মাগরিবের আজান দিচ্ছে বাইরে, শৈশবের বাধানিষেধ এখন নেই তবুও এই মাগরিবের আজান শুনলেই ভেতরটাই ঘরে ফেরার টানটা চলে আসে। এটাই বোধ হয় অভ্যস্ততা,এভাবেই মানুষ পরিচিত জীবন যাপনে নিজেকে মানিয়ে নেয়।কিছু নির্দিষ্ট নিয়মের বেড়াজালে নিজেকে বাঁধে, সেই মত চলার প্রেষণা পায়। বিকাল বেলা জয়নাল যাওয়ার পর নীলার পরিচ্ছন্নতা বাতিক আমাকে বলতে গেলে ঠেলে ঢুকিয়েছে স্টাডিতে। অবশ্য ভালোই হয়েছে, স্থবির বসে থাকার চেয়ে এখানে বসে খানিকটা লেখার চেষ্টা করা ভালো। যদিও জয়নালের অর্ধেক জীবন আমার জানা নেই, যদিও কারোই জীবনের কোনোঅংশই আমরা প্রকৃত জানি না, যদিও আমাদের সামনে একটা মানুষের খন্ডিৎ রূপ প্রকাশ পায় এর পরও আমরা সেই খন্ডিৎ রূপকেই সম্পুর্ন ভেবেই তার সাথে নিজের সামঞ্জস্য, সাযুজ্য বিভেদ বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করি। এই খন্ডিৎ দেখাকেই পূর্ন ভাবাটাই আমাদের জন্য সহজ, আমরা আরও একটু নির্লিপ্ত হয়ে দেখার চেষ্টা করলে হয়তো সবাইকে ভালো ভাবে বোঝার সুযোগটা পেতাম।
বাংলা ভাষা বিবর্তিত হয়েছে, মধ্যযুগীয় অনেক বিশেষন বিশেষ্য এখন প্রচলিত অর্থ হারিয়ে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটা অর্থকেই বহন করছে, তবে এই ভাষাকে সুগঠিত করার কৃতিত্বটা মিশনারীদেরই দিতে হয়। মিশনারিরাই তাদের সভ্যতার ভাবনা আমাদের ভেতর কৌশলে ঢুকিয়ে দিয়েছে, আমাদের দাসত্ব শিখিয়েছে, আমাদের চেতনার দাসত্ব কল্পনার দাসত্ব, আমাদের শিক্ষার দাসত্ব, আমাদের প্রাত্যহিকতার প্রতি মোহ, আসলে দাসত্ব শব্দটাকে অনেক ভাবেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব। কোনো কোনো অর্থ মর্মান্তিক তবে কিছু অর্থ আমাদের সান্তনা দেয়, আমাদের জীবন যাপনে সহায়ক। সংস্কৃতিও একটা প্রথার দাসত্ব, আমাদের পরিচিত জীবনযাপনের প্রতি নিবিষ্ট থাকা, আমাদের শিক্ষা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে সঙ্কুচিত করে দিলেও আমারা সেই শিক্ষার ঘুলঘুলি দিয়েই পৃথিবীর দিকে তাকাই। আমাদের কাছে এসব ব্যাখ্যাই পরিচিত মনে হয়, আমাদের মুখে যারা শব্দ সংজ্ঞা তুলে দেয়, তারাও জানে তারা খুবই নিয়ন্ত্রিত ভাবে আমাদের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে।
আমাদের ভাবতে শেখানো প্রপঞ্চগুলো আসলে আমাদের ভেতরে যে অনুভব তৈরি করে সেটাই সব না। আমরা সবাই বিভিন্ন সমতলে দাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করছি, আর আমাদের এই অবস্থানগত বিচ্ছিন্নতা আমাদের ভিন্ন ভিন্ন শব্দে একই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে শেখাচ্ছে আমাদের ভাবনা আমাদের অজানা, পরিচিত দৃশ্যের বাইরে গিয়ে আমরা কল্পনা করতে পারি না, আমাদের স্বপ্নও আমাদের বিভ্রান্ত করে, আমাদের স্বপ্নও আমাদের পরিচিত জগত দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। আমি জানি না যে মানুষটা কখনই কোনো নগ্ন শরীর দেখে নি, যার কোনো সঙ্গম দৃশ্য স্মৃতিতে নেই তার যৌনস্বপ্ন আসলে কেমন হবে। আমাদের স্মৃতির ভেতর যদি কোনো দৃশ্য নাই থাকে তাহলে সে দৃশ্য আসলেই কি আমাদের পক্ষে কল্পনা সম্ভব?
মিশনারিরা তাদের ভাবনাকে প্রচারের জন্য, যীশুর প্রেমের বানীকে প্রসারের জন্য এসেছে, তারা মানবপ্রেমের প্রতিভূ, তাদের হিতৈষনা তাদের বিশ্বাস তাদের বাংলা ভাষাকে সংস্কারের প্ররোচনা দিয়েছে, তারাই বাংলা ভাষায় ব্যাকরনের সৃষ্টি করেছে, তারাই আমাদের গদ্য ভাষাকে একটা নির্দিষ্ট ছকে বেঁধেছে প্রথম। আমাদের ইশ্বর বাবু সেখান থেকেই শুরু করেছেন সব। আমাদের অক্ষর, আমাদের অক্ষরের অক্ষরের মিলন, আমাদের শব্দযোজন শব্দগঠন, সবই তারা প্রথমে এনে দিয়েছেন। বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরন বইয়ের লেখক কোনো বাঙালি না একজন সাহেব। তার চিন্তা আর কল্পনার সূত্র ধরেই আমরা বাংলা ভাষাকে একটা আকার আকৃতি দিয়েছি। তাদের প্রেষণা ছিলো এই অন্তজ্য জনের ভাষায়, যার কোনো দাপ্তরিক স্ব ীকৃতি নেই, তবে অনেক মানুষের মুখের ভাষাকে একটা নির্দিষ্ট গঠন দেওয়া, এবং সে ভাষায় তাদের বাইবেলকে লিখে ফেলা। বাইবেল প্রচারের জন্য তারা একটা ভাষাকে জন্ম দিয়েছে, তার গণিতিক রূপটাকে সামনে নিয়ে এসেছে, এবং অতঃপর আমরা শিক্ষিত হইলাম, সংস্কৃট পড়ানো টোল, আর ফার্সি শেখানো মক্তবের বাইরে যেসব প্রতিস্থানে আমাদের দাপ্তরিক ভাষার শিক্ষা দেওয়া হতো সেখান বাংলা বলে কিছুই প্রচলিত ছিলো না। আমাদের পাঠ্য সবই ছিলো সংস্কৃতি পুঁথি অথবা ফার্সি পুস্তক। অবশ্য মানুষের অর্থনৈতিক প্রয়োজনের বাইরেও একটা জীবন আছে, সে জীবন যতই সামান্য হোক তুচ্ছ নয়, তাই রাজার বুলি, পুজার বুলি, প্রার্থনার বুলির বাইরে গিয়ে মানুষ তার পরিচিত উচ্চারনে ভাব প্রকাশ করে, এই পরিচিত উচ্চারনের গুরুত্ব বুঝেই তারা এই ভাষায় বাইবেল লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছে, ভাষা দ্্বারা শোষনের মতো মর্মান্তিত শোষন আর নেই, এই ভাষার শোষন আগাদের কল্পনা আর চিন্তাকে দাসত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করে।
ইশ্বর বাবুর গদ্যকে একটা স্টান্ডার্ড মেনে নিয়েই তার রচিত বর্নপরিচয় দিয়েই শিক্ষা জীবন শুরু করা মানুষেরা অবশ্য এই নিয়ম মেনে নিতে পারেন নাই। সেই প্রথম থেকেই মানুষের মুখের বুলিকে আয়ত্ব করে লেখার চেষ্টা চলছিলো, ধুত্তোরি ছাই, কি নাম ঐ লোকটার, প্যারিচাঁদ মিত্তির- না কালী প্রসন্ন সিংহ, কে ঐ বেটা, মনে পড়বে না এখন, কাজের সময় কিছুই মনে পড়বে না।
খুঁজলেই পাওয়া যাবে তবে এই পরিচিত লোকটার নাম এই মুহূর্তে মনে করার চেষ্টা বৃথা। যতই মনে করার চেষ্টা করা হবে ততই সেই লোকের নাম বিস্মৃতিতে চলে যাবে,
কাগজটা মুড়িয়ে ফেলে দেওয়া যায়, আসলেই ভেতরটা অস্থির হয়ে আছে,ংর্ভের সন্তানের প্রতি কোনো মায়া বা স্নেহ জন্মাচ্ছে না, বরং একটা অপরাধবোধ তাকে কুড়ে কুড়ে খায়, এই পৃথিবীতে একজনকে নিয়ে আসার দায়িত্ব নিতে পারবো? তার নিরাপত্তা কে দিবে? প্রতিদিন সংবাদে যেভাবে আছড়ে পড়ে দুঃস্বপ্নের ঢেউ, যেমন বীভৎসতার মুখোমুখি হতে হয় প্রতি দিন সন্ধ্যা থেকে, সেই পরিবেশে একজন শিশুকে নিয়ে আসা আদৌ উচিত কিনা জানি না।
8টা বাজে, এখনই যেতে হবে অফিসে, সম্পাদকের সাথে বসতে হবে, কোন পাতায় কি নিউজ যাবে, কিভাবে সাজানো হবে,ছবি যাবে কি না, সবই অবশ্য জুনিয়ররা করেই রাখে, তার কাজ সম্পুর্নটা দেখে ও.কে করে দেওয়া। নিউজের কনটেন্ট আর ভাষ্য ঠিক করতে গিয়ে প্রায়ই মনে হয় এটা আসলে প্রকৃত কোনো সত্য উপস্থাপিত হচ্ছে না, যদিও তার দৈনিকের ব্যানারে সত্যের সন্ধানে নির্ভ ীক লেখা আছে তবে আসলেই সত্য এমন সাদামাটা সাদাকালো? এমন ভাবে চৌকোনা বাস্কের ভেতর সত্যকে সাজিয়ে রাখা যায়, সত্য মিথ্যার প্রভেদ কি এমনই মোটা দাগে আঁকা? কোথাও না কোথাও একটা অস্পষ্ট সীমারেখা আছে, ধুসর সীমানা, যেখানে থাকলে কোনো সত্যই প্রকৃত না আবার কোনো মিথ্যাই সবৈর্ব মিথ্যা না, মানুষের বসবাস এই ধুসর জগতে,
জীবনানন্দের বলনতা সেন কবিতাটা বার বার পড়ার পরও মাঝে মাঝে বিসিম্বার শব্দটাতে এসে আটকে যাই, মনে হয় ওটা বিম্বসার জগতের কথা, যেখানে একটার পর একটা ছবি সামনে আসতে থাকে, বিম্ব এবং বিম্বিত জীবন, যেখানের সবগুলো ছবিই প্রখর বাস্তব আবার সবগুলোই দৃশ্য মাত্র, এমন ধুসর জগতে আনাগোনা করে সবার জীবন, আর সংবাদ পত্রে আমরা সত্য লিখে রাখি। আমাদের সত্য, আমরা যা বলতে চাই, যেভাবে বলতে চাই সেভাবেই তুলে আনি কথামালা। নিজেদের ইশ্বর মনে হয়, আমরাই সত্যের জন্ম দিচ্ছই, আমরাই মানুষের খন্ডিৎ রূপটাকে সামনে আনছি, নিজেদের পছন্দমতো ব্যাখ্যা তুলে দিচ্ছি তাদের মুখে, তারা আমাদের এই সাদাকালো ছাপানো জগতে সত্য হয়ে বেঁচে আছে। হয়তো তাদের সম্পুর্ন বিশ্বাস আমরা তুলে আনতে পারি না, তবে কিছু মানুষ পয়সা দিয়ে আমাদের দৈনিক কিনে আর তারা ভাবে আমরা যেভাবে বলছি ঘটনা হয়তো সেভাবেই ঘটছে, সম্পাদকের টেবিলের ফোনের ক্ষমতা এদের জানা নেই, এদের জানা নেই অনেক সত্যই আসলে ছাপার অক্ষরের মুখ দেখে না। অনেক মানুষকে তৈরি করার প্রক্রিয়ায় আমরা তাদের কিছু সত্যকে অনায়াসে মুছে দেই, আমরা সবাইকে সব জানতে দিতে চাই না, আমরা নিয়ন্ত্রন করি মানুষের ভাবনা কে, ঔপনেবিশকতার যুগে মিশনারিরা আমাদের ভাবনাকে নিয়ন্ত্রনের জন্য আমাদের ভাষাআগ্রাসনে আমাদের ভাবনাকে নিয়ন্ত্রন করেছিলো আজ 300 বছর পরে আমরা সেই মিশনারিসৃষ্ট বাংলাভাষাকে নিয়ন্ত্রন করে আমাদের বানী পৌঁছে দেই সবার ঘরে।
আমরা মানুষকে ভাবাতে চাই, আমাদের যেভাবে ভাবালে সুবিধা হয় সেভাবেই আমরা ভাবনাটাকে তৈরি করে দিতে চাই। আমরাও সেই একই ভাবেই চেতনাকে নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করছি। আমরাও এই একটা দালানে বসে ঔপনেবিশকতার চর্চা করছি।
আমাদের উপনিবেশ মানুষের চেতনা। উই আর এ্যাট লাস্ট ব্যাক টু দি স্কয়ার ওয়ান ইজ ন'ট ইট?
আয়নার নিজের খন্ডিৎ চেহারা ব্যাঙ্গ করে স্টাডি ছেড়ে বাইরে বের হলো আন্দালিফ।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে আগস্ট, ২০০৬ দুপুর ২:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



