আমিও এখন এরিস্ট্রোক্রেট, দিব্যি ফ্লেভারড চা খাচ্ছি, লেবুর মোতাত ছড়িয়ে পড়ছে শরিরে, আর এক কোনে ভেসে আছে টি ব্যাগ গতর উলটে- গতর শব্দটা মনে পড়ায়ই হয়তো মনে পড়লো ইদানিং জয়নালের লবজ ঢুকে যাচ্ছে তার ভেতরে, এই শালীন উচ্চারনের কোথাও লোকজ ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটতে দেওয়া ঠিক না। আমাদের ভাষায় থাকবে শিক্ষার স্পর্শ আমরা আমাদের আঞ্চলিকতা ভুলে ,সহজাত উচ্চারন ভুলে প্রমিত বাংলা ভাষার চর্চা করবো, আমাদের বাগযন্ত্রনিসৃত উচ্চারনে থাকবে নাটকের প্রবল প্রভাব। আমাদের মেকি ভাষা মুখোশের মতো এঁটে নেবো জীবন যাপনে। এবং অতঃপর আমরা আধুনিক হয়ে উঠবো,বিচ্ছিন্ন শালীন নাগরিকজন, আমরাই সুশীল সমাজ হয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের শিশ্নচাটবো হাসিমুখে, উচ্ছিষ্ট, এঁটো কাঁটা বরাদ্দ হবে, আমরা প্রগতিশীলতার মুখোশ এঁটে নিবো নাগরিক শান্তি মিছিলে যাবো।ইহাকেই বনেদিয়ানা বলে,
আমাদের বইয়ের তাকে পরিপাটি রবিন্দ নাথ মাথা উঁচু করে আমাদের ভাবনার জগতকে শাসন করবেন, আমাদের মুখে, আমাদের প্রেমে ও বিরহে,আমাদের শোকে ও উল্লাসে তিনি আমাদের স্বর জোগাবেন, এবং ইহাও বনেদিয়ানার অংশ।
বনেদিয়ানা শব্দটাকে ঠাওর করে ওঠা শক্ত,লাস্য-ভাষ্য-চর্বচোষ্যচর্বিত জীবনের মাঝে একটু অবসর, একটু শিল্পচর্চা, একটু আর্ট গ্যালারি ঘুরে আসা, দেয়ালে সাজানো কাইয়ুম, কনক চাঁপা, এসবের বাইরেও শব্দটার একটা অস্তিত্ব আছে, একটা বাহ্যিক কাঠামো,
দেয়ালের র্যাক থেকে ভেঙচি কাটছে ফুকো, বিনির্মান,নৃনির্মানের সময়ে কিভাবে বিনির্মানের প্রকোপ চলে আসে, কি ভাবে গঠনের পরতে পরতে অনেক মানুষের ঘামের গন্ধ মিশে একটা প্রাচীর উঠে যায় চেতনায়, এবং কিভাবে জনবিচ্ছিন্ন শব্দগুলো সংজ্ঞায়িত করে ফেলে আমাদের, আমরা কিভাবে পরিপাশর্্বকে সংজ্ঞায়িত করি এবং একই সাথে পুনঃনির্মিত হই এই কাঠোামোর ভেতরে, এবং নিরন্তর ভাঙচুরের ভেতর দিয়ে কোথায়, কখন কিভাবে সমাজ রাষ্ট্র, বিশ্ব ঢুকে যায় আমাদের ড্রইং রুমের চেনা সোফাসেটে, সব কিছুই নির্মিত, আমাদের ভাবনা নির্মিত, প্রতিনির্মিত, বিনির্মিত হয়েই যাচ্ছে, অফুরান চক্র, চাকা ঘুরছে ঘুরছে, ঘুরছে, সময় গড়াচ্ছে, এবং সার্বিক ভাবে কোথাও পৌঁছানো হলো কি না এ বিষয়টা বোঝার জন্য আমাদের শরন খুঁজতে হবে, কোথায় কার কাছে শরন খুঁজবো আমরা।
ঐ যে পরিপারি শান্তিনিকেতন, সেখানেই বসে আচেন কবি, তিনি বলচেন, কি বলচেন, স্বর গুলোকে একটু এলিয়ে দিয়ে সামান্য নাসিক্যতা এনে বলটে হবে এয়েচেন তিনি, বলেচেন যেতে হবে-
অন্তজ জনের মুখে ভাষা আনিবারও চাই,
জয়নালের কোনো অংশই এই পরিবেশের উপযুক্ত না, তার আঞ্চলিক উচ্ছারন, তার মুদ্্রাদোষ, তার চায়ের কাপে বিস্কুট ডুবিয়ে খাওয়া, সবই অশৈল্পিক, শিল্পিত সমাজের ভেতরে তার স্থান খুঁজে পাওয়া শক্ত। তার যত্রতত্র সিগারেটের ছাই ফেলানো অভদ্্রতার দিকে তাকিয়ে নাসিককুঞ্চিত করে ফেলা নীলাকে কিভাবে বোঝানে যাবে এই মানুষটাই আপাতত তার পেটের অন্ন জুগিয়ে যাচ্ছে, তার আরাধ্য ইশ্বর,
জয়নাল এসেছে বেশী ক্ষন হয় নি, এসব পাতলা চায়ে তার আপত্তি, ডাবল পাত্তির চা ছাড়া তার চলে না অনুযোগে এখানে চায়ের আমন্ত্রন এড়িয়ে যাওয়া জয়নালকে ডেকে এনে কোনো ভুল হয়েছে? হলে হবে, একটু বদলে ফেলা দরকার চারপাশকে, এই মুখোশ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে, একটু রেহাই দরকার, রিলিফ, স্ট্রেস ফ্রি লাইফ, চাপ নিলেই হাজার রকম ব্যামো, বুক ফরফর , কোলেস্টোরেল, ভেজিটেবল ওয়েল সব কিছুই এক সুতায় বাঁধা, জীবনটা নাটকের দৃশ্যের মতো না, অন্তত যে বাসায় তার নিবাস, তার দেয়ালে সাজানো নক্সিকাঁথা, নীলা ঘর সাজাতে ভালো বাসে, এটাই তার বিলাস,এটাই তার অবসর বিনোদন, এটাই তার জীবন, অথচ এই জীবনটাকে কিভাবে আয়ত্ত করলো ইংরেজি বিভাগের তুমুল ছাত্রি, তখনও তার ভেতরে অনেক রকম বিদ্্রোহ আর গড়ে উঠার গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিলো, সেই স্বপ্ন নির্মিত হচ্ছে এই ড্রইং রূমের অনুসঙ্গে, দেয়ালের নক্সিকাঁথায়, দেয়ালের রং নির্বাচনের মগ্নতায়, কোথায় টেনিসন, কোথায় ওয়াইলড, কোথায় সেই দুঁদে বিতার্কিক, যার যুক্তির জাল ছিন্ন করা দেখে তার ভেতরের আর্গল খুলে গিয়েছিলো বছর 6 আগে।
এখানে এই পরিপাশর্্ব জয়নালকে ভীষনরকম বেমানান লাগে, তার সবলীল কতৃত্বপরায়ন ভাবভঙ্গি সংকোচের শেকলে বাঁধা, মইদু মিয়ার চায়ের দোকানের সামনে হাঁক দেওয়া জয়নাল, খানকির পোলা এককেরে গাড়ে ফেলবো, আবার যদি একটা বেগেরবাই দেখি, মাদারচোত বেশী কথা কবিতো জিবলা কাটে কাউয়া দিয়ে খাওয়াবো।
যা গিয়া ওরে বলবি আমি ডাকছি,
কিছুক্ষন চুপ থেকে বলা আর কিছু কইতে হইবো না, ওয় বুঝবো কি কাম আছে-
এই দাপুটে জয়নালকে এই ঘরে নিতান্ত অসহায় বন্দি লাগে, চিরিয়া খানার খাঁচায় বাঁধা পরে থাকা শৈর্য্যের মতো, মাঝে মাঝে তার সোনালী ঝলক উগড়ে দিচ্ছে তারচোখ, তবে সে সুবোধ আগি্নগিরি, এর আঁচে আচমন করা যায়, এ আঁচ দহন করে না।
অবশ্য তার দ্্রোহের ভঙ্গি ফুঁসে উঠছে যতবার নীলার অবয়ব আসছে দৃষ্টিসীমায়, বাঘবন্দি খেলা চলছে, নীলা তার সাজানো ড্রইং রুমের চৌকশ শোপিসের মতো শোভন মুর্তি চাইছে, আর জয়নালের জ্বলন্ত সিগারেটে তেরছা নজর দিয়ে এই দৃশ্যের ছন্দপতনের একটা অদৃশ্য চাপের স্রোতে ভাসিয়ে দিতে চাইছে জয়নালকে, জয়নাল এই পরিবেশে বিপন্ন হরিনের মতো বিরুদ্ধ স্রোতের মোকাবেলা করছে, কখনও ঝুপ করে ভেসে উঠছে, আবার তলিয়ে যাচ্ছে..
বনেদিয়ানার শেকল বোধ হয় এরকমই, একটা অদৃশ্য পাহাড়ের মতো, ক্রমাগত পিষ্ট করতে থাকে, আমাদের অস্তিত্বকে সংকুচিত করে দিতে চায়, আমাদের জীবনকে একটা সরল রেখার মতো মসৃন পথে নামিয়ে দিতে চায়, বাঁধা সড়কের শেষে একটা নির্বাচিত ধাম থাকা, একটা গন্তব্য, আবারও একটা নিরাপত্ত াবলয়, সব কিছুই চাই তার।
ঠিক আছে জয়নাল, আমি পরশু যাবো, কোর্টের ঝামেলাটা শেষ হয়ে যাবে আশা করি।
ঠিকাছে আন্দালিফ ভাই, তাহলে চলে আইসেন, আমি মইদুর দোকানেই থাকবো,
সিগারেটের অবশিষ্টাংশ গ্লাসে ফেলে দিয়ে জয়নালের শেষ দ্্রোহের প্রকাশ, কিংবা অভ্যাস। নীলা হয়তো ভীষন আপসেট হয়ে যাবে এই অরাবিন্দরিক ব্যাবহারে, হয়তো গ্লাসটাকে ছুড়ে ফেলে দেবে, তার কোনো অনিয়মই এখন সহ্য হচ্ছে না, শুঁচিবাই বলবে না হরমোনের প্রকোপ এটা নিশ্চিত করতে পারছে না,
জয়নালকে দরজায় দাঁড়িয়ে বিদায় দেওয়ার পর আর কোনো কাজ থাকে না, সেই অলস বসে থেকে টিভি চ্যানেলে ঘোরাঘুরি, সব দৃশ্য চোখের সামনে আসছে, যাচ্ছে, কোনো প্রভাব তৈরি করতে পারছে না, কোথাও স্থির হচ্ছে না, একটা কেন্দর তৈরি করাটা খুব প্রয়োজন, একটা জায়গায় নিজেকে স্থাপন করতে পারা, একটা ভারমোচন, একটু হালকা হয়ে চলতে পারে, সংস্কৃতি জীবনের বোঝার মতো হয়ে যাচ্ছে, সংস্কৃতি অক্ষুন্ন রাখবার প্রক্রিয়ার অর্থই জীবন,
জয়নালের জীবনের সংজ্ঞা অন্য রকম,সেটার সাথে পরিচিত হতে ভালো লাগে কিন্তু এই নিশ্চিত পথ ছেড়ে সে পথে পা বাড়াতে মন সায় দেয় না। মানুষের জীবন ক্রমাগত পতনের ইতিহাস, মানুষ পরাজিত হবেই, সেখানে প্রতিপক্ষ প্রবল, সমাজ, রাষ্ট্র, চেতনা, সবই প্রহরীর মতো দ্্বার আটকে রেখেছে, এদের সাথে সংঘাত হবে, এবং মানুষ বার বার হোঁচট খাবে,
হোঁচট খাওয়ায় লজ্জার কিছু নেই, মানুষ সেই সব জীবন যারা হোঁচট খাওয়ার পর আবার উঠে দাঁড়ায়, আবার সামনে পা বাড়ায়-
তবে সবাই সামনে পা বাড়ানোর সাহস রাখে না, যেমন আমি, আন্দালিফ, দিব্য ছোটো টেবিলে পা উচিয়ে বসে আছি, চোখের সামনে টিভিতে অসংখ্য দৃশ্য ঝাপিয়ে পড়ছে এবং তার কোনো টাই আমার ভেতরে কোনো আগ্রহ তৈরি করতে পারছে না।
অস্থিরতার উৎস খুঁজতে গিয়ে আরও কিছুক্ষন ভাবনায় বুঁদ হওয়া যাবে, হয়তো যেতেও, নীলার চিৎকারটা যদি কানে না আসতো।
ছিঃ, কি বিশ্রি মানুষ বলতো, তুমি কিছু বললে না ওকে, গ্লাসের ভেতর কেউ সিগারেট নেভায়? এটা কোন ধরনের অভব্যতা। তোমার পরিচিত মানুষগুলোও তোমার মতোই , এই যে টেবিলে পা উঠিয়ে রেখেছো, ওটা কি পা রাখার জায়গা, যদি পা তুলে বসতে ইচ্ছা করে স্টাডিতে তো চেয়ার আছেই, সেখানে পা এলিয়ে বসে থাকো, অকর্মার ধারী।
নীলাকে কিভাবে বোঝাবো এই অলস উভচর জীবন যাপনের মোহটাই বড় মোহ। একটা নিরাপদ বেতন, একটু আধটু সাংস্কৃতিক বিলাস, আর এই 29 ইঞ্চি স্ক্রিনের টিভি, এটা শুধু উপভোগের জন্য, যেভাবে ভালো লাগবে সেভাবেই উপভোগ করতে হয়।
শব্দ শুনেই বোঝা যাচ্ছে ঐদিকে গ্লাসের কপালে ভোগান্তির শুরু হয়েছে, এখন হয়তো আরও 10 বার ধুয়ে তবে যদি শান্ত হয় নীলা। অবশ্য সে বই পড়ছে, গর্ভকালীন সময়ে এসব সাময়িক বাতিক তৈরি হয়, হরমোনাল ইমব্যালেন্স, শরীর একটা নতুন জীবনের জন্য অনুকুল পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে, পুরোনো নিয়ম ভেঙে নতুন নিয়মে অভ্যস্ত হইতে চাচ্ছে, এই প্রথম 3 মাস এমনই হবে, এর পর সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু এই 3 মাস যেনো শেষ হতে চাইছে না, ভয়ংকর হলো কারো কারো পুরো 9 মাসই এই মানসিক পরিবর্তনটা ক্রিয়াশীল থাকে, তাদের সারাক্ষনই সাময়িক অসস্তি থাকে, নীলার এমন হলে তো বেঁচে থাকা মুশকিল হয়ে যাবে।
লজ্জা লাগলেও সত্য এটাই প্রথমে আমরা নিজেকে নিয়েই বাঁচি, এই আমাকে নিয়েই আমার জগত শুরু হয়ে যায়, আমার মা , আমার বাবা, আমার পরিবার, সব খানেই আমির মিশাল দিয়ে আপনত্ব আনানোর চেষ্টা, অথচ শব্দগুলোর অর্থ একেবারে নির্ধারিত নয়, পরিবর্তিতও হতে পারে, পরিবর্তন হয়ও।
ফুকো আর দেরিদা মিলে এই বিকেলটাকে তছনছ করে দেবে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



