আশফাক বেশ দশাশই সাইজের মানুষ, 5 ফুট 9 হলেও প্রস্থে বেশ ভালোই, লিটু ভাই অবশেষে অবস্থান পরিবর্তনের দাবি জানালো, আশফাক ফিরে যাবে পেছনে সেখানে যেটে হবে আমাকে, আমার সাইজ চিকনচাকন, গুঁজে দেওয়া যাবে, তবে আমার বেখাপ্পা সাইজের পা দুটোকে কোনোভাবেই ভাঁজ করে রাখা যাচ্ছিলো না, সীট পেছানো যাবে না তাহলে পেছনের সীটের মানুষের বুকের উপর চাপ পড়বে, সামান্য পিছনে হেলিয়ে দিয়ে সীট, পেছনের সবার মতামত গ্রহন করে অনেক কষ্টে নিজেকে ফিট করলাম। স্যান্ডেলের ভেতরে রাখা পা আগুনের মতো জ্বলছে, সবাই জুতা পড়েই আছে, কেউ একজন জুতা খুলে পা উঠিয়ে বসেছিলো, ভয়ংকর গন্ধে এবং জনপ্রতিরোধে তাকে তার মুজা জুতার ভেতরে রাখতে হয়েছে, এবং পেছনের সীটের মানুষেরা মিটিমিটি চোখে জেগে আছে। মাঝের সীটের মানুষেরা এ ওর ঘাড়ে মাথা দিয়ে ঘুমাচ্ছে, মর্তুজা নাক ডাকছে ঘোৎ ঘোৎ করে। বেশ বিরক্তিকর সিম্ফনি।
অবশ্য নাকডাকা জগতে সবাই অনন্য, কারো নাকডাকাই ঠিক অন্য কারো মতো না, স্কেলে পার্থক্য আছে, আছে আওয়াজের বহরের পার্থক্য, একপাশে ঘোঁ শব্দ হলে অন্যপাশে ফুস শব্দ হচ্ছে, কেউ নাকে-মুখে আওয়াজ করছে, তবে যারা যোগাসনে ঘুমাচ্ছে তাদের কথা ভিন্ন, ওরা সটান বসে আছে, নাক ডাকার জন্য একটু কম্ফোর্টেবল সেট আপ লাগে মনে হয়। তাই জসিমের একটা স্কেল, লুকুর একটা স্কেল এবং মর্তুজার একটা স্কেলে নাকডাকা বাদ্য চললেও মাঝে মাঝে বেহালার করুন টান দিয়ে উঠছে জামালের নিঃসঙ্গ নাসিকা।
চৌহান ক্লান্ত তবে তার জেগে থাকার জন্য একজনকে সঙ্গ দিতে হবে । সে করুন মুখে বললো তুমহারে কোঈ একলোককো জাগনা হোগা মেরে সাথ। অর তুম ইয়ে যো আন্তাক্ষশরি খেল রাহেথে না, ও হি খেলতে রাহো, কেয়া হোতাহে কে যাব থাকান আ যাতিহে তো আঁখ লাগ যাতি হে।
শালার কি ভয়ংকর কথা, ড্রাইভার ঘুমায়া গেলে হাতে হ্যারিকেন, বালের দেশের রাস্তার দুইপাশে জঙ্গল, কোনো একটা গাছে বাড়ি লাগলে আর পরদিন বাংলাদেশের পেপারে ছাপা হবে শিক্ষাসফরে গিয়ে মেধাবি ছাত্রদের করুন মৃতু্য, তাদের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি শীল মেধাবী শিক্ষকের মৃতু্য হয়েছে, ঘটনা সুত্রে জানা যায় তারা......
এমন কোনো শিরোনাম হতে দেওয়া যায় না, বিগত প্রেমিকার মুখ মনে পড়ছে, তার সাথে যোগাযোগ নেই তো কি হয়েছে, এসব সাময়িক ভুলবুঝাবুঝির অবসান হয়ে যেতে সময় লাগে না, এসব মান অভিমান পর্বের সাথে আরও অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়া বাকি, এখানে এই ভারতে মেধাবি ছাত্রের করুন মৃতু্যতে এই প্রেম কাহিনীর উপসংহার টানতে রাজী না মন।
ড্যাশবোর্ডে অন্তত 4টা প্যাকেট সিগারেট, একটা বের করে ধরাই, লিটু ভাই একপাশে ঘুমানোর চেষ্টা করছে জানালায় হেলান দিয়ে, আমার পাশে গীয়ারবক্সের শক্ত জায়গা, সেখানে বসায় সুবিধা হয়েছে একটাই, শাররিক অসস্তিতে ঘুমটা ঠিক মতো আসছে না। পেছনের ছেলেদের জাগানো হলো, সামনে ঘোর বিপদ সেনা দল সারারাত গান গাইতে হবে নইলে খবরই আছে।
সবাই ঘুমঘুম কণ্ঠে গান গায় তবে বেশিক্ষন সুবিধা করতে পারে না, একটু পড়েই কণ্ঠ জড়িয়ে যায়, গাড়ী চলছে, চৌহান বেচারা বললো এক সিগারেট দো, জ্বালিয়ে সাথে সাথে দেই, আমাদের সাক্ষাৎ ভগবান এখন চৌহান, ওর হাতেই জীবন মৃতু্যর চাবি কাঠি। একসাথে গল্প করি, বেচারাদের পারিবারিক কোম্পানি, ওরা 3 ভাই এখানে আছে, গাড়ীর সামনে সাঁই বাবার ছবি লাগানো, বেচারা বিয়ে করবে, ইয়ার আঁখ বান্ধ করিও মাত,
আবারও ঠেলে সোজা হই ।আরও একটা সিগারেট। আর চলছে না শরীর। কেয়া হুয়া উনলোগোকো? একটা বন্ধ হয়ে যাওয়া পেট্রল পাম্পের সামনে গাড়ী থামায়। আমি বুঝি নাই কোন লোগোকো কথা বলছে বেটা, বললাম সাব ঘুমারাহাহে। এটাই ভালো বাংলা শব্দকে একটা টুইস্ট দিয়ে হ্যায় লাগিয়ে দেওয়া। চৌহান বললো নেহী ইস লোেগো কি নেহী, বাসসে সিগন্যাল দেরাহা হে, অতঃএব সেই পেট্রেল পাম্পের ওখানে যাওয়া হলো। আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক ছুটছে। ঘটনা কি?
ঘটনা বিবি সাহেবার তলপেটে চাপ পড়েছে, এখন দল বেঁধে টয়লেট খুঁজো। পেট্রলপাম্পে টয়লেট আছে, তবে ওটা ভেতরে, কাঁচের এপাশ থেকে দেখে সান্তনা পেতে হবে। আশে পাশে স্থাপনা বলতে কিছু বাড়ী, তবে এই রাত 2টায় তাদের ডেকে উঠানো কোনো সমাধান না, শায়লাও নেমেছে, তারও প্রয়োজন, আমরা দল বেঁধে এদিক ও দিক যাচ্ছি, সাম্ভাব্য কানা গলি, ঘুঁপছি সব দিকেই নজর রাখছি, একটা চার দেয়ালের আড়াল হলেই হয়। আমাদের ম্যাডাম হালকা হলেই আমরা খুশী।
বিভিন্ন দিকে থেকে আশাহত হওয়ার খবর আসছে, কোথাও একটু আড়াল নেই। আর এসব জায়গায় একটা মসজিদ খুঁজে পেলেও হতো, তবে মসজিদ এই কাফেরদের দেশে পাওয়া যাবে না।
অবশেষে একটা জায়গা খুঁজে পাওয়া গেলো, সবাই বেশ আনন্দচিত্তে হালকা হয়ে ফিরছে, আমার সাথে শায়লার দেখা হলো।
আসলেই তোমার কথা ঠিক, এর পর তোমার কথা মনে থাকবে। আসলে ওকে বেশ কড়া করে একটা দার্শনিক কথা বলেছিলাম, এইসব লোকলজ্জা, এইসব শুচিতা শোভনতা সব কিছু আমাদের মাথার ভেতরে থাকে, মাথার ভেতরে থাকে বলেই আমরা একা বাসায়ও টয়লেটের দরজা লাগিয়ে মুতি। তবে হোয়েন ইন রোম বি এ রোমান, যেখানে যেমন ব্যাবস্থা সেখানে সেভাবেই আচরণ করতে হবে। আর তোমাকে দেখার জন্য উৎসুক হয়ে কেউ বসে নেই এটাও মাথায় রাখবে। অবশ্য কোনো মেয়ের সাথে এই মুতামুতি বিষয়ক আলোচনায় সামান্য অসস্থি চলেই আসে। এই সারাটা ক্ষন কি ভয়ংকর কষ্টে ছিলাম বলতে পারবো না তোমাকে, বাস একটু ঝাঁকি দেয় তো মাথায় গিয়ে লাগে সবটাই, এর পর আর এসব ভাববো না মোটেও।
আমি হাসি মুখে বললাম, গরীবের কথা বাসী হইলে ফলে এইটা মনে রাখবা।
সবাই উঠার পর আবার রওনা হলো বাস, সম্ভবত চন্ডিগর, এর পর পাঞ্জাব, এর পর হিমাচল। অনেক দুর যেতে হবে। বহুদুর যেতে হবে, পথের এখনও অনেক রয়েছে বাকি। সামান্য অবসরে সবাই আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে, সোনিয়ার করুন আর্তিতে শমিককে যেতে হয়েছে বাসে, ওর কথা হলো তোদের সব আছে, আমাদের কি আছে বল। আমরা কি নিয়ে থাকবো, আমাদের শমিককে দে, লুকুও এখানে, মর্তুজও এখানে, আমার জসিম ডার্লিং জামাল ডার্লিংও এখানে, আমাদেরও এন্টারটেইনমেন্টের প্রয়োজন আছে। তাই শমিক চলে গেলো বাসে, সেখানে কে আসলো এখন মনে পড়ছে না।
সবাই চাঙ্গা হয়ে গান ধরেছিলো, ওটাও ম্রিয়মান হয়ে গেছে। আবারও নিস্তদ্ধতা। আমি বিভিন্ন ভাবে বেঁকেচুড়ে নিজেকে স্থাপন করার চেষ্টা করছি তবে সফল হচ্ছি না কোনো টাতেই। এভাবেই পথে পড়লো মোহালী, ভারতের প্রথম প্লানড সিটি। এখানের সব কিছুই আর্কিটেকচারের পরামর্শে বানানো, কোনটার আকৃতি কেমন হবে, কোনটার পরে কি থাকবে, আধুনিক একটা শহর তৈরি করা হয়েছে এখানে। চমৎকার প্রশস্ত রাস্তা। ওয়েলকাম টু মোহালি লেখা সাইনবোর্ড। রাস্তার দুপাশে বনায়ন কর্মসুচির গাছ লাগানো। নির্দিষ্ট দুরত্ব পর পর, গাড়ী চলছে, বিন্দুমাত্র ঝাঁকুনি অনুভব করছি না, রাত গভীর হয়েছে অনেক, অনেক কষ্টে চোখ মেলে আছি, দৃষ্টিবিস্ফোরিত করে দেখা যাকে বলে। এই সেই মোহালি স্টেডিয়াম, ভারতের একমাত্র পেসারদের জন্য বানানো হার্ড পিচ,এখানেই ভারত হারলো ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে, ওটার পাশ দিয়ে যাচ্ছি এখন। রাস্তার দুপাশ বদলে যাচ্ছে। রাত 4টা বেজেছে, চৌহান গাড়ী বোধ হয় বেশী জোড়ে চালিয়েছে, পেছনে বাসের টিকি দেখা যাচ্ছে না, এটা নিয়ে চৌহান একটু চিন্তিত, মেরে ভাই মুঝকো মার ডালেগা, উ বোলাথা হর ওয়াক্ত উসকে পিছে রাহনেকো।
অবশেষে একটা ধাবায় গাড়ী থামলো। সেখানে একদল দোহাতী বসে আগুন পোহাচ্ছে, কনকনে শীত, আমরাও আরমোড়া ভাঙতে ভাঙতে সেই আগুনের পাশে দাঁড়াই, বোধ হয় এটাই সভ্যতার রীতি, আমাদের অতি অতি অতি পূর্বপুরুষও এভাবেই আগুনে পোহাচ্ছিলো ওটাই জমায়েতের আকর্ষন ধরে রাখে। চা নিয়ে আসা হয়েছে, এখানে আসার পর আসলে 11 হিসাবে চলছে সব। চা 11 কাপ, খাবার টেবিলে লাগালে 11টা প্লেট। চৌহান প্রথম দিন একটু গাঁইগুঁই করেছিলো, এখন আর কিছু বলে না।
আমি সেই দোহাতির সাথে কথা বলার চেষ্টা করি, আপকে ঘার কিধার হ্যায়।
বাহুত ঠান্ড পড়ি হে হ্যায় না।
আমার হিন্দি ছবি দেখা ভোকাবুলারি দিয়ে ঠিক কাজ চলছে না তবে সেই 2 জন বৃদ্ধ বেশ আগ্রহ নিয়ে কথা বলছে,
কাঁহা সে আয়ে হো তুম?
বলি বাংলাদেশ, তোমাদের পাশের দেশ। বন্ধুরা আসছি, একটা সময় বাসটা আমাদের সামনে দিয়ে এগিয়ে গেলো। আমরাও রওনা দিলাম সেখান থেকে, আগুনের উত্তাপ আর স্বাধীনতা বাদ দিয়ে সেই সুমোকারাগারে ঢুকতে হবে।
অবশেষে পাহাড়ের দেখা পাওয়া যায়। উঁচু হচ্ছে রাস্তা, কুয়াশা বাড়ছে ধীরে ধীরে, গাড়ি সাবধানে চালাচ্ছে চৌহান।এভাবেই ভোর 6টায় আবার আমরা বাস হারিয়ে ফেললাম। এই শিখদের জবাব নাই, সারারাত দোকান খুলে রেখেছে, ওদের ধাবায় প্রতিদিন কতমানুষ আশ্রয় নেয় কে জানে। সবার জন্যই গরম খাওয়ার ব্যাবস্থা আছে, কোনো আমিষ নেই, গরু, খাসি, মুরগি কিছু নেই, আছে শব্জি আর পনির, ডাল পনির, আর তন্দুরি। সাথে সেই 12 মশলার চা। অতিরিক্ত মিষ্টি, ঠোঁট আঠা হয়ে থাকা চা।
ভোর হয়েছে কিনা বুঝা শক্ত, এমন কুয়াশার চাদর চারপাশে, অবশেষে খবর আসলো পেছনে এক জায়গায় কুয়াশার কারনে আটকে পড়েছে বাস, ওটা সামনে আসতে দেরি হবে। লিটু ভাই দোকানির কাছে একগাদা খবরের কাগজ নিয়ে রওনা হলো। আমি অবাক, এই লোক শালার হিন্দি বলতে পারে না, হিন্দি পেপার নিয়ে কি করবে।
জিজ্ঞাসা করলাম, বস কি ব্যাপার পেপার দিয়া কি করবেন, বললো কাজ আছে, আসতেছি একটু পরে। আমি তাকায়া আছি, আশফাক বললো লিটু ভাই টয়লেটে গেছে, বড় কাজ করতে, আমি আরও আশ্চর্য এখানে, কোথায়, পাহাড়ের উপরে একটা বাসা,
লিটু ভাই ফিরে আসলো গুনগুন করতে করতে, আশফাক গেলো এর পর। সেও গুন গুন করতে করতে ফিরলো। আমিও বেশ কিছু কাগজ নিয়ে রওনা দিলাম, পাহাড়কে উর্বরা করে তোলার বাসনা নিয়ে, খুব সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে, আসলে এখনে প্রকৃতিপ্রেমিকের সংখ্যা অনেক বেশি, সবাই সার দিয়ে গেছে, ওসব বাঁচিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। এর সাথে আবার লোকেশন বাছাই করার বিষয় আছে, সামনে উন্মুক্ত রাস্তা, সকালের আলো ফুটছে ধীরে ধীরে, এসময়ে যদি নীচ থেকে কেউ দেখে - আসলেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা এটা। অবশেষে অনেক খুঁজে একটা আড়াল পাওয়া গেলো। সেখানেই গান গাইলাম কিছু ক্ষন মনের সুখে। উপরে একজনের কথা শোনা যাচ্ছে, হে ধরনী দ্্বিধা হও বলার সুযোগ দেবে কি দেবে না কে জানে। না , নীচে না নেমে উপর দিয়েই হেঁটে গেলো। আমিও আটকে রাখা নি ঃশ্বাস ফেললাম। এর পর পরিস্কার হওয়ার পালা, কোনো মতেই কাগজ দিয়ে পরিস্কার করে সস্তি পাচ্ছি না, একটা সার্বক্ষনিক অশুচি ভাব , শরীরটা ঘিন ঘিন করছে। যাই হোক, আশে পাশে কোথাও পানি নেই, ঘাসের উপর জমা হওয়া শিশির সেঁচে সাগর বানানো সম্ভব না। বেশ কিছু ক্ষন শিশির জমানোর চেষ্টা করে অবশেষে হাল ছেড়ে প্যান্ট চাপিয়ে নিচে নামলাম।
মনে উসখুশ, একটা গোসল না দিলে এই অসস্তি যাবে না। যদিও আন্ডার ওয়্যার পরনে, মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম পরবর্তি একজায়গায় এই আন্ডার ওয়্যার ফেলে দিতে হবে, ওটা মাথায় ঢুকে বসে আছে আমার। অনেকক্ষন হাত ধুয়েও সেই অসস্তি কাটলো না। বিমর্ষ মুখে সিগারেট টানছি আর অপেক্ষা করছি কখন কুয়াশা কেটে বাস আসবে সামনে আমরা রওনা দিবো মানালি অভিমুখে।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০০৬ রাত ১১:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



