1.
মামুন সাহেব খুব ব্যাজার হয়ে তাঁর কিশোর ছেলের দিকে চেয়ে থাকেন। কিশোর বলা ঠিক নয়, কৈশোরের ভালো ব্যাপারগুলো গা ঝাড়া দিয়ে ফেলে ছোকরা প্রায় তরুণই হয়ে উঠেছে বলা যায়। কিছুদিন আগেও ছেলেটা কত ভালো ছিলো, এখন কেমন একটা বেয়াড়া ভাব চলে এসেছে চোখেমুখে। জ্বালাতন।
"শোন।" গম্ভীর মুখে বলেন মামুন সাহেব, তাঁর ছেলে চোখ পিটপিট করে তার দিকে তাকিয়ে। "কবে থেকে এ সমস্যা শুরু হয়েছে বল।"
ছোকরা কিছু বলে না, দাঁতে নখ কাটা শুরু করে।
মামুন সাহেব একবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকান। শীতের প্রায় শেষ, সামনে তেরো তারিখে প্রথমা বসন্ত। বসন্ত তাঁর প্রিয় ঋতু বলে নয়, ঝোঁকের মাথায় বড় ছেলের নাম আগুন রেখেছিলেন বলে ছোটটার নাম ফাগুন রাখা হয়েছিলো। কপাল ভালো তাঁর আর সন্ততি নেই, নইলে এই মিলিয়ে রাখার চাপে পড়ে কী না কী নাম রাখতে হতো কে জানে? অবশ এই নাম নিয়ে হয়তো ছোকরাকে ভুগতে হচ্ছে। সহপাঠীরা সবসময় নাম নিয়ে চমৎকার টিটকিরি মারতে পারে, হয়তো তারা বলে, "মামুনের ছেলে ফাগুন, আপনি এবার ভাগুন!" কিংবা আরো খারাপ কিছু?
"ফাগুন?" নরম গলায় ডাকেন তিনি। "কবে থেকে এই সমস্যা হচ্ছে বাবা?"
ফাগুন ঢোঁক গেলে। একমাত্র বাবা আর মা-ই তাকে এতো মিষ্টি করে ফাগুন ডাকে। ফাগুনসোনা, ফাগুনবাবু। বন্ধুরা তাকে ডাকে ফাগা বলে। তার বান্ধবী তাকে ডাকে জান।
"এই তো বাবা, কয়েকদিন ধরে।" মিনমিন করে বলে ফাগুন।
"কয়েকদিন মানে কতদিন?" মামুন সাহেব একটু অসহিষ্ণু হয়ে পড়েন। "পাঁচদিন? দশদিন?"
ফাগুন অন্য পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ায়। বাবাকে সে ভয় করে চলে। লোকটা ক্ষেপে গেলেই নানারকম আইন প্রয়োগ করে বসেন, মূল ব্যাপারটা টের পেয়ে গেলে তার সমস্যা হবে।
"ইয়ে আব্বু, বেশ ক'দিন ধরে। প্রথমে সমস্যা হতো না তেমন, এখন তো খুব হচ্ছে।" আরো মিনমিন করে বলে সে।
মামুন সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। "ঠিক আছে চল দেখি ডাক্তারের কাছে। জামা পাল্টে আয়। একা একা পারবি না সাহায্য লাগবে?"
ফাগুন আঁতকে ওঠে। "পারবো পারবো, সাহায্য লাগবে না!"
2.
ডাক্তার হুগলভি, চক্ষু বিশেষজ্ঞ, ভিয়েনা থেকে পাশ করে এসেছেন, গম্ভীর মুখে মামুন সাহেবের সামনে এসে বসেন আবার। দূর অতীতে এঁরা পশ্চিমবঙ্গের হুগলি অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন, ফার্সি রীতি অনুযায়ী তাঁদের পদবী হুগলভি। তিনি আর মামুন সাহেব একই জিমে ব্যায়াম করেন।
মামুন সাহেব ব্যাকুল কণ্ঠে জানতে চান, "এ রোগ সারবে তো?"
হুগলভি মাথা দোলান, তারপর রুমাল বার করে চোখ মোছেন। একবার, দু'বার, তারপর বারবার।
মামুন সাহেব ঘাবড়ে যান। ডাক্তারকে ওরকম করে কাঁদতে দেখলে ঘাবড়ে যাওয়াটাই দস্তুর। তিনিও ফুঁপিয়ে ওঠেন, "কী হলো ডাক্তার সাহেব, কী হলো?"
ডাক্তার এবার নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে বসেন, তাঁর দুই চোখ করমচারক্তিম। ফোন তুলে রিসেপশনিস্টকে তিনি এক কাপ গরম চা দিয়ে যেতে বলেন।
মামুন সাহেব কোনমতে কান্না চেপে রেখে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
"রোগটা জটিল।" অবশেষে বলেন ডাক্তার। "ছেলেটা দিনের বেলা চোখে ভালো দেখতে পাচ্ছে না, ছানিরোগীর মতো আচরণ করছে, কিন্তু রাতে পষ্ট দেখতে পাচ্ছে! দিনকানা বলা যেতে পারে ওকে। আমি আগে এমন একটা কেসই দেখেছি ... আবার ইখ ভাইস নিখত ভাস ইখ জাগেন জল!" ভিয়েনা থেকে পাশ করে এসেছেন বলে হুগলভি মাঝে মাঝে আনমনে জার্মানে বকেন।
মামুন সাহেব তো আর জার্মান বোঝেন না, তিনি আঁঃকে উঠে বলেন, "য়্যাঁ? অ্যাতো জটিল রোগ? অ্যাতো লম্বা নাম? সারবে তো?"
হুগলভি আড়চোখে মামুন সাহেবের দিকে তাকান, কিন্তু ভুলটা শুধরে দেবার কোন গরজ নেই তাঁর মধ্যে। তিনি ভাঙা গলায় বললেন, "বুঝতে পারছি না। একদমই বুঝতে পারছি না জনাব!"
মামুন সাহেব ডুকরে ওঠেন, "এ কী বলছেন ডাক্তার সাহেব, এ কী বলছেন? আমার ছোট্ট ছেলে, কত আদরের ছেলে আমার, এমন দিনকানা হয়ে যাবে?"
ডাক্তার এবার টেবিলে কীল মেরে খেঁকিয়ে ওঠেন, "আপনার ছোট ছেলে? আর আমার মেজ মেয়ে? ওর কী হবে? ওরও তো একই অবস্থা! আর আমি, আমি একজন চোখের ডাক্তার হয়ে নিজের সন্তানের জন্যে কিছু করতে পারছি না, আমার কী হবে? য়্যাঁয়্যাঁয়্যাঁ ...।" ভেঙে পড়েন ডাক্তার হুগলভি।
মামুন সাহেব শিউরে ওঠেন। কী সর্বনাশ! কী জটিল রোগ বাঁধিয়েছে ফাগুন! এমন রোগ ডাক্তার হুগলভি আগে একবারই মাত্র দেখেছেন, তা-ও আবার নিজের মেজ মেয়ের ক্ষেত্রে! আবার ফোঁপাচ্ছেন কিছু করতে পারেননি বলে! তাঁর দুই চোখে দরদর করে জল নেমে আসে।
এমন সময় পিয়ন দরজায় নক করে গরম এক কাপ চা নিয়ে এসে ঢোকে। ডাক্তার হুগলভি বিনা অজুহাতে সেই কাপ তুলে নিয়ে চুমুক দ্যান, মামুন সাহেবকে সাধেন না একটুও। মামুন সাহেবের চোখের পানি একটু শুকিয়ে যায়।
তিনি চোখ মুছে ধরা গলায় জানতে চান, "রোগটা ছোঁয়াচে না তো?"
ডাক্তার হুগলভি মাথা নাড়েন। "ছোঁয়াচে হলে তো আমার বড় মেয়ে বা ছোট মেয়েরও হতো। কিংবা আমার বা আমার স্ত্রীর। আমরা দিব্যি সুস্থ, ঐ বেচারিরই এ অবস্থা!"
মামুন সাহেব জানতে চান, "ক'দিন ধরে?"
ডাক্তার হুগলভি দাঁত কিড়মিড় করেন। "বলছে তো বেশ ক'দিন ধরে। প্রথম দিকে নাকি তেমন সমস্যা হতো না, কিন্তু এখন তো অবস্থা সঙ্গীন!"
মামুন সাহেব অস্ফূটে বলেন, "আশ্চর্য! আমার ছেলেও তো তাই বলছে!"
ডাক্তার হুগলভি শুধু বলেন, "হুম!"
চায়ের কাপটা একেবারে চেটেপুটে নিঃশেষ করে তিনি বলেন, "আপনার ছেলের সাথে একটু কথা বলি দাঁড়ান।" ফোন তুলে তিনি পেশেন্টকে নিজের ঘরে আবার পাঠিয়ে দিতে বলেন।
ফাগুন রিসেপশনিস্টের হাত ধরে এসে ঘরে ঢোকে, তাকে ধরে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দেয়া হয়।
ডাক্তার হুগলভি কোমল গলায় বলেন, "ইয়ং ম্যান, তোমাকে শক্ত হতে হবে! তোমার চোখে একটা জটিল অসুখ হয়েছে ...।"
ফাগুনের বোবা চোখে এবার পানি দেখা যায়।
"কাঁদে না বাবা।" মামুন সাহেব ছেলের মাথায় হাত বুলাতে গিয়ে নিজেই ইইইইইইই করে কেঁদে ওঠেন, "বাবা রে! বাবা! তোর কী হলো রে বাবা!"
ডাক্তার হুগলভি চোখের পানি মোছেন, "প্লিজ, কন্ট্রোল ইয়োরসেলভস! এস হিলফত উনজ নিখত!"
জামর্ান ভাষা শুনে ঘরের ভেতর একটা শৃঙ্খলা ফিরে আসে।
"এখন বলো," ডাক্তার হুগলভি নোটপ্যাড টেনে নেন, "তুমি দিনে ঘুমাও কয়ঘন্টা?"
ফাগুন প্রবল অস্বস্তিতে মোচড়ামুচড়ি করে।
মামুন সাহেব কোমল গলায় বলেন, "বেচারা ঘুমানোর সময় আর পায় কই বলেন? সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ক্লাস, এসে খেয়েদেয়ে একটু ঘুমায়, সন্ধ্যেবেলা স্যারের কাছে পড়ে, গভীর রাত পর্যন্ত লেখাপড়া করে আবার একটু ঘুমায়।"
ডাক্তার হুগলভি আবারও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, "আমার মেজ মেয়েটাও! এই পড়াশোনাই ওদের কাল হয়েছে! পড়ে পড়ে চোখের বারোটা বাজিয়েছে!"
মামুন সাহেব ফুঁপিয়ে ওঠেন, "আগে জানলে ছেলেটাকে অশিক্ষিতই বানিয়ে রাখতাম!"
ফাগুন শুধু গা মোচড়ায়।
ডাক্তার হুগলভি কিছু একটা বলতে যান, তার আগেই ঘরের ভেতরে কেমন একটা চ্যাঁভ্যাঁ আওয়াজ ওঠে। ফাগুন তড়িঘড়ি করে নিজের পকেটের গহীন থেকে একটা চকচকে মোবাইল বার করে আনে। তারপর কথা বলতে থাকে।
"কে? আক্কু? কী রে আক্কু? আমি এখন ডাক্তার-এর কাছে! .. .. হ্যাঁ হ্যাঁ .. .. পরে কথা হবে! মাগনাকার্ড কিনবো একটু পরে, তখন এসএমএস দিবো, ঠিক আছে? চিয়াও!" ফোনটা আবার পকেটের কোটরে রেখে দেয় সে।
ডাক্তার হুগলভি কেমন একটা সন্দেহের চোখে তাকান ফাগুনের দিকে। "মাগনাকার্ড? ঐ যে রাত দুইটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত বিনা আলাপের প্যাকেজটা? ওটা ব্যবহার করো নাকি তুমি?"
ফাগুনের মুখ সাদা হয়ে যায়।
"কী আশ্চর্য!" ডাক্তার বিড়বিড় করেন। "আমার মেজ মেয়েটাও তো ...।" তার মুখে চিন্তার ভাঁজ পড়ে।
মামুন সাহেব কিছু একটা বলতে যান, ডাক্তার হাত তুলে তাকে থামিয়ে দেন। "তুমি তো রাতে ভালোই দেখতে পাও, না?"
ফাগুন মাথা নাড়ে। "জি্ব। একদম পরিষ্কার।"
ডাক্তার হুগলভি কী যেন মেলানোর চেষ্টা করেন, মেলাতে পারেন না। তিনি কিছুক্ষণ মৌন মেরে থাকেন, তারপর কিছু ঔষধ লিখে দেন ঘ্যাঁসঘ্যাঁস করে।
3.
ঘরের আলো বন্ধ। গভীর রাত। কাঁথার নিচে শুয়ে ফাগুন ফিসফিস করছে।
"না না সোনা, শুধু তোমার আর আমার না, আমি আজকে ডাক্তার দেখাইতে গেছিলাম, ডাক্তারের মেয়েরও এই রোগ হইছে। ঔষধ দিছে তো, দেখি কী হয়?" পাশ ফিরে শুয়ে মোবাইলটা অন্য কানে ধরে সে।
ওপাশ থেকে ফিসফিস ভেসে আসে, "হ্যা হ্যা, আজকাল অনেকেরই হইছে এই রোগ। আব্বুও আজকে এসে বললো, ওনার এক জিমমেটের ছেলের নাকি এই রোগ হইছে। আজকাল অনেকেরই এই রোগ হইতেছে, চোখ উঠার মতো, না?"
ফাগুন ফিসফিস করে, "বাদ দ্যাও তো এইসব, আসো অন্য কথা বলি ...।" মাগনাকার্ড আজকে সন্ধ্যেবেলায় রিফিল করেছে সে, কিন্তু নিখরচায় মাত্র তিন ঘন্টা কিভাবে যেন কেটে যায় তার, পোষায় না একেবারে। সুপার মাগনাকার্ড কেউ বের করতে পারে না, রাত দিন চবি্বশঘন্টা বিনাপয়সায় কথা বলার কোন প্যাকেজ?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


