somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিএসএফ সিনড্রোম পুলিশেও!

০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১২ সকাল ১০:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :





কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃআমার দেশ

ভারত সরকার-দরবারে দিল্লি এবং সেখানকার সুপ্রিমকোর্ট হঠাত্ ফেসবুক-ইন্টারনেটের বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে পড়েছে—তার মাজেজা প্রথমে আন্দাজ করতে পারিনি। অবাকই হয়েছিলাম। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র—মুক্তমতের দেশ বলে নিজেদের দাবি করে যারা সকাল-সন্ধ্যা জিকির করে চলেছে, তাদের কণ্ঠেই কিনা মুক্তমতের অনিঃশেষ প্রবাহ ইন্টারনেটবিরোধী জিগির। তারা কনট্রোল করতে চায় ইন্টারনেটকে। ফেসবুক, টুইটারসহ অন্যান্য সামাজিক সংগঠনে ছুরি-কাঁচি চালাতে চায় ভারতের সুপ্রিমো। তারা বলছে খুব বাড়াবাড়ি হচ্ছে। মহান মহান নেতানেত্রীদের চালচরিত্র নিয়ে অকথা-কুকথা লেখা হচ্ছে। পাবলিকের মুখে কোনো লাগাম নেই। যা ইচ্ছা তাই লিখছে, বলছে।
সুতরাং তালা দিতে হবে ফেসবুকে। ‘লক’ করতে হবে ইন্টারনেট। জজ সাহেবরা জজিয়তি করে কতটা কী করতে পেরেছেন : আদৌ তালাবাজি করতে পেরেছেন কিনা, তার সর্বশেষ খবর রাখতে পারিনি।
তবে ইন্টারনেটে একটু তত্ত্বতালাশ করতে গিয়ে ভারত সুপ্রিমোর খ্যাপামোর কারণটা আন্দাজ করতে পারলুম।
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ওরফে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স বিএসএফের কলঙ্ক কাণ্ডকীর্তি নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে সারা দুনিয়ায়। সত্যি বলতে কী, ইন্টারনেট—এর ফেসবুক, টুইটার, অন্যান্য ব্লগ এখন মুক্তমতের মহাদুনিয়া। এগুলো এখন প্রিন্ট ও টিভি মিডিয়ার চেয়েও রাতারাতি মেগামিডিয়ায় পরিণত হতে চলেছে। জনমতের অমন মুক্তমঞ্চ আর কিছু নেই। পত্রপত্রিকা, দৈনিক কাগজে লিখতে চাইলেও সাধারণ মানুষ চটজলদি দু’এক লাইন লেখার সুযোগ পান না। সাময়িক প্রতিক্রিয়ানির্ভর পাতা ঢাকাতেই দৈনিক আমার দেশ ছাড়া আর কোনোটিতে নেই।
সেখানে ইন্টারনেটে ব্লগে মন চাইলেই দুটো লাইন লেখা যায়। তা পড়ছেও হাজারো পাঠক। তারাও তাজা-টাটকা মন্তব্যও করছে।
বিএসএফের কলঙ্ক-কাণ্ড নিয়ে নানা ব্লগে ঢেউ বইছে ঘৃণার। অবাক হয়ে দেখলুম, অনেকে বিএসএফ বলতে এখন অন্য কিছু বলছেন। এক ব্লগার লিখেছেন, বিএসএফ মানে হলো—ব্রুটাল স্লটারার ফোর্স, যার অর্থ দাঁড়ায় : পাশবিক খুনি বাহিনী। ব্লগার অবশ্য এই বিএসএফের বাংলা অর্থও লিখে দিয়েছেন : জানোয়ারসুলভ ব্যাপক হত্যাকারী ফোর্স।
আরেক ব্লগার বলছেন : ব্রুট সেমিবারবারিয়ান ফোর্স=বিএসএফ=পশুবত্ অর্ধ সভ্য বাহিনী। মন্তব্য, পাল্টা মন্তব্যের এখানেই শেষ নয়; আরও কিছু দৃষ্টান্ত : বিএসএফ=ব্রুটাল শেইমলেস ফোর্স= বর্বর বেহায়া বাহিনী। আরেকজনের মতে, ব্রুট স্ল্যাংগি ফোর্স পশুবত্ ইতরভাষী বাহিনী।
স্ল্যাংগি শব্দটির সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না। ডিকশনারী খুলে দেখলাম SLANGY মানে ইতর, অসভ্য বুলি আওড়াতে যারা অভ্যস্ত। বিস্ময়ে স্তম্ভিত হলাম ফেসবুক, ব্লগের এইসব ছোট্ট ক্ষুরধার মন্তব্য দেখে। কী অপরিসীম ক্ষমতা এই দু’তিনটি শব্দের মন্তব্যের। হাজার হাজার শব্দ লিখেও যে প্রতিক্রিয়া দেখানো সম্ভব নয়; এসব অখ্যাত নামকরণবিদগণ তারচেয়েও তীব্রতম প্রতিক্রিয়াকে তুলে ধরেছেন মাত্র তিনটি শব্দে।
আর সেই অনুভূতি, প্রতিক্রিয়া, ঘৃণা, নিন্দা কোনো কাগজে ছাপা না হয়েও ছড়িয়ে পড়ছে সারা দুনিয়ায়।
দিল্লির বাদশা গোষ্ঠী; উজির নাজির নায়েব এবং কাজীরা এই ধুন্দুমার ‘অন্তর্জ্বালা’কে নিয়ে উদ্বিগ্ন-উত্কণ্ঠিত হবেন খুবই স্বাভাবিক। তারা তো আর আমাদের ডিজিটালাইজড মহাজোট সরকারের গরু-ছাগল বিশারদ মন্ত্রীদের মতো নন যে, গরু-ছাগল ইত্যাদি চিহ্ন চিনেই মন্ত্রীর তখতে বসে গেছেন। কম্পিউটার, কী-বোর্ড, মাউস কী জিনিস জানেন চেনেন না—শুনেছি এমন অনেক বিজ্ঞ মন্ত্রী আছেন বর্তমান ডিজিটাল মন্ত্রিসভায়। অবশ্য ‘ডিজিটাল বলতে কেন আমরা খামোখা কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ইঁদুরকে বুঝতেছি! যে অফিসের ডিজি সাহেব টাল অর্থাত্ যিনি নিয়মিত মদ খেয়ে টালমাটাল হন, সেটিকে ‘ডিজিটাল অফিস’ বলা যেতে পারে।’ এই মন্তব্যটিও ইন্টারনেট থেকে পাওয়া।
যা হোক, ইন্টারনেট = অন্তর্জাল জগতে নেতানেত্রী এবং তথাকথিত এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে যেসব মন্তব্য-পাল্টা মন্তব্য চলছে তা কহতব্য নয়। আমি কেবল প্রতিবেশী দেশের ওপর দিয়েই কিঞ্চিত্ ব্যাখ্যা করলাম। স্বদেশে আর ভিড়লাম না।

২.
এবার আজকের লেখার শিরোনামে ফিরে যাই। বিএসএফ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হত্যা-নির্যাতনযজ্ঞ নিয়ে বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল নিন্দা চলছে, সেখানে আমাদের ডিজিটাল পুলিশকে কেন বিএসএফ সিনড্রোমে পেয়ে বসল। পাশের দেশ থেকে ট্রাকড্রাইভার বাহিত হয়ে এইডসসহ নানা রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছে সীমান্তের এপারে; কিন্তু বিএসএফ-রোগ এপারে এলো কেমন করে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মতো ‘ডেডলি ফ্রন্টিয়ার’ বিরল হলেও ‘মৃত সীমান্ত’ কিন্তু ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে লাশ ফেলার সীমান্ত আর পাকিস্তানের সঙ্গে ‘মৃত সীমান্ত’ পরিচালনা করছে ভারত। বন্ধু সীমান্তে লাশ ফেলছে আর চিরবৈরী ‘ডেড ফ্রন্টে’ তারা ভুলেও গুলি ছুড়ছে না। কেননা, ঢিলটি ছুড়লে যে পাটকেলটি খেতে হবে। এক পাকিস্তানির লাশ ফেললে বিনিময়ে এক ভারতীয়কেও মূল্য দিতে হবে।
আমরা এক্ষেত্রে অতিউদার। আমরা জান দিতে অভ্যস্ত। ’৭১ সালে আমরা পাকিস্তানি ব্রুটাল হানাদারদের ৩০ লাখ জীবন দিয়েছিলাম। এবার ভারতীয় বিএসএফের গুলির নিচে অকাতরে জীবন বিলিয়ে চলেছি।
বাঙালির অন্তর- দার্শনিক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেই গেছেন, নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান—ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।
আমরা নিঃশর্ত চিত্তে প্রাণ দিতে দিতে নিঃশেষ হতে হতে অক্ষয় হতে চলেছি। আর আমাদের প্রভাবশালী এক ডিজিটাল মন্ত্রী তো বিএসএফকে ব্লাংক চেক দিয়েছেন। সীমান্তে লাশের কাফেলা; ফেলানীকে পাশবিক নির্যাতন, গুলি হত্যা করে ঝুলানো হলো কাঁটাতারে অর্থাত্ কাঁটাতার তো নয়, ফাঁসির মঞ্চ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের হাবিবুর রহমান হাবুকেও লাশ বানাতে চেয়েছিল; কিন্তু যুবকটি ব্রুটাল সেমিবারবারিয়ান বাহিনীর অসভ্য নির্যাতনের শিকার হয়ে ভাগ্যগুণে জান হাতে ফিরল—বিশ্ববাসী আঁতকে উঠল সেই অসভ্যতা দেখে— আর মন্ত্রী বাহাদুর বললেন, সীমান্তের এইসব তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে মহাজোট সরকার মোটেই চিন্তিত নয়। এসব ঘটনা ঘটেই থাকে, ঘটতেই পারে। এ নিয়ে এত ভাবিত হওয়ার কিছু নেই।
একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের মন্ত্রী যখন এমন আত্মঘাতী মন্তব্য করেন, তখন পরদেশী হানাদাররা বাড়াবাড়ি করবে, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু হাবীবের সঙ্গে কি কেবল বাড়াবাড়ি হয়েছিল, নাকি তার চেয়ে বেশি! মাননীয় মন্ত্রী কি দেখেছেন বিএসএফ ব্রুটালিটি (bsf brutality) নামের সেই ভিডিওটি কিংবা ভারতের এনডিটিভি সম্প্রচারকৃত সংক্ষিপ্ত ফুটেজ?
ডিজিটালমন্ত্রী, নিশ্চয়ই তিনি ইউটিউবে দেখে থাকবেন ১২ মিনিটের ভিডিওটি। যদি দেখে থাকেন সজ্ঞানে অমন মন্তব্য তিনি কেমন করে করলেন! মাননীয় মন্ত্রীর জন্য ভিডিওচিত্রটি এই কলামে তুলে ধরছি।
বিএসএফ ব্রুটালিটির ভিডিও-তে দেখা যায় কয়েকজন বাংলাদেশীকে ধাওয়া করছে বিএসএফ। একপর্যায়ে মুরগি ধরার মতো কয়েকজন মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ধরে ফেলে হাবিবুরকে। এ যেন মানুষ শিকারের দৃশ্য। ট্রাক্টরে করে বিএসএফ টর্চার ক্যাম্পে আনার পর তাকে কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখা হয়। হাবিবুরের তখন অসহায় অভিব্যক্তি। কিংকর্তব্যবিমূঢ় সে। আতঙ্কে জড়ো সড়ো। তার ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে—তার কিছুই আন্দাজ করতে পারে না সে। তার চোখে মুখে ক্রমশ গাঢ় ভয় দানা বাঁধতে থাকে। ও দিকে এক অসহায় বাংলাদেশীকে শিকার করতে পেরে বিএসএফের সদস্যদের কণ্ঠে উল্লাস। বাংলাদেশবিরোধী বিভিন্ন কটূক্তি শ্লেষ মাখানো সংলাপ। মাদার চোদ ইত্যাদি গালি বারবার উচ্চারণ করতে থাকে তারা। সর্বভারতীয় নানা জনপ্রিয় চ্যানেলে যে হিন্দি সিরিয়ালগুলো দেখে আমরা নিত্য আপ্লুত, আবেগাক্রান্ত- সেই হিন্দিতেই উচ্চারিত হয় বাংলাদেশ, মুসলমানবিরোধী নানা খিস্তিখেউর।
জবাইয়ের আগে যেভাবে গরুকে বাঁধা হয়- হাবিবুরের পা সেভাবে রশি দিয়ে বাঁধা হয়। পা বাঁধা অবস্থায় লাথি দিয়ে বলা হয়—হাঁট শালা হাঁট। হাবিবুর অসহায় ভঙ্গিতে হাঁটার চেষ্টা করে। সঙ্গে সঙ্গে লাথি। এ পর্যায়ে মোটরসাইকেলের আওয়াজ। উন্মত্ত-উল্লসিত বিএসএফ সদস্যদের সঙ্গে যোগ দেয় আরও একজন টর্চার এক্সপার্ট। নির্যাতনস্থল ক্যাম্পটি সীমান্তবর্তী খোলা জায়গায়। এ পর্যায়ে নির্যাতনের ধরন নিয়ে হানাদারদের মাঝে বািচত চলে। তারা চা খেতে খেতে চূড়ান্ত করে কোন পদ্ধতিতে টর্চার হবে। একপর্যায়ে হাবিবুরের যৌনাঙ্গে পেট্রোল বা গরম কিছু ঢেলে দেয় তারা। আতঙ্কে ককিয়ে ওঠে হাবিবুর।
এ পর্যায় হাবিবুরকে লাথি গুঁতা চলতে থাকে। কেউ একজন শিকার হাবিবুরকে চা খেতে দেয়া যায় কিনা তা নিয়ে রসিকতাপূর্ণ মন্তব্য ছুড়ে দেয়।
উচ্চহাস্য সহকারে আরেক বিএসএফ সদস্য হিন্দিতে জবাব দেয়—শালা মুসলমান। এ শালারা গরু জবাই করে খায়। এই শালাদের ‘চা মাত পিলা’—অর্থাত্ এগুলোকে চা খাওয়াস না।
নিষ্ঠুর নির্যাতকদের চা পান পর্ব শেষ। এরই মধ্যে হাবিবুরের লুঙ্গি জামা অন্তর্বাস সব খুলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করা হয়েছে। ভিডিওতে পা বাঁধা হাবিবুরের যৌনাঙ্গসহ সবকিছু খোলামেলা দেখা যায়। দাঁড়াতে বলা হয় তাকে। হাঁট হাঁট। হাঁটার উপায় নেই হাবিবুরের। তখন এক বিএসএফ সদস্য তার পরনের লুঙ্গি ছিঁড়ে পাকিয়ে রশি বানায়। একজন অন্তর্বাস দেখিয়ে নানা অশ্লীল মন্তব্য খিস্তি করে।
হাবিবুরের দু’হাত পেছনে নিয়ে পিঠমোড়া করে বাঁধা হয় বানানো রশি দিয়ে। তারপর বাঁধা হাতের ফাঁক গলিয়ে ঢুকিয়ে দেয়া হয় বাঁশ।
আবারও হাঁট হাঁট নির্দেশ। লাথি গুঁতা মারতে মারতে ঘানির বলদের মতো হাঁটানোর চেষ্টা চলে তাকে। কৌতুক তামাশার আসর বসে হাবিবুরকে নিয়ে। একজন উল্লসিত কণ্ঠে বলে, পায়ে ওর রশি; হাঁটবে কেমনে শালা। রশি খোল। লাথি দিয়ে ফেলে দেয়া হয় হাবিবুরকে। হ্যাঁচকা টানে পায়ের রশি খুলে দেয় একজন। হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে হাবিব। তারপর শুরু কয়েকজন বিএসএফ সদস্যের সম্মিলিত হামলা। বিরামহীনভাবে বিবস্ত্র হাবিবুরকে পেটাতে থাকে তারা। পেটাচ্ছে আর পেটাচ্ছে। এ নিষ্ঠুরতা যেন থামার নয়। হাবিবুর তখন গুমরে কাঁদছে। গোঙাচ্ছে। চিত্কার করে মাকে ডাকছে। বলছে—মা রে, মাগো, মোরে মাইরা ফালাইল। গোঙাতে গোঙাতে বলে, সে আর কখনও আসবে না। মায়ের নামে কসম কাটে। বলে, কেন আমি এদিকে আসলাম।
একদিকে নির্যাতন চলছে, আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হাবিবুর কাঁদছে, অন্যদিকে বিএসএফ সদস্যরা একদল নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে শিকারের ওপর। অন্যরা হায়েনার মতো হেসেই চলেছে। পিটুনি থামছে না। হাসিও থামছে না। গোঙানিও তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
শোনা যাচ্ছে নানা ভর্ত্সনামূলক সংলাপ—হাবিবুর যে ঘুষ দেয়নি তা নিয়ে বিএসএফের খেদোক্তি।
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই বীভত্স নির্যাতনের সময় বিএসএফের একজন টর্চার পরিচালকও ছিল সেখানে। তার নির্দেশে চলছিল পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতা। ওদিকে নির্মম নির্যাতনের দৃশ্য ভিডিও করা হচ্ছিল। ভিডিওকারীকে নিয়ে হাসিঠাট্টা চলে। তাকে বলা হয়, ভিডিও করা থামিয়ে পেটানোর কাজে যোগ দিতে। তবুও চলতে থাকে ভিডিও করা।
একপর্যায়ে টর্চার টিম লিডার অর্ডার দেয় পিটুনি থামাতে। সামান্য বিরতি। ওরা আলোচনা করে নেয় নতুন কিভাবে টর্চার হবে। এরই ফাঁকে ফাঁকে হাবিবুরের যৌনাঙ্গ লক্ষ্য করে, গুহ্যদ্বারে লাঠির গুঁতা চলতে থাকে। দেখা যায়—তার বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রক্তাক্ত। এক পর্যায়ে হাবিবকে শোয়ানো হয়। এক বিএসএফ তার বুকের ওপরে চেপে বসে। বিএসএফ সদস্যটি হাবিবুরের দু পা বেঁধে দু’পায়ের তালু এক করে ধরে। আবার শুরু হয় তালুতে ভয়ংকর পিটুনি। গোঙাচ্ছে তরুণটি। নিষ্ঠুরতার চরম পর্যায়ে তার জ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার জোগাড়। শোনা যায় চাপা কান্না।
এখানেই শেষ নয়। টর্চার পরিচালনাকারীর নির্দেশে এরপর উল্টানো হয় হাবিবুরকে। আবার উপর্যুপরি পিটুনি।
নির্যাতনের এই ভিডিওটি যেন শেষ হওয়ার নয়। দৃশ্যাবলী দর্শন ও সহ্য করা যে কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষেই দুষ্কর। আর আমাদের একজন ডিজিটাল মন্ত্রী বলছেন-এটা খুবই স্বাভাবিক। এটা ঘটতেই পারে। এ নিয়ে তারা ভাবিত নয়। স্পর্ধার একটা সীমা আছে। একজন বাংলাদেশীর ওপর এমন বর্বরতার পর যিনি বলতে পারেন- এটা তুচ্ছ ব্যাপার। তার জন্য কবি আবদুল হাকিমের কবিতাটি মনে পড়ছে- যেজন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সেজন.... নির্ণয় না জানি।
প্রতিদিনই সীমান্তের জনপদে পাখির মতো গুলি করে মারা হচ্ছে বাংলাদেশীদের। ভারত বড় গলায় বলছে, এরা ক্রিমিনাল, চোরাচালানি।
২০১১-এর ৭ জানুয়ারি তারা বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীর স্মারক হিসেবে বর্ষ শুরুর উপহার দিয়েছিল কাঁটাতারে ঝোলানো কিশোরী ফেলানীর লাশ। তারপরও বাংলাদেশ সরকার একের পর এক কাঁধে তুলে নিয়েছে অসংখ্য লাশ। বিএসএফের হামলায় আহত পঙ্গু হয়েছে হাজারও বাংলাদেশী। সুদৃঢ় মৈত্রীচুক্তির সম্মানার্থে বারবারই বসেছে পতাকা বৈঠক। হয়েছে ঢাকা-দিল্লি বিজিবি-বিএসএফ শীর্ষ বৈঠক।
বিএসএফের ডিজি প্রতিবার অম্লান কণ্ঠে বলেছেন, কোনো বাংলাদেশীকে আর গুলি করে হত্যা করা হবে না। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তকে নো কিলিং জোন করার কথাও সাড়ম্বরে বলেছেন। বিজিবি ডিজি সেই প্রতিশ্রুতির মাল্য গলায় বয়ে এনে আত্মতৃপ্তিতে ভুগেছেন। কিন্তু থামেনি হত্যাকাণ্ড। থামেনি নিষ্ঠুর নির্মম অত্যাচার। বছরের শুরুতে উপহার পেয়েছি লাশ। বছর শেষে মিলেছে হাবিবুরকে উলঙ্গ নির্যাতন কাণ্ডের মতো ‘সবক।’
সাফাই গাইছেন সীমান্তে যাদের মারা হচ্ছে তারা ক্রিমিনাল। অর্থাত্ নিষ্পাপ কিশোরী ফেলানীই হোক কিংবা হতদরিদ্র হাবিবুর — এরা সবাই ক্রিমিনাল। এরা সকলেই গুলি করে হত্যার যোগ্য।
ভারতীয়রা ভারতের পক্ষে বলছেন, তার না হয় একটা যুক্তি আছে; কিন্তু আমাদের মন্ত্রী একই সুরে সেই কথার প্রতিধ্বনি যখন তোলেন তা আমরা কেমন করে মেনে নেই।
তার কথায় তো আমরা উন্নত শির হতে পারছি না। বরং আমাদের মাথা হেঁট হচ্ছে। এই নতজানু ভীরুতায় আমরা ভীষণ কাপুরুষ, আত্মমর্যাদাবোধহীন জাতিতে পরিণত হচ্ছি।
যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইট ওয়াচ পর্যন্ত বিএসএফের ওই বর্বরতার বিচার দাবি করেছে অবিলম্বে।
তারা বলছে নির্যাতনকারী নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অবিলম্বে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের কাছে সরকারের পক্ষ থেকে এ বার্তা দিতে হবে যে, এ ধরনের নির্যাতন আর সহ্য করা হবে না।
তারা বলছে হাবিবুর রহমান নামের এক বাংলাদেশী নাগরিককে উলঙ্গ করে বর্বর নির্যাতনের যে দৃশ্য প্রচারিত হয়েছে তা রীতিমতো ভয়ঙ্কর এবং লোমহর্ষক।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক মিনাক্ষী গাঙ্গুলি বলছেন, এ লোমহর্ষক দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছে বিএসএফ এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন।
কোলকাতাভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ ও একই সুরে বলছে সীমান্তে বিএসএফ সদস্যরা হত্যা নির্যাতন চালানোসহ মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করছে। এসব অপরাধের ব্যাপারে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারত সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
সীমান্ত পারাপারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সাধারণ মানুষ নিয়মিত সীমান্ত পার হয়। অধিকাংশ মানুষ সীমান্ত পার হয় তাদের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে। তবে কিছু মানুষ চোরাচালানির সঙ্গে যুক্ত। মাদক চোরাচালান, মানব পাচার এবং জাল টাকা সরবরাহের মতো অপরাধের সঙ্গে বিএসএফ সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কলকাতার সুরক্ষা মঞ্চ যে বর্বরতার নিন্দা করল অকুণ্ঠচিত্তে, অসমসাহসে; সাত সাগর তের নদীর ওপারে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ পর্যন্ত যার বিরুদ্ধে সোচ্চার, ভারতীয় হয়েও মীনাক্ষী গঙ্গোপাধ্যায় পর্যন্ত যে সত্য লুকোচ্ছেন না; আর ডিজিটালমন্ত্রী কিনা সাফাই গাইছেন তার পক্ষে। সত্যি! ডিজিটাল সরকারের পক্ষে সবই সম্ভব। মন্ত্রী বাহাদুর না হয় নানা হিসাব-নিকাশ করেই ওই আত্মঘাতী বয়ান দিয়েছেন। তিনি জেনেশুনেই বিষপান করছেন। বিএসএফের উলঙ্গ করার সিনড্রোমকে তার কাছে ‘মধুপ্রমেহ’ বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু ভয়ঙ্কর ঘটনা হচ্ছে এই—এই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আমাদের পুলিশও আক্রান্ত হতে চলেছে।
২৯ জানুয়ারি চাঁদপুরে গণমিছিলে শুধু লিমনকে আমাদের পুলিশ গুলি করে আহত করে ক্ষান্ত হয়নি, অভিযোগ রয়েছে, তাকে আছাড় মারা হয়েছে। মুমূর্ষু অবস্থায় তার ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। প্যান্ট খুলে সম্পূর্ণ নগ্ন করা হয়েছে। আমার দেশসহ অন্যান্য পত্রিকায় সেই নগ্ন ছবি ছাপা হয়েছে। ছবির সাক্ষ্যকে অস্বীকার করা যায় না। জলজ্যান্ত ছবি। আহতকে প্রাণের ছোঁয়া দিতে হাসপাতালে নেয়া হয়নি। নগ্ন লিমনকে চরম তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ভ্যানে তুলছে তিন পুলিশ। মাথায় গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত লিমনের বাঁচার আকুতি স্পর্শ করেনি তাদের। দেড় ঘণ্টা তাকে ভ্যানে ফেলে রাখা হয়। সেখানেই লিমনের মৃত্যু ঘটে বিনা চিকিত্সায়, অবহেলায়। বড় করুণ এই মৃত্যু।
এই মৃত্যু কোন অশনি সংকেত বহন করছে! উলঙ্গ করার সিনড্রোম কেন আছর করল পুলিশেও। এর জন্য দায়ী কে?
কে দিল পুলিশ কর্মীদের আশকারা! বন্ধুবেশী প্রতিবেশীর গুলির পর গুলি খেয়েও না হয় অখুশি নন সরকারের মন্ত্রীরা; কিন্তু ঘরের রক্ষকই যখন আমাদের প্রাণের ভক্ষক হয়ে উঠছে, তবে কি স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি আমরা ঘরে-বাইরে-সীমান্তে সর্বত্র হারাতে চলেছি!
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×