আঙ্গুরীর ঈদ আনন্দশ্রু
জাহাঙ্গীর বাবু
ক্লাসের সব শেষের বেঞ্চের এক কোনে বসে আঙ্গুরী।ছাত্রী মোটামুটি। পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ে।গায়ের পোষাকে কালো কালো তিলক স্পষ্ট।কেউ পাশে না বসলেও নুসরাত বসে তার সাথে।অবশ্য একটি নির্দিষ্ট ক্লাস শেষ হওয়ার একটু আগে। কারন,নুসরাত প্রথম বেঞ্চে না বসলে টিচারদের সব কিছু শুনতে পায়না। ছোট বেলার অভ্যাস প্রথম বেঞ্চে বসার।আবার আঙ্গূরীর জন্য ও ভীষন মায়া লাগে।কেউ বসেনা তার পাশে।মমতা ম্যাডামের ক্লাসেই নুসরাত আঙ্গুরীর পাশে বসার সুযোগ নেয়।মমতা ম্যাডাম আঙ্গূরীর খেয়াল রাখেন সব সময়।
এসেছে কুরবানীর ঈদ। কাল থেকে ছুটি।
লেইজারের সময় কুসুম, সীমি, নোহা বলছিলো তাদের বাবা কে কত টাকা দিয়ে কিনেছে কুরবানীর গরু। নুসরাতের এ সব ভালো লাগেনা। গত রাত নুসরাত তার বাবার কাছে শুনেছে, কুরবানী ইতিহাস। কেমন করে প্রিয় পুত্র ঈসমাইল আঃকে পিতা ইব্রাহীম আঃ কুরবানী দিয়েছিলেন,আল্লাহর হুকুমে কি করে দুম্বা কুরবানী হলো।কেমন করে কুরবানী গোস্ত দিতে হয় আত্মীয় পরিজনদের, দরিদ্রদের।কুসুম, সীমি, নোহা আসে নুসরাতের কাছে, জিজ্ঞেস করে তাদের গরুর দাম ,কতো বড় কিনেছে তাদের ধনী বাবারা। নুসরাত জবাব দেয়,দাম আর সাইজ হচ্ছে বড়াই করার জন্যে,অহংকার করে এ সব করা ঠিক নয় আল্লাহ নারাজ হন।
নুসরাতের কাছে পাত্তা না পেয়ে ওরা যায় আঙ্গুরীর কাছে।ওরা আঙ্গুরীর পোষাক নিয়ে তিরস্কার করে।কুরবানী দিতে পারবেনা বলে হাসাহাসি করে।নুসরাত এসে পাশে দাঁড়ায় আঙ্গুরীর। ভেংচি কেটে চলে যায় ধনীর দুলারীরা।
ঈদের দিন নুসরাতদের গরু জবাই হয়ে গেছে।নুসরাতের দাদা দাড়িপাল্লায় মেপে কাগজের তালিকা দেখে প্যাকেট করছেন।তার বাবা সাহায্য করছেন নুসরাতের দাদাকে। নুসরাত কিছু বলতে চায়,বেশ কয়েক বার আব্বু বলে ডাকে,কিন্তু কিছু বলে না।পরে নুসরাতের বাবা বলে কি,কিছু বলবি মা।
নুসরাতের জবাব, আব্বু একটা প্যাকেট আমায় দিবে।
তুমি প্যাকেট দিয়ে কি করবে?
আমার বান্ধবী আঙ্গুরীকে দিবো।
ও তাই,
নুসরাতের দাদা ভাই,খুব খুশী হন নাতিনের কথায়। একটি গোস্তের প্যাকেট তুলে দেন নুসরাতের হাতে।নুসরাত ঘরে গিয়ে তার একটি নতুন জামা বের করে ওয়্যারড্রোব থেকে। বড় আপু মারজানকে বলে তার সাথে যেতে।দু 'বোন মিলে একটা রিক্সা নিয়ে তার খাতায় লেখা ঠিকানা ধরে চলে যায় আঙ্গুরীর কাছে।
আঙ্গূরী থাকে শহরের পাশে ঝিলের উপর পাটাতনের বস্তিতে। দূর থেকে একজন দেখিয়ে দেয় তার ঘর। দু'বোন নুসরাত মারজান টিনের একটা দরজা টেনে উঁকি দেয় ভেতরে। আঙ্গুরী বসে আছে।মেঝে তাদের কাঠের পাটাতন।কাঠের তক্তার ফাঁকে দেখা যায় শহরের বর্জ্য।আঙ্গুরী তাকিয়ে আছে সে দিকে। ঘরে পুরানো দিনের একটা বাক্সের উপর কয়েকটা বই খাতা। পাশে ছেড়া চাদর মোড়ানো কাঁথা। দুটা প্লেট,পুরানো কয়েকটা হাড়ি পাতিল।প্লাস্টিকের জগ,একটা মগ।
আঙ্গুরীকে দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে।কয়েক সেকেন্ড।অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।মারজান, নুসরাত আঙ্গুরীকে জড়িয়ে ধরে।ঈদ মোবারক জানায়। আঙ্গুরীকে নুসরাতের স্যালোয়ার,কামিজ পড়ায়।মারজান সুন্দর করে হিজাব বেঁধে দেয়, আঙ্গূরীর চোখে আনন্দাশ্রু।
ঘড়ির কাঁটায় বিকাল চারটা তখন। দরজা ঠেলে প্রবেশ করে আঙ্গুরীর মা। তিনিও হতবাক।আঙ্গুরীকে নতুন পোষাকে দেখে এতো খুশি হন, আনন্দ আশ্রুতে গাল ভাসে তার।আঙ্গুরী পরিচয় করিয়ে দেয় তার মাকে নুসরাত আর মারজানের সাথে। কাপড়ের আচঁলে ঢেকে খাবার বের করে।তিনি কাজ করেন এক ধনীর বাসায়।ইতস্তত ভাষায় জানতে চাইলেন,কিছু যদি মুখে দেয় এই খাবার থেকে।নুসরাত, মারজান, আঙ্গূরী আর তার মা এক সাথে খাবার খায়।
আঙুরীর মায়ের অনুমতি নিয়ে আঙ্গুরীকে নিয়ে আসে তাদের বাসায়। নুসরাতের দাদা দাদু বাবা মা খুব খুশী হয় নুসরাতের মহানুভবতায়।অহংকার নয় ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত কুরবানী।
গল্পটি কাল্পনিক।আমাদের সন্তানদের মন মানসিকতা কিংবা আমাদের সন্তানদের মানবিক গুনাবলীতে বড় করা উচিৎ নয় কি?
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে আগস্ট, ২০১৮ রাত ৮:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



