somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জাতীয় কতৃপক্ষ
আমি ভীষণ রকমের হিসেবী কিন্তু কিপ্টা না, সময় বদলায়, মানুষ বদলায় কিন্তু আমি বদলাই না। প্রেম, পাপ, সফলতা ও মৃত্যু এবং অন্যের সংসার নিয়ে ক্যান জানি আমার ব্যাপক চিন্তা হয়।

সুখ নামের অচল শব্দটি!

০৯ ই জুলাই, ২০১৬ দুপুর ১২:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



মফ:স্বলের লেখাপড়া শেষ করে রূপা ঢাকায় এসেছে। অনার্স নিয়ে পড়ছে। অসংখ্য নতুন মুখ। ক্লাসের রুটিনবাঁধা জীবন। ছেলেমেয়েরা টি, এস, সি তে দলবেধে বসে আড্ডা দিচ্ছে। এখানে পরস্পর পরস্পরকে জেনে নেবার সুযোগ, কখনো ক্লাসনোট বিনিময় করতে গিয়ে, কখনো কোনো সেমিনারে যুক্ত থাকতে গিয়ে ছেলেমেয়েরা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে।

রূপা চায় এমন একজন ওর মনের মানুষ হবে যার থাকবে গভীর জীবনবোধ ও প্রজ্ঞা। যাকে সবাই ঈর্ষা করবে। আশিক মাহমুদ সদ্য ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হয়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেছেন। আশিকের স্পষ্ট উচ্চারণ ও বিষয়ের উপস্থাপনা রূপাকে আন্দোলিত করেছে। চশমার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা অন্তর্ভেদী দৃষ্টি ওকে স্পর্শ করেছে।

আশিক একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত। এই কর্মকান্ডের সূত্র ধরে ক্রমশ ওরা নিবিড় হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধের উত্তাল সময়ে বাবা- মায়ের মতে ওদের বিয়ে হয়। ক'মাস সুখে সংসার করার পর আশিক যুদ্ধে চলে যায়। যে ক'দিন রূপা সংসার করেছিল সেখানে আশিক ছিল অত্যন্ত দায়িত্ববান। জীবনে আসে নতুন অভিজ্ঞতা।

যুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনীর প্রথম আক্রমণ বিশ্ববিদ্যালয় বুদ্ধিজীবীর উপর। এতে আশিকের কিছু বন্ধু শহীদ হন। কিছু লাশ এলে আশিক স্থির থাকতে না পেরে নিজেও মুক্তিযুদ্ধে নাম লেখালেন। যুদ্ধে যাবার পূর্বে যখন আশিক রূপার কাছে অনুমতি নিতে এলো তখন কোথা থেকে যেন সাহসের পাহাড় এসে ভর করে। হাসিমুখে ছোট্ট একটি কথায় স্বামীকে বিদায় দিল এই বলে -"আমার বিশ্বাস তুমি এবং এ দেশের সবাই সার্থক হবে এ যুদ্ধে, দেশ স্বাধীন হবেই। "

বাইরের আবহাওয়া তখন খুব খারাপ। আশিক ক্যাম্প থেকে বন্ধু সেলিম কে দিয়ে বলে পাঠালেন দেশে বাবা-মায়ের কাছে চলে যেতে। রূপা গেল না তার স্বামীর স্মৃতিজড়িত বাড়ি থেকে। তার কথা মরলে সে এ বাড়ি থেকেই মরবে।

আল্লাহ্‌র রহমতে রূপার কিছু হয়নি যুদ্ধে কিন্তু আশিক এক পা হারালো। দরজায় করাঘাত শুনে দৌড়ে এসে দরজা খুলতেই দেখে তার প্রাণপ্রিয় স্বামী ক্রাচে ভর দিয়ে দাড়িয়ে। রূপা চিৎকার করে কেঁদে উঠে বলে " আশিক এতো আমি চাইনি, এতো আমি চাইনি। "

পরোক্ষনেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, যাক, আমার স্বামীর পা হারিয়েছে সেতো দেশ স্বাধীন করবার জন্যে, এও কি কম গৌরবের। এরপর আর আশিকের চাকুরী করা হয় না। অনেক কষ্টে রূপার একটা চাকরি হয়। ওর আয় দিয়ে সংসার চলতে থাকে। এরপর দু'টো সন্তান আসে ওদের সুখের সংসারে। সংসার অনেক কষ্টে চালাতে হয়। এভাবে দিনগুলো কোনোমতে পার করে যাচ্ছিল রূপা।

সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে অর্নি মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে "মা আজ আমার জন্মদিন না?" চমকে ওঠে রূপা। জানলো কি করে ও? ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে ক'দিন আগে আশিক অর্নির সামনে বলেছিলো জানো ১৭ মার্চ আমাদের অর্নি মামনির বয়স সাতে পড়বে। সজল তখন বারান্দায় খেলছিল। দৌড়ে এসে বলল, মা সবাই জন্মদিন পালন করে বন্ধুদের বলে, আমরাও বলবো অর্নির জন্মদিনে।

ওরা শুনে ফেলেছে দেখে তাড়াতাড়ি রূপা বলে ছি: বাবা, জন্মদিন টন্মদিন করতে নেই। ওসব বড়লোকেরা করে। তোমরা বরং পরীক্ষায় ভালো করো তখন তোমাদের বন্ধুদের খাওয়াবো কেমন? রূপা লক্ষ্য করলো আশিকের মুখে একখণ্ড বেদনার মেঘ ছায়া ফেলেছে।

জন্মদিন, বিয়ে বার্ষিকী, ঘরোয়া জলসা ইত্যাদি উৎসব মুখর দিনগুলো আজ শুধু স্বপ্নের মতোই আবেশে জড়ানো স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়।

রূপার কষ্ট দেখে একদিন আশিক রূপাকে নিবিড় সান্নিধ্যে এনে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলেছিল "আমি যুদ্ধ করেছিলাম দেশ স্বাধীন করবার জন্য এবং তা করতে গিয়ে একটি পা হারিয়েছি। আর আজ তুমি যুদ্ধ করছো আমাদের এই সংসারের সকলকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য। এ যুদ্ধের যেন শেষ নেই। মাঝে মাঝে বড় ভয় হয় রূপা, এই যুদ্ধ করতে করতে যদি একদিন তোমাকেই হারিয়ে ফেলি। তখন আমি কাকে নিয়ে,কি নিয়ে বাঁচব।"

আশিকের ঠোঁটে আঙ্গুল চাপা দিয়ে রূপা বলেছিল, ও কথা বোলো নাগো, তোমার ভালোবাসা পেলে আমি সব দু:খ-কষ্টকে হাসিমুখে বরণ করে নেব।

ক'দিন পরে সজল এসে বলছে মা দু'মাসের মাইনে বাকি, অর্নি বলছে মা স্কুল ড্রেস না বানালে ম্যাডাম বলেছেন ক্লাসে ঢুকতে দেবেন না। রূপা বলে, হবে মা,সব হবে। ঘরে ঢুকে স্বামীকে ঔষধ খাওয়াতে গিয়ে দেখে শিশি খালি। মহাচিন্তায় পড়লো। হাতে তেমন টাকা নেই। এখনো মাসের ৮/১০ দিন বাকি।

চিন্তা করতে করতে ট্রাঙ্ক খুলে কাপড় তচনচ করে ওল্টাতে লাগলো কোথাও কোনো কাপড়ের ভাজে কোনো টাকা পাওয়া যায় কিনা। কিন্তু না কোথাও নেই। নিজের মনে গালি দিতে লাগলো, হায়রে স্বাধীন দেশ। যাঁরা দেশের জন্য প্রাণ দিলো, পঙ্গু হলো তাঁদের কোনো সাহায্য এলো না। তাঁদেরকেই এখন পথে বসতে হচ্ছে। সেই যে যুদ্ধের পর থেকে সুখের মুখ দেখিনা, আর কবে দেখব তাও জানিনা।

পেছনে কখন যে আশিক ক্রাচে ভর করে এসে দাঁড়িয়েছে রূপা তন্ময়তার মাঝে বুঝতেই পারেনি। রূপার পিঠে আলতো করে হাত রেখে বলে "আচ্ছা তোমার সুখ নামের অচল শব্দটিকে মুছে ফেলতে পারো? যদি পারো দেখবে অনেক স্বস্তি,অনেক শান্তি। "

আশিকের কথাগুলো রূপার কানে করুন কান্নার মতো শোনালো।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জুলাই, ২০১৬ দুপুর ১২:৩১
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৩২

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

প্রশ্নটি এখন আর নিছক কল্পনা নয়।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান Makkah Joint Defence Agreement-এ স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা জানেন না তাদের জন্য! কফি এনিমা (Coffee Enema)!

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৩

কফি এনিমা হলো মলদ্বার দিয়ে কোলন বা বৃহদন্ত্রে তরল কফি প্রবেশ করিয়ে পেট পরিষ্কার করার একটি বিকল্প পদ্ধতি। নিচে এটি শরীরে দেওয়ার সাধারণ প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে উল্লেখ করা হলোঃ

প্রয়োজনীয় উপকরণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ একটি পরিচ্ছন্ন শৌচাগার

লিখেছেন রাজসোহান, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৮



বাড়িটা দেখতে বাড়ির মতো না, যেনো একটা ঘোষণা। দ্যাখো, আমি কে।

গেটে দুইটা সিংহ, পাথরের, মুখ হাঁ করা; সিংহ দুইটা কী পাহারা দিচ্ছে তারা নিজেরাও জানে না। ভিতরে উঠান... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসায় শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০

মাদ্রাসায় শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?
====================
একটি ১১ বছরের শিশু যার বয়স খেলাধুলা, পড়াশোনা আর স্বপ্ন দেখার। সেই শিশুকে যদি যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয় এবং তার গর্ভে একটি সন্তান জন্ম নেয়, তাহলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মক্তব চালু করলে শিশুরা ফিরে আসবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪২


ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। মুসা বিন শমসেরের ছেলে। মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে পুরো দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন, নতুন নতুন আইডিয়া দিচ্ছেন। মনে হয়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×