প্রায় দিন দশেক পরে ভুলু ভাইয়ের সাথে দেখা। কাচুমাচু মুখে আমাদের আড্ডায় যোগ দিলেন। আমরাও অনেকদিন পরে উনাকে পেয়ে খুব খুশি হয়ে উঠলাম। আড্ডার এক পর্যায়ে আমি জিজ্ঞেস করি, ভুলু ভাই পার্কের সে মেয়েটার খবর কি, যাকে আপনি তিন দিনের মধ্যে বিয়ে করার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। ভুলু ভাই একটু আহত স্বরে বললেন, আর বলিস না, এ যুগের মেয়ে সব ফাজিল। ভদ্রতার কিছুই জানে না। আমি ওকে একটা ফুল দিয়েছিলাম, টাটকা গোলাপ ফুল। আমাকে কি বললো জানিস? থ্যানক ইউ আংকেল। তোরাই বল- আমাকে কি আংকেলের মতো লাগে? ফাজিল মেয়ে কোথাকার। বাদ দে ওসব। আমি এবার একটা নতুন প্ল্ল্যান করেছি।
নতুন প্ল্যান? বলেন দেখি কি প্ল্যান করলেন?
আমি একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে এম.বি.এ-তে ভর্তি হবো ঠিক করেছি। প্রিপারেশন নেয়াও শুরু করেছি এর মধ্যে। মনের মতো সহপাঠিনী পেলে সহধর্মণীও করে ফেলতে পারি। আইডিয়াটা কেমন বল?
মিল্টু বললো, আইডিয়া মন্দ না। তবে ভর্তি প্রস্তুতির পাশাপাশি মাথায় উইগ পরার প্র্যাকটিসও করে রাখুন। সময়ে কাজে দেবে। নতুবা এই আইডিয়াও ফেল মারবে।
আজ ভুলু ভাই ক্ষেপলেন না। শুধু মুচকি হাসলেন। সম্ভবত: অনাগত প্রেমের স্বপ্নচিন্তায় বিভোর হয়েই।
ভুলু ভাই এম.বি.এ-তে ভর্তি হলেন। দিনের পর দিন গেলো কিন্তু কিছুই হলো না। ভুলু ভাইয়ের চোখের সামনেই সহপাঠিনীরা একের পর এক জোড় বাঁধতে লাগলো। তাদেরকে ক্যাফেটেরিয়ায় আড্ডা দিতে, প্রেমালাপ ও খুনসুটি করতে দেখা গেলো আর সমানুপাতিক হারে ভুলু ভাইয়ের মাথার চুল কমতে লাগলো, তবুও ভাগ্যের শিঁকে ছিড়লো না। উনার দীর্ঘশ্বাস ক্রমশ: দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকলো। একসময় যখন সবশেষ সিঙ্গেল সহপাঠিনীও (মটকু) পলাশের সাথে কাপল গ্রুপ ফর্ম করলো তখন তিনি বুঝতে পারলেন- এখন তিনি রেলিগেশন লীগের প্লেয়ার। আর সেদিনই ভুলু ভাই ঠিক করলেন, না এবার অন্য রাস্তায় যেতে হবে।
অবশেষে প্রেম করে বিয়ে করার সুপ্ত বাসনাটা ভুলু ভাইকে বলি দিতেই হলো। কিছু পেতে হলে কিছু ছাড় তো দিতেই হয়। পারিবারিকভাবে ভুলু ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হলো। তবে এই ভুলু ভাইয়ের সাথে আগের ভুলু ভাইয়ের একটা সূক্ষ্ম ফারাক আছে। এই ভুলু হলেন উইগ ভুলু। আমরাও চাঁদা তুলে দুটো উইগ প্রেজেন্ট করলাম ভুলু ভাইয়ের বিয়েতে ভবিষ্যত চিন্তা করেই।
ঠিক বাসর রাতের পরের দিন সকালে ভুলু ভাই আমার বাসায় এসে হাজির। আমি চোখ কচলে আবার ভালো করে তাকালাম। ভুল দেখছি না তো? ভুলু ভাই একেবারে বিপর্যস্ত। তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে বাইরে এলেন। তারপর বললেন- তোর ভাবী সকালে রাগ করে চলে গেছে। আমি উইগ পরে তাকে বিয়ে করেছি বলে জোচ্চর, ভন্ড, প্রতারক এরকম একশ একটা গালিও উপহার দিয়ে গেছে। এখন তুই যদি একবার ওদের বাড়িতে গিয়ে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করিস।
আমি? আমি কি বলবো? আপনি ভাবীকে বোঝানোর চেষ্টা করেননি? আপনি মাফ চেয়ে নিলেই তো সব ঠিক হয়ে যেতো।
সেই সুযোগই তো পাইনি। আমি দরজা বন্ধ করে যে উইগটা চৌকির স্ট্যান্ডে ঝুলিয়ে রাখলাম, অমনি দেখি ও অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। কাউকে কিছু না বলে পানির ছিটা দিয়ে সংজ্ঞা ফেরাই। এরপর এমন অগি্নদৃষ্টিতে চেয়েছিলো যে আরেকটু হলে আমি নিশ্চিত ভস্ম হয়ে যেতাম। সারারাত পাশ ফিরে শুয়েছিলো। আমি আর ডাকারও সাহস পাইনি। সকালেই ব্যাগ গুছিয়ে চলে গেলো। ভুলু ভাই যেন একেবারে ভেঙ্গে পড়লেন।
আমি উনাকে সান্ত্বনা দিয়ে মিলটুকে নিয়ে ভাবীর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ভাবী রুমে ছিলেন। আমরা দেখা করলাম। ভাবী যা বললেন- তাতে তো একেবারে আক্কেল গুড়ুম অবস্থা।
জানো অভ্র, বিয়েতে যখন আমার মত নেয়া হয় তখন আমি মত দিয়েছিলাম শুধু তোমার ভাইয়ের চুল দেখে। এতো দারুন ঢেউ খেলানো চুল! আর বাসর ঘরে ঢুকে ও যখন উইগটা স্ট্যান্ডে ঝুলিয়ে রাখে তখন মনে হচ্ছিলো কেউ যেন আমার হৃদপিন্ডটা কেটে নিয়ে স্ট্যান্ডে ঝুলিয়ে রাখছে। বলেই ভাবী হু হু করে কাঁদতে লাগলেন।
আমি ভাবীকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলাম। ভুলু ভাইয়ের হয়ে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি অনেক সাফাইও গাইলাম। অবশেষে ভাবী উনার একদফা এক দাবী উত্থাপন করলেন- তোমার ভাইয়া যদি হেয়ার প্ল্যান্টেশন করে তবেই আমি ওর কাছে ফিরে যাবো, নতুবা নয়।
মিশন সাক্সেসফুল হওয়াতে আমি খুশিতে ডগমগ হয়ে ফিরে আসলাম। কিন্তু হেয়ার প্ল্যান্টেশনের কথা শুনেই ভুলু ভাই মুর্ছা গেলেন।
[পরিশেষে- ভুলু ভাইয়ের মাথায় এখন আর্টিফিশিয়াল চুল। ভাবী সেই চুলে হাত বুলায়। উনারা এখন খুব ভালো আছেন। তাই বলে কি মজার ঘটনা থেমে আছে? উহুঁ !! সে গল্প না হয় আরেকদিন হবে।]
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


