মোফার সাথে মামার কী যেন একটা তফাৎ --- ঠিক ধরতে পারি না আমরা, তবে বুঝি --- আছে। মোফা যেদিন উচ্ছল, প্রাণচঞ্চল, সেদিন মামা গুগলির মতো আপাতনিজর্ীব হয়ে থাকেন। মামা যেদিন তেড়ে ওঠেন, সেদিন মোফাটা আফিমখোরের মতো ঝিমোয়। কেন এমন একশো আশি ডিগ্রী ফেজ নিয়ে চলেন দুজন, আমরা বুঝি না।
মোফা যেমন আজ বড্ড তেড়ে সমালোচনা করছিলো আমাদের। আর মামা পাশেই বসে কী যেন ভাবছেন আনমনে। বিড়িটাও যেন আনমনেই ফুঁকছেন, আর চায়ের কাপে মোলায়েম চুমুকগুলোকেও, আনমনাই বলা চলে।
'তোদের উচ্চারণে বড্ড সমস্যা। এখনও আড় কাটে নি।' জানায় মোফা।
আমরা ভদ্রভাবে ক্ষেপে যাই। এই বুড়ো বয়সে এসে উচ্চারণ তুলে গালাগাল আমাদের সহ্য হয় না।
'চুর!' বলি আমি।
'বৈতল!' মন্তব্য করে শিবলি।
'স্সালা!' গদগদস্বরে বলে রেজা।
মোফা কিন্তু ক্ষেপে ওঠে না, নাসর্ারি স্কুলের মিসের মতো ধৈর্য ধরে সব বুঝিয়ে দেয়। 'ব এ শুন্য র, ড এ শুন্য ড়, আর ঢ এ শুন্য ঢ়, এই তিনের তফাৎ বুঝিস তোরা?'
আমি হাসি ঠা ঠা করে, প্রশ্নের মাঝেই তো উত্তর লুকোনো। 'অবশ্যই। ফোঁটাটা কার পাছার তলায় কাটছিস, সেটা খেয়াল করলেই বোঝা যাবে।'
মোফা হাসে, অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসে মাসুদরানা পাঠরত বখা ছাত্রকে পাস্ট পারফেক্ট টেন্সের দুরূহ ট্র্যান্সলেশন করতে দিয়ে যেমন অবশ্যম্ভাবী ধোলাইয়ের সিগন্যাল হিসেবে একটা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে রাখেন, তেমনি নীরস ও নির্মম।
'ওরে অর্বাচীন,' অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারের মতো স্বরেই বলে সে, 'লিখতে তো ঠিকই পারবি, উচ্চারণ করতে পারবি?' চ্যালেঞ্জ ঠোকে ব্যাটা।
আমি সঙ্গত কারণেই ক্ষেপে উঠি। 'একশোবার!'
'বল দেখি আষাঢ়!'
'আশার।' বলি আমি।
মোফাটা হাসে, এবার একধাপ প্রমোশন পেয়ে হাসিটার কিসিম দাঁড়ায় হেডমাস্টারের হাসির মতো। 'মূর্খ! আশার গুড়ে বালি হয় বৈকি, কিন্তু আষাঢ়ের মেঘ ওতে হয় না।'
শিবলি ফোড়ন কাটে, 'তুই পাশাপাশি সব কয়টা রেখে বুঝিয়ে দে না, কোনটা সাপ আর কোনটা ব্যাঙ?'
কিন্তু মোফাটাকে তুচ্ছ জ্ঞান করার উপায় নেই, সে পলকে বলে ওঠে, আমাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে, 'এই মূঢ়টার মুড়োটা গুঁড়োনোর মুরোদ আছে তোর?'
আমাদের তাক লেগে যায়। কেমন একটা ঢ, একটা ড কে ছুঁয়ে যায় ওর ঢ় আর ড়!
রেজা হাততালি দেয়। 'সাবাশ। খাওয়া এখন!'
মোফা প্রতিবাদ করে কিছু বলতে যাচ্ছিলো, বোধহয় সব্জির ছদ্মবেশে মামাকে দেখিয়ে, কিন্তু আমরা কর্ণপাত করি না ওর কথায়।
মোফা হাল ছেড়ে বলে, 'ঠিক আছে, কিন্তু তার আগে স এর ওপর একটু মওড়া হোক। দন্ত্য স, তালব্য শ আর মূর্ধ্য ষ এর ইয়েটা বুঝিস নিশ্চয়ই?'
আমরা আগের মতোই বলিষ্ঠ বুলন্দচিত্তে মাথা নাড়ি।
হতভাগাটা আবারো আমাকেই তাগ করে। 'বল দেখি আষাঢ়!'
আমি দৃপ্ত কন্ঠে বলি, 'আশাড়!'
মোফা আমার পিঠ চাপড়ে দেয়। 'বাহ, উন্নতি হচ্ছে তোর। কিন্তু যা বলছিলাম, জিভের আড় এখনো কাটেনি। --- বল দেখি, আষাড়ে আশার আলো আসার আশায়?'
আমাদের সব আশা নিভে যায় ফুৎ করে।
মোফা হাসে। 'চচ্র্চর্া, আরো চচ্র্চা লাগবে। একটু চড়িয়ে বলতে না পারলে সব চচ্চড়ি হয়ে যাবে। ওরে ---।'
শিবলি বলে, 'খামোশ! এবার আমাকে দন্ত্য ন, মূর্ধ্য ণ, আর তালব্য ন এর তফাৎ বোঝা!'
মোফা চালিয়াতের মতো হাসে। 'খুব সোজা --- হরিণা ধরি না আর --- এক মিনিট!' সোজা হয়ে বসে সে। 'তালব্য ন বলতে কিছু নেই তো!' তীব্র প্রতিবাদ করে সে।
আমরা খ্যাক খ্যাক করে হাসি। 'তুই বললেই হলো?'
মোফা তবুও লড়ে যায়। 'বাড়ি গিয়ে সরল পাঠ খুলে দ্যাখগে, যত্তোসব ---।'
'ওসব তুই দেখিস!' শিবলি জুম্মনকে হাঁক পেড়ে ডাকে। 'সরল-জটিল-মহাজটিল সব পাঠই আমাদের ঠোঁটস্থ। তালব্য শ থাকতে পারে আর তালব্য ন থাকতে পারবে না? মামাবাড়ির আব্দার পেয়েছিস? এখন গণতন্ত্র চলছে দেশে, বুঝলি, একা যেমন খুশি বললেই তুই তালব্য ন-কে বিদায় করতে পারবি না।'
মোফা এবার রীতিমতো তেড়ে ওঠে, পারলে টেবিলে উঠে পড়ে আর কি। 'উচ্চারণ করে দেখা তোর তালব্য ন!' আমাকেই আবার ধরে সে।
আমি হাসি। 'জানিসই তো আমার জিভের আড় কাটেনি, উচ্চারণ করলেও ওটা ঠিক শুদ্ধ শোনাবে না। তুই বরং বাড়ি গিয়ে প্র্যাকটিস কর!'
মোফাটা তেমন তেড়েই বেরিয়ে যাচ্ছিলো, খপ করে ওর ঝোলা চেপে ধরি আমরা। 'দাঁড়াও বৎস, চা, সিঙ্গারা আর পুরির দামটা টেবিলে রেখে যাও। নইলে কিন্তু, হে হে, দন্ত্য ন আর দন্ত্য স নিয়ে ঝামেলায় পড়বে, দাঁতগুলো আমরা খুলে রেখে দেবো কি না!'
মোফা কী একটা তালব্য গালি অস্ফূটে উচ্চারণ করে একমুঠো খুচরো টাকা টেবিলের ওপর রেখে বেগে বেরিয়ে যায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


