখানে। কারণ এখানে আসলে ডাক্তারা আম্মুকে দোষদেয়। কিন্তু আমার আম্মুর তো কোনো দোষ নাই। আমি আমার ভুলে মাদকাসক্ত হয়েছি। আমার ভুল ছিল আমার বন্ধু নির্বাচনে। কথাগুলো বলতে গিয়ে মীম কান্না থামাতে পারছিল না। সব শেষ মীম বলে আমি একজন ভালো মেয়ে হয়ে পাপার(বাবা) কাছে যেতে চাই। আমি একজন ভালো বউ হতে চাই। কিন্তু আমাকে এই সমাজের কেউ মেনে নিবে না। আর যদিও মেনে নেয় তাও নিবে পাপার রেখে যাও টাকার জন্য। যেমনটা বন্ধুরা আমাকে টাকার জন্য গ্রহণ করে ছিল।’

এদিকে ‘মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র ক্রিয়ার ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট কানিজ ফাতেমা বিডিমর্নিংকে জানায়, তাঁর সাথে কথা আমি যতটুকু বুঝতে পেড়েছি মীম মূলত সমাজের অপব্যবস্থার শিকার। সে এখন পর্যন্ত ৩টি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি ছিলেন। কিন্তু প্রতিবার বাড়ি ফেরার পরে কোনো না কোনো ভাবে তাঁর আগের বন্ধ মহল তাকে আবার মাদকের সাথে যুক্ত করে ফেলছে।

বাংলাদেশের মাদক বিরোধী সংস্থা (মানস) সাথে নারীদের মাদক সাথে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে কথা হলে জানা যায়, দেশে প্রায় ৮০ লাখ মাদকাসক্ত ব্যক্তির ২৬ শতাংশই নারী। আর মাঝে ৫৬ শতাংশ ইয়াবা সেবনকারী। আর ৩৩ শতাংশ নারী, সিগারেট ৩২ শতাংশ, মদ ২৮ শতাংশ, গাঁজা ২৬ শতাংশ, ফেনসিডিল ৯ শতাংশ, হেরোইন ৫ শতাংশ, পেথেড্রিন ৩ শতাংশ এবং ১ শতাংশ নারী ড্যান্ডি নিয়ে থাকে। এ জরিপে অংশ নেওয়া ৯৫ জনের পরিবারের মধ্যে ১৬ শতাংশের স্বামী, ১৬ শতাংশের ভাই, ৪ শতাংশের বোন, ৪ শতাংশের বাবা ও ২ শতাংশের মা মাদকাসক্ত ছিলেন। এ ছাড়াও ৩৪ শতাংশ নারীর একাধিক যৌন সঙ্গী আছে এবং ৪৪ শতাংশের অনিরাপদ যৌন অভিজ্ঞতা আছে। তাদের ১১ শতাংশ মাদক সংক্রান্ত মামলায় জড়িত।

ঢাকায় মেয়েদের জন্য একমাত্র আলাদা মাদক নিরাময় কেন্দ্রে রয়েছে আহছানিয়া মিশনের। সেখানকার স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ইকবাল মাসুদের সাথে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, স্কুল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েদের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার একটা প্রধান কারণ পরিবার বা বাবা-মায়ের সাথে ভাল সম্পর্ক না থাকা বা বাবা-মায়ের কাছ থেকে তাদের প্রত্যাশামত সময় না পাওয়া।

তিনি বিডিমর্নিং কে আরও জানায়, ঢাকা আহছানিয়া মিশন ‘নারী মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র’ যাত্রা শুরু করে ২০১৪ সালের ১২ এপ্রিল। সে সময় দেশে মোট মাদকসেবীদের মাঝে নারীদের মাদক নেয়ার প্রবণতা ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। আর এই ৫ শতাংশের ৪ বছরে বেড়ে ২৬ থেকে ২৭ শতাংশে চলে এসেছে।

আহ্ছানিয়া মিশনের নারী মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পূনর্বাসন কেন্দ্রের কাউন্সেলর শারমিন আবেদীন ইরা জানান,১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে পনের শতাংশ নারী নানা ধরণের মাদকে আসক্ত বলেও সাম্প্রতিক তাদের এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

আসক্ত হওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হয়ে বলেন, আইনশিঙ্খলার বাহিনীর অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী আটক গডফাদারে ধরতে না পারার কারণে সমাজে সহজ সহজ লভ্য হচ্ছে মাদক। যার ফলে খুব সহজে নারীদের হাতে মাদক পৌঁছিয়ে যাচ্ছে।

সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মার্চ, ২০১৮ রাত ১২:১৮
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আবার সমস্যা, ব্লগ আমাকে কেন ভোগাচ্ছে?

লিখেছেন মেহবুবা, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:৪৩

আবার সমস্যা ব্লগ ঠিকমত দেখা যায় না। কিছুদিন আগে এমনটি হয়েছিল। ব্লগার সুলাইমান সহজ করে সমাধান বের করে দিয়েছিল। এবার একই সমস্যা হচ্ছে তবে সেই একই উপায়ে কাজ হচ্ছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি ইরানের নতুন শত্রু হতে চলেছে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৬


মরুভূমির গরম বাতাস আর লোহিত সাগরের নোনা জলীয় বাষ্প যেখানে এসে মেশে, বাব এল মানদেব প্রণালীর সেই জায়গাটায় রাতের অন্ধকার নামলেই একটা অদ্ভুত নীরবতা ছেয়ে যায়। কিন্তু সেই নীরবতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কল্প-গল্প : প্রমিথিউসের শেষ রাত

লিখেছেন কাছের-মানুষ, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:১১



“স্যার, কিছু কয়েন দেন!” মোলায়েম স্বরে বলেই হাত কচলায়।

কয়েনটি যিনি চাইলেন, তিনি একজন ভিক্ষুক। ব্যস্ত শহরের এই চৌরাস্তায় বসে নিয়মিত কয়েন আবদার করাই তার একমাত্র কাজ। মালদার পার্টি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একালের আওয়ামী লীগের সাথে সে কালের বিএনপির পার্থক্য কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২১



সে কালের বিএনপি বিভিন্ন সময় আন্দোলনের গল্প শুনাতো। একালের আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময় আপা আসার গল্প শুনায়। এর মধ্যে দু’বছর পার হয়েছে আপা আসেননি। সামনে ডিসেম্বরের মহাক্ষণে আপা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শামারুহ মির্জারাও সত্য মেনে নেয় যখন/ যদিও এর কোনো প্রয়োজনিয়তা আমাদের নেই॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩৮


বিএনপি ঘরানার মুখ থেকেও যখন সত্য বেরিয়ে আসে, তখন তা ইতিহাস হয়ে থাকে!

বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কন্যা ড. শামারুহ মির্জার একটি সত্য স্বীকারোক্তি......
“বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ছাড়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

×