
সায়েন্টিফিক তাফসীর= সুরা নিসা আয়াত নং-১
হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক নফ্স থেকে। আর তা থেকেই তিনি তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর,যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাক। আর ভয় কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক।–সুরা নিসা আয়াত-১
সুরা নিসার এই আয়াতটিতে প্রথমেই রবের প্রতি ভয় পাবার বক্তব্য দিয়ে শুরু করেছেন। প্রশ্ন রবকে ভয় পেতে হবে? গভীর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন।কিন্তু আল কোরআনে যে দুটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে কেনো এই দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ন যার জন্য স্রষ্টাকে ভয় কবরতে নির্দেশ প্রদান করছেন।এই আয়াতটিতে প্রানি জগতের সৃষ্টিশীলতার গভীর নৈপূন্যতার প্রকাশ ঘটানো হয়েছে। আয়াতটির প্রথমে লক্ষ্য করুন প্রথমেই সেই স্রষ্টার প্রশংসা করেছেন যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন।কিন্তু কেনো এক্ষেত্রে সৃষ্টার প্রশংসা করা হয়েছে।প্রশংসা করার কারন এটি সৃস্টির এমন একটি গুরুত্বপূন বিষয় যে বিষয়টির জন্য অবশ্যাই স্রস্টার প্রতি কৃতঙজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। না করলে মানুষের ভিতর এক অনুতপ্তবোধ অপরাধবোধ জমে থাকবে। অয়াতটির পরবর্তী অংশে বলছেন তিনি কিভাবে সৃষ্টি করেছেন।অথাৎ তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক নফস্ থেকে।আর তা থেকেই তিনিই তার জোড়া সৃস্টি করেছেন। আরবীতে নফস শব্দের আভিধানিক অর্থ আত্মা বা প্রান। চেতনা সমৃদ্ধ এমন একটি কিছু। এই আয়াতটি যদি আপনি সাধারন দৃষ্টিকোনে পড়েন তাহলে আপনার কাছে মনে হবে যে এটি মানুষ সৃষ্টি বা আদম সৃস্টি ও আদম থেকে হাওয়া সৃষ্টি কিংবা এ জাতীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।কিন্তু যদি আপনি বৈজ্ঞানিক ভাবে আয়াতটির গভীরতা খুজতে যান তাহলে সত্যিই অবাক হবেন।বলা হচ্ছে সৃস্টি করেছেন নফস বা একটি চেতনা সহ দেহ এবং তা থেকে সৃষ্টি করলেন াারেকটি অংশ বা আরেকটি প্রাণের উদ্ভব। আল কোরআনের ভাষায় তার জোড়া সৃষ্টির কথা বলা হচ্ছে। অথাৎ আল কোরআনের ভাষায় শুরুতে এক কোষি প্রাণি সৃষ্টি করা হয়েছেলো। প্রানি জগৎ সৃষ্টির প্রথম সুচনা লগ্নে প্রিক্যামব্রিয়ান যুগের সেই সময়কালের কথাই বলা হচ্ছে যখন পৃথিবী জুড়ে পানির উপর শুধু এককোষি প্রানিরই তান্ডব এবং তা থেকে জোড়া সৃষ্টি হয়ে কোটি কোটি কোষের আবির্ভাব হতে থাকে। আপনি হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন কেনো আমি এখানে একটি প্রানী না ধরে কেনো একটি কোষকে ধরে নিলাম? বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোনে যখন আপনি বিচার করবেন তখন আল কোরআন অবৈজ্ঞানিক কোন বিষয় উপস্থাপন করতে পারে বলেই ভাবাই যাই না। কারন আল কোরআন নিজেই বলছে ইহা বিজ্ঞানময় কোরআন। সুতরাং আমার সহজাত উপলদ্ধিবোধ এখানে বলতে বাধ্য করছে যে আল কোরআনের উল্লেখিত আয়াতটি সৃষ্টির শুরুতে এক কোষি প্রাণি সৃষ্টির প্রক্রিয়া বা কোষ সৃষ্টি এবং তার স্বপ্রতিলিপিকরন প্রক্রিয়ার কথা আল কোরআন এখানে তুলে ধরছেন।
প্রান সৃস্টির লগ্নে কোষ সৃষ্টি খুবই গুরুত্বপূন একটি বিষয় ছিলো যা জীব বিজ্ঞানীরা স্বিকার করেন।আরো গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো স্বপ্রতিলিপিকরন প্রক্রিয়া সৃষ্টি করা বা একটি থেকে আরেকটির জোড়া হওয়ার সিষ্টেম।
আলোচ্য আয়াতে নফস বলেই এখানে একটি প্রানের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।সুতরাং আমরা কখনই অনুমান নির্ভর আদমকে ধরে নিতে পারি নাই।ধরতাম যদি এখানে নফস্ না বলে ডাইরেক্ট আদম বা অন্য কোন প্রানিকে স্পষ্ট করে বলতো।যেহেতু স্পষ্ট করা হয় নাই বরং বলেছে একটি নফস বা দেহ সম্পন্ন আত্মা। তাহলে আমরা প্রাণ সৃষ্টির শুরুতে প্রি ক্যামব্রিয়ান যুগের বিশাল জলরাশির ভিতরে এক কোষি প্রান বিপ্লব বিষয়টি এখানে আলোচনার বিষয়বস্তু।
নফর্স বা একটি কোষ কিভাবে সৃষ্টি হলো এই প্রবন্ধে এটি আমার আলোচনার বিষয়বস্থু নয় আমার আলোচনার বিষয়বস্তু একটি নফস কিভাবে তার জোড়া সৃষ্টি করে অথাৎ এই প্রতিলিপিকরন সিস্টেমটি আল কোরআনে আল্লা মানুষকে অবগত করে জানিয়েছেন যে এই প্রতিলিপিকরন ক্ষমতা স্রষ্টার দান।তিনি এই বিষয়টি সৃষ্টি না করলে এই প্রাণি জগত পৃথিবীতে আবির্ভুত হতো না।এখন প্রশ্ন হল এই প্রতিলিপি তৈরী করণ ক্ষমতা ভারী অনুর মধ্যে কিভাবে আসে? তার উত্তর আজকের বিজ্ঞানের কাছেও নেই। প্রকৃতিবাদী বিজ্ঞানীরা একে প্রকৃতির নির্দেশণা বা নিয়ম বলে চালিয়ে দিয়েছেন। বিজ্ঞান বলছে, বর্তমান কালের কোষে নির্দেশণা দানকারী দুই প্রকার ভারী অণু তথা নিউক্লিক এসিড ও প্রোটিন রয়েছে, যাদের মধ্যে নিউক্লিক এসিড নিজের প্রতিলিপির নির্দেশণা দানের ক্ষমতা রাখে। নিউক্লিক এসিডে পরিপূরক নিউক্লিওটাইডের (সূত্রক) মধে খাড় জোর থাকার ফলস্রুতিতে তার নিজের সংশ্লেশনের নমুনা প্রদান করতে পারে। পরীক্ষায় দেখা গেছে আর এন এ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিক্রিয়ায় অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। একই ভাবে এটি একদিকে যেমন প্রতিলিপিকরণের নমুনা প্রদান করে অন্যদিকে প্রতিলিপিকরনকে ত্বরাণ্বিত করে। এই আর এন এ কে মনে করা হয় বংশানুক্রমিকতার প্রাথমিক উপাদান। আরও মনে করা হয়ে থাকে জৈব রাসায়নিক বিবর্তন আর এন এ অনুর উপর ভিত্তি করেই শুরু হয়েছিল। আমরা এই আলোচনায় বৈজ্ঞানিক অনুমানটুকু যদি মেনেও নেই তাহলে নতুন যে ধারণার সৃষ্টি হয় তা হল, প্রকৃতিতে বিবর্ততনের মাধ্যামে যেই মাত্র ভারী অনু আর এন এর রূপ ধারণ করল আর অমনি তার অনুরূপ বাচ্চা প্রসব করতে শুরু করল, তাতে দিনে দিনে প্রকৃতি আর এন এ তে ভরে গেল। প্রকৃত পক্ষে আর এন এ কিন্তু কোন প্রাণ কোষ নয়, এটি প্রাণকোষস্থিত একটি অনু। তা হলে আরও ধরে নিতে হবে যে, আর এন’র মধ্যেও বুদ্ধিদীপ্ত মস্তিস্ক রয়েছে যেটি চিন্তাভাবনা করে কোষ গঠনের বাকী অনুগুলোকে সংশ্লেষিত করে এক আদর্শ প্রাণকোষ গঠন করতে পারে। বিজ্ঞান কিন্তু এ কথা স্বীকার করেনা; এমন কি প্রকৃতিতে কোন চিন্তাশীল স্বত্তা আছে বলেও বিজ্ঞান স্বীকার করেনা। তাহলে যৌক্তিকভাবেই স্বীকার করতে হচ্ছে প্রকৃতিতে আপনা আপনি প্রতিলিপি করণ ক্ষমতা সম্পন্ন কোন বায়ো অনু সৃষ্টি হতে পারেনা।তার জন্যে প্রয়োজন নীল নকশা ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রয়োজনীয় নির্দেশ দান। তাহলে সেই নির্দেশ কোথা থেকে এসছে? কারন আধুনিক বিজ্ঞান আর এনএ এবং ডিএনএ কে একটি সফটওয়্যারের সাথে তুলনা করেছেন।হার্ডওয়্যার হিসেবে একটি কোষের সমস্ত দেহকেই বলতে পারি। সুতরাং একটি কোষ মাত্রই একটি একটি জী্বন।সফটওয়্যার হার্ডওয়ারের কারুকার্যময়তা।
আধুনিক বিজ্ঞানের বক্তব্য অনুসারে যতটুকু জানা যায় প্রতিলিপিকরন ক্ষমতা সমৃদ্ধ প্রথম কোন এক কোষি প্রাণিই পৃথিবীতে জীবনের সূচনা করেছিলো। প্রতিলিপিকরণ প্রক্রিয়ার সূচনা মূলত পৃথিবীর আদিম কোষ বা 'প্রোটোসেল' (Protocell) সৃষ্টির সাথেই জড়িত। বলতে পারেন কোষ বিভাজনের সূচনা ঘটেছিল জীবনের উদ্ভবের সাথে সাথেই, যখন প্রথম স্ব-প্রতিলিপিকারী ব্যবস্থা একটি কোষীয় কাঠামোতে আবদ্ধ হয়ে নিজের সংখ্যাবৃদ্ধি শুরু করে। জীবনের শুরুতে আরএনএ (RNA) অণুগুলো নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করতে শিখলে বংশগতির ধারা শুরু হয়।স্ব-প্রতিলিপিকরণ করতে সক্ষম এই আরএনএ অণুগুলো যখন চর্বি জাতীয় পদার্থের (Phospholipid)একটি ক্ষুদ্র বুদবুদ বা আবরণের ভেতরে আটকা পড়ে, তখন প্রথম 'আদি-কোষ' বা প্রোটোসেল গঠিত হয়।প্রাথমিক অবস্থায় কোষ বিভাজনের জন্য কোনো জটিল জৈবিক প্রক্রিয়া ছিল না। পরিবেশের চাপ, যেমন তরলের প্রবাহ বা সংকীর্ণ জায়গার মধ্য দিয়ে চলাচলের সময় আদি-কোষগুলো যান্ত্রিকভাবে দুই বা ততোধিক ভাগে ভেঙে যেত।সময়ের সাথে সাথে এই ভেঙে যাওয়া প্রক্রিয়াটি আরও সুশৃঙ্খল হতে থাকে। ব্যাকটেরিয়া এবং আর্কিয়াদের মতো আদিম প্রাণীদের মধ্যে 'দ্বি-বিভাজন'(Binary Fission) পদ্ধতির উদ্ভব ঘটে, যা আজ আমাদের পরিচিত কোষ বিভাজনের মূল ভিত্তি।আর এই বিষয়টি আল কোরআন একটি নফস থেকে তার জোড়া সৃষ্টি বলে অভিহিত করছেন। এই আয়াতের স্বপক্ষে সমর্থনে আল কোরআনের আরোকটি আয়াত তুলে ধরলাম। লক্ষ্য করুন আল কোরআনের সুরা আরাফের ১৮৫ নং আয়াত। “ فِي ظُلُمَاتٍ ثَلَاثٍ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ “তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে একটি নফস থেকে। অতঃপর তা থেকে তার যুগল সৃষ্টি করেছেন ।”
(পর্ব-২ আসছে)
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




