তাজমহলের সামনে তানভীরের কথা আমাকে অনেক আগে জানা একটা কথা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিলো ভালো ভাবেই, মানুষ কোনো গাণিতিক সমীকরণ নয়, মানুষকে পড়ে ফেলা যায় হয়তো তবে সব সময় চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না মানুষ সম্পর্কে। তারা হঠাৎ করেই সব হিসাব বদলে নতুন একটা উপলব্ধি সামনে নিয়ে আসে। আর মানুষের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেলেও সেটা পুনঃবিবেচনার একটা সুযোগ রাখা দরকার। তানভীরের অনুভব আমার ভাবনায় যতই খেলো মনে হোক তার কাছে এই অনুভবের মুল্য অপরিসীম, তাই তার মনোভাবের কিংবা আবেগের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত।
যদিও নিজেই নিজেকে কন্টরাডিক্ট করাটা আমার স্বভাব, এই বিষয়টার উপলব্ধি হওয়ার পরও তার আবেগ নিয়ে কটু কথা বলতে বা তাকে নিয়ে ব্যাঙ্গ করতে আমার বিন্দুমাত্র অনুশোচনা হবে না এর পরও এই জায়গাটায় একটা সীমারেখা টানা উচিত। একটা সীমারেখা টানবো এমন একটা পণ করি মনে মনে। তাজমহল দেখার পর সবার ভেতরে আবেগের বান ডেকেছে, সবাই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে এক অন্যের দিকে, আর সমাজের কঠোর প্রহরা যেহেতু অনুপস্থিত এই ভারতভূমে তাই সবাই বেশ সাবলীলভাবেই নিজের চাহিদা-চেতনা অনুযায়ি আচরন করছে, আগের সঙ্কোচ কিংবা দ্্বিধা এখন নেই, সবার সামনেই কাঁধে মাথা রেখে প্রেমিক প্রেমিকা গল্প করছে, এখনও ততটা ভয়ানক ভাবে শাররিক ঘনিষ্ঠতা শুরু হয় নি, তবে এই ধারা দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকলে আর যা যা প্রেমিক-প্রেমিকেরা উদ্যানে করে তাও করে ফেলতে পারে।
আমাদের শিক্ষকদের রোমান্টিক ভুমিকায় দেখা, বিবাহিত প্রেমের মজমা দেখার সুযোগ এই প্রথম। আসলে পরিবারের ভেতরে থেকে এভাবে দেখাও যায় না, সবাই অল্পবিস্তর রোামন্স ভরে রাখে ভেতরে, সবার ভেতরেই গান গুনগুন করে, ফুল কিনে দেওয়া, উপহারে সাজানো, ব্যাগ বোঝাই করে গেরস্থালী সরঞ্জাম কেনা, এসব পারিবারিক বিষয়আসয় নিয়ে আমি বিরক্ত হলেও আমার বিরক্তি কেউ আমলে আনছে না মোটেও।
যার ভেতরে যেসব চাহিদা ছিলো যা ক্লাশের চাপে প্রকাশ করা সম্ভব হয় নি, এখানে সেসব আবেগ উন্মুক্ত হচ্ছে। এখন অনেকগুলো জুটিবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে চারপাশে, গনমানুষের জন্য কামলা খাটার কাজ করার মানুষ এখনও বর্তমান, ছেলেমেয়ের অনুপাত সমান হলে হয়তো বিষয়টা অনুপস্থিত হয়ে যেতো দৃশ্যপট থেকে, তাই কামালকে দেখা যাচ্ছে শাম্মির ব্যাগ বহন করছে, তমাল আইভির ক্রমশ ভারি হতে থাকা ব্যাগ ঘাড়ে কলুর বদলের মতো বেঁকে যাচ্ছে, রুবেল স্বর্নার ফুটফরমাশ খাটছে, সোনিয়ার প্রত্যাশা মেটানোর জন্য সঞ্জয় অগ্রহী হলেও সে সুযোগ বেচারার মিলছে না, সোনিয়া চাইছে শমিক এই কাজটা করুক। রিম্পির চাহিদাও পুরন হচ্ছে না সেভাবে, যুঁথি বেশ বিষন্ন বিকাল থেকেই।
তানভীর যুঁথির আশে পাশে নেই, তবে দুর থেকে আঁখিও সে গোলি মারা কার্যক্রম চলছে ভালোভাবেই। সেই করাল দৃষ্টির সামনে কেঁচো হয়ে যাচ্ছে যুঁথি।তার আচরনের অভব্যতার অপরাধবোধের ম্রিয়মান হয়ে যাচ্ছে।ব্যাগ বাসে উঠানো একটা শিল্প। সুমোর ছাদের ব্যাগ উঠানোও শিল্প, তবে সুমোর ছাদে ব্যাগ উঠানো হচ্ছে না, সবাই 2 নাম্বার, এই সুমো কেনা হয়েছে ব্যক্তিগত ব্যাবহারের জন্য , এটাকে বানিজ্যিক কাজে ব্যাবহারের কোনো লাইসেন্স তাদের নেই। উঁচু করে বাঁধা হলো ব্যাগ, সেগুলো খসে পড়ছে, অনেক কষ্টে সবগুলো ঠিকমতো রেখে মেয়েদের অতিরিক্ত ব্যাগ মেয়েরা সাথে নিয়ে বাসে উঠছে, সবার সিটিং এরেঞ্জমেন্ট দেখে সন্তুষ্ট হয়ে আমরা সুমো অভিমুখে, সামান্য পরিবর্তন হয়েছে, বাবু ক্লান্ত, সে আর সুমোতে যাবে না, সে বাসে যাবে, বাবুর বদলে এখানে আসবে শমিক।
আসলে আমরা সবাই ক্লান্ত বললে কম বলা হবে, একেবারে বিধ্বস্ত, এবং সবাই বাংলা ভাষায় কথা বলতে না পারার যন্ত্রনায় কাতর। নিজেদের ভেতরে কথা বলা সমস্যা না কিন্তু অন্য সবার কথা ঠিকমতো বুঝতে না পারার একটা সার্বক্ষনিক যন্ত্রনা আছে, সেই সাংস্কৃতিক দোটানার ছাপ পড়েছে আচরনে। হিন্দি শুনতে শুনতে সবাই অভ্যস্ত এখানে, সবাই হিন্দি ছবি দেখে নিয়ম করে, সবাই রাতের একটা অংশ কাটায় হিন্দি গান শুনে এর পরও চারপাশে যখন হিন্দি, যখন তামিল, তেলেগু মানুষেরা কটকট করছে তখন নিজেদের অসহায় মনে হয় ঠিকই।
এর সাথে অনবরত ছুটে চলার ক্লান্তি, ট্রেনে কাটানো 30 ঘন্টা, এর পর আরও কিছুক্ষন বাসে, এর পর এখানে ওখানে যাওয়া, ট্রেনে অনেকক্ষন বসে থাকলে ট্রেন থামার পর একটা ঝমঝম শব্দ হতেই থাকে মাথার ভেতরে, এখন আমাদের মাথার ভেতরে অবিরাম ইঞ্জিন গজরাচ্ছে, ঘুঁমমমমম ক্যাঁচ, সব ধরনের উদ্ভট আওয়াজ যা শুধুমাত্র যন্তই সরবরাহ করতে পারে। রাতে ঘুম ঠিক মতো হচ্ছে না, সবাই সহনশীলতার অভাবে ভুগছে, সেই অসহিষ্ণুতা প্রকাশ পাচ্ছে আচরনে, সবাই সবার উপর বিদ্্বেষ পুষে রেখেছে।
সুমোতে ঘুমের সুব্যাবস্থা নেই, প্রথম সীটের অবস্থান যেমন তাতে ছোটোখাটো কেউ অনায়াসে বসে ঘুমাতে পারে কিন্তু দুজন বসে ঘুমানোর চেষ্টা করলে সেখানে গীয়ারের উপর চাপ পড়ে কিংবা গিয়ার বদলাতে সমস্যা হয়,
পেছনের সীটে 4 জন বসা মানে গাদাগাদি করে বসা, একজন অন্যজনের ঘাড়ে মাথা দিয়ে ঘুমানো যায় তবে ঘুমের জন্য আদর্শ ব্যাবস্থা হলো বিছানা, যেখানে লম্বা হয়ে সমস্ত শরীরের বিশ্রাম করানো যায়। এখানে বসার কারনে শরীরের কিছু অংশে অহেতুক চাপ পরে , এই অসহনীয় অবস্থায় নির্বিকার ঘুমানো সম্ভব না । পেছনে 2প াশে 2টা করে 4টা সিট। সেখানে ঘুমানোর চেষ্টা বলতে এক হাত হাতলে রেখে ঝিমানো, তানভীর বসে পেছনের সীটের পাশে, সেখানে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়া সহজ, তবে যে পেছনের দরজার দিকে থাকে তাকে এক হাতে সামলে বসতে হয়, সেই হাতে ধ্যানী যোগীর মতো কসরত করে ঘুমানো।
বাবুর হাল ছেড়ে দিলেও মানুষের উৎসাহ কমে নি, শমিক এসেছে, আশফাক বসেছে লিটু ভাইয়ের পাশে, আমি শমিক পাশাপাশি, এর আগে আমি আর বলদ তানভীর পাশাপাশি ছিলাম ,দেখলাম আমার পিঠকে বালিশ বানিয়ে দিব্যি ঘুমাচ্ছে ব্যাটা। ও অবস্থায় ওর ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটিয়ে সিগারেট টানা প্রায় অসম্ভব একটা কাজ, এবং উচ্ছাসের সাথে তাল মিলিয়ে গান গাইতে হবে, সারা রাত চলবে গানের প্রতিযোগিতা। এটাই সুমোসেনাদের কাজ, সারারাত মাস্তি হবে।
রওনা দেওয়ার পর অবস্থাটা তেমন জাম্পেশ মনে হয় না, শুরুতে উচ্ছাস নিয়ে ইটস এ সানি সানি ডে দিয়ে সে রাতের অধিবেশন শুরু হলেও সময়ের সাথে মানুষের উচ্ছাসের গ্রাফটা নীচের দিকে নামতে থাকে, একটা পর্যায়ে সবাই বিরহের গান গাওয়া শুরু করে, এসব গানে ওত উচ্ছাসের ছড়াছড়ি নেই, এর পরের ধাপে রবিবাবুর গান, শমিক বিভিন্ন গানের কথা সামনে আনছে, ওসব গীত হওয়ার পর দেখা যায় আমরা নিথর সময় অতিবাহিত করছি, কাউকে না কাউকে পঁচানো শুরু করতে হবে।
লিটু ভাই প্রায় অর্ধমাতাল তানভীরকে প্রথম প্রশ্ন করে, মিয়া তুমি কি শুরু করলা এইটা, যুঁথির দিকে এইভাবে তাকায়া থাকো। যুঁথি আমার কাছে কমপ্লেইন করছে, আমরা বেশ আশ্চর্য হয়ে শুনি, কিছুটা পুরুষালি আমোদ পাই, নারীদের বিপন্ন করে ফেলায় যেমন একটা আমোদ পুরুষের ভেতরে তৈরি হয়। আমি বললাম আমি তো তোমাদের বন্ধুদের বিষয়ে ইন্টারফেয়ার করতে পারবো না, তুমি তোমার বন্ধুদের বলো। আর তানভীর আর তোমার বিষয়ে আমি ঢুকে পড়াটা ঠিক হবে না।
তানভীর জবাব দেয় যুঁথি আমাকে বলছে ওর পাশে দাঁড়ানো যাবে না, আমি ওর পাশে দাঁড়াবো না কিন্তু ও আমাকে তাকানোর কাজে বাঁধা দিতে পারবে না । আমার চোখ দিয়ে আমি তাকাবো, আহা কি চমৎকার গান মাথায় চলে আসলো- তোমার বাড়ীর সামনে দিয়ে আমার মরন যাত্রা যেদিন যাবে, গানটার প্যারোডী মনে পড়লো, সেটাও সামনে আনা হলো, অবশেষে আমরা শিক্ষক ছাত্র ব্যারিয়ারটা ভেঙে শুরু করলাম পোলার নামে করম বেঁচে মলম------
লিটু ভাই হাল ছেড়ে বললো মিয়ারা তোমরা আমার মানসম্মান খাইবা, আর তোমাগো লগে থাকুম না আমি।
আমরা আশ্বস্ত করি, আরে মিয়া আমরা আমরাই তো আর কাউরে কি কিছু কমু নাকি। দেন একটা সিগারেট ফিকেন পিছনে, জ্বালায়া দিয়েন আমার ম্যাচ নাই।
সিগারেট আসে, এখন অনেক রাত গেয়ে হাঁপিয়ে উঠার মাঝেই রাতের খাওয়ার জন্য একটা ধাবায় থামে গাড়ী। ব্রিটানিকা বিস্কুটটা চমৎকার, আহা কি স্বাদ, মনের মতো, ওটাই প্রিয় হয়ে যায়, সাথে চা, তন্দুরি আর পালাংপানির ভালো লাগে না খেতে, ডাল দিয়ে তন্দুরি খেয়ে কোনো মতে পানি গিলে শান্ত রাখি পেটকে। বাস আসে, সবাই নামে, রাত গভীর হচ্ছে, এই ছোটো ধাবায় কোনো টয়লেটের ব্যাবস্থা নেই। আমরা যে যার মতো ঝোপে র আড়ালে, রাস্তায় পাশে, গাছের গুড়িতে কাম সারছি, একে একে বাস থেকে নামছে মানুষ,
তোরাই সুখে আছিস, বাসে একদম ঘুম আসে না, ঘুমানোর উপায় নেই মোটেও, তার উপরে তোরা নাই সিরাজ ঝন্টুকে দেখলে গুন্ডার কথা মনে হয়, ঘুমাতে পারি নাই। এই সব অভিযোগের জবাবে একটা কথাই বলা যায়, বললাম তাই, নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস- যদি ইচ্ছা থাকে তাহলে সীট বদল কর। বাসে উঠে দেখি রুবেলের উপর হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছে স্বর্না, বেশ নিশ্চিত নির্ভার, তমাল ধরে আছে আইভিকে, বেচারা অসুস্থ, সবাই নামলো একে একে, সবাইকেই খাইতে হয়।
এই ছেলেরা শুনো, শায়লা তার খ্যানখ্যানে গলায় ডাকলো, আশে পাশে কেউ শোনার মতো ছিলো না, তাই আমাকেই এর কবলে পড়তে হলো, ঐ দিক থেকে চলছে শালা লালা শায়লা, এই দিকে শায়লার হাসি, মাঝে খানে আমার ফাঁসি হয়ে যাওয়ার অবস্থা, রাসেল এখানে টয়লেট নাই?
আমি কি উত্তর দিবো? বললাম ধাবায় গিয়া জিগাও আছে কি নাই?
ওখানে তো নাই, একটা টয়লেট খুঁজে দাও না।
মামাবাড়ীর আব্দার, এই অন্ধাকরে নিজের পা ঠিক মতো দেখতে পাই না আর উনার জন্য টয়লেট, বললাম তোমার কি মনে হয় এই এতদুর জার্নি করে আসছি তোমার টয়লেট খোঁজার জন্য?
শায়লার হাজির জবাব পুরুষ মানুষ হইছো এইটুকু করতে পারবা না।
আমি ভালো একটা সাজেশন দেই তোমারে, এই খানে টয়লেট খুঁজাখুঁজির ঝামেলায় না গিয়া ঐ যে সামনে মাঠ আছে ঐ খানের আলের পাশে বইসা কাম সাইরা ফেলাও।
শায়লা বিষয়টাতে ভীষনরকম আপসেট, সান্তনার জন্য বলি আরে কে আর অন্ধকারে তোমারে দেখার জন্য যাইবো, আর যা অন্ধকার কেউ দেখলেও কিছু বুঝবে না। নিশ্চিত মনে কাম সাইরা ফেলাও। তোমার কি মনে হয় এইখানে যারা আছে তারা সবাই টয়লেট খুঁজে, ওরাও একই কাজ করে, আমার কথা শুনো
বেচারা আমার দিকে তাকায় মুখ ঝামটা দিয়ে অন্য দিকে গেলো।
আমি সিগারেট ধরিয়ে উদাস তাকিয়ে থাকি। শালার ভালো কথার বাজারদর সব সময় কম।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০০৬ রাত ১০:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



