আমাদের এ ভূখন্ডটা যেমন সুন্দর তেমনি ঊর্বর। তাই সেই আদিযুগ থেকেই এর প্রতি অনেকের আকর্ষণ ছিল দূর্নিবার। অনার্য, দ্রাবিড়, আর্য বহু জাতি এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছে। মৌর্য, গুপ্ত, মুঘল, বৃটিশরা এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য শাসন-শোষণ করে গেছে। ফল-ফসলে প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরপুর এ অঞ্চলের প্রতি ভাল-মন্দ সকলেরই আগ্রহ ছিল প্রবল। অনেকেই সম্পদ লুটেছে, সুযোগ বুঝে বৃটিশরা লুটে নিয়েছেও অনেক। আর তাই এরা বিদায় নেবার শেষ মূহুর্তে পুরো ভারতবর্ষের পিঠে ছুরি মেরে গেছে। যার ক্ষত সহস্র বছরেও মুছবে কিনা জানি না। হাজার হাজার বছর ধরে বিভিন্ন ধর্ম মতের মানুষের সহাবস্থান ও সম্প্রীতি বজায় থাকলেও ধূর্ত বৃটিশ ধর্মের দোহাই তুলে সরল হিন্দু-মুসলিমের মাঝে বিভেদের সূত্রপাত করে খণ্ড বিখণ্ড করলো। কেবল ভূমিই না, খণ্ডিত করলো মানুষের ঐক্য ও সম্প্রীতিকেও। বৃটিশদের উস্কানী, জিন্নাহ-নেহেরুর ক্ষমতার লোভে টুকরো হলো সুবিশাল ভারতবর্ষ। ধর্মকে ভিত্তি করে এমন বিভক্তি সভ্যতার ইতিহাসে কখনো কোথাও ঘটেছে কিনা জানা নেই। সেই থেকে যে ধর্মের দোহাইয়ে রাজনীতি শুরু হলো, তার চরম ভুক্তভোগী তো আমরাই। পাকিস্তানিরা আমদের শোষণ করেছে কেবল এই ধর্মের ছুঁতো দেখিয়ে।

মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম চেতনা ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। রাষ্ট্র থাকবে ধর্মনিরেপেক্ষ। এমনই তো কথা ছিল। বঙ্গবন্ধুকে নির্মম হত্যাকান্ডের পর আবার পালটে গেল সব। দেশকে পেছনে ফিরিয়ে নিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী। স্বাধীনতার সুফল পাওয়ার সুযোগ পেল না দেশবাসী। যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন করে জিয়া শুরু করলো ধর্মের রাজনীতি, এরশাদ এসে উদ্ভট লেবাস চাপালো রাষ্ট্রধর্ম নামে। রাজাকারদের ক্রমাগত পুনরুত্থানে দেশ ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকারে পরিণত হলো। মুক্তযুদ্ধের সকল চেতনা বিলুপ্ত ও বিকৃত করে ওরা রাজাকারদের নিয়ে একাত্তুর পূর্ব অবস্থায় ফিরে গেল আবার। মুসলিম লীগ, জামায়াত, জেএমবি তথা বাংলাভাই, আনসাউরল্লাহ থেকে শুরু করে হেফাজত। নামে বেনামে আবার উত্থান সে ধর্ম ব্যবসায়ী দলের। এদশের রাজনীতিকে জঘন্য ভাবে কলুষিত করেছে এদের দুর্বৃত্তিপরায়ন কার্যক্রম। খালেদা জিয়ার প্রশ্রয় ও নতুন করে পুনার্বাসন আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে ওদের। বিএনপির কাঁধে বন্দুক রেখে পরগাছা জামায়াতই ক্রমশঃ গ্রাস করছে বিএনপিকে। অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করছে ওরা। সেখানে মুক্তিযোদ্ধারা অবহেলিত, অবহেলিত প্রগতিশীল চিন্তার মানুষজন। ফ্রাংকেস্টাইনের দৈত্যের মতো এরা গ্রাস করেছে বিএনপিকে।
আওয়ামী লীগ সরকার শাসনে ফিরে আসায় স্বাধীনতার পক্ষের সকলেই স্বস্তি বোধ করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরে আসবে দেশ। বঙ্গবন্ধু হত্যা ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যে মানুষ আশ্বস্ত হয়েছিল। দেশ আবার অসাম্প্রদায়িক হবে, দুর্নীতিমুক্ত হবে, সুশিক্ষার আলোকে সামনে এগিয়ে যাবে। ন্যায় বিচার, নাগরিক অধিকার পূণঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করবে। কিন্তু কী হলো ? আর হচ্ছেটাই বা কী? একদল রাজাকারদের পাশে নিয়ে ক্ষমতার লোভে অন্ধ, আরেক দল হেফাজতীদের কোলে নিয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য বিড়াল আদরে মত্ত।
আওয়ামী লীগ যতো কূশলী খেলাই খেলুক, হেফাজতের বিষদাঁত কখনোই দুর্বল নয়। কোলে বসেই ছোবল দিয়ে বিষে নীল করার সুযোগ খুঁজবে এরা। আমরা আর কোন পনেরো আগষ্ট চাই না। একটা পনেরো আগষ্ট মানেই ভয়াবহ নৃশংসতা, দেশ ও জাতিকে পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়া। কে চায় আফগান পরিস্থিতি, কিংবা সিরিয়ার ভয়াবহতা?
হতাশায় নিমজ্জিত না হয়েও এখনো স্বপ্ন দেখি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্ন সফল করবেন। শক্ত হাতে এদেশ থেকে দুর্নীতি বিতারণ করবেন। কুশিক্ষা দূর করে বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক ও একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করবেন। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলবেন।। তার জন্য সবার আগে প্রয়োজন ধর্ম ভিত্তিক সকল রাজনীতি নিষিদ্ধ করা। ধর্ম আর রাজনীতি দুই জিনিস। যারা ধর্মকে রাজনীতির সাথে মেশায়, দুরভিসন্ধি তাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এজন্য আর ভুল বুঝায় সাধারণ মানুষকে। এই কথাটা আমরা মনে রাখি, ধর্ম মানুষের ব্যাক্তিগত বিশ্বাস ও অধিকার। এ বিশ্বাসকে সম্মান জানিয়ে, পরমত সহিষ্ণু হয়েই আমরা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে পারি, গড়তে পারি সুন্দর একটা বাংলাদেশ।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মার্চ, ২০১৮ দুপুর ২:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



