তারাশংকর পড়তে গিয়ে মনে হলো কথাটা- মানুষের মৌলিক বিশ্বাস শিক্ষার প্রলেপে মুছে ফেলতে চাইলেও সদিচ্ছা প্রয়োজন। তারাশংকর গল্প লিখেন ভালো- কবিগুরুর কিংবা মোহিত লালের ভাষ্যমতে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির গল্প লেখক। ছোটো গল্পের চটক আছে তার। প্রতিটা গল্পেই একটা চমক থাকে, বক্তব্য থাকে তবে মোটের উপর লেখক মানুষটার মৌলিক বিশ্বাসের জায়গাটা পরিশীলিত নয়, বরং মধ্যযুগীয় ববর্র। নেহায়েত অশিক্ষিত ভাবনা নিয়ে বয়ে চলা নর্দমার মতো।
লেখার ক্ষমতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই আমার, তার মতো কয়েকটা গল্প লিখতে পারলে আমি বর্তে যেতাম নিঃসন্দেহে -তবে তার গল্পের মোরাল আর মেসেজ নিয়ে আমার আপত্তি- আপত্তিটা আরও চরমে উঠলো তার 'সন্তান' গল্পটা পড়ে।
সংক্ষিপ্ত জীবনিতে জানলাম- ধর্মপ্রাণ মানুষ তিনি- নর্দমার উৎস জানলাম, জেনে বাধিত হলাম। তবে যেকোনো কারণেই হোক এসব ভক্ত মানুষের অন্যকে জানানোর একটা বক্তব্য থাকে। ভালো হয়ে চলো জাতীয় সদুপদেশ। একটা 'সারমন' ভঙ্গি থাকে লেখার ভেতরে।
তবে সন্তান পড়ে ঘৃনায় মুহ্যমান হলাম।
গল্পের বিষয়বস্তু হলো- শাররীক ভাবে বিকলাঙ্গ একজন মানুষ- কোন কারণে এই বিকলাঙ্গতা এসেছে তা কোনো ভাবেই পরিস্কার নয় যেহেতু- নেহায়েত জেনেটিক কারণেই এই বিকলাঙ্গতা কিংবা বিধির বিধান- এখানে লেখকই বিধাতা- কোনো কারণ নির্দেশ না করেই বিকলাঙ্গতা, কুৎসিততা, কদাকার রূপ পরিগ্রহ করতে পারে- তার কলমের ছোঁয়ায় এমনটা ঘটতেই পারে-
শাররীক বিকলাঙ্গতার জন্য তার প্রথম স্ত্রী তাকে ত্যাগ করে- পরবর্তী স্ত্রী গ্রহনের উদ্যোগ - এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে কোনো এক বাসায় গৃহভৃত্যের কাজ শুরু করা-
বিষয়টা অশালীন হলেও সত্য- আমাদের ভেতরে অনেক কুৎসিত প্রবণতা বিদ্যমান- আমরা সামাজিক ভাবে এসবের চর্চাও করি নিয়মিত- এমন কুৎসিত আচরণ হলো- আমাদের শাররীক বিকলাঙ্গতা দেখলে হাস্যরস উঠলে উঠে- আমরা মানসিক বিকলাঙ্গ মানুষকে রাস্তায় তাড়া করি- তাদের গায়ে ময়লা ঢালি- আমরা যেকোনো বিকলাঙ্গ মানুষের সামনে নিজেদের সুপার ইগো প্রকাশ করে শান্তি পাই-তার বিকলাঙ্গতাকে অসম্মান করে তাকে কৌতুকপ্রদ রুপ দিতে চাই- আমরা তার বিকলাঙ্গতা নিয়ে উপহাস, পরিহাস করে কৃতার্থ হই- এখানেও সেই একই রূপ বিদ্যমান।
সেই বাসার খোকনকে দেখে তার বাৎসল্য রস জন্মায়। তার পিতৃত্বকামনা জাগে- যদিও সে শুধুমাত্র সেই খোকনের মুখে বাবা ডাক শুনতে চেয়েছিলো তবে এই অপরাধে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
সুশ্রী কন্যা পাওয়ার জন্য সে ধর্মত্যাগ করে একজনকে বিবাহ করে। অবশেষে সেই কন্যা সন্তানসম্ভবা হয়- সন্তান প্রসব করে-
ঘটনার মূল চমক আর মৌলিক বিশ্বাস থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাটা এখানেই। একজন কুৎসিত কদাকার বিকলাঙ্গ মানুষের বাৎসল্যবোধকে নিয়ে উৎকট রস সৃষ্টি হয় কারণ লেখক এর পরেই কদাকার অশিক্ষিত একটা সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন।
লেখক বিধাতা- তিনি ইচ্ছা করলেই দিনকে রাত রাতকে দিন করতে পারেন- তিনি ইচ্ছা করলেই রূপ আর সম্পদের ভান্ডার খুলে দিতে পারেন- তিনিই সর্বজ্ঞ- তিনিই আদি- তিনিই অনন্ত-
আঁতুর ঘরে ঢোকার কোনো প্রচলন ছিলো না একটা সময়ে বাংলাদেশে- সেখানে শুধুমাত্র মহিলারাই প্রবেশ করতে পারতেন- ফুল পড়ে যাওয়ার পর সেটা পুঁতে আঁতুরের রীতি সমাপ্ত করে সন্তানকে নিয়ে গৃহে প্রবেশ করতেন-
এরপর 'কামান' হবে, আকিকা হবে- নাড়ী শুকিয়ে গেলে একটা অনুষ্ঠান হবে- এত কিছু হওয়ার পর কিংবা একটু শক্তপোক্ত হওয়ার পর বাবা সন্তানকে কোলে নেওয়ার সুযোগ পাবেন-
তবে তারাশংকর বুড়ো হাবরাদের দেখলেও বোধ হয় শিশু সদ্যভুমিষ্ঠ শিশু দেখেন নি। কিংবা সেই শিশু যখন বসতে শিখে তার আগেও তিনি দেখেন নি কোনো শিশু-
বেঁচে থাকলে তাকে বলতাম দৃষ্টি মেলে দেখুন দাদা -গাঁজার কলকে হাতে শিবনেত্র হয়ে থাকলে চলবে ?
জন্মের প্রথম বছরে শিশুর হাত আর পায়ের গড়ন স্বাভাবিক মানুষের মতো থাকে না- অনুপাতটা হাস্যকর রকমের-সেটা স্বাভাবিক আকারে আসতে আসতে অন্তত 2 বছর লাগে- একটা শিশু ছোটো মানুষের প্রতিলিপি হয়ে উঠতে এমন 20-22 মাস লাগে- এর পর তার যেকোনো বিকলাঙ্গতা শাররীক বা মানসিক প্রকাশিত হয় প্রকট ভাবে- তবে 15 মাসের আগে কোনো ভাবেই বলা সম্ভব না এই শিশু ভবিষ্যতে কি রুপ ধারণ করবে-
সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুদের গঠনে এমন বিকট বৈসাদৃশ্য থাকে না যা দেখে তার ভবিষ্যত বিকলাঙ্গতার ভবিষ্যতবানী করা যায়- তবে তারা শংকর মৌলিক বিশ্বাসী- বোধ হয় গাঁজার কলকেতে বীচি ফেলে ঝিমুচ্ছিলেন- তাই বৌয়ের গভ্ভ থেকে ঝড়ে পড়লো ছোটো মাপের নায়ক - তারই মতো বিকলাঙ্গ, কদাকার- এসে বললে বাবা দুদু খাবো-
শিশুর পায়ের মাপের বৈসাদৃশ্য ধরতে পারার মতো কোনো কারণ নেই-দৃষ্টির অগোচরে করূণ রস সৃষ্টির তাড়নায়, মানবিক আবেগকে বাড়ানোর জন্য নায়ককে দিয়ে তিনি শিশুহত্যা করলেন- কিংবা গল্প জমানোর জন্য নেহায়েত ভুল ভাবে হলেও লেখক শিশু হত্যা করলেন-
এরপর নায়ককে পাঠালেন পাগলা গারদে- সেখানে দেয়ালে উজ্জ্বল সব শিশুর পোষ্টার লাগালেন- নায়কের বাৎসল্য রসকে উৎকট ভাবে চিরঃস্বরণীয় করে রাখলেন।
কবিগুরু মরে বেঁচেছেন, তিনিই সাট্টিফিকেট দিয়েছিলেন- তারাশংকর তুমিই সেরা গল্প লিখিয়ে- তোমার মতো আর কাউকে তো দেখছি নে আশেপাশে- এই নাও তোমায় সোনার মেডেল পড়িয়ে দিলুম-
অবৈজ্ঞানিকতা হলো- জেনেটিক মিউটেশনের মাধ্যমে যে বিকলাঙ্গতা তা প্রকৃতি নিজেই শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করে- পুরুষের শরীরে তার মায়ের জিনের প্রভাব বেশী- এমন কি শুধুমাত্র পুরুষ হয়ে উঠার জন্য বাবার " ওয়াই " ক্রোমোজম আর মায়ের " এক্স" ক্রোমোজমের অনুপাত 50 % 50% হতে হবে এমন কোনো কথা নেই- এমন কি যদি সেটা 10 : 90 হয় এর পরও ভুমিষ্ট সন্তান পুরুষ শিশু হিসেবেই জন্ম নেবে এবং দিব্যি সঙ্গম করে সন্তানও জন্ম দিতে পারবে-
তারা শংকর নমস্য। তার বীচি গাঁজার কলকেতে ফেলে যে অপরাধ করেছি সেটাও মার্জনীয়-তবে অহেতুক ভাবরস তৈরি করতে গিয়ে তিনি যা করেছেন সেটা অমার্জনীয় অপরাধ-
গলায় রূদ্রাক্ষ আর কপালে চন্দনের ফোঁটা দেখলে আমাদের গুহ্যদ্বার থেকে গলা অবধি ভক্তি রস থই থই করে-
টুপি- দাড়ি আর কপালের কালো দাগ দেখলে আমাদের শিশ্ন ভেজা বেড়ালের মতো মিইয়ে যায়-আমাদের বিবেচনা বোধ রাস্তার নেড়ী কুত্তার মতো করূণ বিলাপ করে- এই অবসরে ভক্তিরসের যোগন দিয়ে যান অনুভূতীশীল মানুষেরা- তারা নিজস্ব ভালো আর মন্দের সংজ্ঞা -ইহকাল আর পরকালের হিসাব- পূর্ব জন্ম পরজন্মের পাপের ফসলে ভরে তুলের সাহিত্যের গোলা-
মানুষের নিজস্ব বিশ্বাসের জায়গাটা কি রকম হবে তা আসলেই নির্ধারিত নয়- সেই মধ্যযুগে ধর্মীয় আবহে অনেক লেখা হয়েছে- সেখানে লেখকদের ভক্তি রসের তাড়না দেখা গেছে- সেসব নিয়ে আমরা আলোচনাও করছি না এখানে-
এই অবস্থান আসলে দ্বন্দ্বিক উত্থানের অবস্থান-
আমার সিদ্ধান্তের আনতি কোথায় হবে তা পূর্ব নির্ধারিত কিংবা পূর্বানুমিত নয় বলেই আমাকে একটু সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত খুঁজতে হয়- কোনো অবস্থানই চিরকালীন নয়- কোনো কিছুই আসলে মানুষের মানসিকতাকে তেমন ভাবে বদলাতে পারে না- মানসিক প্রেষণার স্বরূপ নিয়ে কাজ চলছে- এসবের উৎস কিংবা আমাদের ভালোলাগা মন্দলাগার কোনো ব্যকরণ এখনও বাজারে আসে নি- আমি নিজের অনুভব লিখছি বলেই আমার কাছে বিষয়টা গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না- তারাশংকরের গল্প যাদের ভালো লাগে তাদের ভালো লাগাও আমার লেখার কারণে বদলাবে না বিন্দুমাত্র-
আমারও কপাল দোষে একজন এমন অনুভূতিশীল মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে- সেও কোনো না কোনো ভাবে এমন সব উদ্ভট বিশ্বাস নিয়ে বসে থাকে- আমার ভাষাজ্ঞান নিয়ে সে বিব্রত- সে খুবই দুঃখিত-
তার অনুভূতি আহত হয় বিধায় আমি সাদাকে সাদা বলিব না, কালো বলিব এমন মহানুভব এখনও হয়ে উঠতে পারি নি- তাকেও বলতে চাই গ্রো আপ- অনেক হলো- চারপাশ দেখে নিজের মনে হলো বলেই সেটা সত্যি এমন রবিঠাকুরীয় মতবাদের বাইরে এসে একটু দৃঢ় হয়ে দাঁড়াও-অনেক হলো- নাঁকি কান্না ছেড়ে পুরুষের মতো উঠে দাঁড়াও -নিজের ক্ষমতা আর অক্ষমতার দায়িত্ব নিতে শিখো-
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



