somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইনসাফ, ইনকিলাব, আযাদি শব্দের ব্যবহার ও এর প্রয়োজনীয়তা।

২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অধ্যাপক ড. তারিক মনজুর বলেছেন- “আমরা ব্যবহার করছি 'ইনসাফ', ন্যায়বিচারের বদলে; বা আমরা ব্যবহার করছি 'ফয়সালা', সেটি মীমাংসার বদলে। এরকম যে শব্দের প্রয়োগ, ব্যবহার করছে একটা ছোট অংশ। ফলে বড় একটা অংশের কাছে এই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে, এই যে শব্দ প্রয়োগ বা ভাষার ব্যবহার, এর ফলে আসলে বাংলা ভাষার বিকৃতি ঘটছে কি না এবং ভবিষ্যতে এর মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা হুমকির সম্মুখীন হবে কি না। এটি যতটা না ভাষা বিকৃতি, তার চেয়ে বেশি এটার রাজনৈতিক ব্যাপার। এর মধ্য দিয়ে ভাষার জন্য হুমকি বলে কিছু দেখি না, কিন্তু আসলে জাতিগতভাবে আমাদেরকে বিভাজনেরই একরকম প্রচেষ্টা আছে বলে মনে হয়।” তার কথার উপর ভিত্তি করে ইদানিং অনেক পত্রিকায় বিপ্লবীদের ব্যবহত শব্দগুলো নিয়ে আলোচনা সমালোচনা চলছে। কেউ দাবি করছেন প্রচলিত শব্দ ব্যবহার না করে এসব ইনসাফ ইনকিলাব, আযাদি শব্দগুলো কেনো ব্যবহার হলো?এ বিতর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এসব বিষয়ে সরকারের মন্ত্রী, শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা ও রাজনৈতিক দলগুলোও মন্তব্য করতে শুরু করেছেন। একজন মন্ত্রী বলেছেন, এসব শব্দের সাথে বাংলা ভাষারই সম্পর্ক নেই।কিন্তু প্রশ্ন হলো কেনো বিপ্লবীরা কেনো এই শব্দগুলো ব্যবহার করলো?

আলোচনার শুরুতে আমি ইনসাফ শব্দটি নিয়ে আলোচনা করি। সমালোচনাকারীদের প্রশ্ন ন্যায় শব্দটি হঠাৎ কি সমস্যা হল? ন্যায় না বলে ইনসাফ শব্দটি কেনো ব্যবহার করা হচ্ছে? স্বাধীনতা শব্দটির-ই বা সমস্যা কোথায়? বা বামপন্থীরা যে বলতেন বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক, সেই বিপ্লব শব্দটি এখন অচ্ছূত হয়ে যাচ্ছে কেন? কেনো বিপ্লব শব্দটি ব্যবহত না হয়ে ইনকিলাব শব্দটির ব্যবহার হচ্ছে? কারন জুলাই বিপ্লবে এবং পরবর্তী সময়ে আমরা ইনসাফ শব্দটি বিপ্লবীদের মুখে ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে।ইনকিলাব জিন্দাবাদ শ্লোগানটির মধ্য দিয়ে কিছু মানুষ বিপ্লবী জোস খুজে পাচ্ছে। কেনো এই বিদেশী শব্দের ব্যবহার চলছে? আমি মনে করি এর পিছনে শব্দগত নিপীড়ন এক্ষত্রে দায়ী। বৈষম্য দায়ী।আমার কথা শুনে চমকে উঠবেন না।বাংলা ভাষায় ব্যবহত আরবী শব্দগুলোতে এলার্জি শুরু হয়েছে ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ শাসন কাল থেকে। কলিকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীরা বাংলা ভাষা থেকে মুসলমানদের ব্যবহার করা শব্দগুলোকে সাহিত্য থেকে বাদ দিতে থাকে এবং সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করতে থাকে। পরবর্তীতে বাংলাদেশের বিশাল অংশ মুসলিম হয়ে গেলেও এর ইসলামী শব্দ বা আরবী শব্দ প্রয়োগে বাধাগ্রস্থ করার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। সেই পদ্ধতি অনুসারে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কবি সাহিত্যিক কলকাতা কেন্দ্রীক লেজুড়বৃত্তি শুরু করে। তারা ইচ্ছে করে বাংলা সাহিত্যে কবিতায় গল্পে আরবী ফাসী শব্দের প্রচলন কমিয়ে কলকাতা কেন্দ্রীক পুরস্কার গ্রহনে অতি উৎসাহী হয়ে ওঠে।এটা নতুন কিছু নয়। বাংলা ভাষায় ইসলাম বিবর্জিত করণ প্রকল্পের একটা অংশ মাত্র। যার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তারিক মনজুর এর বক্তব্যে প্রকাশ পায়।

এবার আমি আসি বিপ্লবীরা কেনো ন্যায় শব্দটি ব্যবহার না করে ইনসাফ শব্দটি ব্যবহার করেছে।এক্ষেত্রে দুটি কারন এখানে বিদ্যমান বলে আমি মনে করি।প্রথমত ইনসাফ আরবী শব্দ এবং ন্যায় সংস্কৃত শব্দ। আরবী শব্দ প্রয়োগ করে বিপ্লবীরা বৎসরর পর বৎসর ধরে চলা ভারতীয় এবং হিন্দুয়ানী আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ হিসেবে দেখিয়েছে। আরবী ও ফার্সী শব্দ সমূহের ব্যবহারের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করে দীঘদিন ধরে ইসলামী দৃষ্টভিঙ্গী সমূহের মানুষকে মানসিকভাবে বিব্রত করে রাখা হয়েছে। দ্বীতিয় কারন বলে আমি মনে করি-অর্থগত পার্থক্য। ইনসাফ (انصاف) এবং ন্যায়—উভয় শব্দই মূলত সুবিচার, সমতা ও সততার সমার্থক শব্দ, অর্থ অনেকাংশে এক।তবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সামান্য পার্থক্য রয়েছে।এই পার্থক্যটা অনেকের চোখে পরে নাই তাই তারা আজ প্রশ্ন করছে? ইনসাফ মূলত একটি আরবি শব্দ যার অর্থ ন্যায়বিচার, নিরপেক্ষতা বা ভারসাম্য।অন্যদিকে, ন্যায় একটি বাংলা শব্দ যা নৈতিকতা, সত্য এবং অধিকারের প্রতি সঠিক আচরণের নির্দেশনা দেয়।কিন্ত্র দুটি শব্দ সমার্থক শব্দ হলেও তাদের মধ্যে পার্থক্য হলো—ইনসাফ শব্দটি বেশি ব্যবহৃত হয় বিচার ও সমবণ্টনের ক্ষেত্রে, আর 'ন্যায়' বা 'ন্যায়বিচার' শব্দটি ব্যাপক অর্থে নৈতিক ও আইনগত সুবিচার বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।ইনসাফ হলো "সবকিছু সমান করে দেওয়া" বা "যথাযোগ্য পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া" । ন্যায় শব্দটি সামাজিক ও আইনগত অধিকারের ক্ষেত্রে ব্যাপক ব্যবহৃত (যেমন: সামাজিক ন্যায়বিচার)। ইনসাফ নিরপেক্ষতা ও পক্ষপাতহীনতাকে (Neutrality) বেশি গুরুত্ব দেয়, যেখানে শত্রু-মিত্র সকলের অধিকার নিশ্চিত করা হয়।আসলে এখানে বিপ্লবীদের ইনসাফ শব্দটি ব্যবহারের মূল কারন হলো বৈষম্য নিরোধ করা। অথাৎ ইনসাফ নিরপেক্ষতা ও পক্ষপাতহীনতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, যেখানে শত্রু-মিত্র সকলের অধিকার নিশ্চিত করা।অথাৎ ইনসাফ শব্দটির মধ্য দিয়ে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বিদ্যমান থাকে।প্রতিষ্ঠা করা বা কায়েম করা।সুতরাং বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন থেকে উদ্ভুত শব্দ অবশ্যই বৈষম্যের বিরোধীতা করার মতো শব্দ গ্রহন করবে বলেই আমি মনে করি।

এবার বিপ্লব শব্দটি ব্যবহার না করে ইনকিলাব শব্দটির কেনো গ্রহন করা হলো? ইনকিলাব জিন্দাবাদ যার অনুবাদ "বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক"। স্লোগানের 'انقلاب' শব্দটি মূলত আরবি– যার অর্থ 'বিপ্লব'। এটি প্রথম সাহিত্যে ব্যবহার করেন কবি মুহাম্মদ ইকবাল।‘ইনকিলাব’ শব্দটি আরবি ‘ইনকিলাব’ থেকে এসেছে, যার অর্থ পরিবর্তন, উলটপালট বা বিপ্লব। আরবি থেকে এটি ফারসি, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় প্রবেশ করে এবং পরে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হতে শুরু করে। বাংলায় ‘ইনকিলাব’ শব্দের অর্থ বিপ্লব বা আমূল পরিবর্তন। সাধারণত রাজনৈতিক বা সামাজিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এখন প্রশ্ন হলো বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক শব্দ ব্যবহার না করে কেনো ইনকিলাব জিন্দাবাদ ব্যবহার করা হল? আমার মনন এবং জ্ঞানে এক্ষেত্রেও দুটি কারন খেজে পেয়েছি।যার মূল কারন শব্দটির জোস বিপ্লবীদের মানসিক ফিটনেস বৃদ্ধিতে সহায়ক হিসেবে ভূমীকা রেখেছে।ইনকিলাব জিন্দাবাদ শব্দের ব্যবহারে বিপ্লবী আবেগ যতটা না প্রভাবিত করেছে বিপ্লব দীঘজীবি হোক শ্লোগানটি ততটি আবেগ সৃষ্টিতে সক্ষম হতো না।কারন বিপ্লব দীঘজীবি হোক শ্লোগানটি সমাজতান্ত্রিক দল গুলো ব্যবহার করে থাকে।এই শ্লোগান ব্যাবহার তখনকার গণমানুষকে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন বলে বিভ্রান্ত করতে পারতো।আর এই কারনেই বিকল্প শ্লোগানের জরুরী প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছেলো।‘ইনকিলাব’ শব্দটি আরবি থেকে ফারসি, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় প্রবেশ করে এবং পরে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হতে শুরু করে।দ্বীতিয় কারনটি হলো ইনকিলাব জিন্দাবাদ একটি ঐতিহাসিক শ্লোগান।ঐপনিবেশিক ইংরেজদের হটাতেই উপমহাদেশের বিপ্লবীরা প্রথম ইনকিলাব শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।এই স্লোগানটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা পায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময়। ভারতীয় উপমহাদেশে বিপ্লবী নেতা ভগত সিং ও তাঁর সহযোদ্ধারা এই স্লোগানকে ব্যাপকভাবে প্রচার করেন। ১৯২৯ সালে দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপের পর তিনি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দেন, যা পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রামের এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে।ভগত সিংয়ের মাধ্যমে এটি গণমানসে গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে।পরবর্তীতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে শ্লোগানটি গুরুত্বপূন হয়ে ওঠে।আমি মনে করি বিপ্লবীরা শ্লোগানটির ঐতিহাসিক পেক্ষাপট এবং গুরুত্ব বিবেচনা করেই শ্লোগানটি গ্রহণ করেছিলো।বাংলা ভাষায় ‘ইনকিলাব’ শব্দটি আজও রাজনৈতিক আন্দোলন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও পরিবর্তনের আহ্বানে ব্যবহৃত হয়। এটি কেবল একটি শব্দ নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও নতুন সমাজব্যবস্থার স্বপ্নের প্রতীক। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ তাই শুধু একটি স্লোগান নয়—এটি সংগ্রাম, সাহস ও আশার এক ঐতিহাসিক ধ্বনি।

এককথায় বাংলা ভাষায় শব্দের ভান্ডার অপ্রতুল। বেশিরভাগ শব্দ বিভিন্ন ভাষা থেকে গ্রহন করা।সুতরাং আরবী শব্দ গ্রহনে আমাদের কোন বাধা থাকবার কথা নেই। এক পক্ষ মনে করছে, বাংলা ভাষার বিশুদ্ধতা রক্ষায় বিদেশি শব্দের স্লোগান পরিহার করা উচিত।কিন্তু আমার মনে হয় তারা যে কলিকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীর সহায়ক যারা বাংলা ভাষা থেকে মুসলমানদের ব্যবহার করা শব্দগুলোকে সাহিত্য থেকে বাদ দিতে উৎসাহী এবং সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করতে আধিপত্যবাদী মানসিকতার লেজুরবৃত্তি করেন। আপনি গভীরভাবে ভেবে দেখেন কোনো শব্দ বা স্লোগান যখন লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসে মিশে যায়, তখন সেটি ভাষার গণ্ডি ছাড়িয়ে জনগণের সম্পদে পরিণত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অধ্যাপক ড. তারিক মনজুর বলেছেন- “আমরা ব্যবহার করছি 'ইনসাফ', ন্যায়বিচারের বদলে; বা আমরা ব্যবহার করছি 'ফয়সালা', সেটি মীমাংসার বদলে। এরকম যে শব্দের প্রয়োগ, ব্যবহার করছে একটা ছোট অংশ। ফলে বড় একটা অংশের কাছে এই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে, এই যে শব্দ প্রয়োগ বা ভাষার ব্যবহার, এর ফলে আসলে বাংলা ভাষার বিকৃতি ঘটছে কি না এবং ভবিষ্যতে এর মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা হুমকির সম্মুখীন হবে কি না। এটি যতটা না ভাষা বিকৃতি, তার চেয়ে বেশি এটার রাজনৈতিক ব্যাপার। এর মধ্য দিয়ে ভাষার জন্য হুমকি বলে কিছু দেখি না, কিন্তু আসলে জাতিগতভাবে আমাদেরকে বিভাজনেরই একরকম প্রচেষ্টা আছে বলে মনে হয়।” তার কথার উপর ভিত্তি করে ইদানিং অনেক পত্রিকায় বিপ্লবীদের ব্যবহত শব্দগুলো নিয়ে আলোচনা সমালোচনা চলছে। কেউ দাবি করছেন প্রচলিত শব্দ ব্যবহার না করে এসব ইনসাফ ইনকিলাব, আযাদি শব্দগুলো কেনো ব্যবহার হলো?এ বিতর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এসব বিষয়ে সরকারের মন্ত্রী, শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা ও রাজনৈতিক দলগুলোও মন্তব্য করতে শুরু করেছেন। একজন মন্ত্রী বলেছেন, এসব শব্দের সাথে বাংলা ভাষারই সম্পর্ক নেই।কিন্তু প্রশ্ন হলো কেনো বিপ্লবীরা কেনো এই শব্দগুলো ব্যবহার করলো?

আলোচনার শুরুতে আমি ইনসাফ শব্দটি নিয়ে আলোচনা করি। সমালোচনাকারীদের প্রশ্ন ন্যায় শব্দটি হঠাৎ কি সমস্যা হল? ন্যায় না বলে ইনসাফ শব্দটি কেনো ব্যবহার করা হচ্ছে? স্বাধীনতা শব্দটির-ই বা সমস্যা কোথায়? বা বামপন্থীরা যে বলতেন বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক, সেই বিপ্লব শব্দটি এখন অচ্ছূত হয়ে যাচ্ছে কেন? কেনো বিপ্লব শব্দটি ব্যবহত না হয়ে ইনকিলাব শব্দটির ব্যবহার হচ্ছে? কারন জুলাই বিপ্লবে এবং পরবর্তী সময়ে আমরা ইনসাফ শব্দটি বিপ্লবীদের মুখে ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে।ইনকিলাব জিন্দাবাদ শ্লোগানটির মধ্য দিয়ে কিছু মানুষ বিপ্লবী জোস খুজে পাচ্ছে। কেনো এই বিদেশী শব্দের ব্যবহার চলছে? আমি মনে করি এর পিছনে শব্দগত নিপীড়ন এক্ষত্রে দায়ী। বৈষম্য দায়ী।আমার কথা শুনে চমকে উঠবেন না।বাংলা ভাষায় ব্যবহত আরবী শব্দগুলোতে এলার্জি শুরু হয়েছে ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ শাসন কাল থেকে। কলিকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীরা বাংলা ভাষা থেকে মুসলমানদের ব্যবহার করা শব্দগুলোকে সাহিত্য থেকে বাদ দিতে থাকে এবং সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করতে থাকে। পরবর্তীতে বাংলাদেশের বিশাল অংশ মুসলিম হয়ে গেলেও এর ইসলামী শব্দ বা আরবী শব্দ প্রয়োগে বাধাগ্রস্থ করার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। সেই পদ্ধতি অনুসারে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কবি সাহিত্যিক কলকাতা কেন্দ্রীক লেজুড়বৃত্তি শুরু করে। তারা ইচ্ছে করে বাংলা সাহিত্যে কবিতায় গল্পে আরবী ফাসী শব্দের প্রচলন কমিয়ে কলকাতা কেন্দ্রীক পুরস্কার গ্রহনে অতি উৎসাহী হয়ে ওঠে।এটা নতুন কিছু নয়। বাংলা ভাষায় ইসলাম বিবর্জিত করণ প্রকল্পের একটা অংশ মাত্র। যার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তারিক মনজুর এর বক্তব্যে প্রকাশ পায়।

এবার আমি আসি বিপ্লবীরা কেনো ন্যায় শব্দটি ব্যবহার না করে ইনসাফ শব্দটি ব্যবহার করেছে।এক্ষেত্রে দুটি কারন এখানে বিদ্যমান বলে আমি মনে করি।প্রথমত ইনসাফ আরবী শব্দ এবং ন্যায় সংস্কৃত শব্দ। আরবী শব্দ প্রয়োগ করে বিপ্লবীরা বৎসরর পর বৎসর ধরে চলা ভারতীয় এবং হিন্দুয়ানী আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ হিসেবে দেখিয়েছে। আরবী ও ফার্সী শব্দ সমূহের ব্যবহারের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করে দীঘদিন ধরে ইসলামী দৃষ্টভিঙ্গী সমূহের মানুষকে মানসিকভাবে বিব্রত করে রাখা হয়েছে। দ্বীতিয় কারন বলে আমি মনে করি-অর্থগত পার্থক্য। ইনসাফ (انصاف) এবং ন্যায়—উভয় শব্দই মূলত সুবিচার, সমতা ও সততার সমার্থক শব্দ, অর্থ অনেকাংশে এক।তবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সামান্য পার্থক্য রয়েছে।এই পার্থক্যটা অনেকের চোখে পরে নাই তাই তারা আজ প্রশ্ন করছে? ইনসাফ মূলত একটি আরবি শব্দ যার অর্থ ন্যায়বিচার, নিরপেক্ষতা বা ভারসাম্য।অন্যদিকে, ন্যায় একটি বাংলা শব্দ যা নৈতিকতা, সত্য এবং অধিকারের প্রতি সঠিক আচরণের নির্দেশনা দেয়।কিন্ত্র দুটি শব্দ সমার্থক শব্দ হলেও তাদের মধ্যে পার্থক্য হলো—ইনসাফ শব্দটি বেশি ব্যবহৃত হয় বিচার ও সমবণ্টনের ক্ষেত্রে, আর 'ন্যায়' বা 'ন্যায়বিচার' শব্দটি ব্যাপক অর্থে নৈতিক ও আইনগত সুবিচার বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।ইনসাফ হলো "সবকিছু সমান করে দেওয়া" বা "যথাযোগ্য পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া" । ন্যায় শব্দটি সামাজিক ও আইনগত অধিকারের ক্ষেত্রে ব্যাপক ব্যবহৃত (যেমন: সামাজিক ন্যায়বিচার)। ইনসাফ নিরপেক্ষতা ও পক্ষপাতহীনতাকে (Neutrality) বেশি গুরুত্ব দেয়, যেখানে শত্রু-মিত্র সকলের অধিকার নিশ্চিত করা হয়।আসলে এখানে বিপ্লবীদের ইনসাফ শব্দটি ব্যবহারের মূল কারন হলো বৈষম্য নিরোধ করা। অথাৎ ইনসাফ নিরপেক্ষতা ও পক্ষপাতহীনতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, যেখানে শত্রু-মিত্র সকলের অধিকার নিশ্চিত করা।অথাৎ ইনসাফ শব্দটির মধ্য দিয়ে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বিদ্যমান থাকে।প্রতিষ্ঠা করা বা কায়েম করা।সুতরাং বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন থেকে উদ্ভুত শব্দ অবশ্যই বৈষম্যের বিরোধীতা করার মতো শব্দ গ্রহন করবে বলেই আমি মনে করি।

এবার বিপ্লব শব্দটি ব্যবহার না করে ইনকিলাব শব্দটির কেনো গ্রহন করা হলো? ইনকিলাব জিন্দাবাদ যার অনুবাদ "বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক"। স্লোগানের 'انقلاب' শব্দটি মূলত আরবি– যার অর্থ 'বিপ্লব'। এটি প্রথম সাহিত্যে ব্যবহার করেন কবি মুহাম্মদ ইকবাল।‘ইনকিলাব’ শব্দটি আরবি ‘ইনকিলাব’ থেকে এসেছে, যার অর্থ পরিবর্তন, উলটপালট বা বিপ্লব। আরবি থেকে এটি ফারসি, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় প্রবেশ করে এবং পরে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হতে শুরু করে। বাংলায় ‘ইনকিলাব’ শব্দের অর্থ বিপ্লব বা আমূল পরিবর্তন। সাধারণত রাজনৈতিক বা সামাজিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এখন প্রশ্ন হলো বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক শব্দ ব্যবহার না করে কেনো ইনকিলাব জিন্দাবাদ ব্যবহার করা হল? আমার মনন এবং জ্ঞানে এক্ষেত্রেও দুটি কারন খেজে পেয়েছি।যার মূল কারন শব্দটির জোস বিপ্লবীদের মানসিক ফিটনেস বৃদ্ধিতে সহায়ক হিসেবে ভূমীকা রেখেছে।ইনকিলাব জিন্দাবাদ শব্দের ব্যবহারে বিপ্লবী আবেগ যতটা না প্রভাবিত করেছে বিপ্লব দীঘজীবি হোক শ্লোগানটি ততটি আবেগ সৃষ্টিতে সক্ষম হতো না।কারন বিপ্লব দীঘজীবি হোক শ্লোগানটি সমাজতান্ত্রিক দল গুলো ব্যবহার করে থাকে।এই শ্লোগান ব্যাবহার তখনকার গণমানুষকে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন বলে বিভ্রান্ত করতে পারতো।আর এই কারনেই বিকল্প শ্লোগানের জরুরী প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছেলো।‘ইনকিলাব’ শব্দটি আরবি থেকে ফারসি, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় প্রবেশ করে এবং পরে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হতে শুরু করে।দ্বীতিয় কারনটি হলো ইনকিলাব জিন্দাবাদ একটি ঐতিহাসিক শ্লোগান।ঐপনিবেশিক ইংরেজদের হটাতেই উপমহাদেশের বিপ্লবীরা প্রথম ইনকিলাব শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।এই স্লোগানটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা পায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময়। ভারতীয় উপমহাদেশে বিপ্লবী নেতা ভগত সিং ও তাঁর সহযোদ্ধারা এই স্লোগানকে ব্যাপকভাবে প্রচার করেন। ১৯২৯ সালে দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপের পর তিনি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দেন, যা পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রামের এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে।ভগত সিংয়ের মাধ্যমে এটি গণমানসে গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে।পরবর্তীতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে শ্লোগানটি গুরুত্বপূন হয়ে ওঠে।আমি মনে করি বিপ্লবীরা শ্লোগানটির ঐতিহাসিক পেক্ষাপট এবং গুরুত্ব বিবেচনা করেই শ্লোগানটি গ্রহণ করেছিলো।বাংলা ভাষায় ‘ইনকিলাব’ শব্দটি আজও রাজনৈতিক আন্দোলন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও পরিবর্তনের আহ্বানে ব্যবহৃত হয়। এটি কেবল একটি শব্দ নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও নতুন সমাজব্যবস্থার স্বপ্নের প্রতীক। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ তাই শুধু একটি স্লোগান নয়—এটি সংগ্রাম, সাহস ও আশার এক ঐতিহাসিক ধ্বনি।

এককথায় বাংলা ভাষায় শব্দের ভান্ডার অপ্রতুল। বেশিরভাগ শব্দ বিভিন্ন ভাষা থেকে গ্রহন করা।সুতরাং আরবী শব্দ গ্রহনে আমাদের কোন বাধা থাকবার কথা নেই। এক পক্ষ মনে করছে, বাংলা ভাষার বিশুদ্ধতা রক্ষায় বিদেশি শব্দের স্লোগান পরিহার করা উচিত।কিন্তু আমার মনে হয় তারা যে কলিকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীর সহায়ক যারা বাংলা ভাষা থেকে মুসলমানদের ব্যবহার করা শব্দগুলোকে সাহিত্য থেকে বাদ দিতে উৎসাহী এবং সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করতে আধিপত্যবাদী মানসিকতার লেজুরবৃত্তি করেন। আপনি গভীরভাবে ভেবে দেখেন কোনো শব্দ বা স্লোগান যখন লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসে মিশে যায়, তখন সেটি ভাষার গণ্ডি ছাড়িয়ে জনগণের সম্পদে পরিণত হয়।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:১৯
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধানের বেপারী খালকেটে নৌকা আনলে ধান লুট হতে পারে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৩৬



জুলাই যোদ্ধা নৌকা ডুবিয়ে ভেলায় চড়িয়ে ধান ভাসিয়েছে।এখন ধানের মালিক খালকেটে নৌকা আনলে নৌকার মাঝি নৌকায় করে ধান লুট করে নিয়ে যেতে পারে।প্রসঙ্গঃ সজিব ওয়াজেদ জয় একত্রিশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামী মরমী সাধনা সুফীবাদ নিয়ে একটি ধারাবাহিক লেখা***** ১ম পর্ব : এক মহিয়সি সুফী সাধিকা নারী রাবিয়া বসরী (রহ.)

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:৩৩


রাবিয়া বসরী (রহ,) কে নিয়ে আলোচনার পুর্বে সুফিবাদ কী এবং সুফিবাদের ইতিহাস নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করে নেয়া হল। (এখানে উল্লেখ্য এ পোস্টে দেয়া রাবিয়া বসরী(র,) সম্পৃক্ত সবগুলি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সহজ সরল জীবনযাপন করা ভীষণ জরুরী

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:৪২



কমনসেন্স বাড়ানো কিচ্ছু নেই।
এটা বয়সের সাথে সাথে অটোমেটিক বাড়তে থাকবে। জন্মের পর থেকেই মানুষ শিখতে থাকে। আমি এটুকু বয়সে এসে বুঝতে পেরেছি, মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শায়খে আকবর মহিউদ্দিন ইবন আরাবি (রহ: ) - এর বয়ানে সাওম পালনের ভিন্নতর অর্থ

লিখেছেন সাজিদ উল হক আবির, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:১৭

পৃথিবী জুড়ে মুসলিম সম্প্রদায় রমজান মাসের রোজা পালন করছে। রমজান আর রোজা বলতেই আমাদের মতো সাধারণ মুসলিমদের মনে কোন কোন শব্দ হুট করে চলে আসে? ইফতার, সেহরি, দিনে রোজা, রাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথের গল্প 'মধ্যবর্তিনী'র রিভিউ

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৯



স্বামী স্ত্রী একই খাটে শুয়ে আছে।
মাঝখানে অনেকখানি জায়গা খালি পড়ে আছে। অর্থ্যাত দূরত্ব! দুজন মানুষ পাশাপাশি শুয়ে আছে। তাদের মধ্যে ভালোবাসা নেই। এরকমই একটা গল্প 'মধ্যবর্তিনী'। লিখেছেন গ্রেট রবীন্দ্রনাথ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×