আমি আমার ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। তার মুখ ভাবগম্ভীর, চোখে ছলছল দৃষ্টি, লোকজনের সামনে যখন সে বক্তৃতা দিতে ওঠে, তখন যেমন করে কোমরের পেছনে হাত বেঁধে দাঁড়ায়, তেমনিভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আমি স্টাইলাস হতে অপেক্ষা করতে থাকি।
'সৃষ্টির শুরুতে,' সে শুরু করে, 'এখন থেকে ঠিক প.. প.. পনেরো দশমিক দুই বিলিয়ন বছর আগে, বিগ ব্যাং এর মধ্য দিয়ে বিশ্বব্রহ্মান্ড রূপ লাভ করে .. .. ।'
লিখতে শুরু করেছিলাম, ওর কথার ছিরি দেখে থেমে গেলাম। 'পনেরো বিলিয়ন বছর আগে?' অবিশ্বাসের সুরে জিজ্ঞেস করি।
'নিশ্চয়ই।'
'তুমি নিশ্চয়ই পনেরো বিলিয়ন বছরের ইতিহাস বলছো না?'
'তাই-ই বলছি। তুমি তো জানো দাদা, আমাকে তাই বলতে হবে। .. .. তাছাড়া যে জিনিস পনেরো দশমিক দুই বি.. বি.. বিলিয়ন বছর ধরে হয়ে এসেছে, তাকে আর কিভাবে বর্ণণা করবো? দুশ্চিন্তা করো না, এখানে সব সা.. সাজানো আছে .. ..।' সে নিজের মাথায় টোকা দেয়।
এবার আমি স্টাইলাস নামিয়ে রাখি। 'এবার আমি বলি, তুমি শোনো। প্যাপিরাসের দাম সম্পর্কে তোমার কোন ধারণা আছে? বাজার সদাই তো কিছুই করতে যাও না, জানো এক বান্ডিলের দাম কত?'
তাকে একটু বিভ্রান্ত দেখায়। 'কেন বলো তো?' পনেরো বিলিয়ন বছরের ইতিহাস ওর মাথায় গোঁজা থাকতে পারি, কিন্তু আমি নিশ্চিত, প্যাপিরাসের বাজারদর তার জানা নেই। সবাই তো আর সব জিনিসের খোঁজ রাখতে পারে না।
'শোনো তাহলে।' আমি এবার গম্ভীর মুখে শুরু করি। 'মনে করো তুমি এক রোল প্যাপিরাসে এক মিলিয়ন বছরের ইতিহাস লিখতে চাও? তাহলে তোমার কতটুকু প্যাপিরাস লাগবে?'
হিসেবে ওর মাথাটা মন্দ নয়। 'পনেরো হাজার রো.. রো .. রোল।'
'তাহলে? পনেরো হাজার রোল প্যাপিরাস কেনার পয়সা আছে আমাদের কাছে? নেই। তাছাড়া মনে করো, প্যাপিরাস কেনার টাকাটা জোগাড় হলো। তারপর? পনেরো হাজার রোল প্যাপিরাস লিখে শেষ করতে গেলে আমার আমার কয়েক বছর লেগে যাবে, যদি না তার আগেই আমার হাতের আঙুল খসে যায়। .. .. আর তুমি তোতলা মানুষ .. ..,' একটু ইতস্তত করে বলি, এ প্রসঙ্গটা বেচারা খুব একটা পছন্দ করে না, '.. .. এতো কথা বলতে গেলে তোমার প্রচুর সময় লেগে যাবে, কষ্টের কথা বাদই দিলাম।'
এবার বেচারাকে সত্যিই খুব অসহায় দেখায়, কিন্তু আমি থামি না।
'তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, আমরা দিনরাত খেটে অল্প সময়ের মধ্যে কাজটা শেষ করতে পারবো। কিন্তু এই বিরাট জিনিস কপি করবে কে? বইটা প্রকাশ করার আগে আমাদের কমসে কম এক হাজার কপি তো মজুদ থাকতে হবে, নইলে মার্কেটে ছাড়বো কি? আর হাজার খানেক কপি না থাকলে রয়্যালটিই বা আসবে কোত্থেকে?'
আমি দম নিই, সে মাথা নিচু করে ভাবতে থাকে। আমি তাকে ভাবতে দিলাম। ভেবে কাজ করুক বেচারা, করে ভাবতে গেলে সমস্যায় পড়বে।
'তাহলে দাদা, তুমি বলছো জিনিসটাকে কেটেছেঁটে ছো.. ছো .. ছোট করতে?' সে মলিন কন্ঠে বলে।
আমার একটু খারাপ লাগলো বেচারার জন্যে, কিন্তু কি আর করা! 'হ্যাঁ। অ----নে---ক ছোট করতে হবে।'
'উম্ম্ .. .. তাহলে একশো বছর ধরবো?'
আমি নির্বিকার মুখে বলি, 'ছয় দিন ধরলে কেমন হয়?'
সে রীতিমতো আঁতকে ওঠে, 'ব .. ব .. বলো কি? মোটে ছয় দিন?'
এবার আমি গলার স্বর কঠিন করে ফেলি, হাজার হোক, তিন বছরের বড় ভাই আমি, শাসন করার অধিকার আমার নিশ্চয়ই আছে। 'দ্যাখো, আমার কাছে খুব বেশি প্যাপিরাস নেই। .. .. এখন বাকিটা তুমি ভেবে দ্যাখো।'
এবার সে সত্যি সত্যি মনমরা হয়ে পড়ে। 'অ্যাঁ, তাই বলছো?' দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে আবার জিজ্ঞেস করে।
আমি মাথা নেড়ে স্টাইলাস হতে নিই।
'ঠিক আছে।' আবার শুরু করে সে। 'ছ.. ছ.. ছয় দিনে .. .. অ্যারনদা, ছয় দিন খুব কম হয়ে যায় না?'
আমি শান্ত, কিন্তু দৃঢ় গলায় বলি, 'না মোজেস, কম হয় না। শুরু করো।'
সে বলতে থাকে, 'ছয় দিনে ঈশ্বর বি .. বি .. বিশ্ব সৃষ্টি করেন .. ..।'
(এ গল্পটি আজিমভের 'হাউ ইট হ্যাপেনড' গল্পের ছায়াবলম্বনে লেখা। আজিমভ'স এসএফ অ্যাডভেঞ্চার ম্যাগাজিন -এর স্প্রিং, 1979 সংখ্যায় সেটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


