somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রয়েসয়ে

১১ ই আগস্ট, ২০০৬ রাত ৩:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



হুঁ, একটু তাড়াহুড়ো করতাম সবকিছুতেই। আজন্ম এই হুড়োহুড়ি আমার।

জন্মের পর থেকেই আশেপাশের সবাইকে ব্যস্ত করে ফেলি। ট্যাঁ ট্যাঁ কান্না, গিগিগি হাসি, আর কাঁথা নষ্ট। আপত্তি করেনি কেউ, এ তো স্বাভাবিক।

কিন্তু অন্যদের যা করতে লাগে কয়েক বছর, আমি তা করে ফেলি কয়েক মাসে। হাঁটি, কথা বলি। দিব্যি বড়দের মতো। সবাই একটু নড়েচড়ে বসে। বলে, রয়েসয়ে!

আমি রইও না, সইও না। ব্যতিব্যস্ত করে ছাড়ি সবাইকে। এটা ধরি, ওটা ভাঙি। এক বড়দের কথা অন্য বড়দের কাছে শিশুতোষ সারল্যে চালান করে দেই। পাশের বাড়ির আঙ্কেল জানতে পারেন, আমার বাবা তাঁকে ইস্টুপিট ডাকেন। আন্টি জানতে পারেন, মা তাঁকে ডাকেন ব্যাটাতুন্নেসা। একটা খিটিমিটি লেগে যায়। আমি গা করি না। ওনাদের মেয়ে লুবনার সাথে আমার দারুণ দহরমমহরম। বাপমা তো দুদিনের মায়া, লুবনাই সব। দুপক্ষের বাবামাই পক্ষ ঝাপটান, বলেন, আরে রয়েসয়ে, এই বয়সেই এই!

ইস্কুলে গিয়ে আবার ব্যাপারটা একটু উল্টে যায়। অন্যরা যা কয়েক মাসে করে ফ্যালে, আমার তা করতে লেগে যায় কয়েক বছর। সব শালাশালি দেখি ফটাফট সরলাঙ্ক মানসাঙ্ক লসাগু গসাগু জ্যামিতি নিয়ে একটা দক্ষযজ্ঞ বাঁধিয়ে বসেছে। আমার তো ত্রিভূজ থেকে চতুভর্ূজের ফারাক করতেই ঝামেলা লেগে যায়। বাবা ক্ষেপে যান, মা বলেন, মনে হয় চোখের দোষ। চশমা লাগবে। লুবনা আমার কামড় খেয়ে হাসে, বলে, দুষ্টু, রয়েসয়ে।

তবে গালাগালিটা ওদিকে বেশ রপ্ত করে ফেলি। অন্যদের যা শিখতে কয়েক বছর লেগে যায়, আমি তা অনায়াসে শিখে ফেলি কয়েক মাসেই। কচি কচি সহপাঠীরা সবে শকার বকার করতে শিখেছে, সস্নেহে তাদের চ-বর্গীয় গালাগালি করি। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে ওরা, আমি চোখ টিপি। মাস্টারদের কাছে বিচার ঠোকে কতিপয় বইখোর বোকাচো*া, আমার ডাক পড়ে তদন্ত কমিটির সামনে। নিখাদ হাবলা সেজে দাঁড়াই, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি, সুন্দরী ম্যাডামের অস্বস্তি ভরে বুকের ওপর আঁচল টানেন। হতাশ হই আমি, হতাশ হন অ্যাসিস্টেন্ট হেডমাস্টারও। আমরা দুই খাঁজভক্ত একে অন্যের দিকে তাকাই। শুনতে পাই তিনি বিড়বিড়িয়ে বলছেন, রয়েসয়ে ...।

এসএসসি পরীক্ষার সময় সাথের পোলাপানের সবে কচি কচি রোমের রেখা নাকের নিচে, আর আমার রীতিমতো আঁচড়ে রাখা গোঁপ। হুঁ, অন্যদের যা বাগাতে কয়েক বছর লেগে যায়, আমার সেটা কয়েক মাসেই গজিয়ে একেবারে ছ্যাড়াব্যাড়া অবস্থা। ইনভিজিলেটর খাবি খায় আমাকে দেখে। এক গ্লাস পানি খেয়ে ধাতস্থ হয়ে বলে, রয়েসয়ে!

লুবনা ওদিকে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। চুটিয়ে রোমান্স করছি আমরা। আমার ইস্কুলের সহপাঠীরা বিষণ্ন হয়ে পড়ে আমাদের হুড়োহুড়ির নমুনা দেখে। বলে, রয়েসয়ে। আমি হাসি। কিছু বলি না। আরে ওরা তো নিছক আবাল, লুবনার সিনিয়র ভাইয়েরাই আমাদের চালচলনে ঘাবড়ে যায়, বলে, রয়েসয়ে ... আর এরা তো মোটে ইস্কুল ছেড়ে বেরোচ্ছে।

তো, হয়তো অন্য কেউ হলে আরো কয়েক বছর সময় নিতো, কিন্তু আমি তা করে ফেলি কয়েক মাসেই। লুবনার সাথে বিয়েটা সেরে ফেলি কাজী অফিসে গিয়ে। কাজী দুষ্টুটা কলমা পড়ায়, আমরা মিটিমিটি হাসি। বিয়ে হয়ে যাবার পর লুবনাকে চুমু খাই সিনেমার ইশটাইলে। কাজী আঁতকে ওঠে। ইউ মে কিস দ্য ব্রাইড বলা তো আর ওর ধাতে নেই। আমরা সামলে নেই, কাজী নিজের বুক আঁকড়ে কী একটা ট্যাবলেট খায়, তারপর বলে, আলহামদুলিল্লাহ, রয়েসয়ে!

বাড়ি ফিরে দেখি আরেব্বাপস, বাপ মা দুজনেই চটে লাল। কত অভিযোগ। ইস্টুপিটের মেয়ে ঘরে আনলাম, ব্যাটাতুন্নেসার মেয়ে ঘরে আনলাম। দুজনে মিলে কয়েক ঘন্টায় যা বকাঝকা করে, অন্য কেউ হলে তা করতে লেগে যেতো কয়েক মাস। আমি অধোবদনে দাঁড়িয়ে থাকি, লুবনা মুচকি মুচকি হাসে। শেষে মায়ের কানে কানে আসল কথাটা বলে। শুনে তো মা ফিট! হায়রে মা, সুসংবাদ শুনে কোথায় একটু হই হল্লা করবি তা না ... এজন্যেই তো মুরুবি্বরা বলে, রয়েসয়ে। লুবনাকে বকা দেই। তখুনি বলার কী দরকার ছিলো?

যা ভাবছেন তাই, অন্যরা বিয়ের পর যা করতে কয়েক বছর লাগিয়ে দেয়, আমরা তা করে ফেলি কয়েক মাসেই। যমজ এসে হাজির। সবার মুখ কিন্তু অন্ধকার, বাচ্চাগুলোই খলখল করে হাসে। পাড়ার বড় ভাইরা এসে পিঠ চাপড়ে দেয়, চোখ টিপে বলে, রয়েসয়ে!

বাবা নোটিশ দেয়, চাকরি বাকরি জোটা, নইলে জুতিয়ে বার করে দেবো। আমি হাসি, বলি, আরে ইস্কুল পাসের পর অন্যদের যা করতে কয়েক বছর লেগে যায়, আমাকে তা কয়েক মাসে করতে বলছো, এ-ই কি ইনসাফ? রয়েসয়ে! বাবা জুতো হাতে তেড়ে আসেন।

চাকরি একটা ধরাধরি করে পাই। সম্মানজনক কিছু নয়। পড়ালেখার পর করতে হয়। বড় চাপ। বাড়ি ফিরে এসে দেখি বাপমাবউবাচ্চা দিয়ে ঘর বোঝাই। ভাল্লাগেনা। অন্যরা হয়তো কয়েক বছর পর ধরতো, আমি কয়েক মাস পরেই ধরে ফেলি। দেশি ভদকা। একটু লেবু চিপে পান করলেই দুনিয়াটা বেশ ডগোমগো হয়ে ওঠে। হামলা করতে গেলে লুবনা বিরক্ত হয়, বলে, আহ কী হচ্ছে আবার, রয়েসয়ে!

তো এভাবেই চলছে গত কয়েক বছর, বুঝলেন। অন্য কেউ হলে কয়েক মাস পরই সব ছেড়েছুড়ে তাবলীগের চিল্লায় চলে যেতো, কিন্তু আমি আঁকড়ে আছি। ভালোবাসার টান, কী করবো বলুন?

তবে আপনাদের জন্য একটাই উপদেশ আমার।

রয়েসয়ে।


[বিশেষ দ্রষ্টব্য ঃ আমি অনেকটা এই গোছেরই, তবে গল্পটা কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে ঘটনাগত বা চরিত্রগত মিল কেউ খুঁজে পেলে সেটা নিছক কাকতাল। অতিরিক্ত ফ্যাদানোর চেষ্টা করলে তা আপনার দুষ্টু মনের ছ্যাবলা ভাবনা।]
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই আগস্ট, ২০০৬ বিকাল ৩:১৬
৩৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জ্ঞান কোনো একক কর্তৃত্ব নয়: সমন্বিত প্রজ্ঞা

লিখেছেন রাড্ডা, ০১ লা মে, ২০২৬ রাত ১০:২১



বিশ্ব আজ যেখানটায় দাঁড়িয়ে তা কোনো একক ব্যক্তি, একক প্রতিষ্ঠান বা একক চিন্তার ফসল নয়; বরং এটি বহুমাত্রিক জ্ঞান, সমন্বিত গবেষণা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার একটি দীর্ঘ যাত্রার ফল। ইউরোপ, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেষ বিকেলের বৃষ্টি

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৭


বিকেলের শেষে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে
জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলে চুপ,
তোমার ওমন ঘন মেঘের মতো চুলে
জমে ছিল আকাশের গন্ধ,
কদমফুলের মতো বিষণ্ন তার রূপ।

আমি তখন পথহারা এক নগর বাউল,
বুকের ভেতর কেবল ধোঁয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

একাত্তরের আগের আর পরের জামাত এখনও এক

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ০২ রা মে, ২০২৬ সকাল ১১:৫৮


গোলাম পরওয়ার বলেছে একাত্তরের জামাত আর বর্তমান জামাত এক নয়। অথচ এক। স্বাধীনতার আগের জামাত আর পরের জামাত একই রকম।
একাত্তরের আগে জামাত পাকিস্তানের গো% চাটতো এখনও তাই চাটে। তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

সোনার ধানে নোনা জল

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০২ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:১২



হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ শব্দে রেদোয়ানের ঘুম ভাঙল। না, কোনো স্বপ্ন নয়; মেঘের ডাক আর টিনের চালে বৃষ্টির উন্মত্ত তান্ডব। বিছানা ছেড়ে দরজায় এসে দাঁড়াতেই এক ঝলক... ...বাকিটুকু পড়ুন

মরহুম ওসমান হাদীর কারণে কবি নজরুলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা মে, ২০২৬ দুপুর ২:৫৯


ইনকিলাব মঞ্চের জাবের সাহেব মাইকের সামনে দাড়িয়ে যখন বললেন , শহীদ ওসমান হাদীর শাহাদাতের উসিলায় নাকি এদেশের মানুষ আজ কবি নজরুলের মাজার চিনতে পারছে, তখন মনে হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×