নীলার জন্য আসার পথে ফুল নিয়ে আসবো, কথাটা লিখে রাখতে হবে, শাহবাগের দোকানগুলো বন্ধ হয় 10টার মধ্যেই, এর আগেই নিতে হবে, বেলী ফুলের মালা নিয়ে আসবে যদিও তার বেলী ফুলের গন্ধে মাথা ধরে তবুও, নীলা খুব পছন্দ করে বেলী ফুল, আমার নিজের পছন্দ বুিল, একটা মাদকতা আছে, মহুয়াও খারাপ না, একটা নেশা নেশা ভাব আসে, তবে মহুয়ার মতো বিলীন হয়ে যায় না বকুলের গন্ধ, যত দিন যায় তত তীব্র হতে থাকে। বেলী ফুলের গন্ধটা কেমন নাকের ভেতরে গিয়ে সুরসুরি দেয়, হয়তো এলার্জিক এই ফুলের প্রতি, বলা যায় না, মানুষের এলার্জির কোনো সীমা পরিসীমা নাই। গোলাপের গন্ধেও মানুষের এলার্জি আছে, ওরা গোলাপের গন্ধ গেলেই চোখ-মুখ ফুলে যায়, গায়ে র্যাশ উঠে, আর অনবরত নাক দিয়ে পানি ঝড়তে থাকে। আমার অবশ্য এমন ভয়ংকর এলার্জিনেই, শুধু নাকটা শুলশুল করে, কয়েক বার হ্যাঁচ্চো হ্যাঁচ্চো করেই আবার স্বাভাবিক।
নাকি একটা তোড়া নিয়ে আসবে, ক্রিসেন্থিয়াম, গোলাপ ঝাউপাতা দিয়ে সাজানো, খবরটা পাওয়ার পর আসলে নীলাকে দেওয়া হয় নি কিছুই, অবশ্য নীলার জীবন থেকে এখন এইসব শখ প্রায় বিলীন হয়ে গেছে, একদিন চাইনিজে গেলাম, সেখানে গিয়ে একটা দানাও মুখে তুললো না, সবটাটেই নাকি বোঁটকা গন্ধ, আর শাড়ী কিনে দেওয়ার মতো বোকামি করা ঠিক হবে না, বড় পছন্দ করে কচি কালাপাতা রংএর টাঙ্গাইল কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম, নীলার প্রথম কথাতেই সব প্রেম ঝড়ে গেলো।
এটা কি জিনিষ আনছো বাছাই করে? এই জিনিষ গায়ে দিয়ে ঘুরলে গরু ছাগল এসে কামড়াবে, মানুষের রংয়ের চয়েস এত জঘন্য হয়, মনে হচ্ছে শাড়ী না একগোছা কাঁঠাল পাতা নিয়ে আসছো ব্যাগে ভরে, কালকেই বদলে নিয়ে আসবে। যার যেটা কাজ না তাকে সে কাজ করতেই হবে এমন কোনো দিব্যি কেউ তো তোকামে দেয় নাই, যার কাজ তারেই সাজে অন্যে করলে ঢনঢন বাজে। বুঝলে কিছু বুদ্ধু কোথাকার।
অবশ্য রাতে সেই শাড়ী পড়েই এসেছিলো,চমৎকার লাগছিলো, চোখটা গোল করে বলেছিলো আহা এই নাও তোমার সাধের শাড়ী পড়ে আসলাম এখন চিবাও ,
ইঙ্গিতে ছাগল বললেও সেটা গায়ে না মেখেই মুগ্ধ তাকিয়ে ছিলো, অতঃপর যা যা হয়, ঘুমের পর এখন হঠাৎ উঠে যদি দেখি বাঁপাশটা খালি, ধ্বক করে উঠে বুকটা।অভ্যস্থতা এমনই ব্যাধি, জীবনের 27 বছর একাকী বিছানায় শুয়ে েই 6 বছরে এমন অভ্যস্থ যে আগের 27 বছরে স্মৃতি মুছে গেছে সম্পুর্ন এখন বিছানাটা শুন্য লাগে, বাঁপাশে একজন আছে, মনে হয় ভারসাম্য ঠিক আছে, নয়তো কোথাও তলিয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয়। মনে হয় ঘরটা কোনো এক অদৃশ্য কারনে তেপান্তর হয়ে যাচ্ছে, নিজেক ছোটো মনে হওয়ার এই গোপন মানসিক ব্যাধির কোনো চিকিৎসা নেই। নীলা আসলেই সব আবার সঠিক প্রোপরশনে চলে আসে, তখন ঘরের জানলাগুলোর মাপ ঠিক হয়ে যায়, দরজাটাও মনে হয় কাছেই আছে, আর বিছানা খোলা মাঠের জায়গার পরিচিত আকার পায়।
নীলা মাঝে মাঝেই রাত জেগে বসে থাকে, তবে আগে যেমন বারান্দায় যেতো যায় না এখন, যে দিন শুরু হলো সেদিনের কথা স্পষ্ট মনে আছে, সেদিন অফিসে কাজ ছিলো, সাজেদ হন্তদন্ত হয়ে এসেছিলো সন্ধ্যায়, ঠিক সন্ধ্যাও না তারও একটু পরে, তখন অপরাশেন ক্লিন হার্ট চলছে, সাংবাদিকের পরিচয়পত্র সার্বক্ষনিক মানিব্যাগে রেখেও তল্লাশির যন্ত্রনা হজম করতে হয়, মালিবাগের ওখানে সন্ত্রাসিকে গুলি করতে গিয়ে বারান্দায় দাঁড়ানো এক মহিলাকে মেরে ফেলেছে আর্মিরা, এই নিয়ে তেমন হৈ চৈ হয় নি, তখন আর্মিদের হাতে সব পাওয়ার, তাদের স্বেচ্ছাচারের অধিকার আছে, তারা যাকে ইচ্ছা ধরছে, যাকে ইচ্ছা গুলি করে মেরে ফেলছে,কেউ কিছু বলছে না, সাধারন মানুষ অনুভুতি শুন্য,বিবেকবর্জিত জীবনযাপন করে, তারা পেপারে মন্তব্য কলামে এই নির্বিচার হত্যার পক্ষ্যে সাফাই গাইছে, শুধু গুটিকয় মানুষ মানবাধিকারের কথা বলে চিৎকার করছে, এমনই সময় এই মৃতু্য, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত মৃতু্য, যার কোনো বিচার হবে না, একটা মানুষ নিজের ঘরের বারান্দায় নিরাপদ না, তাকেও রাষ্ট্র হত্যা করে ফেলতেপ ারে অবলীলায় এই সত্যটা উপলব্ধি করার পর তার ভেতরে ভয়ের শেকড় ডালপালা মেললো, সম্পাদককে বলে কোনো মতে ট্যাক্সি নিয়েই বাসায় ফিরে নীলাকে জড়িয়ে ধরেছিলো। নীলাও কিছু মনে করে নাই, আচ্ছা আসছি, দাঁড়াও, চায়ের পানি বসিয়ে আসছি,
বিস্তারিত শোনার পরও নীলার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয় নি, তার হাসিমুখ সামান্য মলিন হয়েছিলো, আহারে বেচারা, খারাপ লাগছে মহিলার জন্য, অবশ্য কার মৃতু্য কখন কিভাবে হবে এটা কেউ জানে না।
নীলা আমার ভেতরের যন্ত্রনা, ভয়টাকে বুঝে নি তেমন ভাবে। আমার অনিশ্চয়তা, আমার হারানোর ভয়, আমার অসহায়ত্ব , তাকে কিভাবে বোঝাবো সেই মহিলার মৃতু্য আমাকে অপরাধি করে নাই, আমাকে বিভ্রান্ত করেছে, মানুষের সামগ্রিক নিরাপত্তাহীনতা, আর নিরাপত্তপ্রদানের নামে মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তাকে সামনে টেনে এনেছে, এরশাদের পতনের আগে আগে তার সামনের ফ্লাটের নীচে অন্ধকারে একদল আর্মি বুটে পিষ্ট করছিলো এক কিশোরকে, কিশোরের বুকফাটা আর্তনাদ শোনা গেলেও সবাই ঘরের দরজা বন্ধ করে ছিলো, এমন কি কোনো ঘরে মোমবাতিও জ্বলে নাই, সেখানেই গোঙাতে গোঙাতে কিশোরটা ঢলে পড়েছিলো, পরদিন সকালে তার মুখের কষে জমা রক্তের দাগ আর সেখানে ঘুরে বেরানো ডেয়ো পিঁপড়া এরশাদের প্রতি আমার ঘৃনাটাকে শতগুনে বাড়িয়ে দিয়েছিলো,সেই মৃতু্যর কৈফিয়ত দেয় নি কেউ, তখন ছিলো স্বৈরতন্ত্র, এখন গনতন্ত্র, এখনও রাষ্ট্রের হত্যার কোনো বিচার কেউ পায় না, কয়দিন পর দায়মোচন অধ্যাদেশ হবে, সাংবিধানিক ভাবে এসব হত্যার বৈধ্যতা দেওয়া হবে, এই নিষ্ঠুর মানুষগুলোর কোনো বিচার হবে না, রাষ্ট্র নিজের মুখ ফিরিয়ে নিবে, তার জনগনের প্রতি অত্যাচার করবে। আমরা কোন সমাজে বাস করি, যেখানে মানুষের নুন্যতম নিরাপত্তা নেই, এই নীলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে, হয়তো নীচে কোথাও কেউ দৌড়াচ্ছে প্রানভয়ে, রাষ্ট্রের থাবা থেকে নিজেকে বাঁচাতে, আর নীলা ইতিহাস হয়ে যেতে পারে, ভুল করে চলে কোনো বুলেটে নীলা হারিয়ে যেতে পারে জীবন থাকে, এই সামগ্রিক অনিশ্চয়তা নিয়ে আমি সারারাত এপাশ ওপাশ করলাম, ভয়টা মাথার ভেতরে গেঁথে গেলো।
পরে কোনো একদিন রাতে ঘুম থকে উঠে দেখলাম নীলা নেই, সেদিনই এই ভয়ের শেকড়টা ডালপালা মেলে ঘরে ছড়িয়ে গেলো, আমার গোঙানি শুনে নীলা এসেছিলো ঘরে, মুখে পানি ছিটিয়ে , বাতি জ্বালিয়ে বলেছইলো, কি হয়েছে তোমার, ভয়ের কোনো স্বপ্ন দেখেছো? এই তো আমি, আমাকে ধরে থাকো, আমি তো এখানেই আছি, সেই থেকে নীলা ঘুম না আসলেও ঘরে র ভেতরে অন্ধকারে বসে থাকে, এটাকেই ভালোবাসা বলে বোধ হয়।
সাইদ চা নিয়ে আয়, সাইদ ছেলেটা ভালোই এখানে কাজ করে, অফিসের সাবাইকে চা এনে দেয়, কোথায় থাকে কে জানে, সকালে আসে, রাতে 10টার দিকে যায়,সারাদিন এখানেই থাকে, চা সিগারেট আনে,মাঝে মাঝে মনু মিয়ার দোকান থেকে সিঙারাও নিয়ে আসে। ও না থাকলে এই অফিসে কিভাবে বাঁচতো মানুষেরা, আমরা সভ্য মানুষেরা কিভাবে শ্রম শোষন করি তার জলন্ত উদাহরন সাইদ, এত শোষনের পরও তার মুখের হাসিটা মলিন হয় না, ভালো আছেন এডিটর সাহেব বলে চা এনে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, চলে যেতে বললে যাবে, এমন দাসত্ব আছে বলেই এখানে কাজ করে সুখ।
সাজ্জাদকে কপি নিয়ে কনফারেন্সে আসতে বলো,
সাইদ চলে গেলো সাজ্জাদকে খবর দিতে।
প্রবাল বসে আছে, হাতে একটা প্যাকেট, নিশ্চিত ছবি, ও এখানকার ফটোজার্নালিস্ট,
আন্দালিফ ভাই আপনাকে দেখতে হবে না এসব, আপনি হজম করতে পারবেন না, শালার বাঞ্চোত মোল্লারা, দুই পীরের মুরিদদের মধ্যে লাগছিলো, একটারে পিটায়া ফালাফালা কইরা ফেলছে, আলুভর্তা বানায়া ফেলছে এককেরে।আপনে যান আমি সাজ্জাদরে বুঝায়া দিমু, আপনের দেখনের কাম নাই।
***
ভাইসব আন্দালিফের সন্ধ্যা পইড়া পড়া শুরু কইরেন****
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



