বাস রওনা দিলো অবশেষে, গোনাগুনতিতে আমার নামই প্রথমে আসে, লিটু ভাই সেই ট্রেনের ঘটনার পর থেকে আমাকে চোখের সামনে না দেখলে বেশ চিন্তিত হয়ে যায়, সমস্ত দলের ভেতরে একমাত্র আমাকেই তার পোটেনশিয়াল নিরুদ্দেশ হওয়ার ক্ষমতার অধিকারি মনে হয় সম্ভবত, তাই প্রতিবাস বাসে চড়ার আগে রোলকলের আসর বসে, আমরা 1,2,3,4 এরকম ভাবে চিহি্নত ছিলাম, সে মোতাবেক সাড়া দিয়ে বাসে উঠি। অবশ্য জীপের যাত্রিদের 10 জনের হিসাব করা সহজ বাসের 42 জনের হিসাব করা কঠিন। এবার লিটু ভাইয়ের চেঁচামেচিতে জীপের সীট থেকে নিচে নামতে হলো, কি ব্যাপার ভাই এত ডাকেন ক্যান, আমি তো ভিতরে, পুরা ভিতরে গেছি গা।
বাস পাহাড়ের পথে রওনা দিলো, আরও উপরে উঠছে, আমি যে রাস্তা পর্যন্ত উঠবো বলে মনস্থির করেছিলাম সে রাস্তায়ও বাস আসলো, সেখানেই শেষ না আরও উঁচু পাহাড় আছে, সেই ধাপের পর আরও ধাপ। অনন্ত কাল ঘুরপাক খেতে খেতে উপরে উঠছি তো উঠছি, এই স্বর্গারোহনের শেষ নেই কোনো। একবার তপুর সাথে রিকশায় ছিলাম, রিকশা ওয়ালা পথ চিনতো না তবে সওয়ারি নেওয়ার সময় এই কথা বলে নি, সেই রিকশা চলছে তো চলছেই, এই গলি দিয়ে সেই গলি হয়ে আবার আগের রাস্তায় ফিরে আসে, আবার নতুন একটা গলি খুঁজে পায় সেখানে ঢুকে পরে, আবারও আগের রাস্তায় ফিরে আসে,কিছুক্ষন পর তপু রিকশাওয়ালের জিজ্ঞাসা করলো ভাই আপনি চিনেনতো ঠিক মতো?
রিকশাওয়ালা সুপারস্মার্ট বলে হ চিনুম না ক্যা আমারে বরিশাইল্যা ভাবছেন।
তাইলে এইরকম সিলাই করতাছো ক্যান রাস্তা-
রিকশাওয়ালা থতমত খায়, তপু এর পর ডিরেকশন দেয়, সোজা যাইবা, গিয়া হাতের বামে গলি ধইরা আগাও, ঐটার সামনে মাঠ, ঐ খানে নামায়া দিলেই হবে।
সেই জায়গায় আসার পর রিকশা ওয়ালা ভাব নিয়ে বলে মিয়া ডাক্তরবাড়ীর পাশে আইবেন কইলেই তো হইতো।
আমাদের এটা ঠিক সেলাই করা পর্যায়ে নাই, আমরা উলের গুটলি পাঁকানোর মতো উপরে উঠছি, একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর দু পাশের পরিবেশ বদলে যায়। তখন শুধু পাহাড়ী গাছেদের সারি, এবং নানা রংয়ের পাথর ,কত বৈচিত্রপূর্ন হতে পারে পাথরের রং এটা বোঝা হয় রেললাইনের ওখানে গেলে আর পাহাড়ের উপরে উঠলে। সেইসব পাহাড়ী গাছের রং উজ্জল সবুজ, লালচে, বেগুনী, পুরা কালার রায়ট শুরু হয়ে গেলো। এই শব্দটা অবশ্য লিটু ভাইয়ের জবানি থেকে ধার করা, আমাদের কার্জন হলের মালীরা করিতকর্মা, তারা প্রতিবার শীতের সময় মৌসুমী ফুল লাগায় কার্জন হল জুড়ে, সেই ফুলের প্লাবন লাগে সমস্ত কার্জন হলে, এর পর বসন্ত আসে, কার্জন হলের গেটের সামনের স্বর্ণচুড়া উজ্জল হলুদ হয়ে জ্বলে, সেই সাথে মরচে ধরা ল্যাম্প পোষ্টের উপরে বাঁকা হয়ে অদ্ভুত নীল রংয়ের ফুল ফুটে, এই পুরা সময়টাকে এককথায় লিটু ভাই নামকরন করছে কালার রায়ট, এখন পাহাড়ের গায় সে রকম কালার রায়ট।
আমাদের জীপ ছুটছে নিজের আনন্দে, জীপের জানালা দিয়ে দুপাশের দৃশ্য গিলছি হাভাতের মতো, আবার কোনো দিন এমন পাহাড়ে আসা হবে না, এমন অদ্ভুত অদ্ভুত ফুল, গাছ-পাতা দেখা হবে না, দেখা হবে না এই নদিটাও, স্বচ্ছ জলের নদী, পানি ঝকঝক করছে, নীচের পাথরে বাড়ি খেয়ে পানি ছিটকে পড়ছে চারদিকে, কিছু পানি রাস্তায় চলে আসছে বাতাসের তোড়ে, অদ্ভুত সম্মোহনী দৃশ্য। আমাদের গন্তব্য কুলু, ওখানে গরম কাপড় সস্ত, বিশেষ এক ধাঁচের উল তৈরি হয় এখানে, খরগোশের লোম থেকে, অঙ্গুরি কিংবা আঙ্গুরি এই রকম কিছু নাম হবে, আমার সারা জীবনের সোয়েটার বাবাদ বরাদ্দ ছিলো 500 টাকার মতো, এসব দামী সোয়েটার কেনার টাকা হয় নি, তবে ঢাকার বাজারে এসব সোয়েটারের দাম 1500 থেকে শুরু হয়, কোয়ালিটি ভালো হলে সেটার দাম 2500 থেকে 3000 ও যেতে পারে, আমি আদার ব্যাপারী এসব দামি সোয়েটারের খবর নিয়ে কি করবো?
পাহাড়ে মেঘ ঘুরে কথাটা সব সময় সত্য না, এখানে একেবারে শুকনো আকাশ, শীতের সময়টাতে রাতের ঠান্ডায় সব শিশির নিচে পড়ে, সেখান থেকে বাস্পিভূত হয়ে হিউমিডিটি বাড়তে বাড়তে বিকেল হয়ে যায়, এখন সকালে হিউমিডিটির পরিমান খুব কম, দুপুরের রোদ গায়ে পড়া মাত্রই চিরবিড় চিরবিড় করে চামড়া। দুপুরের খাওয়া হবে কোথায় জানি না, কিছু একটা বন্দোবস্ত হবে নিশ্চিত, আপাতত প্রাকৃতিক দৃশ্য খেয়ে প্রাণ ভরাই। আমাদের সিগারেট হাতের মধ্যে নিশব্দে পুড়তে থাকে, আমরা সিগারেট টানার কথা ভুলে যাই, সৈন্দর্য আমাদের বিবশ করে ফেলে। সেই একটা নদীকে পাশ রেখে আমরা চলছি, অবশেষে এক জায়গায় জীপ থামালাম। আমাদের জীপ আমরা যখন ইচ্ছা থামাতে পারি, যেখানে ইচ্ছা থামিয়ে মুততে পারি, তবে এবারের থামানোর কারন ফটো সেশন, একটু উপরে উঠে ছবি তোলা হলো, আমরা সবাই মেটালিকার বিখ্যাত পোষ্টারের অনুকরনে জিন্সের পকেটে হাত গেঁথে ছবি তুললাম, একটু সিগারেট টেনে, একটু নীচে নেমে নদি ছুঁয়ে আসা। আবারও গাড়ী চলছে সামনে,
কুলুতে পৌঁছালাম বিকেলের মাঝামাঝি সময়ে। পাশাপাশি 2টা দোকান, সে দোকানেই গাড়ী থামানো হলো, আমাদের ক্রয়পাগল জনগন ঝাঁপিয়ে পড়লো দোকানে, আমিও ঢুকলাম সবার সাথে, বিশাল দোকানের এ মাথা থেকে ও মাথা শুধু সোয়েটার আর শাল, 100 থেকে শুরু করে 1500 রুপির শাল আছে এখানে, সোয়েটারের দাম 800 রুপি থেকে 2000 রুপি, আরও বেশী ছিলো হয়তো, আমি বুকে হাত দিয়ে উলটে পড়তাম তবে পড়লাম না, দেখলাম সবাই এই দামেই সন্তুষ্ট, আমার পরনে 150 টাকা দামের একটা জ্যাকেট, বঙ্গ থেকে কেনা, সেটা নিয়ে লজ্জায় পেছনে চলে গেলাম। পেছনে খরগোশ, হাজার খরগোশ খাঁচায় বন্দি, উল তৈরি হয় ভেড়ার লোম দিয়ে, অবশ্য সিনথেটিক উলও আছে বাজারে, আর এই আঙ্গুরি উল তৈরি হয় খরগোশের লোম দিয়ে, ভেড়ার লোম যেমন ছেঁটে ফেলা হয় এভাবে ছেঁটে ফেলা হয় কিনা খরগোশের লোম জানি না, তবে খরগোশের লোম ছেঁটে ফেলার যন্ত্রটা নিশ্চিত ভাবেই খুব ভালো মানের হতে হবে, খরগোশের লোম বড়জোড় 1 সেন্টিমিটার হয়, এই লোম কিভাবে উল বানানোর কাজে লাগে জানি না। বিভিন্ন জনের সাথে তাত্তি্বক আলোচনা হয় এই বিষয়ে, রেশমের সুতার বানানোর প্রক্রিয়া জানি, রেশমের গুটি হলে সেটাকে সিদ্ধ করে সুতো খোলা হয়, এবং কাজটা করতে হয় রেশম পোকার গুটি তৈরি পরে আকটা নির্দিষ্ট সময়ে, যদি গুটি কেটে পোকা বের হয়ে যায় তাহলে সুতা বরবাদ, তাই একটা হাইবারনেশন আর মেটামরফেসিস পিরিয়ডের মাঝামাঝি সময়ে সেই পোকাটাকে স্বপ্নের ভেতরে সিদ্ধ করে ফেলানো হয়, আমরা কত ভাবেই না পোকা এবং পশুদের যন্ত্রনা দেই। আমি ঠিক প্রানীপ্রেমিক কেউ না, তবে এভাবে বিলাসিতার জন্য প্রানী নিধন বা প্রানীদের ন্যাংটো করে ছেড়ে দেওয়াটা ঠিক মানতে পারি না, আঙ্গুর ফল টক বিষয়টা প্রযোজ্য হতে পারে হয়তো।
আমি আরও একজনের সাথে আলোচনা শুরু করি যদি বাল দিয়ে উল বানানো হতো তাহলে ঐ সোয়োটারের দাম ক্যামোন হতো, এই পরিমান বাল সংগ্রহ করা আদৌ সম্ভব হবে কি না,যদি কেউ খরগোশের লোম দিয়ে উল বানাতে পারে তবে সেই বেটা বাল দিয়াও উল বানাতে পারবে, এর ভিত্তিতে কার কেমন মুল্য হতে পারে এটাও হিসাব করা হয়, সবাই তো আর সমান বালের সম্রাজ্য নিয়ে জন্মায় না, অবশেষে সবচেয়ে দামি স্যাম্পল ধরা হয় তমালকে,ওর গা ভর্তি লোম, যা গায়ে এত লোম তার......।
এই দোকাংুলোর পেছনেই সেই নদি, আমরা সেই দোকানে খাওয়ার খাই, পেছনের নদির পাশে টেবিল সাজানো, শীত শীত লাগে, এটা প্রাকৃতিক কারনে, গাড়ি দেখলে খোঁড়া, আর নরুন দেখলেই নখ বড় হয়ে যাওয়ার বিষয় না এটা, পাহাড়ের উপরে ঠান্ডা ভালোই পরে, আর ডিসেম্বর এ গোলার্ধে স্ব ী কৃত শীতের কাল। সবাই শাবানা আর অঞ্জু ঘোষ হয়ে নদিতে নেমে যায়, মেয়েরা সালোয়ার গুটিয়ে নামে ছেলেরা প্যান্ট উঠিয়ে নাম নদিতে, অবশ্য আমি একবার হাতে ছুঁয়ে দেখেছি, ভয়ংকর ঠান্ডা, এখানে এসব পাগলামির মানে হয় না কোনো। আমি পাথরের উপর দিয়ে হাঁটি, নদীর গভীরতা এখানে বড়জোর 1 ফুট থেকে 2 ফুট হবে, তবে পাহাড়ি নদী ভিষন রকম স্রোত, একবার যদি কেউ বেকায়দায় পড়ে, সামলে উঠতে উঠতে ভেসে যাবে 100 গজ, অবশ্য পাথরের সংখ্যা আরও বেশী, মুল নদী বোধ হয় এই পাথর সম্রাজ্যের পরে, পাথরে পাথরে হেঁটে মাঝ নদিতে চলে আসি, গর্জন করে নদী ছুটছে, এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে ছবি তোলা হবে না এমনটা বোকামি, শমিক ক্যামেরা সেই ক্লিক শুরু করেছে আর থামে না। আমি সামনের পাহাড়ের চুঁড়ায় গাছে আড়ালে দেখি লাল বলের মতো সূর্য ডুবছে, অনেক কায়দা করে গাছের ডালের মাঝে সূর্য কে স্থাপন করি পাথর বদলে বদলে, ফ্রেম ঠিক করে শাটারে চাপ দেই, এখন ছবি উঠলেই হয়, সরাসরি সূর্যকে তাক করে ছবি তুললে ফ্লিম জ্বলে যায়, ফিলটার সাথে ছিলো না শমিকের তাই আল্লাহ ভরসা। অবশ্য দোয়াদরুদে লাভ হয় নি কোনো, রোজা না রাখা পাপী বান্দাদের ফারিয়াদ শুনে নাই, ছবি 2টার একটাও উঠে নাই।
সবাই যে নদিতে নেমেছে এমনও না, কিছু মানুষ তখনও নদীরপ াড় থেকে খবর নেয়, আচ্ছা ওখানে গেলে ক্যামোন লাগে? এইসব ইতরামির জবাব দেওয়ার কোনো মানে নেই।
কেনাকাটা শেষ হলো, একেকজন হাজার- দু হাজার টাকার জিনিষ কিনে বাসে উঠছে, আমি শালার চিরগরীব মানুষ, আমার বিলাসিতা বলতে চায়ের সাথে একটা বেনসন সিগারেট,এ সব বিদেশি জিনিষ কেনা আমার বিলাসিতার মধ্যে পড়ে না।
বিকালের অবসানে আবার বাস চলা শুরু করলো। শমিক বাসের জানালায় উপুর হয়ে দেখছে দৃশ্য।অবশ্য দুপাশেই দেখার মতো অনেক কিছুই আছে, এসব দৃশ্যের বর্ননা সম্ভব না, এসব দেখার আর অনুভব করার। পাহড়ের দুই পাশে বাসা, সন্ধ্যার সময় সেসব বাড়ীতে সাঁঝবাতি জ্বলে, সমস্ত পাহাড়ের দেয়াল জুড়ে আলো জ্বলে, মনে হয় কেউ মোমবাতি জ্বালিয়ে রেখেছে পাহাড়ের বুকে, অসংখ্য মোমবাতি জ্বলছে, অবশ্য এই সব দৃশ্য বর্ননা করার মতো সাহিত্যক্ষমতা আমার নেই, তাই যারা আগ্রহী তাদের নিজ উদ্যোগে যেতে হবে এ দৃশ্য দেখতে।
অবশেষে আমরা মানালি পৌঁছালাম, আমাদের সর্বউত্তরের গন্তব্য, যদি কপাল ভালো থাকে তুষারপাত দেখতে পাবো। রাস্তায় শীর্ন একটা পানির স্রোত জমে বরফ হয়ে আছে এই দেখেই আশাবাদী হয়ে উঠি, রাতে বরফ পড়বেই পড়বে, তাপমাত্রা 0 এর নীচে এখানে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



